হরিকেল, হরিকেলি, হরিকোলা
কোষকার হেমচন্দ্ৰ তাঁহার ‘অভিধান-চিন্তামণি’তে (দ্বাদশ শতক) বঙ্গ ও হরিকেলি-জনপদ এক ও সমাৰ্থক বলিয়া ইঙ্গিত করিয়াছেন; “চম্পাস্তু অঙ্গা বঙ্গাম্ভ হরিকেলিয়াঃ”। প্রাচ্যদেশের পূর্বতম সীমায় হরিকেল, দুই চীন পরিব্রাজকের (সপ্তম শতক) বিবরণীতে এই খবর জানা যায়। আনুমানিক অষ্টম শতকে রচিত আর্যমঞ্জুশ্ৰীমূলকল্প গ্রন্থে বঙ্গ, সমতট ও হরিকেল তিনটি স্ব-স্বতন্ত্র কিন্তু প্রতিবেশী জনপদ বলিয়া ইঙ্গিত করা হইয়াছে; এই তিনটি জনপদেই অসুর বুলি প্রচলিত ছিল, তাহাও বলা হইয়াছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রক্ষিত ‘রুদ্রাক্ষ মাহাত্য’ (ত্ম্য) এবং ‘রূপচিন্তামোণিকোষ’ (‘রূপচিন্তামণিকোষ’; পঞ্চদশ শতক) নামক দুইটি পাণ্ডুলিপিতে শ্ৰীহট্ট এবং হরিকোলা-নামক জনপদ দুইটিকে এক এবং সমার্থক বলা হইয়াছে। রাজশেখরের ‘কর্পূরমঞ্জুরী-গ্রন্থে (নবম শতক) হরিকেলি-জনপদের নারীদের খুব স্তুতিবাদ করা হইয়াছে, এবং তাহারা পূর্বদেশবাসিনী তাহাও ইঙ্গিত করা হইয়াছে। ‘ডাকার্ণব’-গ্রন্থে বর্ণিত চৌষট্টিটি তান্ত্রিক পীঠের একটি পীঠ হারিকেল, এবং এই হরিকেল টিক্কর, খাড়ি, রাঢ় এবং বঙ্গালদেশ হইতে পৃথক। হরিকেলদেশে বৌদ্ধ দেবতা লোকনাথের একটি মন্দিরও বোধহয় ছিল। টিক্কর ‘রামচরিত’ কাব্যের ঢেক্করীয়-ঢেকুরী, কাটোয়ার কাছে, বর্ধমান জেলায়। শ্ৰীচন্দ্রের রামপাল-লিপিতে শ্ৰীচন্দ্রের পিতা ত্ৰৈলোক্যচন্দ্ৰদেবকে আগে হরিকেল এবং পরে চন্দ্ৰদ্বীপেরও (বাখরগঞ্জ) রাজা বলিয়া ইঙ্গিত করা হইয়াছে। অনুমান হয়, হরিকেল চন্দ্ৰদ্বীপ বা বাখরগঞ্জ অঞ্চলের সংলগ্ন ছিল। কান্তিদেবের চট্টগ্রাম-লিপিতে হরিকেলকে একটি মণ্ডল বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। এইসব সাক্ষ্য প্রমাণ হইতে মনে হয়, হরিকেল সপ্তম-অষ্টম শতক হইতে দশম-একাদশ শতক পর্যন্ত বঙ্গ (চন্দ্ৰদ্বীপ ও বঙ্গে) এবং সমতটের সংলগ্ন কিন্তু স্বতন্ত্র রাজ্য ছিল, কিন্তু ত্ৰৈলোক্যচন্দ্রের চন্দ্ৰস্বীপ অধিকারের-পর হইতেই হরিকেলকে মোটামুটি বঙ্গের অর্ন্তভুক্ত বলিয়া গণনা করা হয়। “ডাকার্ণব এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাণ্ডুলিপি-দুইটির সাক্ষ্য একত্ৰ করিলে হরিকেল বা হরিকোলা যে শ্ৰীহট্ট পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তাহা স্বীকার করিতে আপত্তি হইবার কারণ নাই। আর কাস্তিদেবের লিপি সাক্ষ্যে মনে হয়, সমসাময়িক কালে চট্টগ্রামও হরিকেল-অন্তর্ভুক্ত থাকা কিছু বিচিত্র নয়। শ্ৰীহট্ট চৌষট্টি তান্ত্রিক পীঠের অন্যতম পীঠ। দ্বাদশ শতকে গুজরাতে বসিয়া হেমচন্দ্র যখন তাহার অভিধান লিখিতেছিলেন তখন তাহার পক্ষে বঙ্গ এবং হরিকেল সমার্থক বলা হয়তো খুব অন্যায় হয় নাই। তাহা ছাড়া, তাহার উক্তি একটু শিথিলভাবেই প্রযোজ্য, কারণ, চম্পা অঙ্গদেশের একটি অংশ মাত্র, অবশ্য কেন্দ্রীয় অংশ, অথচ তিনি বলিতেছেন, ‘চম্পাস্তু অঙ্গাঃ’। হরিকেলও সেই হিসাবে বঙ্গের অংশ মাত্র, অবশ্যই রাজা ত্ৰৈলোক্যচন্দ্র দেবের রাজ্যের আদিকেন্দ্র; সে ক্ষেত্রেও তিনি বলিতেছেন, “বঙ্গাস্তু হরিকেলিয়াঃ”। একটু শিথিলভাবে বলা, সন্দেহ কী!
চন্দ্ৰদ্বীপ
এইমাত্র আমরা শ্ৰীচন্দ্রের রামপাল-লিপিতে ত্ৰৈলোক্যচন্দ্রদেবের প্রসঙ্গে চন্দ্ৰদ্বীপের উল্লেখ দেখিয়াছি (দশম-একাদশ শতক)। ১০১৫ খ্ৰীষ্টাব্দের একটি পাণ্ডুলিপিতেও চন্দ্রদ্বীপের তারামূর্তি ও মন্দিরের ইঙ্গিত আছে। বিশ্বরূপ সেনের সাহিত্য-পরিষদ-লিপিতেও বোধহয় চন্দ্রদ্বীপের উল্লেখ আছে (ত্ৰয়োদশ শতক); এই চন্দ্ৰদ্বীপের ঘাঘরকাট্টিপাটক নিশ্চয়ই ঘাঘরনদীর তীরবর্তী ঘাঘরকাটি-নামক কোনও গ্রাম (বরিশাল জেলার ঝালকাটি প্রভৃতি কাটি-পদান্ত নাম লক্ষণীয়); এই ঘাঘরনদীর তীরেই ফুল্লশ্ৰীগ্রামে মনসার পাঁচালীর কবি বিজয়গুপ্তের (পঞ্চদশ শতক) বাসভূমি ছিল।
“পশ্চিমে ঘাঘর নদী পূর্বে ঘণ্টেশ্বর।
মধ্যে ফুল্লশ্ৰী গ্রাম পণ্ডিত-নগর।
স্থানগুণে যেই জন্মে সেই গুণময়।
হেন ফুল্লশ্ৰী গ্রামে বসতি বিজয়৷”
মধ্যযুগে চন্দ্ৰদ্বীপ সুপ্রসিদ্ধ স্থান। ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থের বাকলা পরগনার বাকলা সরকার (বর্তমান বাখরগঞ্জ জেলায়) আর চন্দ্ৰদ্বীপ একই স্থান বলিয়া বহুদিনই স্বীকৃত হইয়াছে। এই চন্দ্ৰদ্বীপ বা বাখরগঞ্জ অঞ্চল যে অন্তত ত্ৰয়োদশ শতকে বঙ্গের অন্তর্ভুক্ত ছিল তাহা তো আগেই দেখিয়াছি।
সমতট
সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ স্তম্ভলিপিতে (চতুর্থ শতক) ডবাক-নেপাল–কর্তৃপুর-কামরূপের সঙ্গে, এবং বরাহমিহিরের (ষষ্ঠ শতক) ‘বৃহৎ-সংহিতায় পুণ্ড্র-তাম্রলিপ্তক–বর্ধমান-বঙ্গের সঙ্গে, সমতট-নামে একটি জনপদের উল্লেখ সর্বপ্রথম পাওয়া যাইতেছে। সপ্তম শতকে য়ুয়ান-চোয়াঙের বিবরণী পাঠে মনে হয়, সমতট ছিল কামরূপের দক্ষিণে। এই শতকেরই শেষাশেষি ইৎসিঙ সমতট রাজভটি-নামে এক রাজার উল্লেখ করিতেছেন; রাজভটি এবং আম্রফপুর পট্টোলীর (সপ্তম শতক) রাজরাজীভট্ট একই ব্যক্তি বলিয়া বহুদিন পণ্ডিতসমাজে স্বীকৃত হইয়াছেন। রাজরাজ্যভট্টের অন্যতম রাজধানী ছিল কর্মান্ত বা ত্রিপুরা জেলার বড়োকামতা। য়ুয়ান-চোয়াঙের বিবরণী পাঠে মনে হয়, মধ্য-বাঙলার অন্তত কিয়দংশ এই সমতটের অংশ ছিল। অথচ, বর্তমান ত্রিপুরাও যে সমতটেরই অংশ ছিল, সপ্তম হইতে আরম্ভ করিয়া দ্বাদশ শতক পর্যন্ত, তাহা অনস্বীকার্য; এ সম্বন্ধে সাক্ষ্যপ্রমাণ সুপ্রচুর। সপ্তম শতকের কথা বলিয়াছি। দশম শতকে প্রথম মহীপালের রাজত্বের তৃতীয় সম্বৎসরে নির্মিত এবং ত্রিপুরা জেলার বাঘাউরাগ্রামের প্রাপ্ত মূর্তিলিপি, আনুমানিক একাদশ-দ্বাদশ শতকের একটি চিত্রিত পাণ্ডুলিপিতে “চম্পিতলা লোকনাথ সমতটে অরিষষ্টান”-উক্তি (চম্পিতলা বর্তমান ত্রিপুরায়), ১২৩৪ খ্ৰীষ্টাব্দের দামোদর দেবের অপ্রকাশিত মোহার পটোলী ইত্যাদির সাক্ষোর ইঙ্গিত হইতে মনে হয়, ত্রিপুরা জেলাই ছিল সমতটের প্রধান কেন্দ্ৰ।
