এই উদ্ধৃতিটি হুগলী জেলা গেজেটিয়ারের (১৯৭২) প্রথম অধ্যায় থেকে (৩১ পৃ)। হাওড়া জেলা গেজেটিয়ারের (১৯৭২) প্রথম অধ্যায়ে (১১ পৃ) কথাটা আরও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে; নীচে তা উদ্ধার করছি।
“When the epicontinental sea covered the tract now forming the Howrah district, the Bhagirathi joined the various sub-deltas of the Chotanagpur rivers and pushed the Gangetic delta towards the sea and thus intercepted the peninsular streams, which, in their turn, pushed the Bhagirathi to the east by the detritus they carried. The sudden bends of the Bhagirathi below Kalna, of the Damodar below Burdwan, of the DWarakeshar near Arambagh, of the Silai above Ghiatal and of the Haldia near the saline soil limit, seem to justiy this conclusion. This abrupt bends were most probably the debouching points of the Chotanagpur rivers into the ancient channel of the Bhagirathi or the epicontinental sea. As the delta face advanced Southwards the braided Channels of the Bhagirathi Vanished… ”
স্বভাবতই মনে হয়, গঙ্গা-ভাগীরথী বইতো আরও পশ্চিম ঘেঁষে। গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ যত রচিত হয়েছে, উপসাগর সরে গেছে, তত, গঙ্গা-ভাগীরথী ও ধীরে ধীরে সরে গেছে, তত পূর্বে। দামোদর-গোষ্ঠীর নদীগুলির ব-দ্বীপে যে স্রোত-তাড়িত পাথুরে বালি ও পলিমাটি জমা হতো তার ঘন, ভাঙা চাপ এই সরে যাওয়ার একটা কারণ হওয়া বিচিত্র নয়। এই পুবে সরে সরে যাওয়া এবং দামোদর-গোষ্ঠীর নদীগুলির দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হওয়া এ খাত-থেকে ও খাতে, ও খাত থেকে আর এক খাতে ধাবমান হওয়া সমস্তই যেন মনে হয়, নিম্নতম প্রবাহে গঙ্গা-ভাগীরথীর ক্রমশ পূর্বশায়ী হওয়ার সঙ্গে জড়িত। উত্তরতর প্রবাহে, অর্থাৎ উত্তর বর্ধমান ও উত্তর মুর্শিদাবাদের উত্তরে তা হয়নি; তার প্রধান কারণ, সে-ভূমি literitic, দৃঢ়, কঠিন, সে মাটি বঙ্গোপসাগর-তাড়িত, গাঙ্গেয় ব-দ্বীপকৃত নরম পলিমাটি নয়।
রক্তমৃত্তিকা মহাবিহার
তাম্রলিপ্তি থেকে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দ্বীপ-উপদ্বীপ ও দেশগুলিতে যাবার সমুদ্রপথের বর্ণনা-প্রসঙ্গে মালয়-উপদ্বীপে প্রাপ্ত জনৈক মহানাবিক বুদ্ধগুপ্তের নামাঙ্কিত একটি লেখার উল্লেখ করেছিলাম। বুদ্ধগুপ্ত রক্তমৃত্তিকার অধিবাসী ছিলেন; তিনি মালয়ে গিয়েছিলেন বাণিজ্যব্যাপদেশে। যাত্রা করেছিলেন রক্তমৃত্তিকা মহাবিহারের আশীৰ্বাদ নিয়ে, এ-সব সমস্তই ঐতিহাসিক মনন-কল্পনাসিদ্ধ। সেখানে ভুল করিনি। কিন্তু লিখেছিলাম, “এই রক্তমৃত্তিকা মুর্শিদাবাদ জেলার রাঙ্গামাটি (য়ুয়ান-চোয়াঙের লো-টো-মো-চিহ) বা চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গামাটিও হইতে পারে; শেষেরটি হওয়াই অধিকতর সম্ভব।” তখন মনে হয়েছিল, চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি (তারও অর্থ রক্তমৃত্তিকা) মালয়ের কাছাকাছি; সুতরাং রক্তমৃত্তিকা সে-রাঙ্গামাটি হবার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু আমার এ-অনুমান ভুল। এখন আর সন্দেহ করবার কারণ নেই যে, মহানবিক বুদ্ধগুপ্ত লিপিকথিত রক্তমৃত্তিক কর্ণসুবর্ণান্তর্গত, য়ুয়ান-চোয়াঙ-কথিত লো-টো-মো-চিহ্ন। য়ুয়ান-চোয়াঙ বলে গেছেন, এই লো-টো-মো-চিহতে ছিল একটি বৌদ্ধবিহার। এখন আর কোনও সন্দেহ নেই যে, মহানাবিক বুদ্ধগুপ্ত তদানীন্তন গঙ্গা-ভাগীরথী সমীপবর্তী, কর্ণসুবর্ণান্তৰ্গত রক্তমৃত্তিকা মহাবিহারের ভিক্ষুসংঘের আশীৰ্বাদ নিয়ে গিয়েছিলেন বাণিজ্যব্যাপদেশে, জীবনোপায়-সমৃদ্ধির সন্ধানে, অন্য কোনও স্থানের অন্য কোনও মহাবিহার থেকে নয়। য়ুয়ান-চোয়াঙের বিবরণ যে কত বাস্তবানুগ, এই আবিষ্কার তার অন্যতম প্রমাণ।
এই স্থির, ধ্রুব ঐতিহাসিকোক্তি করা সম্ভব হলো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে, আমার প্রাক্তন ছাত্র ডাকটর সুধীররঞ্জন দাশের উদ্দীপনা ও নেতৃত্বে মুর্শিদাবাদ জেলার চিরুটি গ্রাম-সন্নিহিত, প্রাচীন কর্ণসুবর্ণের অন্তর্গত রাঙ্গামাটি অঞ্চলের রাজবাড়িডাঙ্গার উৎখননের ফলে। এই উৎখনন থেকে পাওয়া গেছে। ষষ্ঠ-সপ্তম খ্ৰীষ্টীয় শতাব্দীর কিছু কিছু প্রত্নবস্তু, একাধিক বীেদ্ধমন্দির ও বিহারের কিছু প্রত্নাবশেষ এবং একাধিক মৃৎফলক যাতে পরিষ্কার খোদিত আছে রক্তমৃত্তিকা মহাবিহারের নাম। গোল শীলমোহর ফলকটির উপরিভাগে বৌদ্ধ ধৰ্মচক্র; তার দুই পাশে মুখোমুখি উপবিষ্ট দুটি হরিণ; দৃশ্যটি সারনাথ মৃগবিহারে বুদ্ধদেবের ধর্মচক্রপ্রবর্তন মাির প্রতীক। ফলকটির নীচের অংশে দুটি লাইন লেখা জীৱন্তৰ্ভুক্তিকা মহাবস্থা। পিয়ার্থ ভক্ষু সংঘস্য।
জনপদ-বিভাগ সম্বন্ধে নূতন তথ্য
নবাবিষ্কৃত তাম্রশাসনগুলির ভেতর শ্ৰীচন্দ্রের পশ্চিমভাগ (শ্ৰীহট্ট) লিপি এবং লড়হচন্দ্র ও গোবিন্দচন্দ্রের ময়নামতী লিপি তিনটিতে জনপদ-বিভাগ সম্বন্ধে কিছু কিছু নূতন তথ্য জানা যাচ্ছে। যেমন, পুণ্ড্রবর্ধনভূক্তির বিস্তৃতি সম্বন্ধে, পট্টিকের বা পট্টিকেরক সম্বন্ধে। পশ্চিমভাগ লিপিটিতে দেখছি, দশম শতাব্দীতে শ্ৰীহট্টও পুণ্ড্রবর্ধন (পৌণ্ড্র) ভুক্তির সমতট মণ্ডলের অন্তৰ্গত। লড়হচন্দ্রের প্রথম পট্টোলীটিতে জানা যাচ্ছে, পট্টিকেরকেরও অবস্থিতি ছিল (একাদশ শতাব্দী) পৌণ্ড্রভুক্তির সমতট মণ্ডলে, এবং এই পট্টিকেরকে লড়হচন্দ্র লড়হমাধব-ভট্টারকের একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
