পাওয়া যে যায় না, উল্লেখ যে নাই তাহার কারণ তো খুবই পরিষ্কার। লেখমালাই হউক, অথবা অন্য যে-কোনও প্রকার লিখিত বিবরণই হউক, ইহাদের কোনটিই দেশের উৎপন্ন দ্রব্যাদির কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যের, কিংবা দেশের সামাজিক অথবা অর্থনৈতিক অবস্থার পরিচয় দিবার জন্য রচিত হয় নাই। দু’একটি ছাড়া সব লেখমালাই প্রায় ভূমি দান-বিক্রয়ের পট্টোলি, আধুনিক ভাষায় পাট্টা বা দলিল। প্রস্তাবিত দান-বিক্রয়ের ভূমির পরিচয় দিতে গিয়া, কিংবা দান-বিক্রয়ের শর্ত ও স্বত্ব উল্লেখ করিতে গিয়া পরোক্ষভাবে কোনও কোনও উৎপন্ন দ্রব্যাদির নাম বাধ্য হইয়াই করিতে হইয়াছে, কারণ সেইসব উৎপন্ন দ্রব্যাদি সেই ভূমিখণ্ডের ধন-সম্পদ, এবং তাহার অবলম্বনেই ক্রেতা অথবা দানগ্রহীতার ক্রয় অথবা দানগ্রহণের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়। সব লেখমালায় আবার সে উল্লেখও নাই। পূর্বোক্ত মহাস্থান শিলালিপির কথা ছাড়িয়া দিলে, খ্ৰীষ্টীয় পঞ্চম শতক হইতে আরম্ভ করিয়া সপ্তম শতক পর্যন্ত বহু তাম্রপট্টোলীর খবর আমরা জানি, কিন্তু উহাদের মধ্যে কোথাও দত্ত বা ক্রীত ভূমির উৎপন্ন দ্রব্যাদির বা কোনও শিল্পজাত দ্রব্যাদির উল্লেখ নাই বলিলেই চলে; একমাত্র সপ্তম শতকে রচিত কর্ণসুবর্ণ (কর্ণস্বর্ণ-কানসোনা, মুর্শিদাবাদ জেলা) রাষ্ট্রের ঔদুম্বরিক বিষয়ের বপ্যঘোষবাট গ্রামের তাম্রপট্টোলীতে “সর্ষপ-যাণক” বলিয়া সর্ষপক্ষেত্র-পার্শ্ববিলম্বিত যে পথের (?) উল্লেখ আছে তাহা হইতে হয়তো অনুমান করা যায়, উক্ত গ্রামের অন্যতম উৎপন্ন ছিল সর্ষপ বা সরিষা। অষ্টম শতক হইতে ত্ৰয়োদশ শতক পর্যন্ত পাল, সেন ও অন্যান্য রাজবংশের যে সমস্ত পট্টোলীর খবর আমরা জানি তাহার প্রায় সব ক’টিতেই দত্ত অথবা ক্রীত ভূমির প্রধান কৃষিজাত দ্রব্যাদির উল্লেখ আছে, এবং কোনও কোনও ক্ষেত্রে, বিশেষভাবে একাদশ, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতকের পটোলীগুলিতে ভূমিজাত দ্রব্যাদির আয়ের পরিমাণও উল্লেখ আছে। ভূমিসম্পর্কিত দলিল বলিয়াই ভূমিজাত দ্রব্যাদির উল্লেখ পাওয়া যায়, কিন্তু শিল্পজাত দ্রব্যাদির উল্লেখ নাই বলিলেই চলে। প্রশ্ন দাঁড়ায়, পঞ্চম হইতে সপ্তম শতকের লেখমালায় ভূমিজাত দ্রব্যাদির উল্লেখ নাই কেন, এবং অষ্টম হইতে ত্রয়োদশ। শতকের লেখমালায় আছে কেন? সঠিক উত্তর দেওয়া কঠিন, একটা অনুমান করা চলে। বৈন্যগুপ্তের গুনাইঘর পট্টোলীতে (৫০৭-৮ খ্রী) দেখিতেছি, মহাযানিক অবৈবাতিক ভিক্ষ সংঘকে যে গ্রাম বা অগ্রহার দান করা হইতেছে তাহার শর্ত হইতেছে “সর্বতোভোগেন” অর্থাৎ দানাগ্রহীতা সকল প্রকারে এই ভূমির উৎপন্ন দ্রব্য ও তাহার আয় ভোগ করিতে পরিবেন, এই অধিকার তাহাকে দেওয়া হইতেছে। এই যুগের অন্যান্য লেখমালায় এই ধরনের “সর্বতোভোগেন” অধিকারের উল্লেখ বিশেষভাবে নাই, কিন্তু “অক্ষয়নীবীধর্মানুযায়ী” যে দান তাহা যে “সর্বতোভোগেন”ই দেওয়া হইত এবং ক্রেতা ও দানগ্রহীতারা যে সেইভাবেই গ্রহণ করিতেন, এ অনুমান করা যায়। পরবর্তীকালে এই “সর্বতোভোগে”র স্বরূপ নির্দেশ করা প্রয়োজন হইয়াছিল, নানা বিশেষ ও অবিশেষ কারণে; ভোক্তার অধিকার সম্বন্ধে প্রশ্ন হয়ত উঠিয়াছিল, এবং হয়ত এই কারণেই প্রত্যেক ক্ষেত্রেই পরবর্তী কালে কতকটা বিশদভাবে এই অধিকারের স্বরূপ নির্দেশ করা হইয়াছিল; তাহার ফলেই ভূমিজাত দ্রব্যাদির খবর আমরা কিছু কিছু পাই।
এ তো গেল লেখমালাগুলির কথা। অন্যান্য উপাদানগুলি সম্বন্ধে দু’এক কথা বলা দরকার। পূর্বে বলিয়াছি, খ্ৰীষ্টপূর্ব প্রথম শতকে রচিত Periplus of the Erythrean Sea নামক গ্রন্থে ও কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে প্রাচীন বাঙলার প্রধান শিল্পজাত দ্রব্য রেশম ও কার্পাস বস্ত্রের খবর পাওয়া যায়। পূর্বোক্ত গ্রন্থ রচিত হইয়াছিল বিদেশী বণিক যাঁহারা সমুদ্র-পথে ভারতবর্ষের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য চালাইতেন তাহাদের সুবিধার জন্য, কতকটা গাইড় বই’র মতন। বাঙলাদেশ হইতে যে সব জিনিস বিদেশে পশ্চিম এশিয়ায়, মিশরে, রোমে, গ্ৰীসে যাইত, তাহাদের মধ্যে অজ্ঞাতনামা লেখক রেশমীবস্ত্রের কথা উল্লেখ করিয়াছেন। ঐ সব দেশে এই জিনিসের চাহিদা ছিল, তাই ইহার উল্লেখ করা হইয়াছে। অন্যান্য শিল্পজাত দ্রব্যও নিশ্চয়ই ছিল, সেগুলির চাহিদা হয়তো তেমন ছিল না, রপ্তানিও হইত না, সেই জন্য তাহাদের উল্লেখ নাই। কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্ৰে’ এই বস্ত্রশিল্পের উল্লেখ আপরোক্ষভাবে। কারণ, এই গ্রন্থ এবং গ্রন্থোক্ত বিশেষ অধ্যায়টি ভারতবর্ষের বিভিন্ন শিল্পজাত দ্রব্যের সংবাদ দিবার জন্য বিশেষভাবে রচিত নয়। রাজশেখরের “কাব্যমীমাংসায় পূর্বদেশগুলির উৎপন্ন দ্রব্যাদির একটি ক্ষুদ্র তালিকা আছে, কিন্তু একটু লক্ষ করিলেই দেখা যাইবে, এই তালিকা কিছুতেই সম্পূর্ণ হইতে পারে না; মনে হয় কোনও বিশেষ বিশেষ প্রয়োজনে যে সব গন্ধ ও আয়ুৰ্বেদীয় দ্রব্যাদির প্রয়োজন হইতে, এ তালিকায় শুধু সেইসব কয়েকটি দ্রব্যেরই নাম আছে। সেইজন্য আমাদের নানা উপাদানের মধ্যে প্রাচীন বাঙলার ধন-সম্বলের যে সংবাদ তাহা প্রায় সকল ক্ষেত্রেই পরোক্ষ ও অসম্পূর্ণ। এইসব বিচ্ছিন্ন, টুকরো-টাকরা তথ্য আহরণ করিয়া এই ধন-সম্বলের একটি সম্পূর্ণ স্বরূপ গড়িয়া তোলা অত্যন্ত দুঃসাধ্য ব্যাপার। তবু, মোটামুটি একটা কাঠামো গড়িয়া তোলার চেষ্টা করা যাইতে পারে।
০৩. কৃষি ও কৃষিজাত দ্রব্যাদি
প্রথম কৃষি ও ভূমিজাত দ্রব্যাদির কথাই বলি। প্রাচীন বাঙলার কৃষি যে ধনোৎপাদনের এক প্ৰধান ও প্রথম উপায় ছিল তাহার প্রমাণ লেখমালায় ইতস্তত রিক্ষিপ্ত। অষ্টম হইতে ত্ৰয়োদশ শতক পর্যন্ত লেখমালাগুলিতে ‘ক্ষেত্রকরণ্, ‘কর্ষকান্’, ‘কৃষকান্’, ইত্যাদি কথার তো বারংবার উল্লেখ আছেই। জনসাধারণ যে কয়েকটি শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল তাঁহাদের মধ্যে ক্ষেত্রকর বা কৃষকেরাও ছিল বিশেষ একটি শ্রেণী, এবং কোনও স্থানে ভূমি দান-বিক্রয় করিতে হইলে রাজপাদাপোজীবীদের, ব্ৰাহ্মণদের, এবং গ্রামের ও গোষ্ঠীর অন্যান্য মহত্তর ও ক্ষুদ্রতর ব্যক্তিদিগের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষেত্রকর বা কৃষকদেরও দান বিক্রয়ের ব্যাপারে বিজ্ঞাপিত করিতে হইত। উদাহরণ স্বরূপ খালিমপুরে প্রাপ্ত ধর্মপালের লিপি (অষ্টম শতকের চতুর্থ পাদ, আনুমানিক) হইতে এই বিজ্ঞপ্তিসূত্রটি উদ্ধার করিতেছি। :
