ঘনরসময়ী গভীরা বক্রিম-সুভগোপজীবিত কবিভিঃ।
অবগাঢ়া চ পুনীতে গঙ্গা বঙ্গাল-বাণী চ।—বঙ্গালস্য। (সদুক্তিকর্ণামৃত, ৫।৩১৷২)
পুণ্ড্র
পুণ্ড্রজনদের সর্বপ্রাচীন উল্লেখ ঐতরেয়-ব্ৰাহ্মণে, এবং তারপরে বোধায়ন-ধর্মসূত্রে। প্রথমোক্ত গ্রন্থের মতে ইহারা আর্যভূমির প্রাচ্য-প্রত্যন্তদেশের দস্যু কোমদের অন্যতম; দ্বিতীয় গ্রন্থের মতে ইহারা সংকীর্ণযোনী, অপবিত্র; বঙ্গ এবং কলিঙ্গাজনদের ইহারা প্রতিবেশী। ‘ঐতরেয়-ব্ৰাহ্মণের শুনঃশেপ-আখ্যানের এই উল্লেখে দেখা যায়, পুণ্ড্রারা অন্ধ, শবর, পুলিন্দ ও মুতিব কোমদের সংলগ্ন এবং আত্মীয় কোম। এই ধরনের একটি গল্প ‘মহাভারতের আদিপর্বে আছে, একাধিক পুরাণেও আছে; সেখানে কিন্তু পুণ্ড্রারা অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ এবং সুহ্মদের ঘনিষ্ঠ জ্ঞাতি। মানবধর্মশাস্ত্ৰে পুণ্ড্রদের বলা হইয়াছে ব্রাত্য ক্ষত্রিয়, যদিও “মহাভারতের সভাপর্বে বঙ্গ ও পুণ্ড্র উভয় কোমকেই শুদ্ধজাত ক্ষত্ৰিয় বলিয়া বর্ণনা করা হইয়াছে। কৰ্ণ, কৃষ্ণ এবং ভীমের যুদ্ধ এবং দিগ্বিজয় প্রসঙ্গেও মহাভারতে পুণ্ড্রকৌমের উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। কৰ্ণ সুহ্ম, বঙ্গ এবং পুণ্ড্রদের পরাজিত করিয়াছিলেন এবং বঙ্গ ও অঙ্গকে একটি শাসন-বিষয়ে পরিণত করিয়া নিজে তাহার অধ্যক্ষ হইয়াছিলেন। কৃষ্ণও একবার বঙ্গ ও পুণ্ড্রদের পরাজিত করিয়াছিলেন। কিন্তু, ভীমের দিগ্বিজয়ই সমধিক প্রসিদ্ধ। তিনি মুদগগিরির (মুঙ্গের) রাজাকে নিহত করিয়া প্রতাপশালী পুণ্ড্ররাজ ও কোশীনদীর তীরবর্তী অন্য একজন ভূপালকে পরাভূত করেন, এবং তাহার পর বঙ্গরাজকে আক্রমণ করেন। যাহাই হউক, উপরোক্ত উল্লেখগুলি হইতে বুঝা যাইতেছে, পুণ্ড্রদের জনপদ অঙ্গ, বঙ্গ এবং সুহ্ম কোমদের জনপদের সংলগ্ন, এবং হয়তো ইহারা সকলেই একই নিবগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। দ্বিতীয়ত, এই জনপদের অবস্থান মুদগগিরি বা মুঙ্গেরের পূর্বদিকে এবং কোশীতীর-সংলগ্ন। জৈনদের অন্যতম প্রাচীন গ্রন্থ ‘কল্পসূত্রে গোদাসগণ-নামীয় জৈন সন্ন্যাসীদের তিন-তিনটি শাখার উল্লেখ আছে; তাম্রলিপ্তি শাখা, কোটিবর্ষ শাখা, পুণ্ড্রবর্ধন শাখা। এই তিনটি শাখার নামই বাঙলার দুইটি জনপদ এবং একটি নগর হইতে উদ্ভূত। কোটিবর্ষ পুণ্ড্রবর্ধনের অন্তর্গত প্রসিদ্ধ নগর। খ্ৰীষ্টপূর্ব আনুমানিক দ্বিতীয় শতকের মহাস্থান-ব্ৰাক্ষী লিপিতে এক পুন্দনগল বা পুণ্ড্রনগরের উল্লেখ আছে। এই পুন্দনগলই বোধহয় ছিল তদানীন্তন পুণ্ড্রের রাজধানী বর্তমান বগুড়া জেলার মহাস্থান, যাহার পুরাতন ধ্বংসাবশেষ ঘেষিয়া এখনও করতোয়ার ক্ষীণধারা বহমান। এই করতোয়ারই তীৰ্থমহিমা ‘মহাভারতে’র বনপর্বের তীর্থযাত্রা অধ্যায়ে উল্লিখিত হইয়াছে। ‘লঘুভারতে’র কথায় “বৃহৎপরিসরা পুণ্যা করতোয়া মহানদী”।
পুণ্ড্রবর্ধন
এইসব প্রাচীন সাক্ষ্য পরবর্তী সাক্ষ্যদ্বারাও সমর্থিত হইতেছে। ক্রমবর্ধমান সমৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পুণ্ড্র পঞ্চম-ষষ্ঠ শতকে পুণ্ড্রবর্ধনে রূপান্তরিত হইয়াছে, এবং গুপ্তরাষ্ট্রের একটি প্রধান ভুক্তিতে পরিণত হইয়াছে। ধনাইদহ, বৈগ্রাম, পাহাড়পুর এবং দামোদরপুর, তাম্রপটোলী কয়টিতে এবং য়ুয়ান-চোয়াঙের বিবরণে এই পুণ্ড্রবর্ধন নামই পাওয়া যাইতেছে। উপরোক্ত পট্টোলীগুলিতে অ্যালিখিত বিভিন্ন স্থানের নাম হইতে এ তথ্য আজ নিঃসংশয় যে, তদানীন্তন পুণ্ড্রবর্ধনভূক্তি অন্তত বগুড়া-দিনাজপুর এবং রাজশাহী জেলা জুড়িয়া বিস্তৃত ছিল। মোটামুটি সমস্ত উত্তরবঙ্গই বোধহয় ছিল পুণ্ড্রবর্ধনের অধীন, একেবারে রাজমহল-গঙ্গা-ভাগীরথী তীর হইতে আরম্ভ করিয়া করতোয়া পর্যন্ত। কারণ, য়ুয়ান-চোয়াঙ কাজঙ্গল হইতে আসিয়াছিলেন পুণ্ড্রবর্ধনে এবং করতোয়া পার হইয়া— গিয়াছিলেন কামরূপ। কজঙ্গল এবং করতোয়া-মধ্যবর্তী ভূভাগই তাহা হইলে পুণ্ড্রবর্ধন; উত্তরে ‘হিমবচ্ছিখর’; দক্ষিণে সীমা কালে কালে বিভিন্ন।
পরবর্তীকালে পৌণ্ড্রভুক্তি, পুণ্ড্র বা পৌণ্ড্রবর্ধনভূক্তির রাষ্ট্রসীমা উত্তরোত্তর বাড়িয়াই গিয়াছে। ধর্মপালের (অষ্টম শতক) খালিমপুর-লিপিতেই দেখিতেছি পুণ্ড্রবর্ধনান্তর্গত ব্যাঘ্রতটীমণ্ডলের উল্লেখ। এই ব্যাঘ্রতটীমণ্ডল যে দক্ষিণ-সমুদ্রতীরবর্তী ব্যাঘ্ৰ্যাধুষিত বনময় প্রদেশ হওয়া অসম্ভব নয়, সে কথা আগেই বলিয়াছি। সেন-আমলে দেখিতেছি পুণ্ড্রবর্ধনের দক্ষিণতম সীমা পশ্চিম দিকে খাড়িবিষয়—খাড়িমণ্ডল (বর্তমান খাড়ি পরগনা, ২৪ পরগনা), অন্যদিকে ঢাকা-বাখরগঞ্জের সমুদ্রতীর পর্যন্ত। বঙ্গের নাব্য এবং বিক্রমপুর ভাগও তখন পুণ্ড্রবর্ধনের অন্তর্গত। সদ্যোক্ত খাড়ি নিশ্চয়ই ভাগীরথীর পূর্ব তীরের (পূর্ব) খাড়ি বা ১১৯৬ খ্ৰীষ্টাব্দের ডোম্মনপালের পট্টোলীর পূর্ব-খাটিকা। কারণ, লক্ষ্মণসেনের গোবিন্দপুর-পট্টোলীতে পশ্চিম-খাটিকারও উল্লেখ পাইতেছি; এই পশ্চিম-খাটিকা বর্ধমানভুক্তির অন্তর্গত, ভাগীরথীর পশ্চিমতীরে। রাঢ়দেশের কোনও অঞ্চল বোধহয় কখনও পুণ্ড্রবর্ধনভূক্তির অন্তর্ভুক্ত হয় নাই। পশ্চিম-খাটিকার অন্তর্গত বেতডচতুরক। বর্তমান হাওড়া, জেলার বেতড়ে পরিণত হইয়াছে। বেতড় ভাগীরথীর পশ্চিম তীরে।
বরেন্দ্র, বরেন্দ্রী
