দুঃখের বিষয়, প্রাচীন বাঙলার আন্তবাণিজ্যের স্থলপথের বিবরণ স্বল্প। লিপিগুলিতে, বিদেশী পর্যটকদের বিবরণীতে এবং কিছু সমসাময়িক সাহিত্যে কয়েকটি মাত্র প্রাস্তাতিপ্রান্ত সুদীর্ঘ পথের ঈঙ্গিত ধরিতে পারা যায়। বিদেশী পর্যটক ও ঐতিহাসিকেরা বৈদেশিক বাণিজ্য সম্বন্ধেই কৌতুহলী ছিলেন এবং সেইসব বাণিজ্যপথের বিবরণই তাহারা যাহা কিছু রাখিয়া গিয়াছেন। তবু, ফাহিয়ান্ বা য়ুয়ান-চোয়াঙের মতো পর্যটক র্যাহারা বাঙলার এক জনপদ হইতে অন্য জনপদ কিছু কিছু ঘোরাঘুরি করিতে বাধ্য হইয়াছেন, তাহারা প্রসঙ্গত অন্তর্দেশের পথের ইঙ্গিতও দিক, রাখিয়া গিয়াছেন। ইৎসিঙের বিবরণে, সোমদেবের কথাসরিৎসাগরের মতো গ্রন্থে, ২/৪টি জগতকের গল্পে, লিপিমালায় ২/১টি আকস্মিক উল্লেখও এই জাতীয় পথের কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এইসব পথ শুধু অন্তর্বঙ্গপথ নয়; বরং এইসব পথ বাহিয়াই বাঙলাদেশে প্রাচীনকালে সুবিস্তৃত ভারতবর্ষের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সকল প্রকার যোগরক্ষা করিত।
আন্তর্দেশিক স্থলপথ
সোমদেবের ‘কথাসরিৎসাগরে’ পুণ্ড্রবর্ধন হইতে পাটলিপুত্র পর্যন্ত একটি সুবিস্তৃত পথের উল্লেখ আছে। ইৎসিঙ (সপ্তম শতকের তৃতীয় পদের শেষাশেষি)। তাম্রলিপ্তি হইতে বুদ্ধগয়া পর্যন্ত পশ্চিমাভিমুখী একটি পথের ইঙ্গিত দিতেছেন। হাজারিবাগ জেলায় দুধপানিপাহাড়ের আনুমানিক অষ্টম শতকের একটি শিলালিপিতে অযোধ্যা হইতে তাম্রলিপ্তি পর্যন্ত একটি সুদীর্ঘ পথের উল্লেখ পাওয়া যাইতেছে। য়ুয়ান-চোয়াঙ (সপ্তম শতকের দ্বিতীয় পাদ) বারাণসী, বৈশালী, পাটলিপুত্র, বুদ্ধগয়া, রাজগৃহ, নালন্দা, অঙ্গ-চম্পা প্রভৃতি পরিভ্রমণ করিয়া আসিয়াছিলেন কজঙ্গলে। আমি এই গ্রন্থেই অন্যত্র দেখাইতে চেষ্টা করিয়াছি, কাজঙ্গল দেশ অংশত বর্তমান উত্তর-রাঢ়, বাঁকুড়া-বীরভূমের উত্তর-পশ্চিম প্রাস্তবতী অনুর্বর জাঙ্গলময় প্রদেশ। কজঙ্গল হইতে তিনি গিয়াছেন পুণ্ড্রবর্ধনে (উত্তরবঙ্গ=বগুড়া-রাজশাহী-রংপুর-দিনাজপুর), পুণ্ড্রবর্ধন হইতে পথে এক প্রশস্ত নদী পার হইয়া কামরূপ; কামরূপ হইতে সমতট (ত্রিপুরা, ঢাকা, ফরিদপুর, খুলনা, বরিশাল, ২৪ পরগনার নিম্নভূমি); সমতট হইতে তাম্রলিপ্তি (দক্ষিণ পূর্ব মেদিনীপুর); তাম্রলিপ্তি হইতে কর্ণসুবর্ণ (মুর্শিদাবাদ জেলার কানসোনা); এবং কর্ণসুবর্ণ হইতে ওড্র, কঙ্গোব্দ, কলিঙ্গ। য়ুয়ান-চোয়াঙের বিবরণীতে তাহা হইলে মোটামুটি আন্তর্দেশিক পথগুলির একটু ইঙ্গিত পাইতেছি। কজঙ্গল বা উত্তর-রাঢ় অঞ্চল হইতে একটি পথ ছিল পুণ্ড্রবর্ধন পর্যন্ত বিস্তৃত। চম্পা (বর্তমান ভাগলপুর জেলা) হইতে তিনি আসিয়াছিলেন কজঙ্গলে। ভাগলপুর হইতে বর্তমানে যে রেলপথ রাজমহলপাহাড়ের ভিতর দিয়া নানা শাখা-প্রশাখায় দক্ষিণমুখী হইয়া চলিয়া গিয়াছে সিউড়ি-রানীগঞ্জ-বাকুড়া-বিষ্ণুপুর-পুরুলিয়ার দিকে এই পথই ছিল য়ুয়ান-চোয়াঙের পথ। কজঙ্গল হইতে উত্তরমুখী হইয়া এই পথ ধরিয়াই য়ুয়ান-চোয়াঙ রাজমহল বা রাজমহলের কিছুটা দক্ষিণে গঙ্গা অতিক্রম করিয়া পরে পূর্বমুখী হইয়া পুণ্ড্রবর্ধনে গিয়াছিলেন। এখন ই-আই-আর পথের বর্ধমান–রানীগঞ্জ–সিউড়ি হইতে রওয়ানা হইয়া লালগোলাঘাটে গঙ্গা পার হইয়া এ বি-আর পথে উত্তরবঙ্গে যাওয়া যায়, এবং সেখান হইতে সোজা রেলপথ ধরিয়া কামরূপ। এই রেলপথও প্রাচীন রাজপথই অনুসরণ করিয়াছে। কিন্তু কামরূপ হইতে সমতটের পথ এখন বর্তমান কালে আর খুব পরিষ্কার ধরিতে পারা যায় না; ধলেশ্বরী–যমুনা-পদ্মা এই পথকে এমনভাবে ভাঙিয়া বঁকাইয়া দিয়াছে যে, তাহার রেখা কল্পনায় আনা হয়তো যায়, কিন্তু সুস্পষ্ট ধরিতে পারা কঠিন। য়ুয়ান-চোয়াঙ বোধহয় স্থলপথে পদব্রজেই আসিয়াছিলেন, বিবরণী পাঠে এই কথাই মনে হয়। বর্তমান ভূমি-নকশা অনুযায়ী অন্তত দুইবার তাহার দুইটি সুপ্রশস্ত নদী, যমুনা ও পদ্মা, অতিক্রম করা উচিত, কিন্তু তাহার উল্লেখ বিবরণীতে কিছু নাই। মনে হয়, যমুনা বা পদ্মার আজিকার কিংবা মধ্যযুগের মতো প্রশস্ত অস্তিত্ব তখন ছিল না। অথচ, এখন এই দুইটি নদীই এ-বি-আর পথের গতি নির্ণয় করিতেছে। গৌহাটিতে ব্ৰহ্মপুত্র পার হইয়া এক পথ বগুড়াসান্তাহার-ঈশ্বরদী (পদ্মা) ছুইয়া কলিকাতা পর্যন্ত বিস্তৃত; আর-এক পথ জগন্নাথগঞ্জ (যমুনা) সিরাজগঞ্জ-ঈশ্বরদী (পদ্মা) হইয়া কলিকাতা। দুটি পথই বাকিয়া চুরিয়া নদনদী এড়াইয়া অতিক্রম করিয়া বিস্তৃত। যাহাই হউক, সমতট হইতে ভাগীরথী পার হইয়া তমলুকের পথে তো এখনও বি-এন-আর পথ সোজা চলিয়া গিয়াছে, এবং ভাগীরথীতীর হইতে উত্তরাভিমুখী মুর্শিদাবাদ (কর্ণসুবর্ণ) ছাড়াইয়া ই-আই-আর পথের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা এখনও বিস্তৃত। মুর্শিদাবাদ হইতে ওড্র বা উড়িশা পর্যন্তও ই-আই-আর ও বি-এন-আর পথে প্রাচীন রাজপথের ইশারা সহজেই পাওয়া যায়। প্রাচীন বাঙলার বিভিন্ন জনপদ যে সব সুদীর্ঘ পথগুলির দ্বারা পরস্পরযুক্ত ছিল সেইসব পথের ইঙ্গিত য়ুয়ান-চোয়াঙের বিবরণ হইতে পাওয়া গেল। এইসব পথ তিনি নিজে আবিষ্কার করেন নাই। তাহার বহু আগে হইতেই বহু যানের চক্রপোষণে, বহু পশু ও বহু মানুষের পদতাড়নায় এইসব পথ প্রশস্ত হইয়াছিল; তাহার পরেও বহুকাল পর্যন্ত এইসব পথ ক্রমাগত ব্যবহৃত হইয়া আজিকার রেলপথে বিবর্তিত হইয়াছে। কোথাও রেলপথ প্রাচীন পথকে নিশ্চিহ্ন করিয়া দিয়াছে, কোথাও প্রাচীন পথ রেলপথগুলির পাশাপাশি চলিয়াছে। বস্তুত, ভারতবর্ষের কোনো রেলপথই নূতন সৃষ্ট নবাবিষ্কৃত পথ নয়, প্রত্যেকটিই প্রাচীন পথের নিশানা ধরিয়া চলিয়াছে।
