কজঙ্গল
পশ্চিমবঙ্গের এই যে ভূ-প্রকৃতি ইহার প্রাচীন সমর্থন কিছু কিছু পাওয়া যায়। ভট্ট ভবদেব রাজা হরিবর্মদেবের মন্ত্রী ছিলেন (একাদশ শতক)। তিনি তাহার ভুবনেশ্বর শিলালিপিতে রাঢ়দেশের অজলা জাঙ্গলময় প্রদেশের উল্লেখ করিয়াছেন। ভবিষ্য-পুরাণের ব্ৰহ্মখণ্ড অংশে রাঢ়ীখণ্ডজঙ্গল নামে এক দেশের উল্লেখ আছে। বৈদ্যমাথ, বক্ৰেশ্বর, বীরভূম ও অজয় নদ এই দেশের অন্তর্গত; ইহার তিনভাগ জঙ্গল, একভাগ গ্রাম ও জনপদ, অধিকাংশ ভূমি উষর, স্বল্পমাত্র ভূমি উর্বর। এখানে কোথাও কোথাও লৌহ আকর আছে। আমি অন্যত্র দেখাইতে চেষ্টা করিয়াছি, “ভবিষ্যপুরাণ ও ভবদেবভট্ট-কথিত এই দেশের একাংশে য়ুয়ান চোয়াঙ-রামচরিত-বৌদ্ধধর্মগ্রন্থ প্রভৃতি কথিত কয়ঙ্গল—কজঙ্গল—কজাঙ্গল-ক-চু-ওয়েন-কি-লো। বর্তমান কঁকজোল এই ভূখণ্ডের স্মৃতিমাত্র বহন করে। য়ুয়ান-চোয়াঙ চম্পা হইতে কজঙ্গল গিয়াছিলেন। এই দেশের ভূ-প্রকৃতি ও জলবায়ু সম্বন্ধে তাহার কিছু বক্তব্য আছে। তিনি বলিতেছেন (সপ্তম শতক), এই স্থানের উত্তরসীমা গঙ্গা হইতে খুব বেশি দূরে নয়; ইহার দক্ষিণের বনপ্রদেশে বন্য হন্তী প্রচুর। তাহার সময়ে এই রাজ্য পররাষ্ট্রের অধীন, রাজধানীতে লোক ছিল না এবং লোকেরা গ্রামে এবং নগরেই বাস করিত। তাহারা স্পষ্টাচারী (straight forward), গুণবান এবং বিদ্যাচর্চার প্রতি ভক্তিমান ছিল। দেশটি সমতল, ভূমি জলীয় এবং সুশস্যপ্রসু, বায়ু উষ্ণ। য়ুয়ান-চোয়াঙের বর্ণনা হইতে মনে হয়, তিনি কাজঙ্গলের যে অংশে দামোদর-অজয়-ভাগীরথী উপত্যকা সেই অংশের উপত্যক-ভূমির কথা বলিতেছেন, যে অংশে বৈদ্যনাথ-বক্ৰেশ্বর-বীরভূম সেই অংশের কথা নয়। দক্ষিণের বনপ্রদেশ বনবিষ্ণুপুর অঞ্চল বলিয়াই তো মনে হইতেছে। দামোদর-অজয়-ভাগীরথী উপত্যকার ভূমি সমতল, জলীয়, সুশস্যপ্রসূ এবং বায়ু উষ্ণ।
তাম্রলিপ্তি
য়ুয়ান-চোয়াঙ তাম্রলিপ্তি রাজ্যেও গিয়াছিলেন, এবং তাহার বর্ণনাও রাখিয়া গিয়াছেন। তাম্রলিপ্তির ভূমিও সমতল এবং জলীয়; বায়ু উষ্ণ; ফুল ফল শস্য প্রচুর। লোকের আচার-ব্যবহার রূঢ়, কিন্তু তাহারা খুব সাহসী। এই দেশে স্থল ও জলপথের সমন্বয়, এবং ইহার রাজধানী তাম্রলিপ্তির বন্দর সমুদ্রের একটি খাড়ির উপর অবস্থিত। এক্ষেত্রেও য়ুয়ান-চোয়াঙ মেদিনীপুরের পূর্ব ও পূর্ব-দক্ষিণ অংশের কথা বলিতেছেন, পশ্চিমের পার্বত্য অংশের কথা নয়।
কর্ণসুবর্ণ, পুরাভূমি বা রাঙ্গামাটির বিস্তৃতি
য়ুয়ান-চোয়াঙ তাম্রলিপ্তি হইতে গিয়াছিলেন কর্ণসুবর্ণ রাজ্যে। কর্ণসুবর্ণ তাঁহার সময়ে লোকবহুল জনপদ, এবং জনসাধারণের আর্থিক সমৃদ্ধিও তিনি লক্ষ করিয়াছিলেন। ভূমি ছিল সমতল এবং জলীয়, ফল ফুল শস্য ছিল প্রচুর; কৃষিকর্ম ভালো; বায়ু নাতিশীতোষ্ণ। জনসাধারণ সুচরিত্র এবং জ্ঞানবিজ্ঞানের পোষক। য়ুয়ান-চোয়াঙের কর্ণসুবর্ণ মুর্শিদাবাদ জেলার কানসোনা বলিয়া অনুমিত হইয়াছে। এই অনুমানের সমর্থন চীন পরিব্রাজকের বিবরণীতেই পাওয়া যায়। কর্ণসুবর্ণের রাজধানীর সন্নিকটেই তিনি লো-টো-মো-চিহ্ন নামক এক সুবৃহৎ বৌদ্ধবিহারের উল্লেখ এবং বর্ণনা করিয়াছেন। লো-টো-মো-চিহ্ন (=রাত্তমত্তি=রক্তমৃত্তিকা) বর্তমান রাঙ্গামাটি; রাঙ্গামাটি মুর্শিদাবাদের অন্তর্গত। রাঙ্গামাটি নামটি অর্থব্যঞ্জক। এই রাঙ্গামাটি সমতলভূমি হইলেও রাজমহল-সঁওতালভূমের পার্বত্য গৈরিক মাটি এই ভূমির নিম্ন ও উপরিস্তরে অপ্রতুল নয়। পুরাভূমি বা old alluvium-র কিছু কিছু চিহ্ন যে মুর্শিদাবাদ পর্যন্ত বিস্তৃত হইয়াছে তাহার ইঙ্গিত রাঙ্গামাটি, লালবাগ প্রভৃতি নামের স্মৃতির মধ্যে পাওয়া যায়। বাঙলার অন্যত্রও যেখানে-যেখানে স্থান-নামের সঙ্গে রাঙ্গা, লাল, রং প্রভৃতি শব্দ জড়ির সেইসব স্থান লক্ষণীয়। চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চল ঘেষিয়া রাঙ্গামাটি জনপদ এখনও বিদ্যমান। হয়তো ইহাই মহানাবিক বুদ্ধগুপ্তের রক্তমৃত্তিকা। কুমিল্লা শহরের পঁাচ মাইল পশ্চিমে লালমাটি বা লালমাইপাহাড় (ইহাই কি শ্ৰীচন্দ্রের রামপাল ও ধুল্লা লিপির রোহিতাগিরি?)। রেনেলের নকশায় দেখা যাইবে, ব্ৰহ্মপুত্রের উত্তর প্রবাহের পশ্চিমে (রংপুর জেলা), উত্তরে (গোয়ালপাড়া-কামরূপ জেলা), এবং দক্ষিণে (গোয়ালপাড়া কামরূপ জেলা) একাধিক রাঙ্গামাটির উল্লেখ ও পরিচয় (Rangamata, Rangamaty, Rangamati= রাঙামাটি, সন্দেহ থাকিতে পারে না)। ইহার কিছু সমর্থন করতোয়ামাহাত্ম্য গ্রন্থেও পাওয়া যায়—“পশ্চিমে করতোয়ায়া লোহিনী যাত্র মৃত্তিকা”। বর্তমান রংপুর জেলার রংপুর নামও এই রাঙ্গামাটির স্মৃতিবহ বলিয়া আমি মনে করি। ব্লাঙ্গাপুর=বিদেশী Fungpour (যেমন,রেনেলের নকশায়)=রঙ্গপুর=বংপুর হওয়া একেবারে অসম্ভব কিছুই নয়। তাহা ছাড়া, আমিনগাও-এর পথে রাঙ্গিয়া রেল স্টেশন, তেজপুরের পথে রাঙ্গাপাড়া স্টেশন, রাঙ্গাগ্রাম প্রভৃতি সমস্তই রেনেলের রাঙ্গামাটির সমর্থক; কারণ এগুলি সমস্তই ব্ৰহ্মপুত্রের পূর্বে, উত্তরে এবং দক্ষিণে। রংপুরের দক্ষিণ পশ্চিমে বরেন্দ্রী, মুসলমান ঐতিহাসিকদের বরিন্দ। বরেন্দ্রীর মাটি লাল, এবং তোহা একান্তই পুরাভূমি। এই পুরাভূমির বিচ্ছিন্ন অসংলগ্ন রেখা চলিয়া গিয়াছে রাজমহলের নিকট গঙ্গা পার হইয়া ধলভূম-মানভূম-সিং ভুম ধরিয়া সমুদ্রতীর পর্যন্ত। উত্তর-রাঢ় ও দক্ষিণ-রাঢ়ের পশ্চিমাংশ এবং মুর্শিদাবাদ এই পুরাভূমির বিস্তৃতাংশ। পূর্ব দক্ষিণ দিকে এই পুরাভূমির গারোপাহাড় (মধুপুরগড় সহ), পার্বত্য ত্রিপুরা, চট্টগ্রাম হইয়া সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত।
