সপ্তদশ শতক হইতে লৌহিত্য-ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহ-ইতিহাস সুস্পষ্ট; তাহার আগেকার ইতিহাসও কতকটা ধরিতে পারা কঠিন নয়, এবং দেওয়ানগঞ্জ-জামালপুর লাঙ্গলবন্দ-ধলেশ্বরীর পথে সে ইঙ্গিতও কিছু পাওয়া যাইতেছে। এ পথ চতুর্দশ-ষোড়শ শতকের হইতে পারে, প্রাচীনতরও হইতে পারে। কিন্তু তারও আগে এই পথের ইতিহাস কোথাও পাইতেছি না। লৌহিত্য-ব্রহ্মপুত্রের উল্লেখ পুরাণে, প্রাচীন সাহিত্যে (যথা, মহাভারতে ভীমের দিগ্বিজয় প্রসঙ্গে) এবং লিপিমালায় একেবারে অপ্রাচর নয়, এবং তাঁহা সুবিদিত। সুতরাং এখানে তাহার পুনরুল্লেখ নিম্প্রয়োজন। প্ৰাচীন কামরূপরাজ্য ছিল এই লৌহিত্যের তীরে। গুপ্তরাজ মহাসেনগুপ্ত একবার লৌহিত্যতীরে কামরূপরাজ সুস্থিতবৰ্মনের নিকট পরাজিত হইয়াছিলেন (ষষ্ঠ শতকের শেষাশেষি)। প্রায় সকল ক্ষেত্রেই এইসব প্রাচীন উল্লেখ সাধারণত লৌহিত্যের উত্তর-প্রবাহ সম্বন্ধে। দক্ষিণ-প্রবাহে যেখানে বারবার খাত পরিবর্তন হইয়াছে সে-সম্বন্ধে কোনও প্রাচীন ঐতিহাসিক উল্লেখ এখনও পাওয়া যাইতেছে না।
সুরমা-মেঘনা
মেঘনা সম্বন্ধে বক্তব্য সংক্ষিপ্ত। খাসিয়া-জৈন্তিয়া শৈলমালা হইতে মেঘনার উদ্ভব, কিন্তু উত্তর-প্রবাহে মেঘনা সুরমা নামেই খ্যাত এবং এই নামটি প্রাচীন। সুরমা শ্ৰীহট্ট জেলার ভিতর দিয়া মৈমনসিংহ জেলার নেত্রকোণা ও কিশোরগঞ্জ মহকুমার পূর্বসীমা স্পর্শ করিয়া আজমিরিগঞ্জ বন্দর ও অদূরবর্তী বানিয়াচঙ্গ গ্রাম বাম তীরে রাখিয়া ভৈরব-বাজারে এক সময় ব্ৰহ্মপুত্রের সঙ্গে আসিয়া মিলিত হইতো। নিম্নতর প্রবাহের কথা ব্ৰহ্মপুত্র প্রসঙ্গেই বলিয়াছি। সুরমা যেখান হইতে পশ্চিমা গতি ছাড়িয়া দক্ষিণা গতি লইয়াছে (বর্তমান মাকুলি স্টীমার স্টেশনের নিকট) সুরমা সেখান হইতে মেঘনা নামও লইয়াছে। রেনেলের নকশায় এই পথ সুস্পষ্ট দেখান আছে; আজমিরিগঞ্জ-বানিয়াচঙ্গও বাদ পড়ে নাই। এই নদীপথের উল্লেখযোগ্য কোনও পরিবর্তন হইয়াছে, ঐতিহাসিক প্রমাণ এমন কিছু নাই। মেঘনার নিম্ন-প্রবাহের দুই তীরে সমৃদ্ধ জনপদের পরিচয় চতুর্দশ শতকে ইবন বতুতার বিবরণেই পাওয়া যায়; ১৫ দিন ধরিয়া মেঘনার পথে তিনি গিয়াছিলেন; দুই ধারে ঘনবসতিময় গ্রাম, ফলের উদ্যান, মনে হইয়াছিল যেন কোনো বাজারের মধ্য দিয়া যাইতেছেন। মেঘনা নামের উৎপত্তি সম্বন্ধে একটি অনুমানের উল্লেখ এ প্রসঙ্গে হয়তো অবাস্তর হইবে না। চলিত লোকবচনে ও স্মৃতিতে এই উৎপত্তি মেঘনাদ বা মেঘানন্দ শব্দ হইতে। কিন্তু টলেমি খ্ৰীষ্টীয় দ্বিতীয় শতকে গঙ্গার অন্যতম মুখের নাম করিয়াছেন Mega (=great) <sal RTT। এই Mega=Megna (Megna=great), নদী হইতে মেঘনাদ=মেঘান্দ= মেঘনা নামের উৎপত্তি একেবারে ইতিহাস-বিরুদ্ধ না-ও হইতে, পারে। তবে, ইহা একান্তই অনুমান।
করতোয়া : তিস্তা : পুনর্ভবা : মহানন্দা : আত্রাই
উত্তরবঙ্গের নদনদীগুলির কথা এইবার বলা যাইতে পারে। উত্তর-বঙ্গের সর্বপ্রধান নদী করতোয়া। এই নদীর ইতিহাস সুপ্রাচীন এবং ইহার তীর্থমহিমা বহুখ্যাত। পুরাণে বারবার করতোয়া-মাহাত্ম্য কীর্তিত হইয়াছে। তাহা ছাড়া, “করতোয়া-মাহাত্ম্য নামে একখানা সুপ্রাচীন পুঁথি এখনও করতোয়ার তীর্থমহিমা ঘোষণা করে। লঘুভারতে’ বলা হইয়াছে, “বৃহৎ পরিসরা পুণ্য করতোয়া মহানদী”; মহাভারতের বনপর্বের তীর্থযাত্রা অধ্যায়েও করতোয়া পুণ্যতোয়া বলিয়া কথিত হইয়াছে, এবং গঙ্গাসাগরসংগম তীর্থের সঙ্গে একত্র উল্লিখিত হইয়াছে। পুণ্ড্রবর্ধনের রাজধানী প্রাচীন পুন্দনগল (=পুণ্ড্রনগর=বর্তমান মহাস্থানগড়, বগুড়ার অদরে) এই করতোয়ার উপরই অবস্থিত ছিল। খুব প্রাচীন কালেও যে করতোয়া বর্তমান বগুড়া জেলার ভিতর দিয়া প্রবাহিত হইত। তাহা মহাস্থানের অবস্থিতি এবং ‘করতোয়া-মাহাত্ম্য হইতেই প্রমাণিত হয়। সপ্তম শতকে য়ুয়ান-চোয়াঙ পুণ্ড্রবর্ধন হইতে কামরূপ যাইবার পথে বৃহৎ একটি নদী অতিক্রম করিয়াছিলেন; তিনি এই নদীটির নাম করেন নাই, কিন্তু টাং-সু (Tang-shu) গ্রন্থের মতে এই নদীর নাম ক-লো-তু বা Ka-to-tu । Wattersসাহেব Ka-to-tuকে ব্ৰহ্মপুত্র বলিয়া মনে করিয়াছিলেন। নিঃসন্দেহে ইহা ভুল। Ka-lo-tu স্পষ্টতই করতোয়া; এই নদীই যে সপ্তম শতকে পুণ্ড্রবর্ধন ও কামরূপের মধ্যবর্তী সীমা, এ খবরও টাং-সু গ্রন্থে পাওয়া যাইতেছে। সন্ধ্যাকর নদীর “রামচরিতের কবি-প্রশস্তিতেও এই তথ্যের আংশিক সমর্থন পাওয়া যাইতেছে; সেখানে স্পষ্টই বলা হইতেছে, বরেন্দ্রীদেশ (লিপিমালার বরেন্দ্রী বা বরেন্দ্র বা বরেন্দ্রীমণ্ডল) গঙ্গা ও করতোয়ার মধ্যবর্তী দেশ। যাহা হউক, এইসব উল্লেখ এবং লিপিমালার যে-সব গ্রাম ও নগর বরেন্দ্রীর অন্তর্গত বলা হইয়াছে (যেমন বায়ীগ্রাম=বৈগ্রাম বর্তমান দিনাজপুর জেলায় হিলির। নিকটে; কোলঞ্চ = ক্রোড়ঞ্জ, বোধহয় দিনাজপুর জেলায়; কান্তাপুর-কান্তনগর, বর্তমান দিনাজপুর জেলায়; নাটারি=নাটোর, বর্তমান রাজশাহী জেলায়; পদুবন্ধা-পাবনা? ইত্যাদি) তাহাদের অবস্থিতি বিশ্লেষণ করিলে সন্দেহ করিবার কারণ থাকে না যে, সপ্তম শতকে বরেন্দ্রীর পূর্বদিক ঘিরিয়া, প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধনের পূর্ব-সীমা দিয়া, করতোয় প্রবাহিত হইত। ‘করতোয়া-মাহাত্ম্য পাঠে মনে হয়, এক সময় করতোয়া স্ব-স্বতন্ত্র নদী হিসাবে গিয়া সাগরে পড়িত, কিন্তু তাহার কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ নাই। লোকস্মৃতি সাগর বলিতে বোধহয় কোন বৃহৎ জলস্রোতকেই বুঝিয়া ও বুঝাইয়া থাকিবে। অন্তত, মধ্যযুগে করতোয়ার জল নিঃশেষিত হইতেছে প্রশস্ত পদ্মা-ধলেশ্বরী সংগমে। কিন্তু এ সম্বন্ধে যাহা বক্তব্য তাহা পরে বলিতেছি।
