“এযু চতুর্ষ গ্রামেষু সমুপগতান সর্বানেব রাজ- রাজনক- রাজপুত্র- রাজামাত্য-সেনাপতি- বিষয়পতি- ভোগপতি- ষষ্ঠাধিকৃত- দণ্ডশক্তি- দণ্ডপাশিক- চৌরোদ্ধরণিকদৌসসাধসাধনিক- দূত— খেল- গামাগামিকা ভিত্বরমাণ- হস্তাশ্ব- গোমহিষাজীবিকাধ্যক্ষনাকাধ্যক্ষ-বিলাধ্যক্ষ- তরিক- শৌন্ধিক- গৌল্মিক- তদায়ুক্তক- বিনিযুক্তকাদি- রাজপাদপোজীবী- নোহন্যাংশ্চা— কীর্তিতান- চাটভাট-জাতীয়ান- যথাকলধ্যাসিনো- জ্যেষ্ঠকায়স্থমহামহত্তর- মহত্তর- দাশগ্রামিকাদি- বিষয়- ব্যবহারিণঃ- সকরণান- প্রতিবাসিনঃক্ষেত্ৰকারাংশচ- ব্রাহ্মণ- মাননাপূর্বকং যথাৰ্থং মািনয়তি বোধয়তি সমাজ্ঞাপয়তি চ।।”
এই ধরনের উল্লেখ প্রায় প্রত্যেক তাম্র-পট্টোলীতেই আছে। কিন্তু সর্বাপেক্ষা ভালো প্রমাণ, লোকের ভূমির চাহিদা। পঞ্চম হইতে সপ্তম শতক পর্যন্ত যত ভূমি দান বিক্রয়ের তাম্র-পট্টোলী দেখিতেছি, সর্বত্রই দেখি ভূমি-যাচক বাস্তুক্ষেত্রপেক্ষা খিলক্ষেত্রই চাহিতেছেন বেশি পরিমাণে; তাহার উদ্দেশ্য যে কৃষিকর্ম তাহা সহজেই অনুমেয়। যো-জমি কৰ্ষিত হয় নাই সেই জমির চাহিদাই বেশি; উদ্দেশ্য কর্ষণ, তাহাতে আর সন্দেহ কি? ধনাইদহ পট্টোলী (৪৩২-৩৩ খ্ৰী), দামোদরপুরের প্রাপ্ত প্রথম, তৃতীয় ও পঞ্চম পট্টোলী (৪৪৩-৪৪ খ্রী; ৪৮২-৮৩ খ্রী; ৫৪৩-৪৪ খ্ৰী), ধর্মাদিত্যের প্রথম ও দ্বিতীয় পট্টোলী (সপ্তম শতক), গোপচন্দ্রের পট্টোলী (সপ্তম শতক), সমাচার দেবের ঘুগ্রহাটি পট্টোলী (সপ্তম শতক) প্রভৃতিতে শুধু খিলক্ষেত্র প্রার্থনারই উল্লেখ আছে। অন্যত্র, যেখানে খিল ও বাস্তুক্ষেত্র উভয়ই প্রার্থনা করা হইতেছে, যেমন, বৈগ্রাম পট্টোলীতে (৪৪৭-৪৮ খ্ৰী:); সেখানেও খিলক্ষেত্রর পরিমাণ বাস্তুক্ষেত্রের প্রায় বারো গুণ। পরবর্তী কালের পট্টোলীগুলিতে ভূমির পরিমাণ সমগ্রভাবে পাওয়া যাইতেছে, কিন্তু সে-ভূমির কতটুকু খিল, কতটুকু বাস্তু তাহা পরিষ্কার করিয়া কিছু বলা নাই। তবু দত্ত ও ক্রীত ভূমির যে বিবরণ আমরা এই লিপিগুলিতে দেখি, তাহাতে মনে হয়, খিলভূমির কথাই বলা হইতেছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে। তাহা ছাড়া, কৃষির প্রাধান্য সম্বন্ধে অন্য একটি অনুমানও উল্লেখ করা যাইতে পারে। ভূমির পরিমাণ সর্বত্রই ইঙ্গিত করা হইতেছে এমন মানদণ্ডে যাহা কৃষিব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। কুল্যবাপ, দ্রোণবাপ, আঢ়িবাপ বা আঢ়কবাপ, উন্মান (উয়ান) এই সমস্ত মানই শস্য-সম্পর্কিত। এক কুল্য, এক দ্রোণ বা এক আচক (বাঙলা, আঢ়া; পূর্ব-বাঙলার অনেক স্থানে দুন এবং আঢ়া শস্যমান এখনও প্রচলিত) বীজ বপনের জন্য যতটুকু জমির প্রয়োজন তাহার পরিমাণই এক কুল্যবাপ, দ্রোণবাপ অথবা আঢ়বাপ ভূমি এবং এই মানানুযায়ীই পঞ্চম হইতে মোটামুটি অষ্টম শতক পর্যন্ত সমস্ত ভূমির পরিমাপ উল্লেখ করা হইয়াছে। শ্ৰীহট্ট জেলার ভাটেরা গ্রামে প্রাপ্ত গোবিন্দকেশবের তাম্র-পট্টোলী (একাদশ শতক) কিংবা শ্ৰীচন্দ্রের ধুল্লা তাম্র পট্টোলীতে (দশম শতক) ভূমি-পরিমাপের মান হইতেছে। হল, এবং হলই হইতেছে প্রধান কৃষি যন্ত্র। অবশ্য এ কথা সত্য যে আমরা যে সময়ের কথা বলিতেছি। অর্থাৎ খ্ৰীষ্টীয় পঞ্চম হইতে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত ভূমি সর্বত্রই ঠিক এই কুল্যবাপ, দ্রোণবাপ, উন্মান, হল ইত্যাদি মানদণ্ডে মাপা হইত না; তাহার জন্য অন্য মানদণ্ডের নির্দেশও পাইতেছি। নল-মানদণ্ডের নির্দেশ আছে (অষ্টকনবকনল্যাভ্যাম, ৮×৯ নল) পঞ্চম শতকেই, দামোদরপুরের তৃতীয় পট্টোলীতে (৪৮২-৮৩ খ্ৰী)। এই শস্যমান অথবা কৃষি-যন্ত্রমানের সাহায্যে ভূমির পরিমাণের উল্লেখ ইহার মধ্যে কৃষিপ্রধান সমাজের স্মৃতি যে জড়িত তাহা অনুমান করা অসংগত নয়।
ডাক ও খনার বচনগুলিও প্রাচীন বাঙলার কৃষিপ্রধান সমাজের অন্যতম প্রমাণ। যে ভাষায় এখন আমরা এই বচনগুলি পাই তাহা অর্বাচীন, সন্দেহ নাই। এগুলি ছিল জনসাধারণের মুখে মুখে বংশপরম্পরায়। ভাষার অদলবদল হইয়া বর্তমানে তাহা যে রূপ লইয়াছে তাহা মধ্যযুগীয়। তবু, এই বচনগুলি যে খুব প্রাচীন স্মৃতি বহন করে তাহাতে সন্দেহ নাই। কোন কোন ঋতুতে কী। শস্য বুনিতে হইবে, কোন শস্যের জন্য কী প্রকার ভূমি, কী পরিমাণের বারিপাত প্রয়োজন, বারিপাত ও খরাতপ নির্দেশ, বিভিন্ন শস্যের নাম ও রূপ, আবহাওয়া-তত্ত্ব, ভূতত্ত্ব, কৃষিপ্রধান সমাজের বিচিত্র ছবি, ইত্যাদি নানা খবর এই বচনগুলিতে পাওয়া যায়।
বাঙলাদেশ নদীমাতৃক; ইহার ভূমি সাধারণত নিম্ন এবং বারিপাত কৃষির পক্ষে অনুকূল। এ। দেশের ভৌগোলিক সংস্থান সম্বন্ধে বিস্তৃত আলোচনা অন্যত্র করা হইয়াছে; ইহার ভূমির উর্বরতা। সম্বন্ধে চীন-পরিব্রাজক যুয়ান-চোয়াঙের সাক্ষ্যও সেই সম্পর্কে উল্লেখ করিয়াছি। সাধারণ ভাবে। এ দেশের শস্যভাণ্ডার সম্বন্ধেও এই চীন-পরিব্রাজকের দু’চার কথা বলিবার আছে। পূর্ব ভারতের } যে কয়টি দেশে তিনি পরিভ্রমণ করিয়াছিলেন তাহার মধ্যে অন্তত চারিটি বর্তমান। বাঙলা-ভাষাভাষী জনপদের সীমার ভিতরে অবস্থিত—পুন-ন-ফ-টন-ন (পুণ্ড্রবর্ধন), / সন-মো-ত-ট’ (সমতট), তিন-মো-লিহ-তি (তাম্রলিপ্তি) এবং কি-লো-ন-সু-ফ-ল-ন (কর্ণসুবর্ণ)। তাহা ছাড়া আর একটি দেশও তিনি গিয়াছিলেন, তাহার নাম কি-চু-ওয়েন-কি-লো; ইহার ভারতীয় রূপ হইতেছে কযঙ্গল, কাজঙ্গল অথবা কজাঙ্গল। কানিংহাম সাহেব এই কাজঙ্গলকে কাকজোল বা রাজমহলের সঙ্গে অভিন্ন মনে করিয়াছিলেন। সন্ধ্যাকর নন্দীর ‘রামচরিতে’ এক কযঙ্গল রাজার উল্লেখ আছে; কোনও কোনও বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থেও কাজঙ্গলের উল্লেখ পাওয়া যায়। “ভবিষ্যপুরাণের ব্রহ্মখণ্ড পুঁথিতে রাঢ়ীখণ্ডজাঙ্গল নামে এক দেশের উল্লেখ আছে। এই দেশ ভাগীরথীর পশ্চিমে, কীকটি অর্থাৎ মগধ দেশের নিকটে; এই দেশের ভিতরেই বৈদ্যনাথ, বক্ৰেশ্বর ও বীরভূমি (বীরভূম) অজয় ও অন্যান্য নদী; ইহার তিন ভাগ জঙ্গল, এক ভাগ গ্রাম ও জনপদ, ইহার অধিকাংশ ভূমি উষর, স্বল্প ভূমি মাত্র উর্বর। এই যে জঙ্গল ও জঙ্গল প্রদেশ ইহাই তো য়ুয়ান-চোয়াঙের কজঙ্গল বা কজাঙ্গল বলিয়া মনে হয়— রাঢ়দেশের উত্তর খণ্ডের জাঙ্গলময় উষর ভূভাগ যাহা রাজমহল ও সাঁওতালভূমি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এই হিসাবে এই কযঙ্গল-কজঙ্গল-কজাঙ্গল বর্তমানে বাঙলাদেশেরই অন্তর্গত বলিয়া ধরিয়া লওয়া যাইতে পারে। আমার এই মন্তব্যের সমর্থন পাইতেছি। ভট্ট ভবদেবের ভুবনেশ্বর লিপিতে (একাদশ শতক)। ভবদেবী উষার (অজলা) ও জাঙ্গলময় রাঢ়দেশের কোনও গ্রামোপকণ্ঠে একটি জলাশয় খনন করাইয়া দিয়াছিলেন। এখানেও রাঢ়দেশের যে অংশের বিবরণ পাইতেছি। তাহা অজলা, অনুর্বর এবং জাঙ্গলময়। এখন দেখা যাক য়ুয়ান-চোয়াঙ এই পাঁচটি দেশের শস্যসম্ভার সম্বন্ধে সাধারণভাবে কী বলিতেছেন।
