আন্তর্দেশীয় নদীপথ
স্থলপথের কথা বলা হইল। এইবার আস্তর্দেশিক নদী ও সামুদ্রিক জলপথের কথা বলা যাইতে পারে। এ সম্বন্ধে সর্বপ্রাচীন সাক্ষ্য কয়েকটি জাতক-কাহিনী হইতে পাওয়া যায়। “শঙ্খজাতক’, ‘সমুন্দবাণিজজাতক’, ‘মহাজনকজাতক’ ইত্যাদি গল্পে দেখা যায়, মধ্যদেশের বণিকরা বারাণসী বা চম্পা হইতে জাহাজে করিয়া গঙ্গা-ভাগীরথীপথে তাম্রলিপ্তি আসিত এবং সেখান হইতে বঙ্গসাগরের কূল ধরিয়া সিংহলে, অথবা উত্তাল সমুদ্র অতিক্রম করিয়া যাইত সুবৰ্ণভূমিতে (নিম্ন-ব্ৰহ্মদেশ)। সুবৰ্ণভূমির পথে বহুদিন বণিকেরা কুলভূমির চিহ্ন পর্যন্ত দেখিতে পাইত না। মেগাস্থিনিসের বিবরণ হইতে সম্ভবত স্ট্রাবো। এই তথ্য আহরণ করিয়াছিলেন যে, ভাগীরথী-গঙ্গার উজান বাহিয়া সাগরমুখের বন্দর হইতে বাণিজ্যতরীগুলি প্রাচ্য ও গঙ্গারাষ্ট্রের তদানীন্তন রাজধানী পাটলিপুত্র পর্যন্ত যাওয়া-আসা করিত। নদীপথে গঙ্গা-ভাগীরথী বাহিয়াই বঙ্গদেশের সঙ্গে উত্তর-ভারতের যোগাযোগ ছিল। এ পথ প্রাগৈতিহাসিক পথ, এবং রেলপথে দ্রুত বাণিজ্য-সম্ভার যাতায়াতের সূত্রপাতের আগে বাণিজ্যলক্ষ্মীর যাতায়াত এই পথেই ছিল বেশি।
উনবিংশ শতকেও বাঙালী এই নৌকাপথে কাশীধামে যাওয়া-আসা করিত, এই স্মৃতি এখনও বিলুপ্ত হয় নাই। প্রাচীন বাঙলার অন্য দুইটি প্রধানতম নদনদী করতোয়া এবং ব্ৰহ্মপুত্র বা লৌহিত্যপথে বাণিজ্যলক্ষ্মীর যাতায়াতের সাক্ষ্য বড় একটা পাওয়া যায় না। তবে, কামরূপ হইতে কর্ণসুবর্ণ এক জলপথের ইঙ্গিত বোধহয় পাওয়া যায়। য়ুয়ান-চোয়াঙের বিবরণীতে হর্ষবর্ধন-ভাস্করবর্ম সংবাদ প্রসঙ্গে। কিন্তু, এই জলপথ কি ব্ৰহ্মপুত্ৰ-ভাটি এবং গঙ্গা-উজান বাহিয়া, না কামরূপ হইতে স্থলপথে উত্তরবঙ্গের ভিতর দিয়া, তাহার পর কোশী বা মহানন্দার ভাটি বাহিয়া গঙ্গাতীরস্থ কর্ণসুবর্ণ পর্যন্ত, তাহা নিঃসংশয়ে বলা কঠিন। যাহা হউক, এ কথা অনুমান করিতে কিছুমাত্র কল্পনার আশ্রয় লইতে হয় না যে, উত্তর-আসামের রেশমজাতীয় বস্ত্রসম্ভার, বাঁশ, কাঠ, চন্দনকাঠ, পান, গুবক বা সুপারি, তেজপাতা ইত্যাদি ব্ৰহ্মপুত্র-সুরমা-মেঘনা বাহিয়াই বাঙলাদেশে আসিত। বাঁশ, কাঠ, ঘর ছাইবার খড় ইত্যাদি তো এখনও ভাটির স্রোতে ভেলায় ভাসাইয়া বাঙলাদেশে আনা হয়। পাট এবং ধান-চাল তো আজও নৌকাপথেই আমদানি-রপ্তানি হয় বেশি, বিশেষত পূর্ব-বাঙলার বিভিন্ন স্থানে এবং আসামের ও সুরমা উপত্যকা অঞ্চলে। করতোয়া যে এক সময় খুবই প্রশস্ত ও খরস্রোতা নদী ছিল এবং সোজা গিয়া সমুদ্রে পড়িত এ কথা তো আগেই বলিয়াছি। উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গে যোগাযোগ এই নদীপথেই ছিল, সন্দেহ করিবার কারণ নাই। এ কথাও আগে বলিয়াছি যে, এই নদীমাতৃক দেশে স্থলপথ অপেক্ষা নদীপথেই যাতায়াত ও বাণিজ্য প্রশস্ততর ছিল। লিপি এবং সমসাময়িক সাহিত্যেই যে শুধু সে ইঙ্গিত পাওয়া যায় তাহাই নয়; মধ্যযুগের বাঙলা সাহিত্যে এবং উনবিংশ শতাব্দীর শেষাশেষি পর্যন্ত লোকের অভ্যাস ও সংস্কারের মধ্যেও তাহার আভাস ও ইঙ্গিত সুস্পষ্ট।
বহির্দেশীয় সমুদ্রপথ : বঙ্গ-সিংহল পথ
নদীপথে আন্তর্দেশিক বাণিজ্য অপেক্ষা প্রাচীন বাঙলার সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং বাণিজ্য-পথের সাক্ষ্য-প্রমাণ অনেক বেশি পাওয়া যায়। জাতকের গল্পে তাম্রলিপ্তি হইতে সিংহল ও সুবর্ণদ্বীপ যাত্রার কথা বলিয়াছি। দক্ষিণ-ভারত ও সিংহলের পথের কথাই আগে বলা যাক। সিংহলী ইতিগ্ৰন্থ ‘দীপবংশ’ ও ‘মহাবংশে’ উল্লিখিত লাঢ়দেশী রাজপুত্র বিজয়সিংহ কর্তৃক সমুদ্রপথে সিংহেলগমন এবং দ্বীপটি অধিকার ইত্যাদির গাল্পৈতিহ্য বাঙালী কবি সত্যেন্দ্রনাথের কল্যাণে সুপরিচিত। কিন্তু এই লাঢ়দেশ কি প্রাচীন বাঙলার রাঢ় জনপদ, না প্রাচীন গুজরাত বা লাটদেশ, এই লইয়া পণ্ডিতমহলে মতভেদ আছে, এবং এই সম্পৰ্কীয় আলোচনা নানা ঐতিহাসিক, নৃতাত্ত্বিক এবং শব্দতাত্ত্বিক বিতর্কে কণ্টকিত। কিন্তু এ সাক্ষ্য ছাড়াও এই সম্বন্ধে অন্য প্রাচীন সাক্ষা বিদ্যমান। পেরিপ্লাসের সাক্ষ্য আগে উল্লেখ করিয়াছি। এই গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, লগদেশের সঙ্গে দক্ষিণ ভারত ও সিংহলের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য-সম্বন্ধ ছিল। সমুদ্রমুখে গঙ্গাবন্দর হইতে বাণিজ্যসম্ভার কোলণ্ডিয়া (Colandia) নামক এক প্রকার জাহাজ বোঝাই হইত এবং সেই জাহাজগুলি দক্ষিণ ভারতে ও সিংহলে যাতায়াত করিত। প্লিনিও এই সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের উল্লেখ করিয়া বলিতেছেন, আগে প্রাচ্যদেশ হইতে সিংহলে যাইতে ২০ দিন লাগিত, পরে (অর্থাৎ, প্লিনির সময়ে এবং কিছু আগে) লাগিত মাত্ৰ সাতদিন (‘a seven days’ sail according to the rate of speed of ourships’)। চতুর্থ শতকে ফাহিয়ান যখন তাম্রলিপ্তি হইতে এক বাণিজ্য-জাহাজ চড়িয়া সিংহলে যান। তখন লাগিয়াছিল চৌদ্দ দিন ও রাত্রি। সিংহল তো খ্রীষ্টপূর্বকাল হইতেই বৌদ্ধধর্মের এক বিশিষ্ট কেন্দ্ৰ হইয়া দাঁড়াইয়াছিল, এবং কালক্রমে এই হিসাবে এই দ্বীপটির খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠা বাড়িয়াই চলিয়াছিল। ফাহিয়ানের পর হইতেই বহু চীনা বৌদ্ধ পরিব্রাজক সিংহলে-বাঙলাদেশে আসা-যাওয়া করিতেন এবং তাহা সদ্যোক্ত সমুদ্রপথেই। সপ্তম শতকে ইৎসিঙের বিবরণী পাঠে জানা যায়, ঐ সময় অসংখ্য চীনদেশীয় বৌদ্ধশ্রমণ সিংহল হইতে বাঙলায় এবং বাঙলা হইতে সিংহলে ঐ পথে যাতায়াত করিয়াছিলেন। বোধহয়, ঐ সূত্র ধরিয়াই মহাযান বৌদ্ধধর্ম এবং কিছু কিছু নাগরী লিপির বৌদ্ধধর্মগ্রন্থও সিংহলে প্রসারলাভ করিযাছিল। অষ্টম শতকের পর বৈদেশিক বাণিজ্যে বাঙলাদেশের প্রতিষ্ঠা ক্ষুঃ হওয়ার পরে বহুদিন এই পথের কথা আর শোনা যায় না; তবে মধ্যযুগীয় বাঙলা সাহিত্য পাঠ করিলে মনে হয়, তখন এই পথ ধরিয়া অর্থাৎ সমুদ্রোপকূল বাহিয়া সিংহল গুজরাত পর্যন্ত সমুদ্রপথ পুনরুজজীবিত হইয়াছিল, অথবা এইসব পথের সুপ্রাচীন স্মৃতি প্রচলিত গল্প কাহিনীর মধ্যে ঢুকিয়া পড়িয়াছিল, যেমন ‘মনসামঙ্গল কাব্যগুলিতে। সিংহল হইতে মালয়, নিম্ন-ব্ৰহ্ম, সুবর্ণদ্বীপ, যবদ্বীপ, চম্পা, কম্বোজের সমুদ্রপথ তো ছিলই, এবং তাহার প্রমাণও সুপ্রচুর।
