য়ুয়ান চোয়াঙের কজঙ্গল-তাম্রলিপ্তি-কর্ণসুবর্ণবিবরণ পড়িয়া মনে হয়, এই পরিব্রাজক পশ্চিম বঙ্গের সমতল ভূমির ভূখণ্ডের সঙ্গেই পরিচিত হইয়াছিলেন। এই সমতলভূমির পশ্চিমাঞ্চলের উত্তর অংশেই “ভবিষ্যপুরাণ’ কথিত বৈদ্যনাথ-বক্রেশ্বর-বীরভূম-ধূত, উষর ও জাঙ্গলময় যে রাটখণ্ডজঙ্গলভূমি সেই ভূখণ্ডের সঙ্গে তাহার পরিচয় হয় নাই। কিংবা ভবদেব ভট্ট রাঢ় দেশের যে অজলা জঙ্গলময় (=জঙ্গলময় হইতে পারে, আবার জাঙ্গল=জাঙ্গাল=উচ্চ বাধ্যভূমিময়) ভূমির কথা বলিতেছেন তাহার পরিচয়ও তিনি পান নাই। কাজঙ্গল-তাম্রলিপ্তি-কর্ণসুবর্ণ-এই তিনটি রাজ্যেরই যে সমতলভূমি জলীয় এবং ফলমূল-শস্যপ্রসূ যাহার জলবায়ু উষ্ণ অথবা নাতিশীতোষ্ণ, এবং যে ভূমি লোকবহুল সেই ভূমিভাগের সঙ্গেই তাঁহার পরিচয় ঘটিয়াছিল। তিনি আসিয়াছিলেন বৌদ্ধধর্মের অনুরাগী এবং উৎসুক শিক্ষার্থী হিসাবে; বৌদ্ধধর্মসংঘ ও বিহারগুলির পরিচয়লাভ, পণ্ডিত ও ধর্মগুরুদের অনুষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানগুলির পরিচয়লাভই তাহার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। এইসব বৌদ্ধবিহার বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেন্দ্ৰ সাধারণত সহজগম্য এবং লোকালয়প্রধান স্থানেই অবস্থিত ছিল। সুপরিচিত, বহুজনপদচিহ্নিত পথ ধরিয়াই তিনি সে-সব স্থানে গিয়াছিলেন। কাজেই উষর, অনুর্বর ও জঙ্গলময়, এবং সেইহেতু গ্রাম ও নগরবিরল, জনবিরল স্থানগুলিতে যাওয়ার কোনও প্রয়োজন তাঁহার হয় নাই।
উত্তরবঙ্গের পুরাভূমি ও নবভূমি, বরিন্দ্-বরেন্দ্রী
পূর্বোক্তি পুরাভূমির একটি রেখা রাজমহলের উত্তরে গঙ্গা পার রাজশাহী-দিনাজপুর-রংপুরের ভিতর দিয়া, ব্ৰহ্মপুত্র পার হইয়া ঐ নদীর দুই তীরে বিস্তৃত হইয়া আসামের শৈলশ্রেণী স্পর্শ করিয়াছে। এই পুরাভূমিরেখার মাটি পার্বত্য গৈরিক স্থূল বালিময়। রংপুর-গোয়ালপাড়া-কামরূপেই এই রেখার বিস্তৃতি বেশি; রেনেলের নকশায় তাহার প্রমাণ পাওয়া যায়। উত্তর-বঙ্গের রাঙ্গামাটি প্রসঙ্গ আগেই বলিয়াছি। তাহা ছাড়া বগুড়া-রাজশাহীর উত্তর, দিনাজপুরের পূর্ব, এবং রংপুরের পশ্চিম স্পর্শ করিয়া এই রেখার একটি বিস্তৃত স্ফীতি— উচ্চ গৈরিক ভূমি—দেখিতে পাওয়া যায়; ইহাই মুসলমান ঐতিহাসিকদের বরিন্দ, বরেন্দ্ৰভূমির কেন্দ্ৰবিন্দু। এই বরিন্দের উত্তরে হিমালয়ের তরাই পর্বতসানুর অস্বাস্থ্যকর জলীয় নিম্নভূমিতে জলপাইগুড়ি ও কোচবিহার জেলা, পূর্ণিয়ার কিয়দংশ। বরেন্দ্রীর কেন্দ্রবিন্দু বরিন্দের গৈরিক ভূমি অনুর্বর, পুরাভূমি; কিন্তু পূর্ব-পশ্চিম-দক্ষিণ ঘিরিয়া তাঙ্গন-আত্রাই, মহানন্দা-কোশী, লম্বা করতোয়ার জল ও পলিমাটি-দ্বারা গঠিত নবভূমি। উপরোক্ত পুরাভূমিরেখাটুকু ছাড়া নবভূমির বাকি সবটাই সমতল-ভূমি, সুশস্যপ্ৰসূ, জলীয় এবং শ্যামল। বরিন্দ জনবিরল, এমনকি মালদহ-রংপুরের পুরাভূমিরেখাও অপেক্ষাকৃত জনবিরল, এবং মাটির রং গৈরিক; ঘন লোকবসতি সাধারণত পদ্মা-আত্রাই-করতোয়ার সমতলভূমিতেই দেখা যায়। প্রাচীন কালেও পুণ্ড্র-বরেন্দ্রীর সমৃদ্ধ জনপদগুলি সমস্তই এই নদনদীপ্লাবিত সমতলভূমিতে।
‘রামচরিতে” বরেন্দ্রভূমির যে শস্যসমৃদ্ধির পরিচয় পাওয়া যায়, যে ঐশ্বর্যবিবরণ পড়া যায় এবং যাহার কথা ধনসম্বল অধ্যায় প্রসঙ্গে এবং অন্যত্র নানা প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হইয়াছে সেই সমৃদ্ধি সাধারণত এই সমতলভূমির। তাহা হওয়াই স্বাভাবিক। নদনদী বাহিয়াই বাঙলার প্রাচীন সভ্যতা-সংস্কৃতি-সমৃদ্ধির জয়যাত্রা, এবং সমতলভূমিতে নদনদীর তীরেই গ্রাম-নগর-বন্দরের পত্তন, মানুষের ঘনতম বসতি, কৃষি-শিল্প-বাণিজ্যের বিস্তার।
পুণ্ড্রবর্ধন
বরেন্দ্রভূমি প্রাচীন পুণ্ড্র বা পুণ্ড্রবর্ধনেরই এক সুবৃহৎ অংশ, এমনকি কখনও কখনও সমার্থকও। য়ুয়ান-চোয়াঙ ভ্ৰমণ-ব্যাপদেশে পুণ্ড্রবর্ধনেও আসিয়াছিলেন। তখন এই দেশে সমৃদ্ধ, জনবহুল, প্রতি জনপদে দীঘি, আরাম-কানন, পুষ্পেপাদ্যান ইতস্তত বিক্ষিপ্ত; ভূমি সমতল এবং জলীয়, শস্যসম্ভার সুপ্রচুর, জলবায়ু মৃদু। জনসাধারণ জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধাবান। আগে বলিয়াছি, উত্তরবঙ্গ এবং ব্ৰহ্মপুত্র উপত্যকার গোয়ালপাড়া ও কামরূপ জেলার ভূ-প্রকৃতি ও জলবায়ু প্রায় একই প্রকার; সেখানেও একই ভূমির বিস্তার। য়ুয়ান-চোয়াঙের কামরূপ-বিবরণ সেই জন্যই পুণ্ড্রবর্ধনের সঙ্গে একেবারে হুবহু মিলিয়া য়ায়। সেখানেও ভূমি সমতল এবং জলীয়, শস্যসম্ভার নিয়মিত এবং জলবায়ু মৃদু। কামরূপের লোকেরা খর্ব ও কৃষ্ণকায়; সদাচারী হওয়া সত্ত্বেও তাহাদের প্রকৃতি হিংস্র। বিদ্যাথী হিসাবে তাহারা খুব অধ্যবসায়ী এবং তাহাদের ভাষা মধ্যদেশ হইতে পৃথক। এই দেশের দক্ষিণ-পূর্ব বনভূমিতে (গারো ও খাসিয়া-পাহাড়ে?) যুথবদ্ধ হইয়া বন্যহন্তী উৎপাত করিয়া চরিয়া বেড়ায় (এখনও করে); তাহার ফলে এখান হইতে যুদ্ধের প্রয়োজনে হস্তী যথেষ্ট পাওয়া যায়।
রাঢ়-পুণ্ড্রের যোগাযোগ
পশ্চিম-বাঙলার যেমন উত্তরবঙ্গেও তেমনই, য়ুয়ান-চোয়াঙের পরিচয় পুণ্ড্রবর্ধনের সমতল ভূমির সঙ্গে। কেন্দ্ৰভূমি বরিন্দের সঙ্গে বোধহয় তাহার পরিচয় ঘটে নাই। যাহাই হউক, রাঢ় এবং উত্তরবঙ্গের ভূ-প্রকৃতি এবং সঙ্গে সঙ্গে পদ্মা ও ভাগীরথীর ইতিহাস একত্রে স্মরণ ও বিশ্লেষণ বীরভূম-বর্ধমানের ঘনিষ্ঠ যোগ ছিল। ভাগীরথী যখন গৌড়কে ডাইনে রাখিয়া উত্তরহইয়া পরে দক্ষিণবাহী হইত, পদ্মা যখন আরও সোজা পূর্ববাহী ছিল তখন তো পুণ্ড্রবরেন্দ্রীর কিছুটা অংশ (মালদহ জেলা) রাঢ়ভূমির সঙ্গে যুক্তই ছিল। কিন্তু ইহার পরও গঙ্গা বরেন্দ্ৰ-পুণ্ড্র এবং রাঢ়ভূমির মধ্যে কখনও খুব বড় বাধা হইয়া দেখা দেয় নাই। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্বন্ধের একটি ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ প্রাচীন বাঙলার এই দুই ভূখণ্ডের মধ্যে বরাবরই ছিল। আজ উত্তর-বাঙলার সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগ পূর্ব-বাঙলার বেশি, কিন্তু প্রাচীন কালে তাহা ছিল না বলিলেই চলে। দিনাজপুর-রাজশাহী-মালদহের লোকভাষার প্রকৃতিও রাঢ়ের পূর্বাঞ্চলের লোকভাষা-প্রকৃতির সঙ্গে আত্মীয়তাসূত্রে আবদ্ধ। কিন্তু তাহা আলোচনার স্থান। এখানে নয়। তবে, এ কথা অনস্বীকার্য যে, মোটামুটিভাবে পুণ্ড্র-বরেন্দ্রী এবং রাঢ়-তাম্রলিপ্তিই বাঙলাদেশের প্রাচীনতর পলিভূমি।
