পুণ্ড্রবর্ধনের কেন্দ্র বা হৃদয়স্থানের একটি নূতন নাম পাইতেছি। দশম শতক হইতে; এ নাম বরেন্দ্র অথবা বরেন্দ্রী। ৯৬৭ খ্ৰীষ্টাব্দের একটি দক্ষিণী লিপিতে ‘বারেন্দ্ৰদ্যুতিকারিণী এবং ‘গৌড়চূড়ামণি নামক জনৈক ব্ৰাহ্মণের উল্লেখ আছে। কিন্তু প্ৰসিদ্ধতম উল্লেখ সন্ধ্যাকর নন্দীর “রামচরিত’ কাব্যের কবি-প্রশস্তিতে, এবং গায়াড় তুঙ্গদেবের তালচের পট্টোলীতে। কবি সন্ধ্যােকর বরেন্দ্রীকে পালরাজাদের জনকভূ অর্থাৎ পিতৃভূমি বলিয়া ইঙ্গিত করিয়াছেন, এবং গঙ্গা-করতোয়ার মধ্যে সিলিমপুর-শিলালিপি, তৰ্পণদীঘি এবং মাধ্যাইনগর-পট্টোলী তিনটিতে স্পষ্ট উল্লিখিত আছে যে, বরেন্দ্রী পুণ্ড্রবর্ধনভূক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেন রাজাদের পট্টোলীগুলিতে বরেন্দ্রীর অন্তর্গত স্থানগুলির অবস্থিতি হইতে এ অনুমান নিঃসংশয়ে করা যায় যে, বর্তমান বগুড়া-দিনাজপুর ও রাজশাহী জেলা, এবং হয়তো পাবনাও (পদুম্বা?) প্রাচীন বরেন্দ্রীর বর্তমান প্রতিনিধি৷ বরেন্দ্রীই মধ্যযুগীয় মুসলমান ঐতিহাসিকদের বরিন্দ, তবে বরিন্দ প্রাচীন বরেন্দ্রী অপেক্ষা সংকীর্ণতর বলিয়া মনে হয়। ‘তবাকাত-ই-নাসিরী”-গ্রন্থে গঙ্গার পর্বতীরবর্তী এবং লক্ষ্মণাবতী রাজ্যের একটি অংশ মাত্র বলা হইয়াছে। এই গ্রন্থের মতে লক্ষ্মণাবতী রাজ্যের দুই বিভাগ গঙ্গার দুই তীরে; পশ্চিমে রাল (=রাঢ়), পূর্বে বরিন্দ (=বরেন্দ্রী বা বরেন্দ্র)। প্রাচীন বাঙলার আর একটি বিভাগে লক্ষ্মণসেনের বংশধরেরা তখনও (অর্থাৎ, ১২৪২-৪৫ খ্ৰীষ্টাব্দের মিনহাজের লক্ষ্মণাবতী প্রবাসকালে) রাজত্ব করিতেছিলেন; এই বিভাগটির নাম বঙ্গ (=বঙ্গ)। যাহা হউক, মধ্যযুগীয় সাহিত্য, ইতিহাস এবং কুলজী গ্রন্থে বরেন্দ্র-বরেন্দ্রীর উল্লেখ প্রচুর; লোকস্মৃতিতেও বরেন্দ্র এবং বরেন্দ্রীর ঐতিহ্য বরাবর জাগরূক ছিল। ইহাদের ইঙ্গিতেও বরেন্দ্রী উত্তরবঙ্গের কেন্দ্ৰস্থলে।
রাঢ়া
রাঢ়া-জনপদের প্রাচীনতম উল্লেখ পাইতেছি প্রাচীন জৈনগ্রন্থ ‘আয়ারাঙ্গ’ বা ‘আচারাঙ্গ’ সূত্রে মহাবীর তাঁহার কয়েকজন শিষ্যসহ রাঢ়া-জনপদে আসিয়াছিলেন বা ধর্মপ্রচারের জন্য (খ্ৰীঃ পূঃ ষষ্ঠ শতক); এই জনপদ তখন পথবিহীন, আচারবিহীন, এবং লোকেরাও একটু নিষ্ঠুর ও রূঢ় প্রকৃতির। তাঁহারা এইসব অহিংস যতিদের পিছনে কুকুর লেলাইয়া দিয়াছিল। জৈন ‘প্রজ্ঞাপনা’-গ্রন্থে রাঢ় ও বঙ্গজনদের একত্র গ্রথিত করিয়া উভয়কেই আর্য বলা হইয়াছে। কোটিবর্ষ (বা পরবর্তী কোটিবৰ্ষ) ছিল তাঁহাদের রাজধানী। কোটিবর্ষ দিনাজপুর জেলায়, এবং দামোদরপুর-পট্টেলীর (পঞ্চম-ষষ্ঠ শতক) মতে কোটিবর্ষ পুণ্ড্রবর্ধনভূক্তির অন্তর্গত; পাল-আমলেও তাঁহাই। ‘আচারাঙ্গ সূত্রে রাঢ়া-জনপদের দুইটি বিভাগ : বজ্জ বা বজাতৃভূমি, সুবভি বা সুহ্মভূমি। বজ্রভূমিতে জৈন সন্ন্যাসীদের অপরিস্কৃত নিকৃষ্ট খাদ্য খাইয়া দিন কটাইতে হইয়াছিল। সিংহলী পালিগ্রন্থ ‘দীপবংশ’ ও ‘মহাবংশ-কথিত বিজয়সিংহের কাহিনী সুবিদিত। বঙ্গরাজ সীহরাহু (সিংহবাহু) লাড়দেশে সীহপূর-নামে এক নগরের পত্তন করিয়াছিলেন বলিয়া এই কাহিনীতে উল্লিখিত আছে। কেহ কেহ বলেন, এই লাড়দেশ কাথিয়াবাড়ি অঞ্চলের প্রাচীন লাটদেশ, এবং সীহপুর বর্তমান সীহোর। কাহারও মতে লাড়দেশ প্রাচীন লাঢ় বা রাঢ়-জনপদ এবং সীহপুর বর্তমান হুগলী জেলার সিঙ্গুর। সীহবাহু লাড়দেশে নগর পত্তন করিবার সময় বঙ্গ-জনপদেরই রাজা ছিলেন। বঙ্গের সঙ্গে লাড়ের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ এবং নৈকট্য দেখিয়া মনে হয়, লাড়দেশে বঙ্গের রাঢ়দেশ হওয়া অসম্ভব নয়। রাজশেখরের ‘কর্পূরমঞ্জরী-গ্রন্থে রাঢ়া-জনপদের সৌন্দর্যের উল্লেখ আছে; হলায়ুধের অভিধান-গ্রন্থেও অনুরূপ উল্লেখ পাওয়া যায়।
সুহ্মভূমি
রাঢ়-জনপদের বিভাগের মধ্যে সুবভ=সুহ্মবিভাগ সমধিক প্রসিদ্ধ এবং সম্ভবত প্রাচীন। সুহ্ম-জনদের উল্লেখ আছে ‘মহাভারতে, কর্ণ ও ভীমের দিগ্বিজয়-প্রসঙ্গে। কর্ণদেব সুহ্ম, পুণ্ড্র ও বঙ্গজনদের যুদ্ধে পরাজিত করিয়াছিলেন। ভীমের দিগ্বিজয়-প্রসঙ্গেও ভীমকর্তৃক মুদগগিরি, পুণ্ড্র, বঙ্গ, তাম্রলিপ্তি, এবং সুহ্মজন ও রাজাদের পরাজয়ের কথা আছে। ‘দশকুমারচরিত’-গ্ৰন্থ কিন্তু সুহ্ম ও তাম্রলিপ্তিকে পৃথক জনপদ বলিতেছে না, বরং তাম্রলিপ্তিকে সুহ্মের অন্তৰ্গত বলিয়া বলিতেছে। রঘুবংশে রঘুর দিগ্বিজয়-প্রসঙ্গে মহোদধির তালিবনশ্যামপকণ্ঠে সুহ্মদের পরাজয়ের উল্লেখ আছে। এই শ্লোকদ্বয়ের পূর্বেই আর একটি শ্লোক আছে
সে সেনা মহতীং কর্যন পূর্বসাগর গামিনীম।
বভৌ হরজটাভ্ৰষ্টাং গঙ্গামিব ভাগীরথঃ। (৪।৩২)
এই শ্লোকটির ব্যঞ্জনা হইতে মনে হয়, রঘু গঙ্গা-ভাগীরথীর পশ্চিম উপকূল বাহিয়া দক্ষিণসাগরের দিকে অগ্রসর হইয়াছিলেন, এবং ইহারই দক্ষিণ অংশের ভূভাগ সুহ্ম-নামে পরিচিত ছিল। ধোয়ী কবির ‘পবনদূতেও গঙ্গা-তীরবর্তী সুহ্মের উল্লেখ আছে এবং এই দেশে গঙ্গা-যমুনা সংগমে ত্রিবেণী অতিক্ৰম করিয়া লক্ষণসেনের রাজধানী বিজয়পুরের পথের ইঙ্গিত আছে। এই গঙ্গা-যমুনা সংগম ও ত্ৰিবেণী বর্তমান হুগলী জেলায়। এইসব সাক্ষ্য-প্রমাণ হইতে অনুমান করা চলে যে, গঙ্গা-ভাগীরথীর পশ্চিম তীরবর্তী দক্ষিণতম ভূখণ্ড, অর্থাৎ বর্তমান বর্ধমানের দক্ষিণাংশ, হুগলীর বহুলাংশ পশ্চিম এবং হাবড়া জেলাই প্রাচীন সুহ্ম-জনপদ; মোটামুটি ইহাই পরবর্তী কালের দক্ষিণ-রাঢ়। ‘মহাভারতের টীকাকার নীলকণ্ঠ অবশ্য বলিতেছেন, সুহ্ম এবং রাঢ়া এক এবং সমার্থক। হয়তো কখনও সুহ্মজনপদের প্রভাবসীমা সমস্ত রাঢ়দেশেই বিস্তৃতি লাভ করিয়াছিল, যেমন ‘দশকুমারচরিত’-মতে এক সময় সেই প্রভাব তাম্রলিপ্তিতেও বিস্তৃত হইয়াছিল; কিন্তু সাধারণত সুহ্মভূমি রাঢ়ভূমির দক্ষিণতম অংশ বলিয়াই পরিচিত ছিল। বৌদ্ধ পালি গ্রন্থ “সংযুক্ত-নিকায় এবং ‘তেলপত্ত-জাতকেও সুমভি বা সূহ্মাজনদের উল্লেখ আছে, কিন্তু তাহাদের অবস্থিতির কোনও ইঙ্গিত পাওয়া যায় না।
