we found but few villages but almost all wilderness, and saw many buffes, swine and deere, grasse longer than a man, and very many tigers.
সমস্ত উত্তরবঙ্গ জুড়িয়া অসংখ্য মরা নদীর খাত, নিম্ন জলাভূমি এখনও দৃষ্টিগোচর হয়; স্থানীয় লোকেরা ইহাদের বলে বুড়ি কোশী বা মরা কোশী। মালদহের উত্তরে ও পূর্বে যেসব ঝিল ইত্যাদি এখনও দেখা যায় সেগুলি এই কোশী ও মহানন্দার খাত হওয়া অসম্ভব নয়।
দ্বাদশ-ত্ৰয়োদশ শতকের আগে প্রাচীন বাঙলার নদনদীগুলির যে পরিচয় পাওয়া গেল তাহার মধ্যে দেখিতেছি গঙ্গা-ভাগীরথী, পদ্মা-পদ্মাবতী, করতোয় এবং লৌহিত্য-ব্রহ্মপুত্ৰই প্রধান। গঙ্গা-ভাগীরথীর ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত অজয় দামোদর, সরস্বতী ও যমুনা প্রসিদ্ধা নদী। পশ্চিম হইতে সমুদ্রবাহিনী কপিশা বা কাসাইও প্রাচীন নদী। পদ্মা প্রবাহও যে কম প্রাচীন নয় তাহাও দেখা গিয়াছে এবং তাঁহারই শাখা কুমারনদীর নিঃসংশয় উল্লেখ টলেমির বিবরণীতেই পাওয়া যাইতেছে। করতোয়াও সুপ্রাচীন প্রবাহ; কোশী-মহানন্দা–আত্রাই-পুনর্ভবার খুব প্রাচীন উল্লেখ পাওয়া যাইতেছে না, কিন্তু ইহারাও সুপ্রাচীন বলিয়াই মনে হয়–অন্তত, কোশী-মহানন্দার প্রাচীন প্রবাহপথের ইঙ্গিত মিলিতেছে। ত্রিস্রোতা নামটিও প্রাচীন ঐতিহা-স্মৃতিবহ। লৌহিত্যের উল্লেখও খুব প্রাচীন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরিয়া এইসব নদনদীর প্রবাহপথের কতকটা ইতিহাস এইখানে ধরিতে চেষ্টা করা হইয়াছে। বাঙলাদেশ ও বাঙালীর ইতিহাস আলোচনা কালে এই কথা সর্বদা মনে রাখা প্রয়োজন যে, মধ্যযুগে এইসব নদনদীর প্রবাহপথ বারবার যেমন পরবর্তিত হইয়াছে, প্রাচীন কালেও সেইরূপ হইয়াছে, বিশেষত, পদ্মা ও গঙ্গার নিন্ন প্রবাহে, নিম্ন-বঙ্গের সমস্ত তািট জুড়িয়া, এমনকি উত্তর ও পূর্ববঙ্গেও। বর্তমানেও এই ভাঙা-গড়া চলিতেছে।
০৪. যাতায়াত ও বাণিজ্যপথ
(* এই প্রসঙ্গে ধনসম্বল অধ্যায়ে নৌ-শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য বিবরণ দ্রষ্টব্য।)
সাধারণভাবে এবং সংক্ষিপ্ত উপায়ে দেশ-পরিচয় লিখিতে বসিয়া গ্রাম হইতে গ্রামান্তরে বা নগর হইতে নগরান্তরে যাতায়াতের পথের উল্লেখ করিয়া লাভ নাই। যে সব গ্রামের উল্লেখ প্রাচীন বাঙলার লিপিগুলিতে পাওয়া যায় সেগুলি একটু বিশ্লেষণ করিলে প্রায়ই দেখা যায়, গ্রামের প্রান্তসীমায় রাজপথের উল্লেখ; অনেক সময় এই পথগুলিই এক বা একাধিক দিকে গ্রামসীমা অথবা কোনও ভূমিসীমা নির্দেশ করে, এবং সেই হিসাবেই পথগুলির উল্লেখ। অনুমান করিতে বাধা নাই, এই পথগুলিই গ্রাম হইতে গ্রামে ও নগরে বিস্তৃত ছিল। এই রকম দু-একটি পথের উল্লেখ পরবর্তী গ্রাম ও নগর অধ্যায়ে করা হইয়াছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, দামোদর দেবের চট্টগ্রাম লিপিতে কামনপিণ্ডিয়া গ্রামের ডাম্বারডাম পল্লীর একখণ্ড ভূমির পূর্বদিকে এ রাজপথের উল্লেখ আছে। কিছুদিন আগে ধনোরার অদূরে দুইটি বাধান রাজপথের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হইয়াছে। জঙ্গল কাটিয়া অথবা মাটি ভরাট করিয়া নূতন নূতন গ্রাম ও নগর পত্তনের –সঙ্গে সঙ্গে এই ধরনের যাতায়াত পথ ক্রমশ বিস্তৃত হইয়াছে, এই অনুমান করা চলে। এইসব সাধারণ স্থলপথ ছাড়া নদীমাতৃক দেশের অসংখ্য নদনদী, খাটা-খাটিকা, খাল-বিল, যানিকা-স্রোতিকা ইত্যাদি বাহিয়া জলপথে তো ছিলই। উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ বঙ্গে যত লিপি আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হইয়াছে তাহার প্রায় প্রত্যেকটিতেই এইসব জলস্রোতের উল্লেখ সুপ্রচুর। ইহাদের প্রেক্ষাপটে যখন সঙ্গে সঙ্গে লিপিগুলিতে দেখা যায়, এবং সমসাময়িক ও প্রাচীনতর। সাহিত্যে পড়া যায় নৌসাধনোদ্যত, সমুদ্রাশ্রয়ী বাঙালীর কথা, তাহাদের অসংখ্য নৌবাটি, নৌবিতান, নৌদণ্ডক, নাবাতক্ষেণী, প্রভৃতির কথা গুঢ় অধ্যাত্ম-সংগীতে (যেমন, চর্যাপদে) নদনদী, নৌকা, নৌকার নানা উপাদান (যথা, দাড়, হাল, মাস্তুল, পাল, লাগি, নোঙরের কাছি) ইত্যাদির উপমা, তখন সহজেই মনের মধ্যে এই ধারণা জন্মায় যে, জলপথে নৌকাযোগে যাতায়োতই ছিল স্থলপথে যাতায়াত অপেক্ষা প্রশস্ততর। লিপিগুলি বিশ্লেষণ করিলে দেখা যায়, এই নৌকা যাতায়াত পূর্ববঙ্গে পুণ্ড্রবর্ধনে এবং সমতটে, অর্থাৎ নদনদীবহুল নিম্নাশায়ী দেশগুলিতেই বেশি ছিল।
এইসব সাধারণ যাতায়াত পথ ছাড়া দেশের প্রান্ত হইতে প্ৰান্ত পর্যন্ত এবং দেশেরও সীমা অতিক্রম করিয়া দেশান্তরে যে সব স্থল ও জলপথ বিস্তৃত ছিল, যে সব পথ বাহিয়া শতাব্দীর পর শতাব্দী অসংখ্য নরনারী তীর্থযাত্রা, দেশভ্রমণ ও বিচিত্রকর্ম উপলক্ষে-সর্বোপরি শ্রেষ্ঠী, বণিক ও সার্থিবাহের দল ব্যাবসা-বাণিজ্য উপলক্ষে— দেশের বিভিন্ন গ্রামে, নগরে, তীর্থে এবং বাণিজ্যকেন্দ্রে, দেশান্তরের নগরে-বন্দরে যাতায়াত করিত, দেশ-পরিচয় প্রসঙ্গে সেইসব সুদীর্ঘ সুপ্রিশস্ত বহুজনপদলাঞ্ছিত পথগুলির বিবরণই উল্লেখযোগ্য। এইসব পথ দেশের শুধু যাতায়াত পথ নয়, বাণিজ্যপথও বটে এবং এইসব পথ বাহিয়াই বাঙলাদেশে লক্ষ্মীর আনাগোনা। এইসব বহু পথই বর্তমান রেলপথগুলির পূর্ব পর্যন্ত শুধু লক্ষ্মীর নয়, সরস্বতীরও আনাগোনার পথ ছিল; রেলপথগুলি সাধারণত সেইসব সুপ্রাচীন পথ বাহিয়াই প্রতিষ্ঠিত। জীবনধারণের প্রয়োজনে জীবনবিকাশের প্রেবণায় মানুষ সুপ্রাচীন দুৰ্গম বনজঙ্গল কাটিয়া, পাহাড় ভাঙিয়া, নদী ডিঙাইয়া, যে সব পথের প্রতিষ্ঠা করিয়াছে সে সব পথ একদিনে নিশ্চিহ্ন হইয়া যায় না। মানুষের ব্যবহারের মধ্যে, তাহার স্মৃতি ও সংস্কারের মধ্যে, নূতন পথের মধ্যে সেইসব প্রাচীন পথ বাচিয়া থাকে। পৃথিবীতে সর্বত্রই তাহা ঘটিয়াছে, বাঙলাদেশেও তাহার ব্যতিক্রম হয় নাই। নদ-নদী-প্রবাহ সুপ্রাচীন কালে জলপথ নির্ণয় করিত, এখনও করে; নদীর খাত যখন বদলায় সঙ্গে সঙ্গে পথও বদলায়; খাত মরিয়া গেলে নূতন খাতে জলপ্রবাহ ছুটিয়া চলে, জলপথও তাহার অনুসরণ করে। সমুদ্রস্রোত ও বিভিন্ন ঋতুর বায়ুপ্রবাহ প্রাচীনকালে সমুদ্রপথ নির্ণয় কল্পিত; বাষ্প-জাহাজ-পর্বের পূর্ব পর্যন্ত সমগ্ৰ পৃথিবীতে ইহাই ছিল নিয়ম। বাঙলাদেশেও তাহার ব্যত্যয় ঘটে নাই।
