আদিগঙ্গা
এই নদীটির প্রথম বিস্তৃত পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে বিপ্রদাস পিপিলাই’র (১৪৯৫ খ্ৰী) “মনসামঙ্গল গ্রন্থে এবং পরে সংক্ষিপ্ততর পরিচয় পাওয়া যায় জাও দ্য ব্যারোস ও ফান ডেন ব্রেকের নকশায় (যথাক্রমে ১৫৫০ ও ১৬৬০ খ্ৰী: ) এ সম্বন্ধে যা বলবার মূলগ্রন্থেই বলা হয়েছে। লক্ষণীয় শুধু এই যে, আদিগঙ্গার উৎপত্তি হচ্ছে কলকাতা-বেতড়ের দক্ষিণে গঙ্গা-ভাগীরথীর বাম দিক থেকে; নদীটি প্রথম পূর্ববাহিনী ও পরে দক্ষিণবাহিনী হয়ে সোজা চলে গেছে সাগর-সংগমে। পথে যে-সব জায়গা পড়ছে তা অনুসরণ করলে সন্দেহ থাকে না যে, এই প্রবাহ একসময় (পঞ্চদশ থেকে সপ্তদশ শতক, আনুমানিক) গঙ্গার অন্যতম প্রধান প্রবাহ ছিল। কয়েকটি প্রশ্ন স্বভাবতই মন অধিকার করে। প্রথমত, এ-প্রবাহটিকে আদিগঙ্গা বলা হয় কেন? কখন থেকে বলা হয়? এ-প্রবাহ কখনও কি গঙ্গার নিম্নতম প্রবাহে আদিমতম, প্রাচীনতম প্রবাহ ছিল? তা তো মনে হয় না। দ্বিতীয়ত, এ-প্রবাহকে কখনও ভাগীরথী বলা হতো কি? হতো বলে তো প্রমাণ নেই। তৃতীয়ত, এ-প্রবাহটির সূচনা কবে থেকে এবং কি কারণে হয়েছিল? গঙ্গা-ভাগীরথীর মূল প্রবাহ কি শুকিয়ে গিয়েছিল? যদি তা হয়ে থাকে, কবে হয়েছিল? তৃতীয় যুগ্ম প্রশ্নটির কোনো উত্তর আমাদের জানা নেই; জানিবার উপায়ও বোধ হয়। আর নেই। যাই হোক, অষ্টাদশ শতকের আগেই এই অর্বাচীন নদীটি হেজে মজে মরে গেল, এবং গঙ্গা তার প্রাচীনতম ভাগীরথী (সরস্বতী) প্রবাহপথেই ফিরে গেল।
সরস্বতী
গঙ্গা-ভাগীরথীর পশ্চিমতীরে ত্রিবেণীতে ভাগীরথী-প্রবাহ থেকেই সরস্বতীর উদ্ভব এবং সেই উদ্ভবের অদূরেই সপ্তগ্রাম বন্দর, সরস্বতী-তীরে। সরস্বতী ত্ৰিবেণী থেকে দক্ষিণমুখী হয়ে ডােমজুর, আব্দুল স্পর্শ করে ভাগীরথীতেই আবার ফিরে এসেছে, সাকরাইলের কাছে। যত শুকনোই হোক সে-প্রবাহ, তার এই পথই বর্তমান পথ। কিন্তু ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে (অর্থাৎ, দ্য ব্যারোস ও ফান ডেন ব্রোকের নকশায়) সরস্বতী ত্ৰিবেণী থেকে মুক্ত হয়ে শাহনগর, চৌমহা, সুন্দরী, আমগাছি স্পর্শ করে সেখান থেকে পূর্বমুখী হয়ে বেতড়ে এসে ভাগীরথীতে তার জল ঢেলে দিত। Pistola বা পিছলাদা থেকে সরস্বতীর জল প্রবাহিত হয়। গঙ্গা-ভাগীরথীর প্রাচীন খাতে। পটুগীজরা প্রথম সপ্তগ্রামে (Satgaw = Satgaon) আসে ১৫১৮ ও ১৫৩০ খ্ৰীষ্টাব্দে, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে। সরস্বতী বেয়ে জাহাজ চলাচল তখন সুগম ছিল না। ব্যারোস বলছেন,
‘Satgaw (Satgaon) is a great and noble city though less frequented than Chittagong on account of the port not being so convenient for the entrance of ships.’
কিছুদিন পর, ১৫৬৫ খ্ৰীষ্টাব্দে Caesar Fredrich বলছেন, বড় বড় জাহাজগুলো সরস্বতী বেয়ে বেতড়ের উত্তরে আর যেতে পারতো না; ছোট জাহাজগুলোও যে যেতো তা-ও কোনো মতে। বড় জাহাজগুলো সপ্তগ্রাম যেতো গঙ্গা-ভাগীরথী উজান বেয়ে; প্রথম ত্ৰিবেণী, তারপর সরস্বতী তীরে সপ্তগ্রাম।
দামোদর
দামোদরের ইতিহাস দীর্ঘ, কিন্তু সে-দীর্ঘ ইতিহাসে আমাদের প্রয়োজন নেই। আমাদের সমসাময়িক কালে গঙ্গা-ভাগীরথীর নিম্নতম প্রবাহে দামোদরের প্রধান প্রবাহটি দক্ষিণবাহী হয়ে হাওড়া জেলায় প্রবেশ করেছে। ভুরসুট (প্রাচীন, ভূরিশ্ৰেষ্ঠী?) গ্রামের কাছে। সেখান থেকে আমতা হয়ে বাগনানের ভেতর দিয়ে এই প্রবাহ এসে পড়েছে ভাগীরথীতে, ফলতার উলটো দিকে। অথচ, ষোড়শ-সপ্তদশ শতকে এ-প্রবাহটি প্রধান প্রবাহ-পথ ছিল না; সে-প্রবাহপথ ছিল যাকে বলা হয় কানা দামোদর বেয়ে। ১৬৯০ খ্ৰীষ্টাব্দের একটি নকশায় এই কানা দামোদর বেশ বড় নদ এবং এই নদ ভগীরথীতে এসে পড়তো উলুবেড়িয়ার উত্তরে। সে-প্রবাহ এখনো আছে, কিন্তু ক্ষীণতর। দ্য ব্যারোস ও ব্লোভের (Blaev) নকশায় (যথাক্রমে ১৫৫০ ও ১৬৫০) দেখছি, দামোদর দুমুখী হয়ে ভাগীরথীতে এসে পড়েছে, একটি মুখ ফলতার উলটো দিকে, মর্নিং পয়েন্ট ফোর্টের কাছে, Pistola বা পিছলদহ গ্রামের একটু উত্তরে। আর একটি মুখ উলুবেড়িয়ার উত্তরে, সিজবেড়িয়া খাল বা কানা দামোদর পথে, ভাগীরথীতে। ফান ডেন ব্রোকের নকশায় (১৬৬০) কিন্তু দামোদর সম্বন্ধে বিচিত্র এবং নূতনতর খবর পাওয়া যাচ্ছে। এ নকশায় দেখছি দামোদরের প্রধান প্রবাহটি সোজা দক্ষিণবাহী হয়ে পড়ছে এসে রূপনারায়ণে, হাওড়া জেলায় বকসী খালের কাছে। ক্ষীণতর দ্বিতীয় একটি শাখা দামোদরের বর্তমান প্রবাহপথ দিয়ে সোজা চলে গেছে। ভাগীরথীতে। আর, তৃতীয় একটি প্রশস্ত প্রবাহ বর্ধমান শহরের পূর্বদিক স্পর্শ করে, বোধ হয় গাঙ্গুর নদীর প্রবাহ পথ বেয়ে, সোজা গিয়ে পড়েছে ভাগীরথীতে, কালনার কাছে। দামোদরের এই প্রবাহটিই কেতকাদাস-ক্ষেমানন্দর বাঁকা দামোদর, যার জল, ক্ষেপানন্দ বলছেন, “গঙ্গার জলে মিলিয়া” গেল।
রূপনারায়ণ
দামোদর-প্রসঙ্গে এইমাত্র দেখা গেল, আগে যাই হোক, সপ্তদশ শতকে দামোদরের প্রধান প্রবাহ হাওড়া জেলার বকসী খাল বেয়ে রূপনারায়ণে এসে পড়েছে, এবং রূপনারায়ণের প্রবাহ কোলাঘাট হয়ে (তমলুক শহরের ১৫ মাইল উজানে) গোয়াখালির কাছে এসে ভাগীরথীতে পড়েছে, বর্তমান হুগলী-পয়েন্ট-এর উলটো দিকে। ভাগীরথীর এই সংযোগ-স্থলের ১২ মাইল উজানে বর্তমান তমলুক শহর। তবে প্রাচীন তাম্রলিপ্ত নগর-বন্দরের প্রত্নবস্তু তমলুক শহর থেকে যত না আহৃত হয়েছে তার দশগুণ বেশি আহৃত হয়েছে শহর থেকে বেশ দূরে দূরে, নানা স্থানে, এবং সে-সব কোনো কোনো স্থান ৮/৯ মাইল দূরে। কাজেই, বর্তমান তমলুক শহরই যে প্রাচীন তাম্রলিপ্তের একতম প্রতিনিধি তা খুব জোর করে বলা যায় না। যাই হোক, বর্তমানে তমলুক শহর যে-নদীর উপর বা যে-উপত্যকায় অবস্থিত তার নাম রূপনারায়ণ; অন্তত রেনেল সাহেবের (মধ্য অষ্টাদশ শতাব্দী) সময় থেকে।
