সুহ্ম-রাঢ়
কালিদাসের ‘রঘুবংশ’ কাব্যে (আনুমানিক পঞ্চম শতক) রঘুর দিগ্বিজয় প্রসঙ্গে সুহ্মদের উল্লেখ আছে; কবি বলিতেছেন, বেতসলতা যেমন অবনত হইয়া নদীর স্রোতাবেগ হইতে আত্মরক্ষা করে, সুহ্মদেশীয় লোকেরা অবনত হইয়া উদ্ধত-উচ্ছেদকারী সেই রঘুর হস্ত হইতে আত্মরক্ষা করিয়াছিল। কবির এই উক্তির মধ্যে সুহ্মদেশীয়দের লোক-প্রকৃতি সম্বন্ধে কোনও ইঙ্গিত আছে কিনা বলা শক্ত, কারণ টীকাকার মল্লিনাথ, বৈতসীবৃত্তি সম্বন্ধে এ প্রসঙ্গে কৌটিল্যের উক্তি উদ্ধৃত করিতেছেন; “বলীয়সাভিযুক্তো দুর্বলঃ সর্বত্ৰানুপ্রাণতো বেতসধৰ্মমাতিষ্ঠেৎ৷”। সুহ্মেরা রঘু সম্বন্ধেই এইরূপ বৈতসীবৃত্তি অবলম্বন করিয়াছিলেন, না দুর্বল বলিয়া এইরূপ বৃত্তিই ছিল জনসাধারণের প্রকৃতি, তাহা বলা কঠিন।
মহাবীর ও তাহার কয়েকজন শিষ্যকে ধর্মপ্রচারোদ্দেশে পথহীন লাঢ়দেশে, বজ্র (ব্ৰহ্ম?) ও সুহ্মভূমিতে, ঘুরিয়া বেড়াইতে হইয়াছিল (আনুমানিক ষষ্ঠ শতক, খ্ৰীষ্টপূর্ব)। এই গল্পটি জৈনদের ধর্মগ্রন্থ ‘আচারাঙ্গসূত্রে’ বর্ণিত আছে। অন্যত্র তাহা সবিস্তারে উল্লেখ করিয়াছি। এই উপলক্ষে, এই কাহিনীটিতে রাঢ়বাসীদের বৃঢ় আচরণের এবং বজ্জভূমিবাসীদের কুখাদ্য ভক্ষণের প্রতি ইঙ্গিত আছে। তাহা ছাড়া, ‘আর্যমঞ্জুশ্ৰীমূলকল্প’ (অষ্টম শতক) গ্রন্থে গৌড় ও পুণ্ড্রের ভাষাকে অসুরভাষা বলা হইয়াছে, সে কথাও আগে অন্য প্রসঙ্গে বলিয়াছি। মহাভারতে সমুদ্রতীরবাসী বঙ্গদের স্লেচ্ছ এবং ভাগবত-পুরাণে সুহ্মদের ‘পাপ’ কোম বলা হইয়াছে। ‘বোধায়ন ধর্মসূত্রে’ বলা হইয়াছে, মধ্যদেশ বা আর্যবর্ত হইতে বঙ্গদেশে গেলে ফিরিয়া আসিয়া প্রায়শ্চিত্ত করিতে হয়; এই দুই দেশ অশিষ্টভূমির অন্তর্গত এবং লোকেরা ‘সংকীর্ণ-যোনয়ঃ’। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন, এই সমস্ত উক্তি আর্যভাষাভাষী, আর্য-সংস্কৃতিসম্পন্ন লোকদের; গোঁড়-পুণ্ড্র-বঙ্গের অনার্য বা আর্যপূর্ব লোকদের ভাষা, সংস্কৃতি ও আচার-ব্যবহার সম্বন্ধে ইহাদের জ্ঞানও ছিল না, শ্রদ্ধা-ভক্তিও ছিল না; তাহারা সেই সুপ্রাচীনকালে ইহাদের অবজ্ঞার চোখেই দেখিতেন। কিন্তু আশ্চর্য এই, রাঢ়দেশবাসী মুকুন্দরামও “চণ্ডীমঙ্গল” কাব্যে রাঢ়দেশবাসীকে একটু বুঢ়া এবং হিংস্র প্রকৃতির লোক বলিয়াছেন। রাঢ়দেশের লোকেরা যে একটু বুঢ়া এবং অশিষ্ট প্রকৃতির লোক ছিলেন, তাহা ঘনরামের ‘ধর্মমঙ্গলে’র একটি পদেও সুস্পষ্ট। মুকুন্দরাম লিখিয়াছেন :
অক্ষটি হিংশক রাড় চৌদিকে পশুর হাড়।
কৃতাঞ্জলি বীর কহে হই গ চোয়াড়।
লোকে না পরস করে সাভে বলে রাড় ॥
ঘনরাম লিখিয়াছেন :
জাতি রাঢ় আমি রে, করমে রাঢ় তু।
দক্ষিণ-রাঢ়ের ব্রাহ্মণেরা যে দাম্ভিক প্রকৃতিক লোক ছিলেন তাহার একটু পরোক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায় কৃষ্ণমিশ্রের ‘প্ৰবোধচন্দ্ৰোদয়’ নাটকের দ্বিতীয় অঙ্কে। কৃষ্ণমিশ্র এই ব্ৰাহ্মণদের একটু ব্যঙ্গই করিয়াছেন। অহংকাররূপী ব্ৰাহ্মণের যে চিত্র তিনি আঁকিয়াছেন তাহা উজ্জ্বল এবং উপভোগ্য। জন্মদেশ, জনপদ এবং নগরের, পিতার এবং নিজের অহংকৃত পরিচয়ের পর ব্ৰাহ্মণ-অহংকার বলিতেছেন,
নাম্মাকং জননী তথোজ্জলকুলা সচ্ছেত্রিয়ানাং পুনর
বুঢ়া কাচন কন্যক খলু ময়া তেনাস্মি ততোধিকঃ।
অস্মচ্ছ্যালকভাগিনেয়দুহিতা মিথ্যাভিশপ্ত যতস
তৎসম্পর্কবাশান্ময়া স্বগৃহিণী প্রেয়স্যপি প্রোজ্ঝিতা ॥
ব্ৰাহ্মণ-অহংকারের আত্মশ্লাঘার প্রতি শ্লেষ সত্যই উপভোগ্য!
কবি ধোয়ীও দক্ষিণ-রাঢ়ের (সুহ্মদেশের) প্রশংসায় উচ্ছ্বসিত হইয়া বলিয়াছেন, “রসময় সুহ্মদেশঃ।”
রাজশেখরের ‘কর্পূরমঞ্জরী’ গ্রন্থে হরিকেল (চন্দ্ৰদ্বীপ-শ্ৰীহট্ট-ত্রিপুরা-মৈমনসিং অঞ্চল, হয়তো চট্টগ্রাম অঞ্চলও) দেশের নারীদের খুব স্তুতিবাদ করা হইয়াছে, এবং রাঢ় ও কামরূপের নারীদের তুলনায় শ্রেষ্ঠতরা বলা হইয়াছে। রাজশেখর গৌড়াঙ্গানাগণের বেশভূষার বর্ণনা করিয়া যে তুতিবাদ করিয়াছেন ‘সদুক্তিকর্ণামৃত’ গ্রন্থে (১২০৬) তাহা উদ্ধৃত হইয়াছে। এই গ্রন্থেই কোনও এক অজ্ঞাত কবির রচিত (পূর্ব) বঙ্গীয় নারীদের সাজ-সজ্জা বর্ণনার একটি শ্লোক উদ্ধার করা হইয়াছে। অন্য আর একজন কবি বাঙলার গ্রাম্য তরুণীর বর্ণনা দিয়া আর একটি শ্লোক বাধিয়াছেন, তাহাও এই গ্রন্থে পাওয়া যায়। এই সব শ্লোক অন্যত্র উদ্ধার ও আলোচনা করিয়াছি (আহার-বিহার, বসন-ব্যাসন, দৈনন্দিন জীবন প্রসঙ্গ দ্রষ্টব্য)।
প্রাচীন বাঙলার ফলফুল বৃক্ষলতা-শস্যসম্ভারের এবং অন্যান্য উৎপন্ন দ্রব্য ইত্যাদির পরিচয় দেশ-পরিচয়েরই অংশ; ধনসম্বল অধ্যায়ে এ সম্বন্ধে সবিস্তার উল্লেখ করা হইয়াছে। ধান, যুব, পাট, ইক্ষু, সরিষা, আম, মহুয়া, কাঁটাল, নানাবিধ বস্ত্ৰ-সম্ভার, ধাতুদ্রব্য, খনিজ দ্রব্য, লবণ, পান, গুবাক, নারিকেল, বাঁশ, মাছ, ডালিম, ডুমুর (পর্কটী), খেজুর, পিপ্পল, এলাচ ইত্যাদি শস্য ও দ্রব্যসম্ভার কোথায় কী উৎপাদিত হইত। তাহাও সেই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হইয়াছে। জীবজন্তু সম্বন্ধেও একই কথা। বর্তমান ও পূর্বোক্ত অধ্যায়েই ব্যাঘু, হন্তী, হরিণ, ঘোড়া, বানর, গোরু, ভেড়া, ছাগল, কুকুট, বরাহ, নানা প্রকারের মাছ ইত্যাদির কথাও বলা হইয়াছে।
০৬. জনপদ বিভাগ, বাঙলা নামের উৎপত্তি
আমাদের এই দেশের নাম বঙ্গদেশ বা বাঙলাদেশ। মুঘল আমলে এই দেশ সুবা বাঙলা নামে পরিচিত ছিল। আবুল ফজল তাহার ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থে বাঙলা-বাঙ্গালা নামের ব্যাখ্যাও দিয়াছেন। বঙ্গ শব্দের সঙ্গে আলী (সংস্কৃত আলি, পূর্ববঙ্গীয় আইল) যুক্ত হইয়া বাঙ্গাল বা বাঙ্গালা শব্দ নিম্পন্ন হইয়াছে, ইহাই আবুল ফজলের ব্যাখ্যা। আল শুধু শস্যক্ষেত্রের আলি নয়, আল ছোটবড় বাঁধও বটে। এই নদীমাতৃক বারিবহুল দেশে বৃষ্টি, বন্যা এবং জোয়ারের স্রোত ঠেকাইবার জন্য ছোটবড় বাঁধ বাঁধা ছিল কৃষি ও বাস্তুভূমির যথার্থ পরিপালনের পক্ষে অনিবার্য। যে-সব ভূখণ্ডের বারিপাত কম, ভূমি সাধারণত উষর, সেখানেও বর্ষার জল ধরিয়া রাখিবার জন্য ছোটবড় বাঁধ বাঁধা প্রয়োজন হইত, এখনও হয়, যেমন বীরভূম অঞ্চলে। প্রাচীন লিপিতে এই ধরনের বাঁধের পুনঃপুন উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়, যেমন, বিশ্বরূপসেনের মদনপাড়া লিপিতে এবং অন্যান্য অসংখ্য লিপিতে। এ-রকম দুটি চারটি বৃহৎ বাঁধ এখনও প্রাচীন অভ্যাসের স্মৃতি বহন করিতেছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ রংপুর-বগুড়ার ভীমের (কৈবর্তরাজ ভীমের?) জাঙ্গাল বা ভীমের ডাইঙ্গ, বীরভূমের সিউড়ি অঞ্চলের দুই চারটি বাধের উল্লেখ করা যায়। আমার অনুমান, আবুল ফজলের ব্যাখ্যার অর্থ এই যে বঙ্গদেশ আল বা আলিবহুল, যে বঙ্গদেশের উপরিভূমির বৈশিষ্ট্যই হইতেছে আল সেই দেশই বাঙ্গালা বা বাঙলাদেশ। এই আলগুলিই আবুল ফজলের সবিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছিল; তাহার ব্যাখ্যা পড়িলে এই কথাই মনে হয়। Gastaldi (1560), Hondivs (1613), Hermann Moll (1710), Van den Broucke (1660), Izzak Tirion (1730), F. de Witt (1726) প্রভৃতির নকশায়, মধ্যযুগের যুরোপীয় পর্যটকদের বিবরণীতে, সর্বত্রই এই দেশের নাম পাইতেছি Bengala, এবং ইহারা দক্ষিণের সাগরটির নাম Golfo of Bengalবা Gulf of Bengal বলিয়া। মধ্যযুগের বাঙলা-বাঙ্গালা-Bengala একই নাম। Marco Polo এই দেশের নাম বলিতেছেন। Bengala, যদিও তাহার অবস্থিতিনির্দেশ স্পষ্টই ভ্ৰমাত্মক। যাহাই হউক, বাঙ্গালা-Bengala-Bangala-বাঙলা নাম বর্তমান বঙ্গদেশের মোটামুটি প্রায় সমস্তটারই; কোনও কোনও দিকে বর্তমান সীমা অতিক্রমও করিয়াছে, মধ্যযুগীয় সাক্ষ্যে তাহা সুস্পষ্ট। কিন্তু প্রাচীন বাঙলায় বঙ্গ বঙ্গাল বলিতে যে দেশখণ্ড বুঝাইত তাহা বর্তমান বঙ্গ বা বাঙলাদেশের সমার্থক নয়; তাহার একটি অংশ মাত্র। প্রাচীন বাঙলাদেশ যে-সব জনপদে বিভক্ত ছিল বঙ্গ ও বঙ্গাল তাহার দুইটি বিভাগ মাত্র। এই দুইটি বিভাগের নাম হইতেই বর্তমান এবং মধ্যযুগীয় সমগ্র বাঙলাদেশ নামটির উৎপত্তি। কাজেই, প্রাচীন বাঙলার জনপদ-বিভাগের কথা বলিতে গিয়া সর্বাগ্রে এই বিভাগ দুইটির কথাই বলিতে হয়।
