‘রচিব এ মধুচক্ৰ গৌড়জন যাহে
আনন্দে করিবে পান সুধা নিরবধি’
তখন গৌড়জন বলিতে তিনি সমগ্র বাঙলাদেশের অধিবাসীকেই বুঝাইয়াছিলেন। সেন-রাজারা করিয়াছিলেন সে চেষ্টা সার্থক হয় নাই; গৌড় নামের ললাটে সেই সৌভাগ্যলাভ ঘটিল বঙ্গ নামের, যে বঙ্গ ছিল আর্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির দিক হইতে ঘূণিত ও অবজ্ঞাত, এবং যে বঙ্গ নাম ছিল পাল ও সেন রাজাদের কাছে কম গৌরব ও আদরের। কিন্তু, সমগ্র বাঙলাদেশের বঙ্গ নাম লইয়া ঐক্যবদ্ধ হওয়া হিন্দু আমলে ঘটে নাই; তাহা ঘটিল তথাকথিত পাঠান আমলে এবং পূর্ণ পরিণতি পাইল আকবরের আমলে, যখন সমস্ত বাঙলাদেশ সুবা বাঙলা নামে পরিচিত হইল। ইংরাজ আমলে বাঙলা নাম পূর্ণতার পরিচয় ও প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছে, যদিও আজিকার বাঙলাদেশ আকবরী সুবা বাঙলা অপেক্ষা খর্বীকৃত।
০৭. সংযোজন – দেশ-পরিচয়
এ অধ্যায়ে সংযোজন করবার মতন উল্লেখ্য তথ্য ইতিমধ্যে বিশেষ কিছু আবিষ্কৃত হয়নি। তবে, আগে চোখে পড়েনি এমন দু’চারটি ছোট ছোট তথ্য ইতিমধ্যে গোচরে এসেছে। অবশ্য, সেগুলো এমন কিছু অর্থবহ নয় যার ফলে ইতিহাসে নূতন আলোকপাত ঘটতে পারে। সুতরাং সে সব তথ্য আর বর্ণনার অন্তর্ভুক্ত করছি না; আকারণ গ্রন্থের কলেবর বৃদ্ধি করে লাভ নেই। কিন্তু মূল রচনায় তথ্য-বিশৃঙ্খলা কিছু এখানে-সেখানে ছিল, শিথিল বাক্য বা বাক্যাংশও ছিল; সেগুলো সংশোধন করা হচ্ছে।
নদনদী। গঙ্গা-ভাগীরথী, আদিগঙ্গা, সরস্বতী, দামোদর ও রূপনারায়ণ
মূল গ্রন্থে নদনদী প্রসঙ্গে যা বলেছি তাতে নূতন কিছু সংযোজন বা সংশোধনের কিছু আছে বলে মনে হয় না, দু’একটি শিথিল বাক্য বা বাক্যাংশ ছাড়া। তবে, গঙ্গা-ভাগীরথীর নিম্নতম প্রবাহ এবং তার সঙ্গে আদিগঙ্গা, সরস্বতী, দামোদর ও রূপনারায়ণের সম্বন্ধ বিষয়ে আলোচনা ও বিশ্লেষণ ত্ৰিশ বছর আগে যা করেছিলাম তা এখন কেমন যেন একটু অস্পষ্ট ও বিশৃঙ্খল বলে মনে হচ্ছে, যদিও তথ্যের দিক থেকে ভুল কিছু তখন করিনি। তা ছাড়া, এই তৃতীয় সংস্করণের প্রফ পড়া এবং ভারতীয় ভূগোল সমিতির প্রথম নির্মলকুমার বসু স্মারক-বক্তৃতাটি (Chandraketugarh and Tamralipta : two port-towns of ancient Bengal and Connected considerations) রচনা উপলক্ষে প্রসঙ্গটি নূতন করে বিচার বিবেচনা করতে হলো। এ গ্রন্থের প্রথম ও দ্বিতীয় সংস্করণে যা বলেছিলাম প্রায় তাই এখানে বলছি, তবে আরও সংক্ষেপে এবং কিছুটা স্পষ্টতর করে এবং তথ্য ও যুক্তি-শৃঙ্খলায় সাজিয়ে।
গঙ্গা-ভাগীরথী
ত্ৰিবেণী-হুগলী থেকে শুরু করে সোজা একেবারে সমুদ্র পর্যন্ত যে প্রবাহকে সাধারণভাবে এখন বলা হয়। হুগলী নদী, রাজমহলের ভেতর দিয়ে বাঙলা দেশে ঢোকার পর ফরাক্কা থেকে সমুদ্র পর্যন্ত যে প্রবাহকে আমরা বলি গঙ্গা, লক্ষ্মণসেনের গোবিন্দপুর লিপিতে (আনুমানিক, ১১৭৫ খ্ৰী) বেতড় চতুরকের (হাওড়া জেলার বেতড় গ্রাম) পাশ দিয়ে দক্ষিণমুখী যে প্রবাহটিকে বলা হয়েছে জাহ্নবী, মৎস্যপুরাণোক্ত যে-প্রবাহটি বিন্ধ্যশৈলগাত্রে প্রতিহত হয়ে, ব্রহ্মোত্তর (উত্তর রাঢ়) দেশ ভেদ করে, (পূর্ব) বঙ্গ ও (পশ্চিম) তাম্রলিপ্ত (সুহ্মদেশের অন্তর্গত) স্পর্শ করে প্রবেশ করেছে গিয়ে সমুদ্রে এবং যে গঙ্গা প্রবাহটিকে বলা হয়েছে ভাগীরথী, সেই গঙ্গা-ভাগীরথী প্রবাহই এই নদীর প্রাচীনতম ও প্রধানতম প্রবাহ। এই প্রবাহ-পথটি সম্বন্ধে সন্ধান-সম্ভাব্য ও বিশ্বাসযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্যাদি যতটুকু জানা যায় তাতে খানিকটা দৃঢ়তার সঙ্গেই বলা যায় যে, অন্তত পঞ্চদশ-ষোড়শ শতক অবধি দক্ষিণে কলকাতা-বেতড় পর্যন্ত এই প্রবাহ-পথের অদল-বদল বিশেষ কিছু ঘটেনি। যা ঘটেছে তা কলকাতা-বেতড়ের দক্ষিণে, গঙ্গার নিম্নতম প্রবাহে। এই নিম্নতম প্রবাহ সম্বন্ধে কিছু কিছু ঐতিহাসিক ইঙ্গিত বায়ু ও মৎস্যপুরাণে, মহাভারতে, Periplus-গ্রন্থে ও টলেমির বিবরণীতে জানা যায়। ভগীরথ কর্তৃক গঙ্গাকে মর্তে নামিয়ে আনার গল্পটি মৎস্যপুরাণে আছে, রামায়ণেও আছে, আর যুধিষ্ঠির যে এই ভগীরথী প্রবাহের সাগর-সংগমেই তীর্থস্নান করেছিলেন সে-কথা বলা হয়েছে মহাভারতে। Periplus এ আছে গঙ্গা (Gange) বন্দরের কথা যার অবস্থিতি ছিল গঙ্গানদীর তীরে। টলেমিও বলেছেন এই একই গঙ্গাবিন্দরের কথা; তার অবস্থিতি ছিল গঙ্গারাষ্ট্র দেশে; এ-দেশ নিশ্চয়ই ছিল গঙ্গার তীরেই। টলেমি তাম্রলিপ্তের (Tamalites) কথাও বলেছেন, এবং তার অবস্থিতি ছিল গঙ্গার তীরে, যে-গঙ্গার তীরে (অবশ্যই আরও অনেক উত্তরে) অবস্থিতি ছিল Pallimbothra বা পাটলীপুত্র নগরের। স্বভাবতই প্রশ্ন হবে, Gange বন্দরের গঙ্গা আর তাম্রলিপ্ত বন্দরের গঙ্গা, দুইই কি একই গঙ্গা? লিপি, সাহিত্য ও প্রত্নসাক্ষ্যের ইঙ্গিত থেকে মনে হয়, খ্ৰীষ্টিয় সপ্তম শতকের মধ্যেই তাম্রলিপ্তের, এবং চন্দ্ৰকেতুগড় ও Gange যদি এক হয় তাহলে গঙ্গাবিন্দরেরও, বন্দর হিসেবে অস্তিত্ববিলোপ ঘটেছিল, খুব সম্ভব নদীপ্রবাহ শুকিয়ে যাবার দরুণ। কিন্তু যে এ বা একাধিক নদীপ্রবাহ শুকিয়ে গেল তা কোন এক বা একাধিক নদীর?
এ-প্রশ্নের যথাযথ, নিশ্চিন্দ্র উত্তর দেওয়া খুব সহজ নয়। তবে, কিছুটা নির্ভরযোগ্য ইঙ্গিত পাওয়া একেবারে হয়ত অসম্ভব নয়। সে ইঙ্গিত পেতে হলে সরস্বতী, আদিগঙ্গা, দামোদর ও রূপনারায়ণ, অন্তত এই চারটি নদীর ইতিহাস ও সে-ইতিহাসের সঙ্গে গঙ্গা-ভাগীরথীর নিম্নতম প্রবাহের সম্বন্ধ কী ছিল মোটামুটি তার একটু হিসেব নেওয়া প্রয়োজন। দুঃখের বিষয়, সপ্তম-অষ্টম শতকের পর ও পঞ্চদশ শতকের আগে এ-সম্বন্ধে কোনো তথ্যই আমাদের জানা নেই; যা আছে তা পঞ্চদশ শতকে ও তার পরে।
