কিন্তু তাহার আগে জনপদ-বিভাগ সম্বন্ধে সাধারণ দু’একটি কথা বলিয়া লওয়া দরকার। অধিকাংশ ক্ষেত্রে, বিশেষত প্রাচীনতর সাক্ষ্যে, জনপদগুলির নাম যেভাবে আমরা পাই, তাহা ঠিক জনপদ বা স্থানের নাম নয়-কোমের নাম যথা-বঙ্গাঃ, রাঢ়াঃ, পুণ্ড্রাঃ, গৌড়াঃ, অর্থাৎ বঙ্গ জনাঃ, গৌর জানাঃ, পুণ্ড্র জনাঃ, রাঢ়া জনাঃ, বঙ্গ-গৌড়-পুণ্ড্র-রাঢ় কোম (tribe অর্থে)। এইসব জনাঃ বা কোম যে-সব অঞ্চলে বাস করিত, পরে তাহাদের, অর্থাৎ সেই সেই অঞ্চলের নাম হইল বঙ্গ, গৌড়, পুণ্ড্র ইত্যাদি। এইভাবে বহুবচনে জনবাচক অর্থে এইসব নামের ব্যবহার একাদশ-দ্বাদশ শতকের সাক্ষ্যপ্রমাণেও দেখা যায়। দু-এক ক্ষেত্রে তাহার ব্যতিক্রমও আছে, যেমন সুবভি বা সুহ্মভূমি, বজজ বা বজ্রভূমি (ব্ৰহ্মভূমি?)। দ্বিতীয়ত, জন হইতে বা জনকে কেন্দ্ৰ করিয়া গঠিত এক-একটি জনপদে এক এক সময়ে এক-একটি রাষ্ট্র বা রাজবংশের আধিপত্য স্থাপিত হইয়াছে, এবং অনেক সময়ে তাহাদের রাষ্ট্ৰীয় আধিপত্য সংকোচ বা বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে জনপদটির সীমাও সংকুচিত বা বিস্তারিত হইয়াছে। পুণ্ড্র বা পৌণ্ড্রদের জনপদকে কেন্দ্ৰ করিয়া গড়িয়া উঠিয়াছিল পুণ্ড্রবর্ধন রাজ্য (সপ্তম শতক) এবং পরে পাল ও সেন রাজাদের আমলে পুণ্ড্র-পৌণ্ড্রবর্ধনভূক্তি বা পৌণ্ড্রভুক্তি। এই ভুক্তিটি এক সময় হিমালয়-শিখর হইতে আরম্ভ করিয়া (দামোদরপুর লিপি, পঞ্চম শতক) সমূদ্র পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করিয়াছিল। (খাদশ শতকে বিশ্বরূপসেনের সাহিত্য-পরিষদ লিপি দ্রষ্টব্য)। ১২৩৪ খ্ৰীষ্টাব্দের মোহার লিপি অনুসারে ত্রিপুরা জেলাও এই ভুক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল। অথচ প্রাচীন পুণ্ড্র বা পীেণ্ড জনপদ গড়িয়া উঠিয়াছিল বগুড়া-দিনাজপুর-রাজশাহী-রংপুর জেলাকে কেন্দ্ৰ করিয়া। বর্ধমান রাঢ়দেশের একটি অংশমাত্র ছিল, অথচ এক সময় এই বর্ধমান রাষ্ট্রবিভাগে রূপান্তরিত হইয়া বর্ধমানভুক্তি নাম লইয়া শুধু উত্তর ও দক্ষিণ রাঢ়ন্দেশকেই নয়, দণ্ডভুক্তিমণ্ডলকেও গ্রাস করিয়াছিল। দণ্ডভুক্তি মেদিনীপুর জেলার বর্তমান দাতন অঞ্চল; এই অঞ্চল সপ্তম শতকে তাম্রলিপ্তি রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল, য়ুয়ান-চোয়াঙের বিবরণ হইতে তাহা অনুমান করা কঠিন নয়। সুহ্মদেশ মোটামুটি দক্ষিণ-রাঢ়ের সমার্থক; মহাভারতে তাম্রলিপ্তিকে সুহ্মদেশ হইতে পৃথক বলা হইয়াছে; অধিকাংশ প্রাচীন সংক্ষ্যের ইঙ্গিতও তাঁহাই। কিন্তু ‘দশকুমার-চরিত’ গ্রন্থে দামলিপ্ত বা তাম্রলিপ্তকে সুহ্মের অন্তর্ভুক্ত বলা হইয়াছে। জৈন প্রজ্ঞাপনায় তাম্রলিপ্তি বা তাম্রলিপ্তকে আবার বঙ্গের অন্তর্ভুক্তও বলা হইয়াছে, অথচ প্রাচীন সাক্ষের সর্বত্রই ইঙ্গিত এই যে, বঙ্গ ভাগীরথীর পূর্ব-তীরে। এই দৃষ্টান্ত হইতে সহজেই বুঝা যায়, রাষ্ট্র-পরিধির বিস্তার ও সংকোচের সঙ্গে সঙ্গে এক এক সময় এক এক জনপদের সীমাও বিস্তারিত ও সংকুচিত হইয়াছে, সব জনপদের সীমা সকল সময় এক থাকে নাই। আসল কথা, প্রাকৃতিক সীমা ও রাষ্ট্রসীমা সর্বত্র সকল সময় এক হয় না, প্রাচীন বাঙলায় হয় নাই। জনপদ বৃত্তান্ত পাঠের সময় এ কথা মনে রাখা প্রয়োজন। এই জনপদ কথা বলিবার সময় সেইজন্য প্রাকৃতিক সীমা-নির্ধারণর চেষ্টাই প্রথম কর্তব্য, যদিও তোহা সহজসাধ্য নয়, সাক্ষ্য-প্রমাণ প্রায়শ সুদূর্লভ। দ্বিতীয় কর্তব্য, বিভিন্ন সময়ে নির্দিষ্ট জনপদের রাষ্ট্রসীমার বিস্তার ও সংকোচ, এবং তাহার বিভিন্ন রাষ্ট্রগত ও সংস্কৃতিগত বিভাগের নির্দেশ। এ কাজ অত্যন্ত কঠিন; কারণ এ ক্ষেত্রেও সাক্ষ্য-প্রমাণ সুলভ নয়। তবু, যতটা সম্ভব মোটামুটি একটা ধারণা গড়িয়া তোলার চেষ্টা করা যাইতে পারে। তৃতীয়ত, খুব প্রাচীন কাল হইতেই নানা প্রসঙ্গে বাঙলার বিভিন্ন জনপদের উল্লেখ প্রাচীন গ্রন্থাদি এবং লিপিগুলিতে পাওয়া যায়। এইসব উল্লেখ সুবিদিত এবং বহু আলোচিত। কাজেই, এ প্রসঙ্গে তাহার পুনরালোচনার কিছু প্রয়োজন নাই। যে সব উল্লেখ্য, যে সব সাক্ষ্য-প্রমাণ জনপদগুলির সীমা ও অবস্থিতি নির্ণয়ের সহায়ক, শুধু তাহাদের উল্লেখ ও আলোচনাই এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। তাহা ছাড়া, প্রাচীনতর উল্লেখ যাহা পাইতেছি তাহা সমস্তই আর্যভাষাভাষী আর্য-সংস্কৃতিসম্পন্ন লোকদের গ্রন্থ হইতে, যাহারা আর্যপূর্ব বা অনার্য ভাষা ও সংস্কৃতির উপর শ্রদ্ধাবান ছিলেন না এমন লোকদের নিকট হইতে, এ কথাও মনে রাখা দরকার।
বঙ্গ, বঙ্গের পশ্চিম সীমা
বঙ্গ অতি প্রাচীন দেশ। ‘ঐতরেয় আরণ্যক’ গ্রন্থে বোধহয় সর্বপ্রথম এই দেশের উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়; “বয়াংসি বঙ্গাবগধাশ্চেরপাদাঃ” পদে বঙ্গজনদের বগধদের সঙ্গে যুক্ত করা হইয়াছে। বগধ বোধহয় মগধ, এই অনুমান অনৈতিহাসিক না-ও হইতে পারে। এই গ্রন্থের ঋষিরা বঙ্গকে মগধের প্রতিবেশী জনপদ বলিয়াই জানিতেন বলিয়া মনে হয়। বোধায়নের ‘ধর্মসূত্রে’ বঙ্গ জনপদটিকে কলিঙ্গ জনপদের প্রতিবেশী বলিয়া ইঙ্গিত করা হইয়াছে, এমন অনুমান করিলে ভুল হয় না; আরট্র, পুণ্ড্র, সৌবীর, বঙ্গ ও কলিঙ্গাজনেরা একেবারে বৈদিক সংস্কৃতিবহির্ভূত, এবং তাহাদের দেশে যাতায়াত করিলে ফিরিয়া আসিয়া প্রায়শ্চিত্ত করিতে হয়, বোধায়ন এইরূপ নির্দেশ দিয়াছেন। মহাভারতে দেখিয়াছি, ভীম দিগ্বিজয়ে বাহির হইয়া মুদগগিরি (মুঙ্গের) রাজকে হত্যা করিয়া কোশীনদী-তীরবর্তী পুণ্ড্ররাজকে পরাজিত করেন; তাহার পর, পর পর তিনি বঙ্গ, তাম্রলিপ্ত, কৰ্কট, সুহ্ম, প্রসুহ্ম রাজাদের এবং অনেক স্লেচ্ছ কোমদের পরাভূত করেন। মহাভারতের আদিপর্বে বঙ্গজনপদের উল্লেখ করা হইয়াছে অঙ্গ, কলিঙ্গ, পুণ্ড্র এবং সুহ্মজনদের সঙ্গে; সভাপর্বে পুণ্ড্রদের সঙ্গে! ‘রামায়ণে’ও অন্যান্য জনদের সঙ্গে বঙ্গজনদের উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়; সকলেই অযোধ্যার অভিজাত-বংশীয়দের সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ ছিলেন, এইরূপ ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সিংহলী মহাবংশ’ গ্রন্থে বঙ্গাজনেরা লাল (রাঢ়)-জনপদের সঙ্গে উল্লিখিত হইয়াছে। ‘প্রজ্ঞাপনা’-নামক একটি জৈন উপাঙ্গে বঙ্গজনদের সঙ্গে লাল (রাঢ়)-জনদের উল্লেখ করিয়া উভয়কেই আর্য বলা হইয়াছে। এই প্রসঙ্গে তাম্রলিপ্তিকে বঙ্গ জনদের অধিকারে বলিয়া নির্দেশ করা হইয়াছে। ‘মহাভারতের উল্লেখ হইতে স্পষ্টই বুঝা যায়, বঙ্গ পুণ্ড্র, তাম্রলিপ্ত ও সুহ্মের সংলগ্ন দেশ, এবং প্রত্যেকটি দেশই স্ব-স্বতন্ত্র; কিন্তু জৈন উপাঙ্গটির ইঙ্গিত হইতে মনে হয়, কোনও সময়ে তাম্রলিপ্ত বোধ হয় বঙ্গের অধিকারভুক্ত হইয়া থাকিবে। বঙ্গের উল্লেখ গুন্টুর জেলার নাগাৰ্জনীকোণ্ড (খ্ৰীষ্টীয় তৃতীয় শতক) শিলালিপিতে, রাজা চন্দ্রের (চতুর্থ শতক) মেহেরৌলি স্তম্ভলিপি এবং বাতাপীর (বাদামী) চালুক্যরাজ পুলকেশীর মহাকুট স্তম্ভলিপি (সপ্তম শতক)-কেও দেখিতে পাওয়া যায়, কিন্তু ইহাদের একটিতেও বঙ্গের অবস্থিতি-নির্দেশ পাওয়া যায় না। কালিদাসের (চতুর্থ শতক?)। “রঘুবংশে এই নির্দেশ দেন। অনেকটা স্পষ্ট। এই কাব্যের চতুর্থ সর্গে রঘুর দিগ্বিজয় প্রসঙ্গে পর পর পাঁচটি শ্লোক আছে। প্রথম দুইটি শ্লোকে তালীবিনশ্যাম উপকূলে সুহ্ম-জনপদের পরাজয়ের কথা আছে; তারপরেই তিনি নৌ-সাধনোদ্যত বঙ্গজনদের পরাভূত করিয়া ‘গঙ্গাস্রোতহস্তরে জয়স্তম্ভ স্থাপন করিয়াছিলেন। বঙ্গজনদের উৎখাত এবং প্রতিরোপিত করিয়া পরে তিনি কপিশা (কসাই)-নদী পার হইয়া উৎকলাদিগের প্রদর্শিত পথে কলিঙ্গ অভিমুখে গিয়াছিলেন। টীকাকার মল্লিনাথ ‘গঙ্গাস্রোতোহন্তরেষু, পদটির টাকা করিয়াছেন ‘গঙ্গায়াঃ প্রবাহনাম দ্বীপেযু; এবং আধুনিক ঐতিহাসিকেরাও ‘গঙ্গাস্রোতের মধ্যে এই অর্থই করিয়াছেন। এই অর্থ মানিয়া লইলে স্বীকার করিতে হয়, কালিদাসের সময়েও তাম্রলিপ্তি বঙ্গজনপদেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং রঘু সুহ্ম অর্থাৎ মোটামুটি দক্ষিণ রাঢ় জয় করিয়া বঙ্গ জয় করেন, এবং কপিশা পার হইয়া উৎকলে যান। কিন্তু মহোদধির তালীবিনশ্যামোপকণ্ঠে উপনীত হইয়া সুহ্ম জয়ের উল্লেখ হইতে আমার মনে হয়, তদানীন্তন তাম্রলিপ্তি সুহ্মদেশের অন্তর্ভুক্ত ছিল৷ ‘দশকুমারচরিত’ গ্রন্থে দামলিপ্ত (তাম্রলিপ্ত) সুহ্মের অন্তর্ভুক্ত বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে। তাহা হওয়াই স্বাভাবিক; উভয়েই গঙ্গা-ভাগীরথীর পশ্চিমান্ত সংলগ্ন দেশ, এবং তাম্রলিপ্তিই যথার্থতি সমুদ্রতীরবর্তী তালীবনশ্যাম ভূখণ্ড বলিয়া বর্ণিত হওয়া যুক্তিযুক্ত। তাহা হইলে, বঙ্গ গঙ্গাস্রোতের বামে বা পূর্বদিকে হওয়া উচিত; আমার মনে হয়, ‘গঙ্গাস্রোতোহন্তরেষু’ বলিয়া কালিদাস গঙ্গাস্রোতের অপর দিকে বুঝাইতে চাহিয়াছেন; অন্তরেষু। অর্থাৎ পার হইয়া। পরবর্তী সমস্ত সাক্ষ্য-প্রমাণে গঙ্গা-ভাগীরথীই যে বঙ্গের পশ্চিম সীমা, এই ইঙ্গিত বারবার পাওয়া যায়। বঙ্গ-জয়ের পর রঘু আবার পশ্চিমদিকে ফিরিয়া সুহ্মের ভিতর দিয়া, কপিশা পার হইয়া উৎকল-কলিঙ্গে গিয়াছিলেন।
