দক্ষিণ-রাঢ় ।। ভুরসুট-ভুরিশিট-ভুরসিট = ভূরিসৃষ্টি ভূরিশ্রেষ্ঠিক-ভূরিশ্রেষ্ঠী
এই অধ্যায়ে একাধিক বার এবং অন্য দু’একটি অধ্যায়ে ভুরসুট বা ভূরিশ্রেষ্ঠী গ্রাম বা অঞ্চলের কথা বলেছি, এবং এক জায়গায় বলেছি। এই গ্রাম বা অঞ্চলটির অবস্থান ছিল হাওড়া জেলায়, অন্যত্র বলেছি, হুগলী জেলায়।
কথাটা একটু পরিষ্কার করে বলা দরকার। মধ্যযুগীয় বাঙালীর ইতিহাসে দেখতে পাচ্ছি, ভুরসুট বলে গ্রাম যেমন আছে তেমনই ভুরসুট বলে একটি পরগণাও আছে, এবং সে-পরগণা বর্তমান হাওড়া ও হুগলীর জেলার নানা অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত। এখনও ভুরসুট বা ভুরশুট বলে দুটি গ্রাম আছে, একটি হাওড়া জেলার উদয়পুর থানার অন্তৰ্গত, আর একটি হুগলী জেলার জঙ্গীপুর থানার। এই দুটি গ্রামই প্রাচীন ভূরিশ্রেষ্ঠীর স্মৃতি বহন করছে, এবং সে-স্মৃতি হাওড়া ও হুগলী জেলার এক বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত। এই বিস্তৃত অঞ্চলটাই একসময়ে অধূষিত ছিল ভুরি বা অসংখ্য শ্রেষ্ঠীদের দ্বারা, এই কথাটাই ছিল আমার বক্তব্য। সে-বক্তব্য আজও একই আছে।
০৪. ধন-সম্বল
০১. যুক্তি – ধন-সম্বল
সমাজ-সংস্থানের বস্তু-ভিত্তি হইতেছে ধন। এই ধন যে শুধু ব্যক্তির পক্ষে, তাহার জীবনধারণ, অশন-বসন, শিক্ষা-দীক্ষা, ধর্ম-কর্মের জন্য অপরিহার্য তাহা নয়, গোষ্ঠী ও সমাজের পক্ষেও ইহা সমভাবে অপরিহার্য। সমাজ-নিরপেক্ষ পারিত্রিক মঙ্গলের জন্য, অথবা তপশ্চর্যায় বিশুদ্ধ ধৰ্মজীবন যাপনের জন্য কোনও উদ্দেশ্যে সমাজের বাহিরে একান্ত ভাবে একক জীবন যাঁহারা যাপন করেন, তাহাদের মধ্যে কেহ কেহ এমন মুক্ত পুরুষ হয়তো আছেন যাহারা কোনও ভাবেই ধন কামনা করেন না, অশন-বসনের ও কামনার উর্ধের্ব যাঁহাদের স্থান। তাহারা সমাজ-ইতিহাসের আলোচনার বিষয় নহেন। আমরা তাহাদের কথাই বলিতেছি যাঁহারা জীবনের দৈনন্দিন সুখ-দুঃখে, জীবনের বিচিত্র টানাপোড়েনে নিত্য আন্দােলিত, ঐহিক জীবনের ক্ষুৎপিপাসায়, শীতাতপে পীড়িত এবং সামাজিক নানা বিধি-বিধান প্রয়োজন-আয়োজন দ্বারা শাসিত। সমাজধর্মী এই যে ব্যক্তি তাহার দৈনন্দিন জীবনে ধন অপরিহার্য বস্তু; এই ধন বলিতে শুধু মুদ্রা বুঝায় না, টাকা-আনা-পয়সা বুঝায় না, এ কথা আজকাল আর কাহাকেও বুঝাইয়া বলিবার প্রয়োজন নাই; ব্যক্তির যেমন, সমাজেরও তেমনিই; ধন ছাড়া কোনও দেশের কোনও বিশেষ কালের সমাজের ব্যবসা-বাণিজ্য কল্পনাই করিতে পারা যায় না; ধন ছাড়া সমাজের রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালিত হইতে পারে না; কারণ, যাঁহারা এই রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনা করিবেন তাহাদিগকে র্তাহাদের কায়িক অথবা মানসিক শ্রমের বিনিময়ে নিজেদের ভরণ-পোষণের, শিক্ষা-দীক্ষার, ধম-কর্মের, আরাম-বিলাসের জন্য বেতন দিতে হইবে, তাহা শস্য দিয়া হউক, মুদ্রা দিয়া হউক, প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি দিয়া হউক, ভূমি দিয়া হউক, অথবা অন্য যে-কোনও উপায়েই হউক। শুধু রাষ্ট্রের কথাই বা বলি কেন, ধর্ম, শিল্প, শিক্ষা, সংস্কৃতি, কিছুই এই ধন ছাড়া চলিতে পারে না, এবং সমাজ সংস্থানের যে-কোনও ব্যাপারেই এ কথা সত্য।
নানা বর্ণ, নানা জাতি এবং নানা শ্রেণীর অগণিত ও অলিখিত জনসমষ্টি লইয়া প্ৰাচীন বাঙলার যে সমাজ, তাহার পরিকল্পনা এবং সংস্থানে যে-ধন প্রয়োজন হইত, তাহা আসিত কোথা হইতে? একটু ভাবিয়া দেখিলেই দেখা যাইবে, যাঁহারা রাজসরকারে চাকরি করিতেন, লেখমালায় যাহাদের বলা হইয়াছে রাজপাদাপোজীবী, তাহারা ধন উৎপাদনা করিতেন না, উৎপাদিত ধনের অংশ মাত্র ভোগ করিতেন, শ্রম ও বুদ্ধির বিনিময়ে। শিক্ষাবৃত্তি ছিল যাঁহাদের, তাঁহারাও যতটুকু পরিমাণে নিজ নিজ বিশেষ বৃত্তির মধ্যে আবদ্ধ থাকিতেন ততটুকু পরিমাণে ধনোৎপাদনের দায় ও কর্তব্য হইতে মুক্ত ছিলেন। কিন্তু, উৎপাদিত ধনের অংশ তাহারা ভোগ করিতেন, শ্রম ও বুদ্ধির বিনিময়ে, নিজ নিজ সুযোগ ও অধিকার অনুযায়ী। সোজাসুজি প্রত্যক্ষ ভাবে ধনোৎপাদন ইহারা কেহই করেন না বটে, তবে পরোক্ষ ভাবে ধনোৎপাদনে সাহায্য সকলকেই কিছু না কিছু করিতে হয়, কোনও না কোনও উপায়ে। সমাজ-বিবর্তনের ইতিহাসের সঙ্গে যাঁহাদের পরিচয় আছে, তাহারাই একথা জানেন।
তাহা হইলে প্রশ্ন দাড়াইতেছে, ধনোৎপাদনের উপায় কী কী? প্রাচীন বাঙলায় দেখিতেছি, ধনোৎপাদনের তিন উপায় : কৃষি, শিল্প এবং ব্যবসা-বাণিজ্য। ইহাদের মধ্যে কৃষি ও বাণিজ্য। ইহাদের মধ্যে কৃষি অ বানিজ্য প্রধান; আজ পর্যন্তও বাংলাদেশে কৃষিই প্রধান ধন-সম্বল; তার পরেই শিল্প। এই কৃষি ও শিল্পজাত জিনিসপত্র লইয়া দেশে-বিদেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের ফলে উৎপাদিত ধনের বৃদ্ধি এবং দেশের বাহির হইতে নূতন ধনের আগমন হইত। এই তিন উপায়ে আহৃত যে ধন তাহাই প্রাচীন বাঙলার ধন-সম্বল। এবং এই ধন-সম্বলের উপরই সমাজ, রাজা, রাষ্ট্র, ধর্ম, শিক্ষা, শিল্প, সংস্কৃতি সবকিছুর প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ।
০২. উপাদান – ধন-সম্বল
কিন্তু এই ধন-সম্বলের কথা বলিবার আগে আমাদের ঐতিহাসিক উপাদান সম্বন্ধে দু’একটি কথা আলোচনা করিয়া লওয়া দরকার। আমাদের প্রধান উপাদান লেখমালা, এবং প্রাচীন বাঙলার সর্বপ্রাচীন লেখমালার তারিখ আনুমানিক খ্ৰীষ্ট-পূর্ব তৃতীয় হইতে দ্বিতীয় শতকের মধ্যে। বগুড়া জেলার মহাস্থানে প্রাপ্ত এই সুপ্রাচীন প্রস্তর-লেখখণ্ডটিতে প্রাচীন বাঙলার ধন-সম্বলের একটি প্রধান উপকরণের সংবাদ পাওয়া যায়। এই উপকরণটি ধান, কৃষিজাত দ্রব্যাদির মধ্যে সর্বপ্রথম ও সর্বপ্রধান। এই লেখখণ্ডটি ছাড়া, পঞ্চম হইতে ত্ৰয়োদশ শতক পর্যন্ত বাঙলাদেশে সম্পর্কিত প্রচুর লিপির সংবাদ আমরা জানি, কিছু কিছু প্রাচীন গ্রন্থের উপাদানও আমাদের অজ্ঞাত নয়, অথচ এই সর্বপ্রাচীন মহাস্থান-লেখখণ্ডটি এবং আরও দুই চারিটি তাম্রশাসন ছাড়া বাঙলাদেশের প্রধান উৎপন্ন ধন যে ধান-লিপিতে সে উল্লেখ কোথাও নাই বলিলেই চলে। সন্ধ্যাকর নন্দীর ‘রামচরিতে’ অবশ্য বলা হইয়াছে, বরেন্দ্রীর লক্ষ্মীশ্ৰী দৃষ্টিগোচর হইত নানা প্রকার উৎকৃষ্ট ধান্যক্ষেত্রের কমনীয় রূপে অর্থাৎ বরেন্দ্ৰ-ভূমিতে (উত্তর-বাঙলায়) নানাপ্রকারের খুব ভাল ধান জন্মাইত, এই ইঙ্গিত ‘রামচরিতে’ পাওয়া যাইতেছে। অথচ, ইহা তো সহজেই অনুমেয়, আজও যেমন অতীতেও তেমনি ধান্যই ছিল শুধু বরেন্দ্ৰভূমির নয়, সমগ্র বাঙলাদেশেরই প্রধান ধন-সম্বল। শুধু ধান সম্বন্ধেই নয়, অন্যান্য অনেক কৃষি ও শিল্পজাত বা খনিজ দ্রব্যের উল্লেখই আমাদের ঐতিহাসিক উপাদানে পাওয়া যায় না। কাজেই, আমাদের এই বিবরণীতে যে-সব উপকরণের উল্লেখ নাই, অথচ যাহা উৎপাদিত ধন হিসাবে বর্তমান ছিল বলিয়া সহজেই অনুমান করা যায়, তাহা প্রাচীন বাঙলার ছিল না, এ কথা নিশ্চয় করিয়া বলা যায় না! কার্পাস বস্ত্র ও রেশম বস্ত্ৰ যে বাঙলার প্রধান শিল্পজাত দ্রব্য ছিল এবং সুদূর মিশর ও রোমদেশ পর্যন্ত তাহা রপ্তানি হইত, সর্বত্র তাহার আদরও ছিল এ কথা আমরা খ্ৰীষ্টপূর্ব প্রথম শতকে অজ্ঞাতনামা গ্রন্থকার বর্ণিত Periplus of the Erythrean Sea অথবা কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্ৰ’ কিংবা ‘চর্যাগীতি’-গ্ৰন্থ হইতে কিছু কিছু জানিতে পারি; অথচ এ-যাবৎ বাঙলাদেশ -সম্পর্কিত যত লেখমালার খবর আমরা জানি কোথাও তাহার উল্লেখ নাই। উদাহরণ দিবার জন্য ধান্য ও বস্ত্ৰ-শিল্পের উল্লেখ করিলাম মাত্র, তবে অনেক খনিজ, কৃষি ও শিল্পজাত দ্রব্যের সম্বন্ধেই এ কথা বলা যাইতে পারে। কাজেই অনুল্লেখের যুক্তি অন্তত এক্ষেত্রে অনস্তিত্বের দিকে ইঙ্গিত করে না। কৃষি ও শিল্পের তদানীন্তন অবস্থায়, প্রাচীন বাঙলার তদানীন্তন ভূমি-ব্যবস্থায়, সামাজিক পরিবেশ ও জলবায়ু এবং নদনদীর সংস্থানে যে-সব দ্রব্য উৎপন্ন হওয়া স্বাভাবিক তাহা সমস্তই উৎপাদিত হইত এই অনুমানই যুক্তসংগত, তবু ঐতিহাসিক বিবরণ লিখিতে বসিয়া কেবলমাত্র সেইসব উপকরণই বিবৃত করা যাইতে পারে যাহার উল্লেখ অবিসংবাদিত উপাদানের মধ্যে পাওয়া যায়, এবং যাহার উল্লেখ না থাকিলেও অস্তিত্বের অনুমান প্রমাণের অনুরূপ। মূল্য বহন করে। একটি উদাহরণ দিলেই আমার বক্তব্য পরিষ্কার হইবে। তক্ষণ অথবা স্থাপত্য শিল্পের কোনও উল্লেখ আমরা আমাদের জ্ঞাত উপাদানের মধ্যে পাই নাই, যদিও তিব্বতী লামা তারনাথ তাহার বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাসে ধীমান ও বীটপাল-নামে বরেন্দ্ৰভূমির দুই খ্যাতনামা শিল্পীর উল্লেখ করিয়াছেন, এবং বিজয়সেনের দেওপাড়া তাম্রশাসনে “বারেন্দ্রক শিল্পিগোষ্ঠীচুড়ামণি রাণিক শূলপাণি”র উল্লেখ আছে। ঠিক তেমনই স্বর্ণকার অথবা রৌপ্যকারের উল্লেখও নাই। অথচ বাঙলাদেশে প্রাপ্ত অগণিত দেবদেবীর পোড়ামাটি ও পাথরের মূর্তিগুলি দেখিলে, পাহাড়পুর ও অন্যান্য স্থানের প্রাচীন মন্দির, স্তুপ এবং বিহারের ধ্বংসাবশেষ অথবা সমসাময়িক চিত্রে ও ভাস্কর্যে সেই যুগের ঘর-বাড়ি-মন্দিরাদির পরিকল্পনা দেখিলে, দেবদেবীর মূর্তিগুলির চিরযৌবনসুলভ শ্ৰীঅঙ্গে বিচিত্ৰ গহনার সূক্ষ্ম ও বিচিত্ৰতর কারুকার্যগুলির দিকে লক্ষ করিলে এ কথা অনুমান করিতে কোনও আপত্তি করিবার কারণ নাই যে, তদানীন্তন কালে তক্ষণ ও স্থাপত্য শিল্প অথবা স্বর্ণ ও রৌপ্যশিল্পজাত দ্রব্যাদির কোনও প্রকার অপ্রতুলতা ছিল। অন্যান্য অনেক কৃষি ও শিল্পজাত দ্রব্যাদি সম্বন্ধেই এ কথা বলা যাইতে পারে। ব্যবসা-বাণিজ্য সম্বন্ধেও একই কথা। গঙ্গা ও তাম্রলিপ্তি যে মস্ত বড় দুইটি বন্দর ছিল এ খবর বিশেষভাবে পেরিপ্লাস-গ্রন্থ, টলেমির বিবরণ, জাতক-গ্ৰন্থ ও ফাহিয়ান-যুয়ান-চোয়াঙের বিবরণীর ভিতর পাওয়া যায়; তাহা ছাড়া অন্য কোথাও ইহাদের বিশদ উল্লেখ কিছু নাই বলিলেই চলে। এই দুই বন্দর হইতে, এবং কিছু পরবর্তীকালে অর্থাৎ, মধ্যযুগের প্রারম্ভ হইতেই সপ্তগ্রাম হইতে যে পূর্ব-দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপগুলিতে, দক্ষিণ-ভারতের উপকূল বাহিয়া সিংহলে, এবং পশ্চিম উপকূল বাহিয়া সুরাষ্ট্র-ভৃগুকচ্ছ পর্যন্ত বাণিজ্যতরী যাতায়াত করিত তাহার কিছু কিছু আভাস হয়তো পাওয়া যায়, কিন্তু সমসাময়িক বিশদ প্রমাণ কিছু নাই বলিলেই চলে। অৰ্ত্তবাণিজ্যও নিশ্চয়ই ছিল, , বাঙলাদেশের বিভিন্ন জনপদগুলির ভিতর এবং দেশের বাহিরে অন্যান্য রাজ্য ও রাজ্যখণ্ডগুলির সঙ্গে। এই অন্তবাণিজ্য চলিত হয়তো অধিকাংশই নদীপথে, কিন্তু স্থলপথেও কিছু কিছু না চলিত এমন নয়। অথচ এই সব বাণিজ্য-সম্ভার, বাণিজ্যপথ এবং ব্যবসা-বাণিজ্য-সংক্রান্ত অন্যান্য খবরের আভাসও উপাদানগুলির মধ্যে খুঁজিয়া বাহির করা কঠিন। হাট-বাজার, আপণ-বিপণি, ব্যাপারী ইত্যাদির নির্বিশেষ উল্লেখ লেখামালাগুলির মধ্যে মাঝে মাঝে দেখা যায়, কিন্তু তাহা উল্লেখ মাত্রই; বিশেষ আর কিছু খবর পাওয়া যায় না।
