লক্ষ্মণসেনের আনুলিয়া-শাসনে ব্ৰাহ্মণদের অনেক গ্রামদানের উল্লেখ আছে; এইসব গ্রাম ছিল নানা শস্যক্ষেত্র এবং উপবন শোভায় অলংকৃত, এবং শস্যক্ষেত্রে শালিধান্য জন্মাইত প্রচুর। কেশবসেনের ইদিলপুর-শাসনেও দেখা যাইতেছে, রাজা অনেক ব্ৰাহ্মণকে বহু গ্ৰাম দান করিয়াছিলেন; এইসব গ্রামে সুন্দর সমতল সুবিস্তীর্ণ ক্ষেত্র ছিল এবং সেইসব ক্ষেত্রে চমৎকার ধান উৎপন্ন হইত। ধান এবং ধান চাষ ইত্যাদি সম্বন্ধে আরও খবর জানা যায়; দু একটি উল্লেখ করিতেছি। রঘুবংশ’-কাব্যে রঘুর দিগ্বিজয় প্রসঙ্গে বঙ্গাভিযানের উল্লেখ আছে; কালিদাস বলিতেছেন, ধানের চারাগাছ যেমন করিয়া একবার উৎপাটন করিয়া আবার রোপণ করা হয় রঘু তেমনই করিয়া বঙ্গজনদের একবার উৎখাত করিয়া আবার প্রতিরোপিত (উৎখাত-প্রতিরোপিতঃ) করিয়াছিলেন। কবিগুরুর বীক্ষণ-শক্তি ও স্থানীয় জ্ঞান দেখিয়া বিস্মিত হইতে হয়। এই ধরনের ধানের চাষ সহজ এবং নিরাপদ এবং বাঙলাদেশের ও আসামাঞ্চলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। অন্য যে দুই ধরনের ধানের চাষ বাঙলাদেশে প্রচলিত কালিদাস তাহাও জানিতেন। কিনা, এই কৌতুহল প্রায় অনিবার্য। কাটা ধান মাড়াই করার পদ্ধতি এখন যেমন, সুপ্রাচীন কালেও তেমনই ছিল বলিয়া মনে হয়। “রামচরিত’-কাব্যের কবি-প্রশস্তিতে ধানের ‘খলা’ বা মাড়াই-স্থানের ইঙ্গিত আছে, এবং গোলাকার সাজানো কাটা ধানের উপর দিয়া গোরু-বলদ ঘুরিয়া ঘুরিয়া হাঁটিয়া কী করিয়া ধান মাড়াই করিত তাহারও উল্লেখ আছে। কালিদাসের রঘুবংশ’-কাব্যে ইক্ষুক্ষেত্রের ছায়ায় বসিয়া কৃষক রমণীগণ কর্তৃক শালিধান্য পাহারা দিবার কথা আছে, কিন্তু তাহা বাঙলাদেশ সম্বন্ধে কিনা, তাহা নিঃসংশয়ে বলা যায় না।
ইক্ষু
ধান্য, বিশেষভাবে শালিধান্য এবং ইক্ষু সম্বন্ধে বাঙালী কবির কল্পনা নানাভাবে উদ্দীপ্ত হইয়াছে। ‘সদুক্তিকর্ণামৃত’-গ্রন্থে উদ্ধৃত দুইটি বাঙালী কবির রচিত দুইটি শ্লোকে বর্ষায় ধানের ক্ষেত, হেমন্তে কাটা শালিধানের স্তুপ, আখের ক্ষেত, আখ-মাড়াই কল ইত্যাদি লইয়া যে কবি-কল্পনা বিস্তারিত হইয়াছে তাহা অন্য প্রসঙ্গে (দেশ-পরিচয় অধ্যায়ে, জলবায়ু প্রসঙ্গে) উদ্ধার করিয়াছি। এখানে পুনরুল্লেখ নিম্প্রয়োজন।
সর্ষপ
সর্ষপ যে অন্যতম উৎপন্ন শস্য ছিল তাহার কথা আগেই উল্লেখ করিয়াছি; বপ্য-ঘোষবাট গ্রামের তাম্র-পট্টোলীতে উল্লিখিত ‘সর্ষপ-যানক কথাটিতে তাহার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
য়ুয়ান-চোয়াঙ যে বাঙলার সর্বত্রই প্রচুর ফলশস্য-সম্ভারের কথা উল্লেখ করিয়াছেন, তাহা উক্তি মাত্রই নয়; ইহার সত্যতার প্রমাণ পাওয়া যায় অষ্টম হইতে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত রচিত তাম্র-পট্টোলীগুলিতে। আমি আগেই বলিয়াছি, পঞ্চম হইতে সপ্তম শতক পর্যন্ত রচিত লিপিগুলিতে ভূমিজাত দ্রব্যাদির উল্লেখ নাই বলিলেই চলে। কিন্তু অষ্টম শতকে পাল-রাজত্বের আরম্ভের সূত্রপাত হইতেই এই উল্লেখ পাওয়া যায়। কী ভাবে তাহা পাওয়া যায় তাহা দেখা যাইতে পারে।
আম্র, মহুয়া, মৎস্য, লবণ, বাঁশ, কাঠ ও ইক্ষু
খালিমপুর-তাম্রশাসনে দেখিতেছি, ধর্মপাল চারিটি গ্রাম দান করিতেছেন। হট্টিকা তলপটক (বাটক?) সমেত; উৎপাদিত শস্যাদির কোন উল্লেখ নাই। দেবপালের মুঙ্গের-শাসনে দেখিতেছি, মোষিকা নামক একটি গ্রাম দান করাহ হইতেছে “স্বামীমাতৃণযুতিগোচর পর্যন্ত সতলঃ সোদ্দেশঃ সাম্র মধুকরঃ সজলস্থলঃ সমৎস্যঃ সতৃণঃ…”। যে জমি দান করা হইতেছে তাহার উপর রাজা কোনও অধিকারই রাখিতেছেন না, শুধু ভূমির উপরকার স্বত্ব নয়, ভূমির নিচের স্বত্ব (সতলঃ), জলস্থলের স্বত্ব (সজলস্থলঃ সমৎস্য), গাছগাছড়ার স্বত্ব সবই দান করিয়া দিতেছেন। তিনটি উৎপন্ন দ্রব্যের সংবাদ এখানে আছে—আম্র, মহুয়া (মধুকঃ) ও মৎস্য। নারায়ণপালের ভাগলপুর-লিপিতেও অনুরূপ সংবাদই পাওয়া যায়, শুধু মৎস্যের উল্লেখ নাই। যাহাই হউক, মুঙ্গের ও ভাগলপুর-লিপির দুটি গ্রামই হয়তো বর্তমানে বিহার প্রদেশে, কাজেই এই সাক্ষ্য হয়তো বাঙলাদেশের প্রতি প্রযোজ্য অনেকে না-ও মনে করিতে পারেন। কিন্তু, দেখিতেছি। দিনাজপুর জেলার বাণগড়ে প্রাপ্ত প্রথম মহীপালদেবের তাম্রশাসনে যে কুরটিপল্লিকা গ্রাম দান করা হইতেছে, তাহার উৎপন্ন দ্রব্যাদির উল্লেখ ঠিক পূর্বোক্ত ভাগলপুর-লিপিরই অন্যরূপ; এখানেও মৎস্যের উল্লেখ নাই, কিন্তু আম ও মহুয়ার উল্লেখ আছে। প্রথম মহীপালদেবের রাজত্বকালে মোটামুটি একাদশ শতকের প্রথমার্ধ বলিয়া অনুমান করা হইয়াছে। অথচ, ইহার কিছু পূর্ববর্তী অর্থাৎ দশম শতকের একটি শাসনে উৎপন্ন দ্রব্যাদির তালিকা অন্যরূপ। কম্বোজরাজ নয়পালদেবের ইরদা তাম্রপট্টে বৃহৎ ছত্তিবান্না (যে গ্রামে খুব বড় একটি ছাতিম গাছ ছিল?) নামে একটি গ্রাম দানের উল্লেখ আছে। এই গ্রামটি বর্ধমানভুক্তির দণ্ডভুক্তি মণ্ডলের অন্তর্গত। দণ্ডভুক্তি মেদিনীপুর জেলার দাতন অথবা দান্তন! এই গ্রামটি দান করা হইতেছে সমস্ত অধিকার সমেত; র্যাহাকে দান করা হইতেছে তিনিই ইহার সাব-কিছু ভোগ করিবেন, বাস্তুক্ষেত্র, জলাধার, গর্ত, মার্গ (পথ), পতিত বা অনুর্বর জমি, জঞ্জাল বা আবর্জনা ফেলিবার। জায়গা যাহাকে আমরা বলি আঁস্তাকুড় (=আবষ্করস্থান), লবণাকর, সহকার (আম) ও মধুক বৃক্ষের ফলফুল, অন্যান্য গাছ-গাছড়া, হাট, ঘাট, পার বা খেয়া ঘাটী, (সহট্ট-ঘট্ট-সতর) ইত্যাদি সমস্তই তাহার ভোগ্য। ধান্য ও অন্যান্য শস্য ছাড়া, আস্ৰ-মধুক ছাড়া, এখানে আর একটি উৎপন্ন দ্রব্যের খবর পাওয়া যাইতেছে, তাহা লবণ। মেদিনীপুর জেলার দান্তন সমুদ্রতীরবর্তী। জোয়ার। যখন আসে, তখন সমুদ্রতীরবর্তী অনেক স্থানই নোনীজলে ভাসিয়া ডুবিয়া যায়, বড় বড় গর্ত করিয়া লোকে এখনও সেই জল ধরিয়া রাখে, পরে রৌদ্রে অথবা জ্বাল দিয়া শুকাইয়া লবণ তৈরি করে। এই প্রথা প্রাচীন কালেও প্রচলিত ছিল তাহার প্রমাণ পাওয়া যায় ইরদা লিপিটিতে। এই বড় বড় গর্তগুলিই শাসনোল্লিখিত লবণাকর। জল কিংবা তলের কিংবা পারঘাটের অধিকার ছাড়িয়া দিয়া রাজা যে ভূমিচ্ছিন্দ্ৰন্যায়ানুযায়ী বা অক্ষয়নীবীর্ধমানুযায়ী ভূমি দান করিতেছেন বলিয়া দেখিতেছি, তাহার অর্থ পরিষ্কার। কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্ৰে’ দেখি, জল, স্থল, পারঘাট ইত্যাদির। অধিকার রাষ্ট্রে কেন্দ্রীভূত; পারঘাটের আয় রাজার, ভূমির উপরকার অধিকার প্রজার হইলেও নিচেকার অধিকার রাষ্ট্র কখনই ছাড়িয়া দেয় না। সেইজন্যই যেখানে ছাড়িয়া দেওয়া হইতেছে, তাহা উল্লেখ করা প্রয়োজন। এই ‘অর্থশাস্ত্ৰেই দেখি, লবণে রাষ্ট্রের অথবা রাজার একচেটিয়া অধিকার। সেই একচেটিয়া অধিকারও ছাড়িয়া দেওয়া হইতেছে যেখানে রাজা ভূমিদান করিতেছেন। বৈদ্যদেবের কমােলি লিপিতে প্রাগজ্যোতিষভুক্তির কামরূপ মণ্ডলের বাড়া বিষয়ে। একটি গ্রামাদানের উল্লেখ আছে; এই গ্রামটি দানের শর্ত জল-স্থল-খিলারণ্য-বাট। গোবাট-সংযুক্ত’। পথ-গোপথের অধিকারও ছাড়া হইতেছে, কিন্তু উল্লেখযোগ্য হইতেছে অরণ্যের উপর অধিকার ত্যাগ। অথচ, কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্ৰে’ অরণ্য রাষ্ট্রসম্পদ ও সম্পত্তি। এই অরণ্য-দানের উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট। কাঠ অর্থোৎপাদনের একটি প্রধান উপায়। মদনপালদেবের মনহসি তাম্রপট্টে পুণ্ড্রবর্ধন-ভুক্তির কোটিবৰ্ষবিষয়ের খলাবর্তমণ্ডলে যে গ্রামদানের উল্লেখ আছে তাহাও দেখিতেছি সতলঃ–সাম্রমধুকঃ সজলস্থলঃ সৰ্গতোষিরঃ সকাট-বিটপঃ-। পুণ্ড্রবর্ধনেও তাহা হইলে বিস্তুত মহুয়ার চাষ ছিল। এই মহুয়া গাছের আয় দুই প্রকার—খাদ্য হিসাবে এবং মহুয়াজাত আসব হইতে। মহুয়া-আসবের উল্লেখ কৌটিল্য তো বিশদভাবেই করিয়াছেন। ঝাট-বিটপও উল্লেখযোগ্য; বাঁশ অথবা অন্য গাছের ঝাড় ও অন্যান্য বড় গাছও একরকমের অর্থাগমের উপায়। সাধারণ লোকেরা যে বাশের চাচের বেড়া দিয়াই ঘর-বাড়ি বাধিত (খুঁটিও ব্যবহার করিত নিশ্চয়ই।), তাহার প্রমাণ পাওয়া যায় শবরীপাদের একটি চর্যাগীতিতে—“চারিপাশে ছাইলারে দিয়া চঞ্চালী।” চঞ্চালী-চঞ্চারিকা যে আমাদের বাঁশের চাচারি এ সম্বন্ধে আর সন্দেহ কী? বাশের ব্যবসায় তো এখনও বাঙলাদেশে সর্বত্র সুপরিচিত। খুব ভাল বাঁশের ঝাড় ছিল বরেন্দ্রীতে; রামচরিতে এ কথার প্রমাণ আছে। এই প্রসঙ্গেই সন্ধ্যাকর নন্দী একথাও বলিতেছেন যে, বরেন্দ্রীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম উপকরণ ছিল সেখানকার ইক্ষু বা আখের ক্ষেত। এই ভূমির প্রাচীনতর ও বৃহত্তর সংজ্ঞা হইতেছে পুণ্ড্র। ব্রাত্য পুণ্ড্রদের বাসস্থান পুণ্ড্রদেশ, পুণ্ড্রবর্ধন। এই পুণ্ড্র-পুড় কোম বোধ হয় আখের চাষে খুব দক্ষ ছিল, এবং হয়ত সেইজন্যই আখের অন্যতম নামই হইতেছে। পুঁড়ি; এক জাতীয় দেশি আখকে বলে পুঁড়ি। আর একটি লক্ষণীয় নাম গৌড়। গৌড় যে গুড় হইতে উৎপন্ন তাহার শব্দতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক প্রমাণ সুবিদিত। এ তথ্যের মধ্যেও আখের চাষের ইঙ্গিত ধরিতে পারা কঠিন নয়। সুবিখ্যাত “সুশ্রুত’-গ্রন্থে পৌণ্ডক নামে একপ্রকার ইক্ষুর উল্লেখ আছে, এবং বহু সংস্কৃত নিঘন্টু-রচয়িতা ও কোষকারদের মত এই যে, পুণ্ড্রদেশে যে ইক্ষু জন্মাইত তাঁহাই পৌণ্ডক। আজকাল পীেড়িয়া, পুঁড়ি, পীেড়া প্রভৃতি নামে যে ইক্ষু ভারতের সর্বত্র চাষ হইতে দেখা যায় তাহা এই পৌণ্ডক ইক্ষু নাম হইতে উদ্ভূত। সুপ্রাচীন কালেই প্রাচ্যদেশের ইক্ষু ও ইক্ষুজাত দ্রব্য-চিনি ও গুড়—দেশে-বিদেশে পরিচিত ছিল। গ্ৰীক লেখক ঈলিয়ন (Aelien) ইক্ষদণ্ড পেষণ-জাত একপ্রকার প্রাচ্যদেশীয় মধুর (পাতলা ঝোলা গুড়?) কথা বলিতেছেন। ইক্ষুনল পেষণ করিয়া একপ্রকার মিষ্ট রস আহরণ করিত গঙ্গাতীরবাসী লোকেরা, একথা বলিতেছেন অন্যতম গ্ৰীক লেখক লুক্যান (Lukan); এ-সমস্তই খ্ৰীষ্টপূর্ব শতাব্দীর কথা।
