উপবঙ্গ বঙ্গ, প্রবঙ্গ, অনুত্তর-বঙ্গ
‘বৃহৎসংহিতা’য় উপবঙ্গ-নামে একটি জনপদের উল্লেখ আছে। আনুমানিক ষোড়শ-সপ্তদশ শতকে রচিত ‘দিগ্বিজয়-প্রকাশ’-নামক গ্রন্থে উপবঙ্গ বলিতে যশোর ও তৎসংলগ্ন কয়েকটি কাননময় অঞ্চলের দিকে ইঙ্গিত করা হইয়াছে (উপবঙ্গে যশোরাদ্যাঃ দেশাঃ কাননসংযুক্তাঃ)। ‘মনোরথপুরণি এবং অপাদান’-নামক পালি বৌদ্ধগ্রন্থে বঙ্গান্তপুত্ত এবং বঙ্গীশ এই দুইটি অভিধান হইতে মনে হয়, বঙ্গ শব্দটির সঙ্গে এই দুইটি অভিধার কোনও প্রকার যোগ ছিল, কিন্তু তাহাতে বঙ্গ, উপবঙ্গ, বঙ্গান্তদেশের অবস্থিতির কোনও পরিচয় পাওয়া যায় না। প্রবঙ্গ-নামেও আর একটি জনপদের উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রবঙ্গ পরবর্তীকালের অনুত্তর বঙ্গ বা দক্ষিণ-বঙ্গের মতো বঙ্গেরই একটি অংশ হয়তো ছিল; কিন্তু ইহারও অবস্থিতি সম্বন্ধে কোনও ইঙ্গিত আমাদের জানা নাই।
গুপ্ত আমলে বঙ্গের দুইটি বিভাগ ছিল বলিয়া মনে হয়। সমাচার দেবের ঘুগ্রহাটি লিপিতে দেখিতেছি, সুবর্ণবীথিতে একজন উপরিকের শাসনকেন্দ্র ছিল। এই সুবর্ণবীথি নব্যাবকাশিকার ছিল বলিয়া মনে হয়। নব্যাবকাশিকা যে ঢাকা-ফরিদপুর অঞ্চলের (ষষ্ঠ-সপ্তম শতকের।) न्म ভূমি তাহা তো আগেই বলিয়াছি। ঢাকা জেলার বর্তমান সুবর্ণগ্রাম (সোনার গাঁ), সোনারাং, সোনাকান্দি প্রভৃতি স্থানের সঙ্গে প্রাচীন সুবর্ণবীথির একটি অর্থগত যোগ আছে, এ অনুমান বোধহয় সংগত। সুবর্ণবীথির অন্তর্গত ছিল বারকমণ্ডল, এবং লিপিতে উল্লেখ করা হইয়াছে বারকমণ্ডল ছিল প্রাক-সমুদ্রশায়ী। বারকমণ্ডল-মধ্যবর্তী খুঁবিলাটি বর্তমান ফরিদপুর শহরের নিকটবর্তী ধুলট।
পাল ও সেন আমলে বঙ্গ পুণ্ড্রবর্ধনভূমির অন্তর্গত বলিয়া বার বার বলা হইয়াছে, কিন্তু গুপ্ত আমলে বঙ্গ এবং পুণ্ড্রবর্ধন দুই পৃথক রাষ্ট্রবিভাগে ছিল বলিয়া মনে হয়।
পাল ও সেন আমলের লিপিগুলিতে বঙ্গের উল্লেখ বারবার পাওয়া যায়। প্রতিহাররাজ ভোজদেবের গওআলিয়র প্রশস্তিতে দ্বিতীয় নাগভট কর্তৃক বঙ্গপতিকে (ধর্মপাল) পরাভূত করিবার কথা উল্লিখিত আছে (নবম শতক)। পালরাজ রামপালের মন্ত্রীপুত্র কুমারপালের প্রধানামাত্য বৈদ্যদেবের কমীেলি লিপিতে (একাদশ শতক) অনুত্তর-বঙ্গের সমরবিজয়-ব্যাপারের উল্লেখ আছে; সেই প্রসঙ্গে ‘নৌবাটহীহীরব এবং কিঞ্চোৎ-পাতুক-কেনিপাত-পতন-গ্ৰীতসপিতৈঃ শীকরৈঃ’ পদ দুইটির উল্লেখ হইতে অনুত্তর-বঙ্গ যে দক্ষিণ-বঙ্গ এ সম্বন্ধে কোনও সন্দেহ থাকে না। মনে হয়, একাদশ শতকের শেষাশেষি বঙ্গের দুইটি বিভাগ কল্পিত হইয়াছিল; একটি বঙ্গের উত্তরাঞ্চল, আর একটি অনুত্তর বা বঙ্গের দক্ষিণাঞ্চল। অনুমান হয়, বঙ্গের উত্তরাঞ্চলের উত্তর সীমা ছিল পদ্মা এবং সমুদ্রশায়ী খােলনোলা সমাকীর্ণ দক্ষিণাঞ্চল ছিল অনুত্তর-বঙ্গ। অথবা এমনও হইতে পারে, অনুত্তর-বঙ্গ কোনও বিশিষ্ট স্থানের নাম (proper name) নয়, দক্ষিণ ও পূর্ব-দক্ষিণাঞ্চলের বর্ণনাত্মক নাম মাত্র। যাহাই হউক, কেশব সেন ও বিশ্বরূপ সেন এই দুই সেনরাজের আমলে বঙ্গের অন্তত দুইটি বিভাগের নাম পাওয়া যাইতেছে; একটি বিক্রমপুর-ভাগ, অপরটি নাব্য (ভাগ) বা নাব্য (?) মণ্ডল। চন্দ্র ও সেন রাজাদের অনেক লিপিই তো বিক্রমপুর জয়স্কন্ধাবার হইতে উৎসারিত। কেশব সেনের ইদিলপুর লিপি ও বিশ্বরূপ সেনের মদনপাড়া লিপিতে বিক্রমপুর-ভাগ পুণ্ড্রবর্ধনভূক্তির অন্তর্গত বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। বিশ্বরূপ সেনের সাহিত্য-পরিষদ-লিপিতে পাইতেছি নাব্যভাগের উল্লেখ; তাহাও পুণ্ড্রবর্ধনভূক্তি বঙ্গ বিভাগের অন্তৰ্গত, এবং সেই পুণ্ড্রবর্ধনভূক্তির এবং নাব্যভাগের পূর্বতম সীমায় সমুদ্র, তাহা সাহিত্য-পরিষদের লিপিটিতে উল্লিখিত হইয়াছে। এই লিপিটির নাব্যভাগের অন্তর্গত রামসিদ্ধি পাটক বাখরগঞ্জ জেলার গৌরনদী অঞ্চলের একটি গ্রাম। চন্দ্ররাজ শ্ৰীচন্দ্রের রামপাল-পট্টোলীর নাব্যমণ্ডল এবং তদন্তর্ভুক্ত নেহকাঠি যথাক্রমে নাব্যমণ্ডল এবং নৈকাঠি (বাখরগঞ্জ জেলা) হওয়াও কিছুই বিচিত্র নয়। এই প্রসঙ্গে ষষ্ঠ-সপ্তম শতকের ফরিদপুর লিপির নব্যাবকাশিকার সঙ্গে নাব্যের সম্ভাব্য সম্বন্ধেরও উল্লেখ করা যাইতে পারে। যাহাই হউক, এইসব লিপিপ্রমাণ হইতে বুঝা যাইতেছে, বাখরগঞ্জ জেলা এবং আরও পূর্বদিকে সমুদ্র পর্যন্ত অঞ্চল সমস্তটাই নাব্য নামে পরিচিত হইয়াছিল, এবং বর্তমান বিক্রমপুর পরগনার সমগ্র এবং ইদিলপুর পরগনার কিয়দংশ লাইয়া ছিল বিক্রমপুর-ভাগ (কেশব সেনের ইদিলপুর লিপি)। সেন লিপিতে বঙ্গ তো শুধু বঙ্গ নয়, সে যে ‘মধুক্ষীরক বঙ্গ-প্রচুর পয়ঃ যে দেশে সে দেশকে কবি মধুক্ষীরক বালিবেন, আশ্চর্য কি?
বঙ্গের অবস্থিতি সম্বন্ধে বাৎস্যায়ন-কামসূত্রের টীকাকার যশোধর তাহার ‘জয়মঙ্গল’ নামীয় টীকায় বলিতেছেন : “বঙ্গা লৌহিত্যাৎ পূর্বেন’ অৰ্থাৎ বঙ্গ লৌহিত্যের পূর্বদিকে। যশোধরের এই উক্তি বিশ্বাস করা কঠিন। প্রথমত, প্রাচ্যদেশগুলি সম্বন্ধে যশোধরের জ্ঞান অত্যন্ত সীমাবদ্ধ; কতকগুলি অত্যন্ত মারাত্মক রকমের ভুল তাহার টীকায় দেখা যায় এবং সেগুলি ইতিপূর্বেই পণ্ডিতদের লক্ষ্যগোচর হইয়াছে। দ্বিতীয়ত, ইতিপূর্বেই আমরা দেখিয়াছি, সমস্ত বিক্রমপুর পরগনা এবং ফরিদপুর-বাখরগঞ্জেরও কিয়দংশ বঙ্গের অন্তর্ভুক্ত ছিল, এবং এই সমস্ত ভূখণ্ডই ব্ৰহ্মপুত্রের পশ্চিম দিকে। বর্তমান যমুনাও যদি ব্ৰহ্মপুত্রের প্রাচীনতর কোনও প্রবাহপথ হইয়া থাকে তাহা হইলেও ফরিদপুর-বাখরগঞ্জ প্রাচীন বঙ্গ বহির্ভূত হইয়া পড়ে। কাজেই যশোধরের উক্তি অবিশ্বাস্য বলিয়া মনে হয়।
