বহির্দেশীয় স্থলপথ
অন্তর্দেশের পথ ছাড়িয়া দেশ হইতে দেশান্তরের পথগুলির ইঙ্গিত এইবার ধরিতে চেষ্টা করা যাইতে পারে। উল্লিখিত বিবরণ হইতে বুঝা যাইবে, বাঙলাদেশ হইতে তিনটি প্রধান পথ পশ্চিম দিকে বিস্তৃত ছিল। একটি পুণ্ড্রবর্ধন বা উত্তরবঙ্গ হইতে মিথিলা বা উত্তর-বিহার ভেদ করিয়া (বর্তমান বি–এন–ডব্লিউ–আর এই পথ অনুসরণ করিয়াছে) চম্পা (ভাগলপুর) হইয়া পাটলিপুত্রের ভিতর দিয়া বুদ্ধগয়া স্পর্শ করিয়া (অথবা, পাটনা-আরা হইয়া) বারাণসী-অযোধ্যা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল; সেখান হইতে একেবারে সিন্ধু–সৌরাষ্ট্র— গুজরাতের বন্দর পর্যন্ত। বিদ্যাপতির পুরুষপরীক্ষায় গৌড় হইতে গুজরাত পর্যন্ত বাণিজ্য-পথের ইঙ্গিত আছে। য়ুয়ান-চোয়াঙের বিবরণী ও ‘কথাসরিৎসাগরের গল্প হইতে এই পথের আভাস পাওয়া যায়। দ্বিতীয় পথটিরও ইঙ্গিত পাওয়া যায় য়ুয়ান-চোয়াঙের বিবরণীতেই। এই পথটি তাম্রলিপ্তি হইতে উত্তরাভিমুখী হইয়া কৰ্ণসুবর্ণের ভিতর দিয়া রাজমহল-চম্পা স্পর্শ করিয়া পাটলিপুত্রের দিকে চলিয়া গিয়াছে। তৃতীয় পথটির আভাস পাওয়া যাইতেছে ইৎসিঙের বিবরণ এবং পূর্বোল্লিখিত হাজারীবাগ জেলার দুধপানিপাহাড়ের আনুমানিক অষ্টম শতকীয় লিপিটিতে। এই পথ তাম্রলিপ্তি হইতে সোজা উত্তর-পশ্চিমাভিমুখী হইয়া বুদ্ধগয়ার ভিতর দিয়া অযোধ্যা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এই তিনটি পথ আশ্রয় করিয়াই প্রাচীন বাঙলাদেশ উত্তর ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক, সামরিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ রক্ষা করিত। বাঙলা ও উত্তর ভারতের যে-কোনও বর্তমান রেলপথের নকশা খুলিলেই দেখা যাইবে এই রেলপথগুলি সেইসব প্রাচীন পথই অনুসরণ করিয়াছে।
উত্তর-পূর্বমুখী পথ
বাঙলার পূর্বদিকে কামরূপ রাজ্য, উত্তরে চীন ও তিব্বত। উত্তরবঙ্গ ও কামরূপের ভিতর দিয়া বাঙলাদেশ এই উত্তরশায়ী দেশদুটির সঙ্গে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ রক্ষা করিত। এই পথের বিবরণ পাওয়া যায়। য়ুয়ান-চোয়াঙ এবং কিয়া-তানের ভ্রমণ-বৃত্তান্তে, চীন-রাজদূত, চাঙি-কিয়েনের প্রতিবেদনে, এবং বোধহয় মুহম্মদ ইবন বখতিয়ারের আসাম-তিব্বত অভিযান সংক্রান্ত সুবিখ্যাত শিলালিপিটিতে। ‘তবকাত-ই নাসিরী’ গ্রন্থেও বোধহয় কামরূপের ভিতর দিয়া তিব্বত পর্যন্ত বিস্তৃত এই পথের উল্লেখ আছে। এই সাক্ষ্যগুলি বিশ্লেষণ করিলে পথটির আভাস স্পষ্ট হইতে পারে। পুণ্ড্রবর্ধন হইতে কামরূপ এবং কামরূপ হইতে সমতট পর্যন্ত দুইটি সুদীর্ঘ পথ যে ছিল, য়ুয়ান-চোয়াঙের বিবরণী এ-সম্বন্ধে আর কোনও সন্দেহই রাখে না; ইতিপূর্বেই তাহা বিশ্লেষণ করিয়া দেখানো হইয়াছে। এই দুই পথ দিয়া প্রাচীন কামরূপ এবং সুবর্ণকুড্যকের সমৃদ্ধ ৭। সুচারু বস্ত্ৰশিল্প, অগুরু, চন্দন, হাতি প্রভৃতি বাঙলাদেশে আমদানি হইত, এবং বাঙলার সামূদ্রিক বন্দর ও আন্তর্দেশিক বাণিজ্য কেন্দ্রগুলি হইতে ভারতের অন্যান্য প্রদেশে ও ভারতবর্যের বাহিরে রপ্তানি হইত। কিন্তু কামরূপই পূর্বাভিমুখী এই পথের শেষ সীমা নয়।
উত্তর ব্ৰহ্ম-মণিপুরী কামরূপ আফগানিস্থান পথ
য়ুয়ান-চোয়াঙের অন্তত সাত শত বৎসর আগে চাঙ-কিয়েন (Chang Kien) নামে এক চৈনিক রাজদূতের প্রতিবেদনে দক্ষিণ-চীন হইতে আরম্ভ করিয়া উত্তর-ব্ৰহ্ম ও মণিপুরের ভিতর দিয়া কামরূপ হইয়া আফগানিস্থান পর্যন্ত বিস্তৃত এক সুদীর্ঘ প্রান্তাতিপ্রান্ত পথের ইঙ্গিত ধরিতে পারা যায়। চাঙ-কিয়েন (খ্ৰীঃ পূঃ ১২৬) ব্যাকট্রিয়ার বাজারে দক্ষিণ-চীনের যুন্নান এবং সজেচোয়ান প্রদেশেজাত রেশমী বস্ত্র এবং সূক্ষ্ম বাঁশ দেখিতে পাইয়া খোজ লইয়া জানিয়াছিলেন, এই সমস্ত দ্রব্য আসিত চীন হইতে আফগানিস্থান পর্যন্ত বিস্তৃত উত্তর ভারতবর্ষ জুড়িয়া লম্বমান সুদীর্ঘ পথ বাহিয়া, সার্থবাহাদলের পশু ও শকটবাহিনী ভর্তি হইয়া। সজেচেয়ান হইতে কামরূপ পর্যন্ত এই পথের খবর য়ুয়ান-চোয়াঙ সপ্তম শতকেও শুনিয়াছিলেন কামরূপবাসীদের নিকট হইতে; কঠিন পার্বত্য পথ দুই মাসে অতিক্রম করিতে হইত, এ-খবরও য়ুয়ান-চোয়াঙ পাইয়াছিলেন। নবম শতাব্দীর গোড়ায় কিয়া-তান (৭৮৫-৮০৫ খ্ৰী) নামে আর একজন চীনা পরিব্রাজক টঙ্কিন শহর হইতে কামরূপ পর্যন্ত আর-একটি পথের খবর বলিতেছেন। কামরূপে আসিয়া এই পথটি চাঙ-কিয়েন বর্ণিত পথের সঙ্গে মিলিত হইয়া কজঙ্গল এবং সেখান হইতে মগধ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কাজঙ্গল হইতে পুণ্ড্রবর্ধন হইয়া কামরূপের যে পথের কথা কিয়া-তান বলিতেছেন সেই পথই সপ্তম শতকে য়ুয়ান-চোয়াঙের পথ ছিল।
চাঙ-কিয়েন বর্ণিত পথটির এবং অন্য আর-একটি পথের আরও ইঙ্গিত অন্য দুইটি সাক্ষ্য হইতে পাওয়া যায় বলিয়া মনে হয়। ‘তবাকাত-ই-নাসিরী গ্রন্থে বর্ণিত আছে, মুহম্মদ ইবন। বখতিয়ার নুদিয়া জয় ও ধ্বংস করিয়া, গৌড় বা লক্ষ্মণাবতীতে নিজ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করিয়া তিব্বত জয়ে অগ্রসর হইয়াছিলেন। পথে তাহাকে একটি সুপ্ৰশস্ত খরস্রোতা নদী (খরতোয়া=করতোয়া?) পার হইতে হয়; সেই নদীর কূল ধরিয়া দশ দিনের পথ চলার পর তিনি ২০টি পাষাণনির্মিত খিলানযুক্ত একটি সেতু পার হন। সেই সেতু পার হইয়া আরও ১৬ দিনের পথের পর একটি প্রাকারবেষ্টিত দুৰ্গরক্ষিত নগর দেখিতে পান এবং সংবাদ পান যে, সেখান হইতে ২৫ ক্রোশ দূরে করবত্তন, করপত্তন বা করমন্বত্তন নামে একটি জায়গায় ৫০,০০০ তুরুস্ক (? ) সৈন্য আছে; সেখানে বহু ব্ৰাহ্মণের বাস, এবং সেখানকার বাজারে প্রতিদিন সকালবেলা ১,৫০০ টাঙ্গন (টাটু) ঘোড়া বিক্রয় হয়। লক্ষ্মণাবতীতে যে সব ঘোড়া দেখিতে পাওয়া যায় সে সমস্তই সেই বাজারে কেনা। ঐ দেশের পথ-ঘাট পার্বত্যদেশ ভেদ করিয়া বিলম্বিত। তিব্বত হইতে কামরূপ পর্যন্ত এই পার্বত্য পথে ৩৫টি গিরিবর্তু আছে এবং সেইসব গিরিবর্ক্সের ভিতর দিয়াই লক্ষ্মণাবতী পর্যন্ত ঘোড়াগুলিকে আনা হয়। এই বিবরণ কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য বলা কঠিন। প্রাকারবেষ্টিত দুৰ্গরক্ষিত নগরটি কোন নগর তাহা নির্ণীত হয় নাই। করবত্তন, করপত্তন বা করমবত্তন কোন স্থান নির্দেশ করে, তাহাও বলা যায় না। কেহ কেহ। বলেন, করমন্বত্তনের ঘোড়ার হাট দিনাজপুর জেলার নেকদমার হাট; সেই হাটে নাকি এখনও বহু ঘোড়া বিক্রয় হয়, এবং সে সব ঘোড়া তিব্বত-ভোটানের টাটু ঘোড়া। কিন্তু করমত্তন হাট দিনাজপুর জেলায় হওয়া একটু কঠিন। গৌড় হইতে দিনাজপুর জেলার যে-কোেনও স্থান ২৬ দিনের পথ হইতে পারে না, দশ সহস্র সৈন্য লইয়া হাঁটিলেও নয়। তাহা ছাড়া, অন্য যুক্তিও আছে; তাহা এখনই বলিতেছি। যাহাই হউক, বখতিয়ার তিব্বত পর্যন্ত অগ্রসর হইতে পারেন। নাই; মধ্যপথেই পর্যুদস্ত হইয়া নানাভাবে লাঞ্ছিত হইয়া তীহাকে ফিরিয়া আসিতে হইয়াছিল। মিনহাজ তাহার বিস্তৃত বিবরণ লিখিয়া গিয়াছেন। মিনহাজের বিবরণ সব বিশ্বাসযোগ্য না হইলেও বখতিয়ার যে কামরূপের ভিতর দিয়া ব্যর্থ একটা উত্তরাভিযান চালাইয়াছিলেন তাহা বর্তমান গৌহাটির নিকটে ব্ৰহ্মপুত্রের তীরে কানাই-বরিশীবোয়া-নামক স্থানে পাষাণাগাত্রে খোদিত একটি শিলালিপিতেই সুপ্ৰমাণ। এই লিপিটির পাঠ এইরূপ :
