ব্রীহিঃ স্তম্বকারিঃ প্রভূত পয়সঃ প্রত্যাগতা ধেনবঃ
প্রত্যুজ্জীবিতমিক্ষুণা ভূশমিতি ধ্যায়ন্ত্রপেতানাধীঃ।
সান্দ্রোশীর কুটুম্বিনী স্তনভর ব্যালুপ্তঘর্মক্লমো।
দেবে নীরমুদারমুজ্ঝতি সুখং শেতে নিশাং গ্রামণীঃ৷ সিদুক্তিকর্ণামৃত, ২/৮৪/৩]
প্রচুর জল পাইয়া ধান চমৎকার গজাইয়া উঠিয়াছে, গোরুগুলি ঘরে ফিরিয়া আসিয়াছে; ইক্ষুর সমৃদ্ধিও দেখা যাইতেছে; [কাজেই] অন্য কোনও ভাবনা আর নাই; ঘর্মক্লান্তিমুক্ত স্ত্রীও ঘরে এই অবসরে উশীর প্রসাধন করিতেছে; বাহিরে আকাশ হইতে জল ঝরিতেছে প্রচুর, গ্রাম্য যুবক সুখে শুইয়া আছে।
প্রাচ্যদেশ বাঙলাদেশ যে প্রচুর জল এবং প্রচুর বারিপাতেরই দেশ, তাহা তো পাল-লিপির প্রসিদ্ধ ‘দেশে প্রাচি প্রচুর পয়সি স্বচ্ছমাপীয় তোয়ং’ পদেই প্রমাণ। আর, ‘গুরু-গভীর ঘন বর্ষায়’ মেদুর আকাশকে ‘মেঘৈর্মেদুরমম্বরম’ বলিয়া বাঙালী কবি জয়দেব যে অভিনন্দন জানাইয়াছেন, এবং তার শ্যাম মহিমাকে যে চিত্রে ফুটাইয়া তুলিয়াছেন, তাহা তো বাঙালীর একান্তই সুপরিচিত এবং তাহা বাঙলাদেশ সম্বন্ধেই প্রযোজ্য বলিয়া মনে হয়।
যে ‘সদুক্তিকর্ণামৃত’ কাব্য-সংকলন গ্ৰন্থ হইতে বর্ষার বাঙলার উপরোক্ত চিত্রটি উদ্ধার করা হইয়াছে, সেই গ্রন্থ হইতেই হেমন্তের বাঙলার আর একটি ছবি উদ্ধারের লোভ সংবরণ করা গেল না; এটি একটি অজ্ঞাতনামা (বোধহয় বাঙালী) কবির রচনা, এবং ধান্য ও ইক্ষুসমৃদ্ধ বাঙলার অগ্রহায়ণ-পৌষের অনবদ্য, মধুর বাস্তব চিত্র।
শালিচ্ছেদ-সমৃদ্ধ হালিকগৃহাঃ সংসৃষ্ট-নীলোৎপল
স্নিগ্ধ-শ্যাম-যব-প্ররোহ-নিবিড়ব্যাদীর্ঘ-সীমোদেরাঃ।
মোদন্তে পরিবৃত্ত-ধেন্বনডুহচ্ছাগাঃ পলালৈনবৈঃ
সংসত্তা-ধ্বনিদিষ্ণু যন্ত্রমুখরা গ্ৰাম্য গুড়ামোদিনঃ৷ [সদুক্তিকর্ণামৃত, ২/১৩৬/৫]
কৃষকের বাড়ি কাটা শালিধান্যে সমৃদ্ধ হইয়া উঠিয়াছে। [আঁটি আঁটি কাটা ধান আঙিনায় স্তুপীকৃত হইয়াছে—পৌষ মাসে এখনও যেমন হয়]; গ্রাম সীমান্তের ক্ষেতে যে প্রচুর যব হইয়াছে তাহার শীষ নীলোৎপলের মতো স্নিগ্ধ শ্যাম; গোরু, বলদ ও ছাগগুলি ঘরে ফিরিয়া আসিয়া নূতন খড় পাইয়া আনন্দিত; অবিরত ইক্ষুযন্ত্র ধ্বনিমুখর [আখ মাড়াই কলের শব্দে মুখরিত] গ্রামগুলি [নুতন ইক্ষু] গুড়ের গন্ধে আমোদিত।
লোক-প্রকৃতি
লোক-প্রকৃতি সম্বন্ধে কিছু ইঙ্গিত য়ুয়ান-চোয়াঙের সাক্ষ্য হইতে ইতিপূর্বেই পাওয়া গিয়াছে। কজঙ্গলের লোকেরা স্পষ্টাচারী, গুণবান এবং শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাবান; পুণ্ড্রবর্ধনের লোকেরাও জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধাবান। কামরূপের লোকেরা সদাচারী হওয়া সত্ত্বেও হিংস্র৷ প্রকৃতির; তাম্রলিপ্তির লোকেরা বুঢ়াচারী কিন্তু তাহারা কর্মঠ ও সাহসী; সমতটের লোকেরা কর্মঠ; কর্ণসুবর্ণের লোকেরা ভদ্র ও সচ্চরিত্র এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের সুপোষক; তাম্রলিপির লোকেরাও জ্ঞানবিজ্ঞানের অনুরাগী। কিন্তু লোক-প্রকৃতির ব্যক্তিগত বিবরণ যথেষ্ট বস্তুগত ও প্রামাণিক সাক্ষ্য বলিয়া গ্রহণ করা কঠিন। প্রথমত, এ ব্যাপারে দর্শক বা পর্যবেক্ষকের ব্যক্তিগত লুচি-অরুচির প্রশ্ন অনিবার্য; দ্বিতীয়ত, দুই-একটি বিচ্ছিন্ন, প্রসঙ্গবৰ্জিত উদাহরণ হইতে সাধারণভাবে কয়েকটা মন্তব্যে পৌঁছানও এইসব লেখক ও পর্যবেক্ষকের পক্ষে অসম্ভব কিছু নয়! তৎসত্ত্বেও বিদেশী ও ভিনাপ্রদেশী লােকেরা বিভিন্ন সময়ে বাঙালীর লোক-প্রকৃতি সম্বন্ধে কী কী বিভিন্ন ধারণা পোষণ করিতেন তাহার একটু হিসাব লওয়া হয়তো নিরর্থক নয়।
গৌড়-বঙ্গ
‘কামসূত্র’-রচয়িতা বাৎস্যায়ন (তৃতীয়-চতুর্থ শতক) বলিতেছেন, তাহার সময়ে প্রাচ্যদেশের লোকেরা মধ্যদেশের জনসাধারণ অপেক্ষা যৌন ও মিথুন ব্যাপারে অনেক বেশি শিষ্ট ছিল। প্রাচ্যদেশের অন্যান্য অনেক বিভাগের সঙ্গে গৌড় ও বঙ্গ এই দুইটি বিভাগ তিনি জানিতেন; কাজেই তাহার এই মন্তব্য গৌড়-বঙ্গ সম্বন্ধেও নিশ্চয়ই প্রযোজ্য। কদৰ্যতম যৌন অনাচার হইতে তাহারা মুক্ত ছিল; তবে এই দেশেরই রাজান্তঃপুরের–সব দেশে-কালেই যেমন হইয়া থাকে-মহিলারা তাহাদের কামবাসনা চরিতার্থ করিবার জন্য নানারূপ কৌশল অবলম্বন করিতেন। গৌড়বাসীরা সুপুরুষ ছিল, এ সাক্ষ্য বাৎস্যায়ন দিতেছেন, এবং গৌড়-নারীরা যে মৃদুভাষিণী, মৃদু-অঙ্গা এবং অনুরাগবতী ছিলেন তাহাও বলিতেছেন। তাহা ছাড়া তিনি একটি কৌতুহলোদ্দীপক খবরও দিতেছেন; তাহা এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যাইতে পারে। গৌড়-পুরুষেরা আঙুলের সৌন্দর্যবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে লম্বা লম্বা নখ রাখিতেন এবং মহিলারা নাকি তাহাতে খুব আকৃষ্ট হইতেন। গৌড়দেশের বিভিন্ন নাগরিক এবং বিদগ্ধ নারীদের নানাপ্রকার কাম এবং বিলাস লীলার বিবরণ পড়িলে বাঙলার নগর-সভ্যতা তৃতীয়-চতুর্থ-পঞ্চম শতকে যৌনব্যাপারে খুব যে নীতি ও সংযমপরায়ণ ছিল, অবশ্য বর্তমান আদর্শে, তাহা তো মনে হয় না। কিন্তু এ প্রসঙ্গ গ্রন্থের অন্যত্র আলোচিত হইয়াছে।
গৌড়বাসী সম্বন্ধে আরও খবর পাওয়া যাইতেছে। বাঙালীদের বিদ্যাচর্চায় অনুরাগের সাক্ষ্য য়ুয়ান-চোয়াঙের নিকট হইতে আগেই পাওয়া গিয়াছে। তাহা ছাড়া, য়ুয়ান-চোয়াঙের বিবরণে, নানা তিব্বতী গ্রন্থে, অসংখ্য ভিনাপ্রদেশের লিপিমালা এবং সাহিত্যগ্রন্থ হইতে অনবরতই দেখা যাইতেছে, এখনকার মতো প্রাচীন কালেও বাঙালী ছাত্র ও শিক্ষকরূপে ভারতবর্ষের সর্বত্র এবং ভারতবর্ষের বাহিরে যাতায়াত করিত। কবি ক্ষেমেন্দ্র তাহার “দেশোপদেশ’ গ্রন্থে কাশ্মীরে গৌড়দেশের ছাত্রদের বর্ণনা প্রসঙ্গে বলিতেছেন, এইসব ছাত্রর দেহ এত ক্ষীণ যে, হস্তম্পর্শেই ইহাদের দেহ ভাঙিয়া পড়িবে বলিয়া যেন মনে হয়, কিন্তু কাশ্মীরের জল-হাওয়ায় কিছুদিনের মধ্যেই তাঁহাদের প্রকৃতি উদ্ধত হইয়া উঠে, এবং স্বল্পমাত্র উত্তেজনাতেই একেবারে সহসা মারমুখী হইয়া উঠে। একবার এইরূপ একটু উত্তেজনার ফলে তাহারা এক দোকানদারকে জিনিসের দাম দিতে অস্বীকার করে এবং মুহুর্তমধ্যেই ছুরিকাঘাতে উদ্যত হয়। গৌড়বাসীর এই অচির-ক্ৰোধপরায়ণতা এবং কলহপ্রিয়তা ‘মিতাক্ষরা’-লেখক বিজ্ঞানেশ্বরও বেশ লক্ষ করিয় ছিলেন।
