শাকে ১১২৭ [= ১২০৬, ২৭শে মার্চ, আনুমানিক]
শাকে তুরগ যুগ্মেশে মধুমাস ত্রয়োদশে।
কামরূপং সমাগত্য তুরস্কাঃ ক্ষয়মাযযুঃ।
লিপিটির নিকটেই পাথরের খিলানযুক্ত একটি সেতু আছে। এই সেতুই কি মিনহাজ। কথিত ৩২-খিলান-যুক্ত পাষাণ-সেতু? এই সেতু পার হইয়া আরও ১৬ দিনের পথ হাঁটিয়া বখতিয়ার যেখানে পৌঁছিয়াছিলেন সেখান হইতেও আরও ২৫ ক্রোশ দূরে করমবত্তনের হাট। কাজেই করমবত্তন দিনাজপুর জেলায় হইতেই পারে না। বরং মনে হয়, শিলালিপি ও মিনহাজ। কথিত সেতু, প্রাকারবেষ্টিত দুৰ্গরক্ষিত নগর এবং করমবত্তনের হাট সমস্তই কামরূপসীমা হইতে তিব্বতের সুদুৰ্গম পার্বত্য পথে অবস্থিত ছিল। এই পথে অসংখ্য গিরিবর্তু ছিল, এ খবর মিথ্যা। না-ও হইতে পারে। যাহাই হউক, কামরূপ হইতে তিব্বত পর্যন্ত একটি দুৰ্গম গিরিপথ ছিল এ বিষয়ে সন্দেহের অবসর কম। কামরূপে আসিয়া এই পথ চাঙ-কিয়েন কথিত চীন-ভারত-আফগানিস্তান প্রান্তাতিপ্রান্ত সুদীর্ঘ পথের সঙ্গে মিলিত হইত হইতে পারে, এই পথ দিয়াও বৌদ্ধ পণ্ডিত ও পরিব্রাজকেরা এবং তিব্বতী দূতেরা মগধ ও বঙ্গদেশ হইতে তিব্বতে যাতায়াত করিতেন। গৌহাটি শহরের নিকট ব্ৰহ্মপুত্র পার হইয়া সোজা পঁচিশ মাইল উত্তরে একটি জায়গায় এখনও বৈশাখী পূর্ণিমায় এক বিরাট মেলা বসে; সেই মেলায় বহু তিব্বতী ব্যবসায়ী কম্বল, ভেড়া, ঘোড়া ইত্যাদি বিক্রয়ের জন্য লইয়া আসে।
কিন্তু তিব্বতের সঙ্গে যোগাযোগের আর-একটি পার্বত্য পথ বোধহয় ছিল। এই পথ উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি-দার্জিলিং অঞ্চল হইতে সিকিম, ভোটান পার হইয়া হিমালয় গিরিবর্ক্সের ভিতর দিয়া তিব্বতের ভিতর দিয়া চীনদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। পেরিপ্লাস গ্রন্থে (প্রথম শতক) বোধহয় এই পথের একটু ইঙ্গিত আছে। খ্ৰীষ্টীয় প্রথম শতকে চীনদেশ হইতে যে রেশম ও রেশমজাত দ্রব্যাদি বঙ্গদেশে আসিত তাহা পূর্বোক্ত কামরূপের পথ বা এই সদ্যোক্ত পথ বাহিয়া আসিত বলিয়াই তো মনে হয়। এখনও কালিমপং বা গ্যাংটকের বাজারে যে সব পার্বত্য টাটু ঘোড়া, কম্বল, কঁচা হলুদ, কঁচা সোনার অলংকার, নানা বর্ণের পাথর ইত্যাদি বিক্রয় হয় তাহা vায় সমস্তই আসে তিব্বত ও ভোটান হইতে; ঐ দেশীয় লোকেরাই তাহা লইয়া আসে।
কামরূপ হইতে তিব্বতের পথে বা জলপাইগুড়ি-দাৰ্জিলিং হইতে তিব্বতের পথ ইহার (কানওটাই এখন আর বহুলব্যবহৃত নয়। পার্বত্য প্রদেশের লোকেরাই শুধু এই পথ ব্যবহার করিয়া থাকে বঙ্গ ও আসামের সমভূমিতে আসিবার প্রয়োজনে। কম্বল, ঘোড়া, সোনা, পাথর ইত্যাদির বিনিময়ে লবণ, বিলাসদ্রব্য ইত্যাদি কিনিবার জন্য। কামরূপ হইতে উত্তর-পূর্ব আসাম ৩। মণিপুরের ভিতর দিয়া, উত্তর ব্রহ্মের ভিতর দিয়া যে-পথ দক্ষিণ-পূর্ব চীনে চলিয়া গিয়াছে, (যা পথের কথা চাঙ-কিয়েন বলিয়াছেন সেই পথে লোক-যাতায়াত বরাবরই কিছু কিছু ছিল; মধ্যযুগেও ছিল, এবং বর্তমান যুগেও আছে। আসামে ও বাঙলায় গোপনে আফিম আমদানী তো এই পথেই হইয়া থাকে। কিন্তু গত ভারত-ব্ৰহ্ম-চীন-জাপান যুদ্ধের তাগাদায় এই পথ পুনরুজ্জীবিত হইয়াছে।
ত্রিপুরা-মণিপুর পথ
ব্রহ্মদেশ হইতে পূর্বাভিমুখী আর-একটি স্থলপথের উল্লেখ করিতেই হয়। এ পথটি পূর্ব বাঙলার ত্রিপুরা জেলার লালমাই-ময়নামতী (প্রাচীন পট্টিকের রাজ্য) অঞ্চল হইতে আরম্ভ করিয়া সুরমা এ কাছাড় উপত্যকার (বর্তমান, শ্ৰীহট্ট-শিলচর) ভিতর দিয়া, লুসাই পাহাড়ের উপর দিয়া, মনিপুরের ভিতর দিয়া, উত্তর ব্ৰহ্মদেশ ভেদ করিয়া, মধ্য ব্ৰহ্মদেশে পাগান পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। পট্টিকেরা রাজ্যের সঙ্গে একাদশ ও দ্বাদশ শতকে ব্ৰহ্মদেশের পাগান রাষ্ট্রের খুব ঘনিষ্ঠ বৈবাহিক ও রাজনৈতিক সম্বন্ধ বিদ্যমান ছিল। এই দুই রাজ্যের সংযোগ ছিল এই সদ্যোক্ত পথে। এই পথের সংবাদও স্থানীয় লোক ছাড়া আর সকলেই ভুলিয়া গিয়াছিল, অথচ মধ্যযুগে মণিপুর-ব্ৰহ্মযুদ্ধের সৈন্যসামন্ত তো এই পথ দিয়াই যাওয়া-আসা করিয়াছে। চোরাই ব্যাবসাও বরাবরই এই পথে চলিত। আজ প্রয়োজনের তাড়নায় সেই পথ আবার বহুজনের পদচারণে প্রশস্ত হইয়াছে।
চট্টগ্রাম-আরাকান পথ
আর একটি পথের প্রতি একান্ত সাম্প্রতিক কালের দৃষ্টি পড়িয়াছে। এই পথ দক্ষিণশায়ী চট্টগ্রাম হইতে আরাকানের ভিতর দিয়া নিম্ন-ব্ৰহ্মের প্রোম বা প্রাচীন শ্ৰীক্ষেত্র পর্যন্ত বিস্তৃত। আনুমানিক নবম-একাদশ শতকে আরাকানে চন্দ্ৰবংশীয় রাজাদের আধিপত্য সুবিদিত। চট্টগ্রামের সঙ্গে ইহাদের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধও সমান সুপরিচিত। মধ্যযুগে আরাকান মুসলমান রাজসভায় বাঙলা সাহিত্যের প্রচুর সমৃদ্ধি দেখা গিয়াছিল; এই সাহিত্যের সঙ্গে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যের সম্বন্ধ ঘনিষ্ঠ। আজ প্রয়োজনের তাড়নায় এই চট্টগ্রাম-আরাকান-প্রোম পথও জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছে। অবশ্য এই পথের সমান্তরালবাহী সমুদ্রকুলশায়ী জলপথ তো সঙ্গে সঙ্গে ছিলই।
তাম্রলিপ্তি হইতে দক্ষিণমুখী পথ
আর একটি স্থলপথের উল্লেখ করিলেই স্থলপথ বৃত্তান্ত শেষ হইবে। এই পথটি তাম্রলিপ্তি-তমলুক হইতে, কর্ণসুবর্ণ হইতে, সোজা দক্ষিণবাহী হইয়া বাঙলাদেশকৈ দক্ষিণ ভারতের সঙ্গে যুক্ত করিয়াছে। য়ুয়ান-চোয়াঙ এই পথ ধরিয়াই কর্ণসুবর্ণ হইতে ওড্র, কঙ্গোব্দ, কলিঙ্গ, দক্ষিণ-কৌশল, অন্ধ হইয়া দ্রাবিড়, চোল, মহারাষ্ট্র প্রভৃতি দেশে গিয়াছিলেন। পাল ও সেন রাজারা এই পথেই দক্ষিণ দেশ আক্রমণে অগ্রসর হইয়াছিলেন। পশ্চিম-চালুক্যবংশীয় বিক্ৰমাদিত্য, চোলরাজ, রাজেন্দ্ৰচোল, এবং পূর্ব-গঙ্গােবংশের রাজারা এই পথেই বঙ্গদেশ আক্রমণে সৈন্যচালনা করিয়াছিলেন। এই পথেই চৈতন্যদেব নীলাচল এবং দক্ষিণ-ভারতে গিয়াছিলেন। এই পথেই বর্তমান কালের বি-এন-আর এবং মাদ্রাজ-রেলপথ বিস্তৃত।
