তাম্রলিপ্তি-আরাকান-ব্ৰহ্ম-মালয়-যবদ্বীপ-সুবর্ণদ্বীপ পথ
তাম্রলিপ্তি হইতে নিম্ন-ব্ৰহ্মদেশ বা সুবৰ্ণভূমির দ্বিতীয় সমুদ্রপথের ইঙ্গিত যে “মহাজনকজাতকের গল্পে পাওয়া যাইতেছে, সে কথা ইতিপূর্বে বলিয়াছি। এই পথ সম্ভবত ছিল চট্টগ্রাম-আরাকানের সমুদ্রোপকূল বাহিয়া। একাদশ শতকে এবং পরে মধ্যযুগে চট্টগ্রামের সঙ্গে আরাকানের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধের আনাগোনা যে এই পথেই অনেকটা হইত। তাহা কতকটা অনুমান করা চলে। মধ্যযুগীয় বাঙলা সাহিত্যেও বাঙলার সঙ্গে নিম্ন-ব্রহ্মের সামুদ্রিক বাণিজ্যের এবং এই বাণিজ্যপথের সুদূর স্মৃতি ধরিতে পারা কঠিন নয়। ‘সুপারগ জাতক’ নামে আর-একটি জাতকের গল্পেও পূর্ব ভারতের বণিকদের সুবৰ্ণভূমিতে যাত্রার কথা আছে। মধ্যযুগে চীন বণিক ও পরিব্রাজকেরা (যেমন, মা-হুয়ান), আরব বণিকেরা এবং পরে পর্তুগীজ বণিকেরা সপ্তগ্রাম ও চেহাটি-গান বা চট্টগ্রাম হইতে এই সমুদ্রোপকূল বাহিয়াই আরাকান ও নিম্ন-ব্ৰহ্মদেশে যাওয়া-আসা করিতেন, এমন প্রমাণ একেবারেই দুর্লভ নয়। ইৎসিঙ সপ্তম শতকেই বলিতেছেন, হিউয়েন-ত নামে একজন চীন পরিব্রাজক মালয় উপদ্বীপের সমুদ্রকুলবর্তী কেন্ডা (Keddah) হইতে সোজা তাম্রলিপ্তি গিয়াছিলেন। এই পথটির আভাস বোধহয় খ্ৰীষ্টীয় চতুর্থ-পঞ্চম শতক হইতে পাইতেছি। মহানাবিক বুদ্ধগুপ্তের যে লিপিটি মালয় উপদ্বীপে পাওয়া গিয়াছে সেই লিপিটিতে দেখিতেছি, বুদ্ধগুপ্ত রক্তমৃত্তিকা হইতে সমুদ্রপথে গিয়াছিলেন মালয়ে, বাণিজ্যব্যাপদেশে। এই রক্তমৃত্তিকা মুর্শিদাবাদ জেলার রাঙ্গামাটি (য়ুয়ান-চোয়াঙের লো-টো-মো-চিহ) বা চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গামাটিও হইতে পারে; শেষেরটি হওয়াই অধিকতর সম্ভব। নবম শতকের মাঝামাঝি দেবপালের নালন্দা লিপিতেও বঙ্গসাগর বাহিয়া এক সমুদ্রপথের ইঙ্গিত পাওয়া যাইতেছে। তখন তাম্রলিপ্তি বন্দর অবলুপ্ত; বাঙলার আর কোনও সামুদ্রিক বন্দরের উল্লেখও পাইতেছি। না। কাজেই, এই পথ সমুদ্রতীর বাহিয়া, না কোনাকুনি বঙ্গোপসাগর বাহিয়া, ওড়িশার কোনো বন্দর হইয়া, তাহা নিঃসংশয়ে বলা যাইতেছে না।
তাম্রলিপ্তি-পলৌরা-মালয়-সুবর্ণভূমি পথ
তৃতীয় আর-একটি পথের কথাও বলিতে হয়। এই পথের সর্বপ্রাচীন সংবাদ দিতেছেন ভৌগোলিক ও জ্যোতির্বেত্তা টলেমি। তাম্রলিপ্তি হইতে যাত্ৰা করিয়া জাহাজগুলি সোজা আসিত ওড়িশা দেশের পলৌরা (Paloura) বন্দরে, এবং সেখান হইতে কোনাকুনি বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়া যাইত মালয়, যবদ্বীপ, সুমাত্রা প্রভৃতি দ্বীপ-উপদ্বীপগুলিতে।
০৫. ভূ-প্রকৃতি ও জলবায়ু : লোক-প্রকৃতি
নদনদী ও পাহাড়-পর্বত মিলিয়া বাঙলার ভূ-প্রকৃতি নির্ণয় করিয়াছে, এবং তোহা ইতিহাস আরম্ভ হইবার পূর্বেই। ঐতিহাসিক কালেও ভূ-প্রকৃতির কিছু পরিবর্তন ঘটিয়াছে, সন্দেহ নাই, বিশেষত নবগঠিত ভূমিতে—” new alluvium-এ। নদীর পলি পড়িয়া, বন্যার দ্বারা তাড়িত মাটি উচ্চভূমিতে বাধা পাইয়া, কিংবা ভূমিকম্প বা অন্য কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে নূতন ভূমির সৃষ্টি বা পুরাতন ভূমি পরিত্যক্ত হয়। বাঙলাদেশেও তাহা হইয়াছে; নূতন ভূমির সৃষ্টি হইয়াছে অল্পবিস্তর, কিন্তু তাহাতে প্রাগৈতিহাসিক কালের নবগঠিত ভূমি বা new alluvium-ই প্রসারিত হইয়াছে। পুরাতন ভূমি পরিত্যক্তও হইয়াছে, বিনষ্ট হইয়াছে— সাধারণত নদীর প্রবাহপথের পরিবর্তনের ফলে; কিন্তু তাহাতে ভূ-প্রকৃতির মৌলিক কোনও পরিবর্তন ঘটে নাই, পুরাভূমিতেও (old alluvium) নয়, নবভূমিতেও (new alluvium) নয়।
পশ্চিমাংশের পুরাভূমি এবং নবভূমি
ভূ-প্রকৃতির দিক হইতে বাঙলাদেশের চারিটি বিভাগ সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট। পশ্চিম বাঙলার একটা সুবৃহৎ অংশ পুরাভূমি। রাজমহলের দক্ষিণ হইতে আরম্ভ করিয়া এই পুরাভূমি প্রায় সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত। রাজমহল, সাঁওতালভূম, মানভূম, সিংহভূম, ধলভূমের পূর্বশায়ী মালভূমি এই পুরাভূমির অন্তর্গত; তাহারই পূর্বদিক ঘেষিয়া মুর্শিদাবাদ-বীরভূম-বর্ধমান–বাঁকুড়া-মেদিনীপুর জেলার পশ্চিমাংশের উচ্চতর গৈরিকভূমি; ইহাও সদ্যোক্ত পুরাভূমির অন্তর্গত। মালভূমি অংশ একান্তই পার্বত্য, জাঙ্গলময়, অজলা এবং অনুর্বর। এখনও এই অংশে গভীর শালবন, পার্বত্য আকর ও কয়লার খনি এবং ইহা সাধারণত অনুর্বর। প্রাচীন উত্তর-রাঢ়ের অনেকখানি অংশ, দক্ষিণ-রাঢ়ের পশ্চিমাংশ এবং তাম্রলিপ্তি রাজ্যেরও কিয়ৎ-পশ্চিমাংশ এই মালভূমি এবং উচ্চতর গৈরিক ভূমির অন্তর্গত। দক্ষিণ-রাঢ়ের রাণীগঞ্জ-আসানসোলের পার্বত্য অঞ্চল, বাঁকুড়ার শুশুনিয়াপাহাড় অঞ্চল, বনবিষ্ণুপুর রাজ্য, মেদিনীপুরের শালবনী-ঝাড়গ্রাম-গোপীবল্লভপুর অঞ্চল সমস্তই এই পুরাভূমিরই নিম্ন অংশ। এইসব পার্বত্য ও গৈরিক অঞ্চল ভেদ করিয়াই ময়ূরাক্ষী, অজয়, দামোদর, রূপনারায়ণ, দ্বারকেশ্বর, শিলাবতী (শিলাই), কপিশা (কসাই), সুবর্ণরেখা প্রভৃতি নদনদী সমতল ভূমিতে নামিয়া আসিয়াছে। এখনও ইহারা ইহাদের জলস্রোতে পার্বত্য লাল মাটি বহন করিয়া আনে। সমতলভূমি এই নদনদীগুলির জল পলিতে উর্বর। এই উর্বর সমতলভূমি নবগঠিত ভূমি, সদ্যোক্ত নদনদীগুলি এবং ভাগীরথী-প্রবাহদ্বারা সৃষ্ট ভূমি। মুর্শিদাবাদের বহুলাংশ, বর্ধমানের পূর্বাংশ, বাঁকুড়ার স্বল্প অংশ, হুগলি-হাওড়া এবং মেদিনীপুরের পূর্বাংশ এই নবসৃষ্ট ভূমি—বৃক্ষশ্যামল, শস্যবহুল।
