পট্টিকেরা
এই কেন্দ্ৰস্থলটি যে একাদশ হইতে ত্ৰয়োদশ শতক পর্যন্ত পট্টিকেরা-রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল তাহার প্রমাণ পাওয়া যাইতেছে ‘অষ্টসাহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা’র একটি পাণ্ডুলিপিতে (১০১৫ খ্ৰীষ্টাব্দ; চুণ্ডাদেবীর ছবির নিচে “পট্টিকেরে চুণ্ডাবর ভবনে চুণ্ডা”-পরিচয় দ্রষ্টব্য; এই চুণ্ডাবর ভবন ও চুণ্ডাদেবীর সঙ্গে বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমার চুন্টটাগ্রামের একটু যোগ আছে বলিয়া মনে হইতেছে), ব্ৰহ্মদেশীয় রাজবৃত্ত হিমনান গ্রন্থে, এবং ১২২০ খ্ৰীষ্টাব্দের রণবঙ্কমল্ল শ্ৰীহরিকালদেবের একটি লিপিতে। কিন্তু, অন্তত দ্বাদশ শতকে সমতটের পশ্চিম সীমা বোধহয় মধ্য-বঙ্গ অতিক্রম করিয়া একেবারে বর্তমান চব্বিশ পরগনার খাড়ি পরগনা (প্রাচীন খাড়িমণ্ডল) পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। বিজয়সেনের বারাকপুর পট্রেলীতে দেখিতেছি, খাড়িমণ্ডলের ভূমির পরিমাপ করা হইতেছে। ‘সমতাটিয় নলেন। সেন-লিপিগুলিতে ভূমিপরিমাপের যে অভ্যাসের পরিচয় আমরা পাই তাহাতে মনে হয়, যে ভূখণ্ড যে জনপদের অন্তর্ভুক্ত সেই জনপদে ব্যবহৃত নলেই ভূখণ্ডের পরিমাপ করা হইত। সেইজন্য মনে হয়, খাড়িমণ্ডল তখন সমতটেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল। এরূপ হওয়া কিছুতেই অস্বাভাবিক নয়, অসম্ভব তো নয়ই। সমতটের অর্থই হইতেছে তটের সঙ্গে যাহা সমান, অর্থাৎ সমুদ্রশায়ী নিম্নদেশ। গঙ্গা-ভাগীরথীর পূর্বতীর হইতে আরম্ভ করিয়া একেবারে মেঘনা-মোহনা পর্যন্ত সমুদ্রশায়ী ভূখণ্ডকেই বোধহয় বলা হইত সমতট, যাহা মুসলমান ঐতিহাসিকদের এবং মধ্যযুগীয় বাঙলা সাহিত্যের ভাটি, তারনাথের বাটি। যাহা হউক ত্রিপুরা ও মধ্য-বঙ্গ –যে বঙ্গেরই অন্তর্ভুক্ত, তাহা তো আমরা আগেই দেখিয়াছি।
নারায়ণপালদেবের ভাগলপুর-শাসনে সৎসমতটজন্মা শুভদাসপুত্ৰ শ্ৰীমান সংখদাস নামে এক শিল্পীর উল্লেখ আছে; সৎসমতট কোন জায়গা তাহা নির্ণয় করা কঠিন, তবে নিশ্চয়ই সমতট-সম্পূক্ত কোনও স্থান। অথবা, সৎ শুধু সমতটের একটি বিশেষণ মাত্র।
বঙ্গাল
একাদশ শতক হইতে প্রাচীন বঙ্গের একটি বিভাগের নূতন একটি নাম পাইতেছি, বঙ্গাল। বিজ্জল কলচুর্যের অবলুর লিপি, রাজেন্দ্রচোলের তিরুমালয় লিপি এবং আরও কয়েকটি দক্ষিণী লিপিতে প্রথম বঙ্গালদেশের নামের উল্লেখ দেখিতেছি। অবলুর লিপি এবং আরও অন্তত দুটি দক্ষিণী লিপিতে বঙ্গ ও বঙ্গাল দুটি জনপদই একই সঙ্গে উল্লিখিত হইয়াছে। এ অনুমান স্বাভাবিক যে, বঙ্গ ও বঙ্গল একাদশ শতকে দুই পৃথক জনপদ ছিল। পরেও ইহাদের পৃথকভাবেই গণ্য করা হইত। নয়চন্দ্র সূরীর “হাম্মির মহাকাব্য (পঞ্চদশ শতক) এবং সামশ-ই-সিরাজ আফিফা -র তারিখ-ই-ফিরুজস্যহী”-গ্রন্থেও এই দুই জনপদকে পৃথক ভাবে গণ্য করা হইয়াছে। কিন্তু, এই একাদশ শতকেরই রাজেন্দ্রচোলের তিরুমালয় লিপি পাঠে মনে হয়, চোল সৈন্য দণ্ডভুক্তি (তাম্রলিপ্তি অঞ্চল, বর্তমান দাতন) ও তককণ লাঢ় (দক্ষিণ-রাঢ়) জয় করিবার পর বঙ্গালদেশের রাজা গোবিন্দচন্দ্ৰকে পলায়নপর করেন; বঙ্গের কোনও উল্লেখ এই লিপিতে নাই। স্বতঃই অনুমান হয়, দক্ষিণ-রাঢ়ের পরই ছিল, বঙ্গলদেশ, এবং এই দুই দেশের মধ্যসীমা ছিল বোধহয় গঙ্গা-ভাগীরথী। রাজা গোবিন্দচন্দ্ৰ যে বংশের রাজা সেই বংশ যে হরিকেল-ত্রিপুরা চন্দ্ৰদ্বীপের অধিপতি ছিলেন, এ তথ্য ঐতিহাসিকদের কাছে সুবিদিত। বিক্রমপুর অঞ্চলেও গোবিন্দ চন্দ্রের অন্তত দুইটি লিপি প্রমাণ পাওয়া গিয়াছে এবং এই অঞ্চলও গোবিন্দচন্দ্রের রাজ্যভুক্ত ছিল। দেখা যাইতেছে, একাদশ শতকে বঙ্গালদেশ বলিতে প্রায় সমস্ত পূর্ব-বঙ্গ এবং দক্ষিণ-বঙ্গের সমুদ্রতটশায়ী সমস্ত দেশখণ্ডকে বুঝাইত। ইহার সম্পূর্ণ না হউক কতক অংশকে যে সমতট বলা হইত, তাহা তো আগেই দেখিয়াছি। চন্দ্ৰদ্বীপ-হরিকেলও তখন বঙ্গালদেশেরই অংশ। দ্বাদশ শতকে না হউক, ত্ৰয়োদশ শতকে এইসব অংশই আবার বঙ্গের। বিক্রমপুর এবং নাব্যভাগের অন্তর্গত। মানিকচন্দ্র রাজার গানের “ভাটি হইতে আইল বাঙ্গাল লম্বা লম্বা দাড়ি” পদে অনুমান হয়, ভাটি ও বঙ্গাল বা বাঙ্গালদেশ এক সময়ে প্রায় সমার্থকই ছিল। কিন্তু বঙ্গাল বা বাঙ্গালদেশের কেন্দ্ৰস্থান বোধহয় ছিল পূর্ববঙ্গে। বিশ্বরূপসেনের সাহিত্য-পরিষদ -লিপিতে রামসিদ্ধি পাটকের দক্ষিণে বাঙ্গালবড়া-নামে একখণ্ড ভূমির উল্লেখ আছে। রামসিদ্ধি পাটক যে বর্তমান বাখরগঞ্জ জেলার গৌরনদী অঞ্চলের একটি গ্রাম তাহা এখন স্বীকৃত এবং আগেই তাহা উল্লেখও করিয়াছি। বাঙ্গালিবাড়াও বাখরগঞ্জ জেলার কোনও স্থান হওয়াই স্বাভাবিক। Gastaldi-র (১৫৬১) নকশায় Bengala-র অবস্থিতি যেন এই অঞ্চলেই দেখান হইয়াছে; কিন্তু ষোড়শ শতক হইতে যতো নকশা প্রায় প্রত্যেকটিতেই দেখিতেছি Bengala-র অবস্থান আরও পূর্বদিকে। এই Bengala-বন্দর যে কোন বন্দর তাহা বলা কঠিন; কেহ বলেন চট্টগ্রাম, কেহ বলেন প্রাচীন ঢাকা। ঢাকা শহরে বাঙ্গালাবাজার এখনও প্রসিদ্ধ পল্লী ও বাজার; বাঙ্গালাবাজার মধ্যযুগীয় Bengala-বন্দরের স্মৃতি বহন করা অসম্ভব নয়। ‘সদুক্তিকর্ণামৃত’-গ্রন্থে (সংকলন কাল ১২০৬; সংকলন-কর্তা শ্ৰীধর দাস) জনৈক অজ্ঞাতনামা বঙ্গল=বাঙ্গাল=পূর্ববঙ্গীয় কবির রচিত একটি গঙ্গাস্তোত্র স্থান পাইয়াছে। এই কবি নিজের বাণীকে গঙ্গার সহিত উপমিত করিয়াছেন। উপমাচাতুর্যে স্তোত্রটি এত সুন্দর যে, বঙ্গ-বাঙ্গাল প্রসঙ্গে ইহা উদ্ধৃত করিবার লোভ সংবরণ করা কঠিন :
