গৌড়
গৌড়পুর-নামক একটি স্থানের উল্লেখ পাওয়া যাইতেছে পাণিনি-সূত্রে; কিন্তু এই গৌড়পুর বর্তমান বঙ্গদেশের কোনও স্থান। কিনা নিঃসংশয়ে বলা যায় না। কৌটিল্য বঙ্গদেশের অনেক জনপদেরই খবরাখবর রাখিতেন; তাহার ‘অর্থশাস্ত্ৰে গৌড়, পুণ্ড্র, বঙ্গ এবং কামরূপে উৎপন্ন অনেক শিল্প ও কৃষিদ্রব্যাদির খবর পাওয়া যায়; অন্যত্র তাহা উল্লিখিত হইয়াছে। পাণিনির টীকাকার পতঞ্জলিও গৌড়দেশের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। তৃতীয়-চতুর্থ শতকে বাৎস্যায়ন গৌড়দেশের সঙ্গে সুপরিচিত ছিলেন; গৌড়ের নাগরিকদের বিলাসব্যসন, নারীদের মৃদুবাক্য ও মৃদু অঙ্গের সবিশেষ পরিচয় তাহার ছিল; বঙ্গ এবং পৌণ্ডের সঙ্গেও তঁাহার পরিচয় ছিল। তাহাও যথাস্থানে যথাপ্রসঙ্গে উল্লিখিত হইয়াছে,। পুরাণে এক গৌড়দেশের উল্লেখ আছে (যেমন, “মৎস্যপুরাণে), কিন্তু সে গৌড়দেশ কৌশলীজনপদে বলিয়া অনুমিত হয়। বরাহমিহির (আনুমানিক, ষষ্ঠ শতক) গৌড়ক, পৌণ্ড্র, বঙ্গ, সমতট, বর্ধমান এবং তাম্রলিপ্তক নামে ছয়টি স্বতন্ত্র জনপদের উল্লেখ করিয়াছেৰ্ম্ম। ভাষায় গৌড়ীরীতির খবর পাওয়া যাইতেছে দণ্ডীর কাব্যাদর্শে, রাজশেখরের ‘কাব্যমীমাংসা’য়; বস্তুত, প্রাচীন সাহিত্যে গৌড়ের উল্লেখ সুপ্রচুর। কিন্তু সর্বত্র গৌড়দেশের অবস্থিতির ইঙ্গিত পাওয়া যায় না। বরাহমিহিরের ‘বৃহৎ-সংহিতার উল্লেখ হইতে খানিকটা আভাস অবশ্য পাওয়া, যাইতেছে, এবং সে আভাস যেন মুর্শিদাবাদ-বীরভূম-পশ্চিম বর্ধমানের দিকে। মুরারির ‘অনৰ্ঘারাঘবে’ (অষ্টম শতক) চম্পা গৌড়জনপদের রাজধানী বলিয়া কথিত হইয়াছে; এই চম্পা কি ভাগলপুর জেলার প্রাচীন চম্পা না মন্দারণ সরকারের অন্তর্গত বর্ধমান-শহরের উত্তর-পশ্চিমে, দামোদরের বামতীরের চম্পানগরী, বলা কঠিন। অষ্টম শতকের শেষার্ধে (ধর্মপালের প্রায় সমসাময়িক) গৌড়ের রাষ্ট্রাধিকার প্রাচীন অঙ্গদেশে বিস্তৃত ছিল ইহা একেবারে অসম্ভব নয়। মুদগগিরি বা মুঙ্গেরে যে একটি পাল-জয়স্কন্ধাবার ছিল তাহা তো সুবিদিত; তীরভুক্তি বা তিরহুতেও একটি ভুক্তি ছিল। কৃষ্ণমিশ্রের ‘প্ৰবোধচন্দ্রোদয়’ নাটকে রাঢ়া বা রাঢ়াপুরী এবং ভূরিশ্রেষ্ঠিক গৌড়রাষ্ট্রের অন্তর্গত বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে। একটি দক্ষিণী লিপিতেও রাঢ়দেশকে গৌড়দেশের অন্তর্ভুক্ত বলা হইয়াছে; কিন্তু যাদবরাজ প্রথম জৈন্তুগির মনগোলি লিপিতে অবার লাল (রাঢ়) এবং গৌল (গৌড়) পৃথক জনপদ বলিয়া ইঙ্গিত করা হইয়াছে। কামসূত্রের টীকাকার যশোধর কিন্তু বলিতেছেন, গৌড়দেশ একেবারে কলিঙ্গ পর্যন্ত বিস্তৃত। ‘ভবিষ্য-পুরাণের মতে গৌড়দেশের উত্তর সীমায় পদ্মা, দক্ষিণ সীমায় বর্ধমান। ত্ৰয়োদশ-চতুর্দশ শতকের কোনও কোনও জৈনগ্রন্থে জানা যায়, বর্তমান মালদহ জেলার প্রাচীন লক্ষ্মণাবতী গৌড়ের অন্তর্গত ছিল। সমসাময়িক মুসলমান ঐতিহাসিকদের ইঙ্গিতও তাঁহাই; বস্তুত, লক্ষ্মণাবতী নগরকেই তাহারা বলিয়াছেন গৌড় এবং এই গৌড় রাঢ়দেশে। মনে রাখা দরকার লক্ষ্মণাবতী-গৌড় তখন গঙ্গার পশ্চিম বা দক্ষিণ তীরে অবস্থিত ছিল; গঙ্গা তখন ঐখানে আরও উত্তর ও পূর্ববাহিনী হইয়া পরে দক্ষিণবাহিনী হইত। “ভবিষ্য-পুরাণ’ বা “ত্রিকাণ্ডশেষ গ্রন্থে গৌড়কে (লক্ষ্মণাবতী নগরী?) যে যথাক্রমে পুণ্ড্র বা বরেন্দ্রীর অন্তর্গত বলা হইয়াছে, তাহা এই কারণেই। শক্তিসংগমতন্ত্রে গৌড়দেশ বঙ্গ হইতে একেবারে ভুবনেশ (ভুবনেশ্বর) পর্যন্ত বিস্তৃত বলিয়া বলা হইয়াছে; ‘কথাসরিৎসাগরে বর্ধমানকে গৌর (= গৌড়)-জনপদের অন্তর্ভুক্ত বলিয়া বলা হইয়াছে। এক গৌড় ছিল কৌশলে (বর্তমান যুক্তপ্রদেশের গোণ্ডণ জেলা)। আর এক গৌড়ের খবর পাওয়া যায় শ্রীহট্ট জেলায়, গৌড়ের রাজার সঙ্গে পীর শাহজালালের যুদ্ধকাহিনী-প্রসঙ্গে। ‘রাজতরঙ্গিণী-গ্রন্থে প্রথম পাওয়া যাইতেছে পঞ্চগৌড়ের উল্লেখ, এবং পরে একাধিক গ্রন্থে দেখা যায় গৌড়, সারস্বত, কান্যকুব্জ, মিথিলা এবং উৎকল লইয়া পঞ্চগৌড়। পালসম্রাট ধর্মপাল-দেবপালের সময় গৌড়েশ্বরের রাষ্ট্ৰীয় প্রভুত্ব বিস্তারের ইতিহাস এই পঞ্চগৌড় নামটির মধ্যে পাওয়া যাইতেছে বলিয়া মনে করিলে বোধহয় কিছু অন্যায় হয় না। আর এক গৌড়-উপনিবেশের খবর পাওয়া যাইতেছে দক্ষিণ ব্রহ্মের পেগু শহরের নিকটবর্তী কল্যাণী লিপিমালায়; এই লিপিতে গোল বা গৌড়দের উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়।
কিন্তু এইসব উল্লেখ ও বিবরণের মধ্যে গৌড়জনপদের সঠিক অবস্থিতি সুস্পষ্ট জানা গেন্স না; শুধু এইটুকু বুঝা গেল, মুর্শিদাবাদ-বীরভূমই এই জনপদের আদি কেন্দ্র; পরে মালদহ এবং বোধহয় বর্ধমানও এই জনপদের সঙ্গে যুক্ত হয়। বর্তমানের এই কয়টি জেলা লইয়াই প্রাচীন গৌড়। এই গৌড়ের রাষ্ট্ৰীয় আধিপত্য যখন যেমন বিস্তৃত হইয়াছে-কখনও কলিঙ্গ, কখনও ভুবনেশ্বর-জনপদসীমাও তখন তেমনই বিস্তারিত হইয়াছে। ধর্মপাল-দেবপালের আমলে ভারতীয় ঐতিহাসিক ও জনসাধারণের পঞ্চমুখে শুনা যাইতেছে পঞ্চগৌড়ের কথা; বাঙলা অর্থই যেন গৌড়।
কর্ণসুবর্ণ
গৌড়ের অবস্থিতি সম্বন্ধে বঙ্গীয় লিপি-প্রমাণ কী আছে দেখা যাইতে পারে; সমসাময়িক ও নিঃসংশয় বিশ্বাসযোগ্য ভিনাপ্রদেশী লিপি এবং ইতিবিবরণও এই সম্পর্কে আলোচ্য। ঈশানবৰ্মণ মৌখরীর হড়াহা লিপিতে (৫৫৪ খ্ৰীষ্টাব্দ) গৌড়জনদের বর্ণনা করা হইয়াছে ‘গৌড়ান। সমুদ্রাশ্রয়ান বলিয়া। এই কথার সমর্থন পাওয়া যায় একাদশ শতকের গুৰ্গি লিপিতে; এই লিপিতে বলা হইয়াছে, “the lord of Gauda lies in the watery fort of the sea’। এই উক্তি হইতে মনে হয়, গৌড়াজনপদের দক্ষিণ সীমা ষষ্ঠ শতকে সমুদ্র হইতে খুব বেশি দূর ছিল না। সপ্তম শতকে গৌড়-কর্ণসুবর্ণরাজ শশাঙ্কের নবাবিষ্কৃত মেদিনীপুর-লিপিদুইটিতে দেখা যাইতেছে, গৌড়রাষ্ট্রের আধিপত্য সমুদ্রসীমা পর্যন্ত বিস্তৃত; উৎকলসহ দণ্ডভুক্তিদেশ গৌড়-রাষ্ট্রসীমার অন্তর্গত বলিয়া এই লিপিদুইটিতে স্পষ্ট উল্লেখ আছে। য়ুয়ান-চোয়াঙের বিবরণ এবং বাণভট্টের “হর্ষচরিতে শশাঙ্কের যে ইতিহাস বর্ণিত আছে তাহাতে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, শশাঙ্ক ছিলেন গৌড়ের রাজা; এবং কর্ণসুবর্ণ (=বর্তমান কনসোনা, মুর্শিদাবাদ জেলার রাঙ্গামাটি অঞ্চল) ছিল তাহার রাষ্ট্রকেন্দ্র বা রাজধানী, অর্থাৎ মুর্শিদাবাদ অঞ্চলই ছিল গৌড়ের কেন্দ্ৰভূমি।
