পূর্ববঙ্গের পুরাভূমি ও নবভূমি, মধুপুরগড়, নবভূমির দুই ভাগ
পূর্ব-বাঙলা একান্তই নবভূমি এবং এই নবভূমি পদ্মা-ব্ৰহ্মপুত্র এবং সুরমা-মেঘনার সৃষ্টি। এই নবভূমির উত্তরে, পূর্বে এবং পূর্ব-দক্ষিণে গারো-খাসিয়া-জৈন্তিয়া–ত্রিপুরা-চট্টগ্রামের শৈলশ্রেণী;; ইহাদের অব্যবহিত সানু ও তলদেশ পার্বত্য না হইলেও কোথাও কোথাও গৈরিক বালুকাময়, কখনও কখনও বালির শক্ত স্তরময়, যেমন চট্টগ্রাম-ত্রিপুরা-শ্ৰীহট্ট-কাছাড় জেলার কোনও কোনও স্থানে। চট্টগ্রামের পার্বত্য-চট্টগ্রাম ও ত্রিপুরার পার্বত্য-ত্রিপুরা অঞ্চল, কাছাড় জেলার উত্তরাংশ ও দক্ষিণাংশে হালিয়াকান্দি অঞ্চল, এবং শ্ৰীহট্ট জেলার পূর্বাঞ্চলকে মোটামুটি পুরাভূমির অন্তর্গতই বলিতে হয়। তাহা ছাড়া, ঢাকা ও মৈমনসিংহ জেলার বিস্তৃত একটি অংশ জুড়িয়া গৈরিক পার্বত্য গজারী-বনময় একখণ্ড পুরাভূমির স্ফীতি দেখিতে পাওয়া যায়-ইহা মধুপুরগড় নামে খ্যাত। ঢাকা জেলার ভাওয়ালের গড়ও তাঁহাই। মধুপুরগড়ের উপরের স্তরের মাটি যেন লাল কাদা-জমানো-মাটি, কিন্তু তাহার নিচের স্তরেই লাল বালি; এই বালি ও অজয়-বরাকর উপত্যকার লাল বালি একই গৈরিক পার্বত্য মাটি। পূর্ব-বাঙলার অন্য সমস্ত ভূমিই জলীয় সমতল ভূমি অর্থাৎ নবগঠিত ভূমি এবং সর্বত্র খালবিল ও সুবিস্তীর্ণ জলাভূমিদ্বারা আচ্ছন্ন। কিন্তু তাহা হইলেও এই নবগঠিত ভূমির দুইটি বিভাগ সুস্পষ্ট। ইহারই মধ্যে মৈমনসিং, ঢাকা, ফরিদপুর, সমতল-ত্রিপুরা ও শ্ৰীহট্টের বহুলাংশের গঠন পুরাতন (old formation), এবং খুলনা, বাখরগঞ্জ, সমতল-নোয়াখালি ও সমতল-চট্টগ্রামের গঠন (new formation)। শ্ৰীহট্ট জেলার পঞ্চখণ্ড অঞ্চলে প্রাপ্ত নিধনপুর তাম্রপটোলী (সপ্তম শতক), ভাটোরায় প্রাপ্ত গোবিন্দকেশবের পট্টোলী (একাদশ শতক), বন্দরবাজারে প্রাপ্ত লোকনাথের মূর্তি (দশম-একাদশ শতক), ত্রিপুরা জেলার প্রাপ্ত লোকনাথের পট্টোলী (অষ্টম শতক) এবং তৎপরবর্তী অগণিত লিপি ও মূর্তি, ফরিদপুরে প্রাপ্ত ধর্মাদিত্য-গোপচন্দ্ৰ ইত্যাদির পট্টোলী (ষষ্ঠ-সপ্তম শতক), ঢাকা জেলায় প্রাপ্ত অসংখ্য মূর্তি ও লিপি এইসব ভূখণ্ডে প্রাচীনকাল হইতেই বহুদিন স্থিত সমৃদ্ধ সভ্যতা এবং জনাবাসের দ্যোতক। এইসব ভূখণ্ড পুরাতন গঠন, এবং ইহাদের অবলম্বন করিয়াই প্রাচীন বাঙলার সভ্যতা ও সংস্কৃতি পূর্বাঞ্চলে বিস্তারলাভ করিয়াছিল। এইসব ভূখণ্ডের তুলনায় খুলনা-বাখরগঞ্জ-নোয়াখালি-সমতল চট্টগ্রাম নূতন, এবং লক্ষণীয় এই যে, এইসব ভূখণ্ডে বাঙলার প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতির বড় একটি চিহ্ন এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয় নাই। চট্টগ্রামে বহু মূর্তি এবং কয়েকটি লিপি, নোয়াখালিতে দু-একটি মূর্তি আবিষ্কৃত হইয়াছে, কিন্তু তাহার একটিও নবগঠিত সমতলাংশে নয়।
মধ্য বা দক্ষিণ বঙ্গের নবভূমি
মধ্য বা দক্ষিণ-বঙ্গে পুরাভূমির অস্তিত্ব কোথাও নাই; এই ভূমি একেবারে পদ্মা-ভাগীরথী-মধুমতীর সৃষ্টি, এবং বাঙলার নবভূমির অন্তর্গত; শতাব্দীর পর শতাব্দীর পলিমাটি জমিয়া জমিয়া এই ভূখণ্ডকে এক ধারে বন্যা ও অন্য ধারে সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার উর্ধের্ব উৎক্ষিপ্ত করিয়া দিয়াছে। খাড়িমণ্ডল-ব্র্যাঘাতটী-সমতট প্রভৃতি নাম লক্ষণীয়। নদীয়া জেলার কিয়দংশ, যশোহর, খুলনা, এবং চব্বিশ-পরগনা এই ভূখণ্ডের অন্তর্গত। সমতট অবশ্যই সমতল-ত্রিপুরা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল—তাহার একাধিক লিপি-প্রমাণ বিদ্যমান-কিন্তু সমতল ত্রিপুরাও তো ফরিদপুরের মতো নবভূমিরই অংশ। তবে ইহাদের মধ্যে নদীয়া-যশোর, এবং বোধহয় চব্বিশ-পরগনা ফরিদপুর-ঢাকা-ত্রিপুরার মতো পুরাতন গঠন, আর, খুলনা-বাখরগঞ্জ সমতল নোয়াখালি বা সমতল-চট্টগ্রামের মতো নূতন গঠন। চব্বিশ-পরগনার গাঙ্গেয় অঞ্চল তো সুপ্রাচীন জনাবাস ও সভ্যতার কেন্দ্ৰই ছিল।
সমতট
য়ুয়ান-চোয়াঙ সমতটেও আসিয়াছিলেন। তিনি বলিতেছেন, এই সমতট সমুদ্র-তীরবর্তী দেশ; ইহার ভূমি জলীয় এবং সমতল। ইহার শস্যসম্ভার বা জনসমৃদ্ধি সম্বন্ধে তিনি কিছুই বলেন নাই। য়ুয়ান-চোয়াঙের সমতট তদানীন্তন যশোর-ফরিদপুর-ঢাকা অঞ্চল বলিয়াই যেন মনে হয়; অন্তত খুলনা-বাখরগঞ্জের ভূখণ্ড যে নয় এ অনুমান বোধহয় করা চলে। তখন বোধহয় এইসব অঞ্চল ভালো করিয়া গড়িয়াই উঠে নাই। আগেই দেখিয়াছি, ষষ্ঠ শতকে ফরিদপুরের কোটালিপাড়া অঞ্চল নূতন সৃষ্ট হইয়াছে মাত্র, তখনও তাহার নাম ‘নব্যারকাশিকা’, এবং সম্ভবত এই জনপদ তখন প্রায় সমুদ্রতীরবর্তী। বাখরগঞ্জের ‘নাব্য’ অঞ্চল তাহার অনেক পরের সৃষ্টি। ঐতিহাসিক কালে নূতন ভাঙাগড়া উলট-পালট বাঙলার এই দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলেই বেশি হইয়াছে।
জলবায়ু, বসন্ত বায়ু, বৰ্ষা ও হেমন্তের বাঙলা
জলবায়ু সম্বন্ধে য়ুয়ান-চোয়াঙের সাক্ষ্য ভূ-প্রকৃতি প্রসঙ্গে কিছু কিছু জানা গিয়াছে; মোটামুটি একটা ধারণা তাহা হইতেই পাওয়া যায়। বাঙলার জলবায়ু এখনও নাতিশীতোষ্ণ; তবে পশ্চিমাঞ্চলে, বিশেষত বীরভূমে, বর্ধমানের পশ্চিমাংশে এবং কতকটা মেদিনীপুরেও, গ্ৰীষ্মের তাপ প্রখরতার; অন্যত্র গ্ৰীষ্মের বায়ু উষ্ণ জলীয়। য়ুয়ান-চোয়াঙ তাহা লক্ষ্য ও বিবরণীবদ্ধ করিতে ভোলেন নাই। কিন্তু বাঙলাদেশের জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য হইতেছে। পূর্ব ও উত্তর-বঙ্গের বারিপাতবাহুল্য। এই বারিপাত ভারত-মহাসাগরবাহিত মৌসুমীবায়ুসঞ্জাত। এই বায়ু হিমালয়, গারো, খাসিয়া ও জৈন্তিয়াপাহাড়ে প্রতিহত হইয়া সমগ্ৰ উত্তর ও পূর্ব-বাঙলাকে, বিশেষভাবে, দাৰ্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, রংপুর, পাবনা, বগুড়া, মৈমনসিং, শ্ৰীহট্ট, ফরিদপুর, বরিশালকে অবিরল বারিপাতে ভাসাইয়া দেয়। আর-একটি বায়ু-প্রবাহ বসন্তের। ফাল্গুন-চৈত্র মাসের দক্ষিণা বাতাসের বৃপকচ্ছলে এই প্রবাহের কিঞ্চিৎ আভাস বোধহয় ধোয়ী কবির ‘পবনদূতে’ পাওয়া যায়। লক্ষণসেন যখন দিগ্বিজয়-উদ্দেশে দক্ষিণ-ভারতে গমন করেন তখন কুবলয়াবতী নামে মলয়পৰ্বতের এক গন্ধৰ্ব্বনারী তাহার প্রতি প্রেমাকৃষ্ট হন; বসন্তাগমে কুবলয়াবতী লক্ষণসেনের বিরহ সহ্য করিতে না পারিয়া বসন্ত পবনকে দূত করিয়া প্রেরণ করেন। এই বসন্ত পবন উত্তর-পূর্ববাহী, এবং যেহেতু ইহা মলয়পৰ্বত স্পর্শ করিয়া আসে সেই হেতু কাব্যসাহিত্যে বসন্তের বাতাসের নাম মলয় পবন। কুবলয়াবতী পবনদূতকে মলয় পর্বত হইতে উত্তর-পূর্ববাহী হইয়া গৌড়ে লক্ষণসেন-সমীপে যাইতে আদেশ করিয়াছিলেন; দূত সে আদেশ পালন করিয়াছিল, তবে পথে হয়তো বিভ্রান্ত হইয়া অনেক বিপথ বিদিক ঘুরিয়া তবে রাজধানী বিজয়পুরে আসিয়া পৌছিয়াছিল। যাহা হউক, এই কাহিনীতে বাঙলার বসন্তকালীন পবন-প্রবাহের ইঙ্গিত সুস্পষ্ট। সংকলনকর্তা শ্ৰীধরদাসের সদুক্তিকর্ণামৃত-নামক সংকলন-গ্রন্থে বিভিন্ন বাঙালী কবির রচিত বায়ু প্রসঙ্গে প্রাকৃতিক বর্ণনাময় কতকগুলি শ্লোক উদ্ধৃত আছে। দক্ষিণ-বায়ুর বর্ণনা প্রসঙ্গে দক্ষিণাপথের বিভিন্ন দেশের তরুণীদের আশ্রয়ে দুইজন অজ্ঞাতনামা কবি বেশ রোম্যান্টিক কবি-কল্পনার পরিচয় দিয়াছেন। বারিবাহী মৌসুমী বায়ুর কোনও বিশ্বাসযোগ্য ঐতিহাসিক উল্লেখ ও বর্ণনা পাওয়া যাইতেছে না; তবে, রাজেন্দ্রচোলের তিরুমালয় লিপিতে বাঙলাদেশের অবিরল বারিপাতের একটু সংক্ষিপ্ত উল্লেখ আছে। বাঙলাদেশ সম্বন্ধে বলা হইয়াছে, এই দেশে বারিপাতের কখনও বিরাম ছিল না। (Vangaladesa where the rain water never stopped) বর্ষার অবিরল বৃষ্টিপাত তো এখনও পূর্ব ও দক্ষিণ-বঙ্গের জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য। একাদশ-দ্বাদশ শতকের বাঙলার বর্ষার একটি বাস্তব সুন্দর ছবি আঁকিয়াছেন কবি যোগেশ্বর (ইনি বাঙালী ছিলেন, এতটুকু সন্দেহ নাই), এবং ছবিটি গ্রাম্য নায়ক তথা কৃষক যুবকের সুখস্বপ্নেরও। উদ্ধার-লোভ সংবরণ করা কঠিন।
