প্ৰতীহার-রাজ ভোজদেবের গওআলিয়ার-লিপিতে দেখিতেছি, পালরাজ (ধর্মপাল)কে বলা হইয়াছে “বঙ্গপতি। দ্বিতীয় নাগভট যখন চক্রায়ুধকে পরাজিত করেন তখন ধর্মপাল বঙ্গপতি কিন্তু অন্যত্র সর্বত্রই সকল লিপিতেই পালরাজারা ‘গৌড়েশ্বর। রাষ্ট্রকূটরাজ প্রথম অমোঘবর্ষের (৮১৪-৮৭৭) কানহেরী-লিপিতে গৌড়জনপদ গৌড়বিষয় বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে। যাহাই হউক, ধর্মপালের রাজত্বকাল হইতেই গৌড়েশ্বর উপাধি পালরাজাদের নাম-ভূষণরূপে ব্যবহৃত হইতে থাকে, যদিও তখন বঙ্গজনপদ পৃথক স্বতন্ত্রভাবে বিদ্যমান এবং পালেরা বঙ্গেরও অধিপতি। রাজা অমোঘবর্ষের নীলগুণ্ড-লিপিতে বঙ্গজনপদ-রাষ্ট্রের এবং কর্করাজের বড়োদা পট্টোলীতে (৭১১-১২) একই সঙ্গে বঙ্গ ও গৌড়জনপদ রাষ্ট্রের উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। ভট্ট ভবদেবের ভুবনেশ্বর-লিপিতেও গৌড় নৃপ এবং বঙ্গরাজ পৃথকভাবে উল্লিখিত হইয়াছেন। সেনরাজ বিজয়সেনের সময়ে গৌড়রাষ্ট্র স্বতন্ত্র রাজার করায়ত্ত্ব ছিল, কিন্তু বিজয়সেন তাঁহাকে পরাভূত করিয়াছিলেন (দেওপাড়ালিপি)। আবার বল্লালসেনের আমলে বর্ধমানভুক্তির অন্তর্গত উত্তর-রাঢ়মণ্ডল সেন রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হইয়া গিয়াছিল (নৈহাটি-লিপি)। লক্ষ্মণসেনের মাধাইনগর-লিপিতে দেখিতেছি, তিনি সহসা গৌড় রাজ্য আক্রমণ ও জয় করিয়াছিলেন, এবং বোধহয়, এইজন্যই এই লিপিতে তিনি গৌড়েশ্বর বলিয়া অভিহিত হইতেছেন। এইসব প্রমাণ হইতে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত করা চলে যে, গৌড় বঙ্গ ও পুণ্ড্রবর্ধন হইতে স্বতন্ত্র জনপদ, এবং আমরা মোটামুটি পশ্চিমবঙ্গ বলিতে (অর্থাৎ মালদহ-মুর্শিদাবাদ বীরভূম-বর্ধমানের কিয়দংশ) এখন যাহা বুঝি তাহাই ছিল প্রাচীন গৌড়জনপদ।। দক্ষিণ-রাঢ়মণ্ডল বা তাম্রলিপ্ত-দণ্ডভুক্তি বোধহয় গৌড়জনপদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না, যদিও গৌড়ের রাষ্ট্রসীমা কখনও কখনও উৎকল দণ্ডভুক্তি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, এবং গৌড় বলিতে এক এক সময় হয়তো সমগ্র বাঙলাদেশকেও বুঝাইত।
প্রাচীন জনপদ ও বাঙলা নামকরণ
প্রাচীন বাঙলার বিভিন্ন জনপদগুলি সম্বন্ধে উপরে যাহা বলা হইয়াছে, তাহা হইতে মোটামুটি ভাবে, একটু শিথিল ভাবেই, কয়েকটি কথা বলা চলে। প্রাচীনতম ঐতিহাসিক কাল হইতে আরম্ভ করিয়া আনুমানিক খ্ৰীষ্টীয় ষষ্ঠ-সপ্তম শতক পর্যন্ত প্রাচীন বাঙলাদেশ পুণ্ড্র, গৌড়, রাঢ়, সুহ্ম, বজ (অথবা ব্ৰহ্ম), তাম্রলিপ্তি, সমতট, বঙ্গ প্রভৃতি জনপদে বিভক্ত। এই জনপদগুলি প্রত্যেকেই স্ব-স্বতন্ত্র ও পৃথক; মাঝে মাঝে বিরোধ-মিলনে একের সঙ্গে অন্যের যোগাযোগের সম্বন্ধও দেখা যায়, কিন্তু প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র-পরায়ণ। সপ্তম শতকের প্রথম পাদে শশাঙ্ক গৌড়ের রাজপদে প্রতিষ্ঠিত হন এবং বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ-মালদহ-মুর্শিদাবাদ হইতে আরম্ভ করিয়া একেবারে উৎকল পর্যন্ত সর্বপ্রথম এক রাষ্ট্ৰীয় ঐক্য লাভ করে। কিন্তু বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জনপদগুলি এক নাম লইয়া এক ঐক্যসূত্রে আবদ্ধ হইবার সূচনা বোধহয় দেখা দেয়। শশাঙ্কের আগেই, খ্ৰীষ্টীয় ষষ্ঠ শতকের মাঝামাঝি হইতে (হীড়হা-লিপির ‘গৌড়ােন)। শশাঙ্ক তাহাকে পূর্ণ পরিণতি দান করেন। এই সময় হইতেই গৌড় নামটির ঐতিহাসিক ব্যঞ্জনা যেন অনেকখানি বাড়িয়া গিয়াছিল; এবং পাল-রাজারা বঙ্গপতি হওয়া সত্ত্বেও গৌড়াধিপ, গৌড়েন্দ্র, গৌড়েশ্বর-নামে পরিচিত হইতেই ভালোবাসিতেন। লক্ষ্মণসেন সম্বন্ধেও একই কথা বলা চলে। যাহাই হউক, শশাঙ্কের পর হইতে, অর্থাৎ মোটামুটি অষ্টম শতক হইতেই, বাঙলাদেশের তিনটি জনপদই যেন সমগ্র বাঙলাদেশের সমার্থক হইয়া উঠে-পুণ্ড্র বা পুণ্ড্রবর্ধন, গৌড় ও বঙ্গ। এ কথা সত্য, আগে যেমন পরেও তেমনই, দেশে বিভিন্ন জনপদ এবং তাহাদের নামস্মৃতি ছিলই, নূতন নূতন স্থানের বিভাগীয় নামের উদ্ভবও হইতেছিল (যেমন, পূর্ব ও দক্ষিণ বাঙলা অঞ্চলে বঙ্গল হরিকেল, চন্দ্ৰদ্বীপ, সমতট; উত্তর-বঙ্গ অঞ্চলে বরেন্দ্রী; তাম্রলিপ্তি অঞ্চলে দন্ডভুক্তি; পশ্চিম বাঙলা অঞ্চলে রাঢ়ের উত্তর ও দক্ষিণ বিভাগ) এবং এইসব বিভাগের আবার নূতন নূতন উপবিভাগও নূতন নূতন নাম লইয়া দেখা দিতেছিল। কিন্তু আর সমস্তই যেন এই তিনটি জনপদের কাছে স্নান বলিয়া মনে হয়; আর সকলেই যেন ধীরে ধীরে ইহাদের মধ্যেই নিজেদের সত্তা বিলোপ করিয়া দিতেছিল। রাঢ়ের মতন প্রাচীন জনপদও যেন ক্রমশ গৌড়-নামের মধ্যেই বিলীন হইয়া যাইতেছিল। শশাঙ্ক এবং পাল-রাজারা সমগ্র পশ্চিম-বঙ্গের অধিকারী হইয়াও নিজেদের রাঢ়াধিপতি বা রাঢ়েশ্বর না বলিয়া নিজেদের পরিচয় দিলেন গৌড়াধিপ এবং গৌড়েশ্বর বলিয়া, এবং ভিন-প্রদেশীরাও তাহা মানিয়া লইল। ‘হর্ষচরিত’ ও ‘রাজতরঙ্গিণী-গ্ৰন্থ এবং নবম শতকের ভিন-প্রদেশী লিপিগুলিই তাহার প্রমাণ। পুণ্ড্র-বরেন্দ্রী সম্বন্ধেও একই কথা বলা চলে। পুণ্ড্রবরেন্দ্রীর স্মৃতি পুণ্ড্রবর্ধনের মধ্যে বঁচিয়া ছিল সেন আমলের প্রায় শেষ পর্যন্ত; কিন্তু এই পুণ্ড্রও যেন তাহার স্বতন্ত্র নামসত্তা গৌড়ের মধ্যে বিসর্জন দিতে যাইতেছিল; একজন পাল রাজা যদি বা একবার অন্তত বঙ্গপতি বলিয়া অভিহিত হইয়াছেন, পুণ্ড্রাধিপ বা পুণ্ড্র-বর্ধনেশ্বর বা বরেন্দ্রী-অধিপতি বলিয়া কোথাও তঁাহাদের উল্লেখ করা হয় নাই, যদিও বরেন্দ্রী ছিল তাহাদের জনকভূমি বা পিতৃভূমি। ইহার ঐতিহাসিক ইঙ্গিত লক্ষ্য করিবার মতন। পাল এবং সেন রাজাদের লক্ষ্য ও আদর্শ ছিল গৌড়েশ্বর বলিয়া পরিচিত হওয়া। বঙ্গপতি যে মুহুর্তে গৌড়ের অধিপতি সেই মুহূর্তেই তিনি গৌড়েশ্বর। লক্ষ্মণসেন যে মুহুর্তে গৌড় অধিকার করিলেন সেই মুহুর্তে তিনিও হইলেন গৌড়েশ্বর। শশাঙ্কের সময় হইতেই একটি মাত্র নাম লইয়া প্রাচীন বাঙলার বিভিন্ন জনপদগুলিকে ঐক্যবদ্ধ করিবার যে চেষ্টার সজ্ঞান সূচনা দেখা দিয়াছিল পাল ও সেন রাজাদের আমলে তাহা পূর্ণ পরিণতি লাভ করিল, যদিও বঙ্গ তখনও পর্যন্ত আপন স্বতন্ত্র-জনপদপ্রতিষ্ঠা বজায় রাখিয়াছে। এক গৌড় নাম লক্ষ্য ও আদর্শ হওয়া সত্ত্বেও বঙ্গ নাম তখনও প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে বিদ্যমান; পুণ্ড্র, পুণ্ড্রবর্ধনের রাষ্ট্রসত্তা আছে, কিন্তু স্বতন্ত্র পৃথক জনপদ-সত্তা তখন আর নাই। পরবর্তী কালেও গৌড় নামে বাঙলাদেশের কিয়দংশের জনপদ সত্তা বুঝাইবার চেষ্টা হইয়াছে; বাঙলার বাহিরে বাঙালী মাত্রেই গৌড়বাসী বা গৌড়ীয় বলিয়া পরিচিত হইয়াছেন, এমন প্রমাণও দুর্লভ নয়। ঔরঙ্গ জীবের আমলে সুবা বাঙলার যে অংশ নবাব শায়েস্তা খাঁর শাসনাধীন ছিল তাহাকে বলা হইত। গৌড়মণ্ডল। উনবিংশ শতকে যখন মধুসূদন দত্ত মহাশয় লিখিয়াছিলেন :
