করতোয়া ভোটান-সীমান্তেরও উত্তরে হিমালয় হইতে উৎসারিত হইয়া দাৰ্জিলিং-জলপাইগুড়ি জেলার ভিতর দিয়া বাঙলাদেশে প্রবেশ করিয়াছে। এই উত্তরতম প্রবাহে ইহার নাম করতোয়া নয়, দিস্তাং বা তিস্তা, যাহার সংস্কৃতিকরণ হইয়াছে ত্রিস্রোতা। জলপাইগুড়ি হইতে তিস্তার (ফান ডেন ব্রোকের নকশায়—Tiesta) তিনটি স্রোত তিন দিকে প্রবাহিত হইয়াছে; দক্ষিণবাহী পূর্বতম স্রোতের নাম করতোয়া; দক্ষিণবাহী মধ্যবর্তী স্রোন্তোধারার নাম আত্রাই; দক্ষিণবাহী পশ্চিমতম স্রোতের নাম পূর্ণভবা বা পুনর্ভবা। পুনর্ভবা উনবিংশ শতকে আইয়রগঞ্জের নিকটে মহানন্দার সঙ্গে মিলিত হইত, এবং মহানন্দা রামপুর-বোয়ালিয়ার নিকটে পদ্মার সঙ্গে মিলিত হইত। কিন্তু, তাহার আগে এক সময় মহানন্দা (এবং পুনর্ভবা) লক্ষ্মণাবতী গৌড়ের ভিতর দিয়া আসিয়া করতোয়ায় নিজ প্রবাহের জল নিষ্কাশিত করিত, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়। রেনেলের নকশায় সে পরিচয় পাওয়া যাইতেছে; কিন্তু ফান ডেন ব্রোকের আমলে মহানন্দার গতি আরও পশ্চিমে। আত্রাই (তঙ্গন-আত্রাই) তিস্তা হইতে নিৰ্গত হইয়া সোজা দক্ষিণবাহী হইয়া চলনবিলের ভিতর দিয়া জাফরগঞ্জের নিকট করতোয়ার সঙ্গে মিলিট হইত। ফান ডেন ব্রোক, ইজাক টিরিয়ন, থর্নটন সকলের নকশাতেই আত্রাই-করতোয়া-সংগম সুস্পষ্ট দেখান আছে। এই নকশাগুলিতেই দেখা যায়, আত্রাইর ছোট একটি শাখা পশ্চিমবাহী হইয়া গিয়া পদ্মায় পড়িয়াছে; কিন্তু তাঙ্গন-আত্রাই পথই প্রধান প্রবেশপথ।
দেখা যাইতেছে, তিস্ত হইতে নিৰ্গত দুইটি স্রোতই উত্তর-বঙ্গের বিভিন্ন অংশ ঘূরিয়া প্লাবিত করিয়া তাহাদের জলরাশি শেষ পর্যন্ত ঢালিয়া দিত তৃতীয় স্রোতটিতে, অর্থাৎ করতোয়ায়; তাহা ছাড়া, সে নিজের এবং উত্তরতম প্রবাহ তিস্তার সমস্ত জলধারা তো বহন করিতই। এইসব কারণেই ষোড়শ শতকের শেষাশেষি পর্যন্ত করতোয় ছিল অত্যন্ত বেগবতী। নদী। সপ্তদশ শতকের গোড়াতে মির্জা নাথনের বিবরণী (১৬০৮) পড়িলে মনে হয়, শাহজাদপুরের (পাবনা) দক্ষিণে করতোয় বক্র, সংকীর্ণ ও ক্ষীণতেীয়া হইতে আরম্ভ করিয়াছে। আজ করতোয়া মৃতপ্রায়; আত্রাই-পুনর্ভবারও একই দশা! কিন্তু সপ্তদশ শতকেও অবস্থা তত খারাপ হয় নাই। ফান ডেন ব্রোকের নকশায় (১৬৬০) আত্রাই ও করতোয়া দুয়েরই আকৃতি প্রশস্ত। টেভারনিয়ার ১৬৬৬ খ্ৰীষ্টাব্দে উত্তরগত একটি বড় নদীর নাম করিতেছেন Chativor; এই Chativor তো করতোয়া বলিয়াই মনে হয়। তাহা ছাড়া, জাও ডি ব্যারোস (১৫৫০) এবং কান্তেল্লি দা ভিনোলা (১৬৬৩) এই দুইজন তাহাদের নকশায় উত্তর হইতে সোজা দক্ষিণে সমুদ্র পর্যন্ত লম্ববান একটি নদী দেখাইতেছেন; ইহার নাম কাওরা (Calor)। কাওরকেও করতোয়া বলিয়াই স্বীকার করিতে হয়। ইহাদের নকশা যথাযথ নয় এবং হয়তো সর্বত্র সর্বথা নির্ভরযোগ্যও নয়; তবু সমসাময়িক বাঙলার নদনদীবিন্যাসের আভাস এইসব নকশায় খানিকটা নিশ্চয়ই পাওয়া যায়।
হয়তো ইহাদের কাছে মনে হইয়াছিল, অথবা লোকস্মৃতিতে বা লোকমুখে ইহারা শুনিয়াছিলেন যে করতোয়া সাগরগামিনী নদী। Caor যে করতোয় তাহা একটি পরোক্ষ প্রমাণ ডি ব্যারোস নিজেই দিতেছেন। তাহার নকশায় দেখিতেছি করতোয় Reino de Comotah বা কামতা রাজ্যের ভিতর দিয়া প্রবাহিত। কামত বর্তমান রংপুর-কোচবিহার। করতোয়া-আত্রাইর সম্মিলিত প্রবাহ এক সময় হয়ত ব্ৰহ্মপুত্রে গিয়া মিশিত। এ সম্বন্ধে ঐতিহাসিক প্রমাণ কিছু নাই; তবে হাণ্টার সাহেব শুনিয়াছিলেন, করতেঁায়াবাসীরা করতোয়াকে ব্ৰহ্মপুত্র বলিয়াই জানিত। ফান ডেন ব্রোকের নকশায় করতোয়া ব্ৰহ্মপুত্রে গিয়া পড়িতেছে বলিয়া যেন মনে হয়। যাহাই হউক, বুঝা যাইতেছে সপ্তদশ শতকে করতোয় (এবং আত্রাইও) উল্লেখযোগ্য নদী। অষ্টাদশ শতকে রেনেলের নকশায়ও আত্রাই এবং করতোয়ার সেই মোটামুটি সমৃদ্ধ রূপ দৃষ্টিগোচর হইতেছে, এবং করতোয়া তদানীন্তন রংপুর-দিনাজপুরের ভিতর দিয়া সোজা দক্ষিণবাহী হইয়া, পুঁটিয়ার (Pootyah) কিঞ্চিৎ উত্তর হইতে পদ্মার সঙ্গে প্রায় সমান্তরালে, পূর্ব-দক্ষিণবাহিনী হইয়া পদ্মা-ব্ৰহ্মপুত্রের সংগমস্থানের নিকটে, পদ্মায় গিয়া পড়িতেছে। কিন্তু ১৭৭৭ খ্ৰীষ্টাব্দের হিমালয় সানুর বিরাট বন্যায় আত্রাই-করতোয়ার সমৃদ্ধি বিনষ্ট হইয়া গেল। উত্তর-প্রবাহে যে-তিস্তা এই নদী দুইটির সমৃদ্ধির মূলে সেই তিস্তা এই বিরাট বন্যার বিপুল জলরাশি বহন করিতে না পারিয়া পূর্ব-দক্ষিণ দিকে একটি প্রায় অবলুপ্ত, প্রাচীন সংকীর্ণ-নদীর খাত ভাঙিয়া সবেগে ফুলছড়িঘাটে ব্ৰহ্মপুত্রে গিয়া বিপুল জলরাশি ঢালিয়া দিল। সেই সময় হইতে তিস্তা ব্ৰহ্মপুত্ৰমুখী; সে আর পুনর্ভবা-আত্রাই-করতোয়ায় হিমালয় নদীমালার জল প্রেরণ করে না।
এবং, আজ যে এই নদী তিনটি, বিশেষভাবে করতোয়া, ক্ষীণা হইতে ক্ষীণতরা হইতেছে তাহার কারণও তাঁহাই। তবু, উনবিংশ শতকের গোড়ায়ও করতোয়ার কিছু খ্যাতি-সমৃদ্ধি ছিল বলিয়া মনে হয়; ১৮১০ খ্ৰীষ্টাব্দে জনৈক যুরোপীয় লেখক বলিতেছেন, করতোয়া “was a very considerable river, of the greatest celebrity in Hindu fable”।
উত্তরবঙ্গের আর একটি প্রসিদ্ধ ও সুপ্রাচীন নদী কৌশিকী (বা বর্তমান কোশী)। এই কোশী উত্তর-বিহারের পূর্ণিয়া জেলার ভিতর দিয়া সোজা দক্ষিণবাহী হইয়া গঙ্গায় প্রবাহিত হয়। অথচ, এই নদী এক সময় ছিল পূর্ববাহী এবং ব্ৰহ্মপুত্রগামী। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরিয়া সমস্ত উত্তরবঙ্গ জুড়িয়া ধীরে ধীরে খাত পরিবর্তন করিতে করিতে কোশী আজ পূর্ব হইতে একেবারে পশ্চিমে সরিয়া গিয়াছে। কোশী প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাঙলার নদী-বিন্যাসের ইতিহাসে এক বিরাট বিস্ময়। কোশী (এবং মহানন্দার) এইরূপ বিস্ময়কর খাত পরিবর্তনের ফলেই গৌড়-লক্ষ্মণাবতী-পাণ্ডুয়া অঞ্চল নিম্ন জলাভূমিতে পরিণত হইয়া অস্বাস্থ্যকর এবং অনাবাসযোগ্য হইয়া উঠে, বন্যার প্রকোপে বিধ্বস্ত হয়, এবং অবশেষে পরিত্যক্ত হয়। কোচবিহার হইতে হুগলীর পথে রালফ ফিচু (১৫৮৩-৯১) গৌড়ের ভিতর দিয়া আসিয়াছিলেন; এই পথে
