কজঙ্গল সম্বন্ধে তিনি বলেন, এ দেশের শস্যসম্ভার ভালো। পুণ্ড্রবর্ধনের বর্ধিষ্ণু জনসমষ্টি তাহার দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছিল, এবং এ দেশের শস্যসম্ভার ফলফুল যে সুপ্রচুর তাহাও তিনি লক্ষ করিয়াছিলেন। সমতট ছিল সমুদ্রতীরবর্তী দেশ; এ দেশের উৎপাদিত শস্য সম্বন্ধে তিনি কিছুই বলেন নাই। তাম্রলিপ্ত ছিল সমুদ্রের এক খাড়ির উপরেই; এখানকার কৃষিকর্ম ভালো ছিল, ফলফুল ছিল প্রচুর। স্থলপথ ও জলপথ। এখানে কেন্দ্রীভূত হইয়াছিল বলিয়া নানা দুপ্তপ্রাপ্য দ্রব্যাদি এখানে মজুত হইত এবং এখানকার অধিবাসীরা সেই হেতু প্রায় সকলেই বেশ সম্পন্ন ও বর্ধিষ্ণু ছিল। কর্ণসুবর্ণের লোকেরাও ছিল খুব ধনী, এবং জনসংখ্যাও ছিল প্রচুর; কৃষিকর্ম ছিল নিয়মিত ঋতু অনুযায়ী, ফলফুল-সম্ভার ছিল সুপ্রচুর। দেখা যাইতেছে, য়ুয়ান-চোয়াঙের দৃষ্টিও দেশের কৃষিপ্রাধান্যের দিকেই আকৃষ্ট হইয়াছিল, এবং সর্বত্রই তিনি উৎপন্ন শস্য-সম্ভারের উল্লেখ করিয়াছিলেন, এক সমতট ছাড়া। সমুদ্রতীরবর্তী এই দেশে স্বভাবতই কৃষিকর্মের অবস্থা হয়তো ভালো ছিল না। তাম্রলিপ্তির সমৃদ্ধির হেতু যে শুধু কৃষিকৰ্মই নয়, তাহাও তিনি লক্ষ কুরিয়ািছলেন, এবং সেই জন্যই এই দেশের অর্জবাণিজ্য ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রতি ইঙ্গিত করিয়াছিলেন।
এইবার কৃষিজাত কী কী শস্য ও অন্যান্য উৎপন্ন দ্রব্যাদির খবর আমরা জানি একে একে তাহার আলোচনা করা যাইতে পারে।
ধান্য
প্রথমেই প্রধান শস্য ধানের সহিত আমাদের পরিচয়। এই পরিচয়, আগেই বলিয়াছি, আমরা পাই খ্ৰীষ্টপূর্ব তৃতীয় হইতে দ্বিতীয় শতকের মধ্যে উৎকীর্ণ, প্রাচীন করতোয়া-তীরবর্তী মহাস্থানের শিলালিপিখণ্ডটি হইতে। ইহা একটি রাজকীয় আদেশ; রাজা অজ্ঞাত, এবং যে স্থান হইতে এই আদেশ দেওয়া হইতেছে, তাহার নাম অজ্ঞাত। তবে, অক্ষর দেখিয়া শ্ৰীযুক্ত দেবদত্ত রামকৃষ্ণ ভাণ্ডারকর মহাশয় অনুমান করেন, এবং তঁাহার অনুমান সত্য বলিয়াই মনে হয় যে, আদেশটি দিয়াছিলেন কোনও মৌর্য সম্রাট। আদেশটি দেওয়া হইতেছে পুন্দনাগলের (পুণ্ড্রনগরের) মহামাত্ৰকে, এবং তঁাহাকে শাসনোল্লিখিত আদেশটি পালন করিতে বলা হইয়াছে। পুণ্ড্রনগরে ও পার্শ্ববর্তী স্থানে সংবঙ্গীয়দের মধ্যে (অন্য মতে, ছবিগীয়—ষড়বগীয় ভিক্ষুদের মধ্যে) কোনও দৈবদুর্বিপাকবশত নিদারুণ দুৰ্গতি দেখা দিয়াছিল। এই দৈবদুর্বিপাক যে কী তাহা উল্লেখ করা নাই। এই দুৰ্গতি হইতে ত্ৰাণের উদ্দেশ্যে দুইটি উপায় অবলম্বন করা হইয়াছিল। প্রথমটি কী, তাহা হইতে হয়তো শিলাখণ্ডটির প্রথম লাইনে লেখা ছিল, কিন্তু ভাঙিয়া যাওয়াতে তাহা জানিবার উপায় নাই। তবে, অনুমান করা হইয়াছে যে, গণ্ডক মুদ্রায় কিছু অর্থ সংবঙ্গীয়দের (ছবিগগীয়দের?) নেতা (?) গলদনের হাতে দেওয়া হইয়াছিল, ঋণ হিসাবে। দ্বিতীয় উপায়ে রাজকীয় শস্যভাণ্ডার হইতে দুঃস্থ জনসাধারণকে ধান্য দেওয়া হইয়াছিল—খাইয়া বাচিবার জন্য, না বীজ হিসাবে, তাহা উল্লেখ করা হয় নাই, কিন্তু এই ধান্য-বিতরণও ঋণ হিসাবে। কারণ, এই আশার উল্লেখ লিপিখণ্ডটিতে আছে যে, রাজকীয় এই আদেশের ফলে সংবঙ্গীয়ের অথবা ছবিগগীয় ভিক্ষুরা বিপদ কাটাইয়া উঠিতে পরিবে, এবং জনসাধারণের মধ্যে আবার শস্যসমৃদ্ধি ফিরিয়া আসিবে। তখন গণ্ডক মুদ্রাদ্ধারা রাজকোষ এবং ধান্যদ্বারা রাজকোঠাগার ভরিয়া দিতে হইবে। এই শিলাখণ্ড হইতে স্পষ্টই বুঝা যাইতেছে যে, জনসাধারণের প্রধান উপজীব্যই ছিল ধান্য; দুৰ্গতি—দুর্ভিক্ষের সময়ও এই ধান্য ঋণ গ্রহণই ছিল জীবনধারণের উপায়। রাজাও সেই উপায়ই অবলম্বন করিয়াছিলেন; রাজকোঠাগারে দৈবদুর্বিপাক কাটাইবার জন্য ধন্যই সংগ্ৰহ করিয়া রাখা হইত। এই বিপদে রাজা ধান বিনামূল্যে বিতরণ করেন নাই, ঋণ-স্বরূপই দিয়াছিলেন-; অর্থও ঋণস্বরূপই দিয়াছিলেন, ইহা লক্ষণীয়।
পরবর্তীকালের অসংখ্য লিপিতে এই ধান্যশস্যের উল্লেখ সর্বত্র নাই; কিন্তু তাহাতে কিছু আসিয়া যায় না। ধন্যই ছিল একমাত্র উপজীব্য এই দেশের, এবং শস্য বলিতে ধান্যই বুঝাইত সর্বাগ্রে; তাহার নাম করিবার প্রয়োজন হইত না। এই ধান্য একান্তভাবে বারিনির্ভর; সেইজন্য অগণিত নদনদী-খালবিল থাকা সত্ত্বেও এ দেশের ছড়ায়, গানে, পল্লীবচনে নানা লোকায়ত ব্ৰত ও পূজানুষ্ঠানে মেঘ ও আকাশের কাছে বারিপ্রার্থনার বিরাম নাই; অতীতে ছিল না, আজও নাই। লক্ষণসেনের আনুলিয়া, তৰ্পণদীঘি, গোবিন্দপুর ও শক্তিপুর এই চারিটি তাম্রশাসনে একটি মঙ্গলাচরণ শ্লোক আছে; এই শ্লোকটিতে ধানোপজীবী বাঙালীর আন্তরিক আকুতি ধ্বনিত হইয়াছে মনে করিলে অনৈতিহাসিক উক্তি কিছু করা হয় না।
বিদ্যুদযাত্ৰ মণিদ্যুতিঃ ফণিপতেৰ্বালেন্দুরিন্দ্রায়ুধং
বারি স্বৰ্গতিরঙ্গিণী সিতশিরোমালা বলাকবলিঃ।
ধ্যানাভ্যাসমীরণোপনিহিতঃ শ্রেয়োহঙ্কুরোদ্ভূতয়ে
ভূয়াদ বঃ সা ভবার্তিতাপভিদুরঃ শম্ভোঃ কপৰ্দাম্বুদঃ।
ফণিপতির মণিদ্যুতি যাহাতে বিদ্যুৎস্বরূপ, বালেন্দু ইন্দ্ৰধনুশ্বস্বরূপ, স্বৰ্গতিরঙ্গিণী বারিস্বরূপ, শ্বেতকপালমালা বলাকস্বরূপ, যাহা ধ্যানাভ্যাসরূপ সমীরণের দ্বারা চালিত এবং যাহা ভবার্তিতপভেদকারী, শম্ভুর এমন কদৰ্পরূপ অম্বুদ তোমাদের শ্রেয়শস্যের অন্ধুরোদগমের কারণ হউক।
