যেহেতু বর্তমান তমলুক শহরের অবস্থিতি রূপনারায়ণ-উপত্যকায়, প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিকরা মেনে নিয়েছেন যে, প্রাচীন তাম্রলিপ্তও এই নদীটির উপর, সমুদ্র-মোহনার অনতিদূরে অবস্থিত ছিল। একটা কারণ ছিল বোধহয় য়ুয়ান চোয়াঙের সাক্ষ্য, “তাম্রলিপ্ত ছিল artif inlet of the sea-5 °is
এ-সম্বন্ধে অন্য যে-সব সাক্ষ্য আমাদের জানা আছে তা একত্র করে আর একবার। এ-প্রসঙ্গটি বিচার-বিবেচনা করে দেখা যেতে পারে। ‘মৎস্যপুরাণের সাক্ষ্যে মনে হয়, তাম্রলিপ্তর অবস্থিতি ছিল (সুহ্ম দেশে) ভাগীরথীর পশ্চিমতীরে, ভাগীরথীর কোনো শাখার তীরে নয়। খ্ৰীষ্টীয় দ্বিতীয় শতকে টলেমি পরিষ্কার, দ্ব্যর্থহীনভাবে বলছেন Tamalites নগর অবস্থিত ছিল main river Ganga-র উপর, যে-নদীর উপর অবস্থিত ছিল অন্যতম সু-প্রসিদ্ধ নগর Pallimbothra বা পাটলীপুত্র। ষষ্ঠ-সপ্তম শতক পর্যন্ত, অর্থাৎ ফা-হিয়েন-য়ুয়ান-চোয়াঙ–ইৎসিঙের কাল পর্যন্ত যে তাহাই ছিল এমন মনে না করবার কোনো কারণ আমি দেখছিনে।
যাই হোক, পরবর্তীকালের সাক্ষ্য কী তা দেখা যেতে পারে। প্রায় হাজার বছর পরও Gastaldi (১৫৬১) ও Jao de Barros (১৫৫০) নদীটির নাম বলছেন। গঙ্গা; একশ’ বছর পরও (১৬৫০) Blaev নামটি লিখছেন গুয়েঙ্গা (Guenga)। সপ্তদশ শতাব্দীর অন্যান্য সাক্ষ্যে এবং ১৭০৩ খ্ৰীষ্টাব্দের একটি নকশায় সর্বত্রই নদীটির নাম দেওয়া হচ্ছে সংলগ্ন শহরটির নামানুসারে : Tamalee, Tomberlee, Tümbolee, Tombolee, Tumberleen ইত্যাদি। ১৬৭০ খ্রীষ্টাব্দেও Valentin নদীটির নাম বলছেন, পত্রিঘাটা, অর্থাৎ পত্রঘাটার পাশ দিয়ে যে-নদীটি বয়ে যেতো। একজনও কেউ কিন্তু রূপনারায়ণ বলছেন না। রেনেলই সর্বপ্রথম বলছেন, নদীটির নাম রূপনারায়ণ, “falsely called the old Ganges”।
‘মৎস্যপুরাণ’, টলেমি থেকে শুরু করে সকলেই ভুল করেছেন, আর রেনেল সাহেবই একমাত্র ব্যক্তি যিনি যথার্থ বলেছেন, এমন আমি মনে করতে পারছিনে। অবশ্যই তার কালে তমলুকের অবস্থিতি রূপনারায়ণের উপর, গঙ্গার উপর নয়, এবং সপ্তদশ থেকেই, হয়ত তার আগে থেকেই, গঙ্গা পূর্বদিকে সরে যেতে শুরু করেছিল, এবং সঙ্গে সঙ্গে দামোদর, রূপনারায়ণ ইত্যাদি ছোটনাগপুর পার্বত্য অঞ্চল-নিঃসৃত অন্যান্য নদনদীগুলিও। কিন্তু ষোড়শ শতকেও তমলুক-তম্বোলি যে একদা গঙ্গার উপরই অবস্থিত ছিল সে-স্মৃতি নিশ্চয়ই বেশ জাগবৃক ছিল, যেহেতু সে-স্মৃতি খুব পূর্বগত কিছু ছিল না। নইলে জাও দ্য ব্যারোস, গ্যাস্টিলডি, ব্ৰেভ্ নদীটিকে গঙ্গা কিছুতেই বলতেন না।
কিন্তু যে তাম্রলিপ্তর কথা আমি বলছি সে-তো আরও হাজার বছরের আগেকার কথা। সে-তাম্রলিপ্ত যে গঙ্গা-ভাগীরথীর উপরই ছিল এবং সেই বন্দর-নগর যে সমুদ্র-মোহনা থেকে খুব বেশি দূরে ছিল না, এ-সম্বন্ধে সন্দেহ করবার কোনো কারণ দেখিনে। সে-বন্দর থেকে বেশ বড় একটি সমুদ্রগামী জাহাজে চড়ে ফা-হিয়েন সিংহলে গিয়েছিলেন।
ত্ৰিশ বছর আগে যখন ‘বাঙালীর ইতিহাস’-এর নদনদী প্রসঙ্গ লিখেছিলাম তখন ইঙ্গিত করেছিলাম, গঙ্গা-ভাগীরথী। খুব প্রাচীনকাল থেকেই ক্রমশ খুব ধীরে ধীরে পূর্বদিকে সরে যাচ্ছে, যত দক্ষিণে নুরম মাটিতে নামছে তত বেশি সরে যাচ্ছে, এবং তার সঙ্গে সঙ্গে ছোটনাগপুর সাঁওতালভূমি-মানভূমের পাহাড় থেকে যে সব নদনদী নিঃসৃত হয়ে, সাধারণত পূর্ব-দক্ষিণবাহিনী হয়ে গঙ্গা-ভাগীরথীতে পড়তে, সেগুলো ক্রমশ দীর্ঘািয়ত হচ্ছে। আমার এই ইঙ্গিতে পশ্চাতে যুক্তি বিশেষ কিছু ছিল না, ছিল শুধু মৎস্যপুরাণোক্ত-উক্তি ভাগীরথীর বিন্ধাশৈলশ্রেণী গাত্রে প্রতিহত হবার কথা, আর ছিল ফরাক্কা থেকে শুরু করে দক্ষিণে সমস্ত গঙ্গা-ভাগীরথীর পশ্চিম তীরের ব্যক্তিগত স্থানীয় পর্যবেক্ষণ।
সম্প্রতি আমার সুযোগ হ’লো পশ্চিম বঙ্গ-সরকার কর্তৃক প্রকাশিত তাদের হাওড়া ও হুগলী জেলার ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার দুটির প্রথম অধ্যায় (General and Physical Aspects) পড়বার, বিশেষ করে ভূগোল ও ভূগোল বিষয়ক অংশটি। এই অংশটি কে লিখেছেন, জানিনে, কোথাও কিছু উল্লেখ নেই। কিন্তু যে-ই লিখে থাকুন তাকে প্রকাশ্যে সাধুবাদ জানাচ্ছি। পশ্চিম-বাঙলার নদনদীগুলি সম্বন্ধে এমন বিশদ, সুন্দর, সুশৃঙ্খল ভৌগোলিক-ঐতিহাসিক আলোচনা আর কোথাও আমি দেখিনি। রচনাটি পাঠ করে আমি উপকৃত হয়েছি। আমার এখন মনে হচ্ছে, ত্রিশ বছর আগে আমি যা অনুমান করেছিলাম, ভূতত্ত্ব ও ভূগোলের দিক থেকে সে অনুমান হয়তো একান্ত মিথ্যা নাও হতে পারে। ছোটনাগপুর পাহাড়-নিঃসৃত নদনদীগুলির কথা বলতে গিয়ে লেখক বলছেন,
“… ages ago the Damodar used to flow directly into epicontinental sea, an extension of the Bay of Bengal. As the Gangetic delta formed, the main western branch of the Ganges, namely, the Bhagirathi, intercepted the Damodar Group or rivers which were forced to form subsidiary deltas higher up their Courses … its (Damodar’s) deltaic action is not dependent on the tides but starts much higher up at places where it can no longer carry the excess charge of sand that it brings down from the hills, and so drops it on the bed …”
