দক্ষিণ-রাঢ়
রাজেন্দ্রচোলের সৈন্য ওড্ডবিষয় এবং কোশলৈনাডু (দক্ষিণ-কোশল) জয় করিয়া পরে তন্ডবুত্তি (=দন্ডভুক্তি=বর্তমান দাঁতন) অধিকার করিয়াছিল, এবং দন্ডভুক্তির পরেই দক্ষিণ-রাঢ়। দেশগুলির ভৌগোলিক অবস্থিতি সুস্পষ্ট; দন্ডভুক্তি এবং বঙ্গের মধ্যবর্তী জনপদ-রাষ্ট্রেই দক্ষিণ-রাঢ় বা তককণলাঢ়ম। দক্ষিণ-রাঢ়ের প্রাচীনতম উল্লেখ মিলিতেছে বাকপতি মুঞ্জের একটি লিপিতে, এবং শ্ৰীধরাচার্যের ‘ন্যায়কন্দলী’-গ্রন্থে (৯৯১-৯২)। “ন্যায়কন্দলী’-গ্রন্থে আছে ‘আসীদক্ষিণারাঢ়ায়াং দ্বিজানাং ভূরিকর্মণাম। ভূরিসৃষ্টিরিতি গ্রামো ভূরিশ্রেষ্ঠিজনাশ্রয়ঃ’৷ শ্ৰীধরের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন দক্ষিণ-রাঢ়ের অধিপতি গুণরত্নাভরণ কায়স্থ কুলতিলক’ পাদ্ভুদাস। এই পাড়ুদাসই পাণ্ডুভূমি-বিহার প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন। কৃষ্ণমিশ্রের ‘প্ৰবোধচন্দ্রোদয়’ নাটকে (একাদশ-দ্বাদশ শতক) রাঢ়ের এবং একটি দক্ষিণী লিপিতে দক্ষিণ-রাঢ়ের উল্লেখ আছে; কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই এই জনপদটিকে গৌড় বা গৌড়দেশান্তর্গত বলা হইয়াছে। মধ্যপ্রদেশের নিমার জেলান্তর্গত মান্ধাতা অঞ্চলের অমরেশ্বর মন্দিরের একটি লিপিতে, এবং মুকুন্দরামের “চন্ডীমঙ্গল কাব্যেও (১৫৯৩-৯৪) দক্ষিণ-রাঢ়ের উল্লেখ পাওয়া যাইতেছে। শ্ৰীধর এবং কৃষ্ণমিশ্র দক্ষিণ-রাঢ়ের দুইটি প্রসিদ্ধ গ্রামের নাম করিতেছেন : ভূরিসৃষ্টি বা ভূরিশ্রেষ্ঠিক এবং নবগ্রাম; আর মুকুন্দরাম বলিতেছেন। দামুনাগ্রামের কথা, যে দামুন্যা বা দামিন্যা ছিল তাহার জন্মভূমি (“সহর সেলিমাবাজ তাহাতে সজ্জনরাজ নিবসে নেউগী গোপীনাথ। তাহার তালুকে বসি দামিন্যায় চাষ-চযি নিবাস পুরুষ ছয় সাত৷”) ভূরিসৃষ্টি বা ভূরিশ্রেষ্ঠিক (যেখানে ছিল অনেক শ্ৰেষ্ঠীর বাসস্থান=ভূরিশ্ৰেষ্ঠী জনাশ্রয়) বর্তমান হাওড়া জেলার ভুরসুট (বা ভূরিশিষ্ট্র বা ভুরসিট)-গ্রাম। নবগ্রাম বর্তমান হুগলী জেলায়, এবং দামুন্যা দামোদরের পশ্চিমে বর্তমান বর্ধমান জেলায়। স্পষ্টতই দেখা যাইতেছে, বর্তমান হাওড়া এবং হুগলী ও বর্ধমানের অধিকাংশ দক্ষিণ-রাঢ়ের অন্তর্গত। দ্বাদশ শতকের ওড়িশার চোড়গঙ্গরাজাদের আধিপত্য মিথুনপুর (নিঃসন্দেহে, বর্তমান মেদিনীপুর) পর্যন্ত বিস্তৃত হইয়াছিল, এবং অনন্তবৰ্মন চোড়গঙ্গ গঙ্গাতীরে মন্দার-রাজকে পরাভূত করিয়া তাহার দুর্গনগর আরম্য ধ্বংস করিয়াছিলেন। মিথুনপুর না হউক, মন্দার এবং আরম্য বোধহয় সেই সময় দক্ষিণ-রাঢ়ের অন্তর্গত ছিল। মন্দার নিঃসন্দেহে বর্তমান মন্দারণ বা মদারণ, মধ্যযুগের সরকার মন্দারণ বা গড় মন্দারণ; আরমও বর্তমান আরামবাগ। দুইই বর্তমান হুগলী জেলায়।
বর্ধমানভুক্তি, কঙ্কগ্রামভুক্তি
রাঢ়দেশের দুইটি রাষ্ট্রবিভাগের পরিচয় পাওয়া যায়। ষষ্ঠ শতকের মল্লসরুল-লিপি, দশম শতকের ইর্দা-লিপি, লক্ষ্মণসেনের নৈহাটি ও গোবিন্দপুর-লিপিতে বর্ধমানভুক্তির সাক্ষাৎ মেলে। ইর্দালিপিতে দেখিতেছি, দন্ডভুক্তিমন্ডল অর্থাৎ দীর্তন পর্যন্ত বর্ধমানভুক্তির সীমা বিস্তৃত; কিন্তু পঞ্চম ষষ্ঠ শতকে বোধহয় দক্ষিণে বর্ধমানভুক্তির এত বিস্তার ছিল না; কারণ, বরাহমিহির গৌড়ক, বর্ধমান ও তাম্রলিপ্তক পৃথক পৃথক জনপদ বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। পাল ও সেন-আমলে দন্ডভুক্তি-মণ্ডল ছাড়া বর্ধমান-ভূক্তির আরও তিনটি বিভাগ ছিল উত্তর-রাঢ়, দক্ষিণ-রাঢ়, মণ্ডল এবং পশ্চিম-খাটিকা। বর্ধমানভুক্তির অন্যতম রাষ্ট্রবিভাগ হিসাবে দক্ষিণ-রাঢ় মণ্ডলের উল্লেখ কোন লিপিতে নাই, কিন্তু এই মণ্ডলটিও যে বর্ধমানভুক্তির অন্তর্গত ছিল তাহা সহজেই অনুমান করা যাইতে পারে। যাহাই হউক, এই তিনটি জনপদ-রাষ্ট্রের কথা আগেই বলা হইয়াছে। পাল ও সেন-আমল ছাড়া দন্ডভুক্তি সাধারণত তাম্রলিপ্ত জনপদেরই অন্তর্ভুক্ত বলিয়া অনুমিত; সেইজন্য দন্ডভুক্তির কথা তাম্রলিপ্ত প্রসঙ্গেই বলা যাইবে। তবে, এইখানে বলিয়া রাখা চলে যে, ইর্দা-লিপি ছাড়া রাজেন্দ্রচোলের তিরুমালয়-লিপিতে এবং সন্ধ্যাকর নন্দীর “রামচরিতে যথাক্রমে তন্ডবুত্তি=দন্ডভুক্তি ও দন্ডভুক্তি-মণ্ডলের উল্লেখ আছে। দন্ডভুক্তি বর্তমান মেদিনীপুর (প্রাচীন মিথুনপুর) জেলার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ; বর্তমান দাতন প্রাচীন দন্ডভুক্তির স্মৃতিবহ। পশ্চিম-খাটিকা যে মোটামুটি বর্তমান হাওড়া জেলা, এবং গঙ্গার পশ্চিম তীরে সে ইঙ্গিত তো আগেই করা হইয়াছে। লক্ষ্মণসেনের শক্তিপুর-পট্টোলীতে রাঢ়ের আর একটি বিভাগের খবর পাওয়া যায়; ইহার নাম কঙ্কগ্রামভুক্তি, এবং উত্তর-রাঢ় এই ভুক্তির অন্তর্গত। কঙ্কগ্রাম কাহারও মতে রাজমহল নিকটবর্তী কাকজোল, কাহারও মনে মুর্শিদাবাদ জেলার ভরতপুর থানার কাগ্রাম। যাহাই হউক শাসনোল্লিখিত স্থানগুলির অবস্থিতি হইতে মনে হয়, বর্তমান মুর্শিদাবাদ এবং বীরভূম জেলার অধিকাংশ এবং সাঁওতাল পরগনারও কিয়দংশ এই কঙ্কগ্রামভুক্তির অন্তর্গত ছিল।
তাম্রলিপ্ত, দন্ডভুক্তি
মহাভারতে ভীমের দিগ্বিজয়-প্রসঙ্গে তাম্রলিপ্তের উল্লেখ সর্বপ্রথম পাওয়া যায়; পুরাণে তো বারবারই এই জনপদটির দেখা মেলে। বঙ্গ, কর্বট ও সুহ্মজনেরা ছিলেন তাহাদের প্রতিবেশী। জৈন ‘কল্পসূত্র’-গ্রন্থে গোদাসগণ-নামীয় জৈন সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের অন্যতম শাখার নাম তাম্রলিপ্তি শাখা। জৈন প্রজ্ঞাপনাগ্রন্থেও তামলিত্তি (তাম্রলিপ্তি) বঙ্গজনদের অধিকারে ছিল বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে। দশকুমারচরিত-গ্ৰন্থ দামলিপ্ত (তাম্রলিপ্ত) আবার সুহ্মের অন্তর্গত বলিয়া বর্ণিত হইয়াছে। জাতকের গল্পে, বৌদ্ধগ্রন্থে বারবার তাম্রলিপ্তির উল্লেখ পাওয়া যায় সুবৃহৎ নৌ-বাণিজ্যের কেন্দ্ররূপে। পেরিপ্লাস-গ্রন্থে, টলেমির বিবরণে, ফাহিয়ানায়ুয়ান-চোয়াঙ ও ইৎসিঙের বিবরণে তাম্রলিপ্ত বন্দরের বর্ণনা সুবিদিত। টলেমির সময়ে তাম্রলিপ্ত জনপদের রাজধানীই ছিল তাম্রলিপ্ত (Tamalites) বন্দর; সপ্তম শতকে য়ুয়ান-চোয়াঙ বলিতেছেন, তাম্রলিপ্ত বন্দর সমুদ্রের একটি উপবাহুর তীরে অবস্থিত ছিল (near an inlet of sea)। অষ্টম শতকের পর হইতেই তাম্রলিপ্ত বন্দরের সমৃদ্ধির পতন ঘটে, এবং বোধহয় তাহার আগে সপ্তম শতক হইতেই দন্ডভুক্তিজনপদের নামেই তাম্রলিপ্ত জনপদের পরিচয়। ইহাও হইতে পারে, এই সময় তাম্রলিপ্ত কিছুদিনের জন্য সুহ্মজনপদদ্বারা প্রভাবান্বিত হয়। যাহাই হউক, ষষ্ঠ-সপ্তম শতকে বরাহমিহির তাম্রলিপ্তকজনপদকে গৌড়ক (মুর্শিদাবাদ-বীরভূম এবং সম্ভবত পশ্চিম-বর্ধমান ও মালদহ) এবং বর্ধমান হইতে পৃথক জনপদ বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন, কিন্তু সপ্তম শতকে দণ্ডভুক্তি গৌড়-কর্ণসুবর্ণরাজ শশাঙ্কের করতলগত। সম্প্রতি আবিষ্কৃত শশাঙ্কের মেদিনীপুর-লিপি দুইটিতে দেখিতেছি, দণ্ডভুক্তি বা দণ্ডভুক্তিদেশ একজন শাসনকতাঁর (সামন্ত-মহারাজ সোমদত্ত এবং মহাপ্ৰতীহার শুভকীর্তি) অধীনে, এবং উৎকলদেশ এই রাষ্ট্রবিভাগের অন্তৰ্গত। দশম শতকের ইর্দা-লিপিতে দন্ডভুক্তিমন্ডল বর্ধমানভুক্তির অন্তর্গত। একাদশ শতকের প্রথম পাদে রাজেন্দ্রচোলের তিরুমালয়-লিপিতে তন্ডবুত্তি বা দন্ডভুক্তি দক্ষিণ-রাঢ়, বঙ্গালদেশ, এবং উত্তর-রাঢ় হইতে পৃথক জনপদ-রাষ্ট্র; দ্বাদশ শতকের মধ্যপাদে আবার এই দন্ডভুক্তি বর্ধমানভুক্তির অন্তর্গত। দন্ডভুক্তির রাজা পালরাজ রামপালের অন্যতম বিশ্বস্ত বন্ধু এবং সহায়ক ছিলেন।
