আকবরের আমলে ঈশা খাঁ আফগান ভাটি অঞ্চলের সামন্তপ্ৰভু ছিলেন; সেই সময়ে মাহমুদবাদ ও খলিফতাবাদ সরকারের অন্তর্গত ছিল বর্তমান ফরিদপুর, যশোর এবং নোয়াখালি জেলার কিয়দংশ, এবং এই দুই সরকারান্তৰ্গত বহুলাংশ গভীর অরণ্যময় ছিল। খান জাহান আলীর আমলে (যোড়শ শতকে) যশোর জেলার দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে গভীর অরণ্য; তিনি সুন্দরবনের অনেক অংশে নূতন আবাদ করাইয়াছিলেন। য়ুসুফ সাহ, সৈয়দ হোসেন সাহ, নসরৎ শাহ (১৪৯৪, ১৪৯৪, ১৫২০) প্রভৃতি সুলতানেরাও এইসব অরণ্যে কিছু কিছু নূতন আবাদ করাইয়াছিলেন, প্রধানত ফরিদপুর ও যশোরে। এই দুই জেলার অনেক অংশ ফতেহাবাদ সরকারের অন্তর্গত ছিল; বিজয় গুপ্তের ‘মনসামঙ্গলে’ ফতেহাবাদের উল্লেখ আছে। (পঞ্চদশ শতক)। জেসুইট্ পাদ্রী ফারনানডিজ (Fernandus, 1598) হুগলী হইতে শ্ৰীপুর (খুলনা জেলায় ইছামতীর তীরে, বর্তমান টাকির উলটা দিকে) হইয়া চট্টগ্রামের সমস্ত পথটাই ব্যাখ্রসংকুল বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। এক বৎসর পর ফনসেকা (Fonseca 1599) ৰাকলা হইতে সপ্তগ্রামের (সাতগাঁ=Chandeecan) পথ বানর ও হরিণ-আধুষিত বনময় ভূমি বলিয়া বর্ণনা করিতেছেন। পূর্বোক্ত ফিচ সাহেব (১৫৮৩-৯১) বলিতেছেন, বাকলা বন্দরের পাশ ঘিরিয়াই জঙ্গল। ষোড়শ শতকের শেষের দিকে প্রতাপাদিত্য যশোরে সুন্দরবন অঞ্চলেই নিজ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। ত্ৰয়োদশ শতকের পর কোনও সময় চব্বিশ-পরগনা জেলার নিম্নভূমি কোনও অজ্ঞাত অনির্ধারিত কারণে পরিত্যক্ত হয়। এই কারণ কোনও প্রাকৃতিক কারণ হইতে পারে, কোনও রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক কারণও হইতে পারে। তাহার পর হইতেই এই অঞ্চল গভীর অরণ্যময়। যশোর-খুলনা ও ফরিদপুর-বাখরগঞ্জের কিছু কিছু নিম্নভূমি হিন্দু আমলেই ধীরে ধীরে ক্রমশ সমৃদ্ধ জনপদ গড়িয়া উঠিতেছিল, এবং নূতন নূতন আবাদ তথাকথিত পাঠান আমলেও নূতন জনপদ গড়িয়া তুলিতেছিল, কিন্তু প্রকৃতির তাণ্ডব এবং মানুষের ধ্বংসলীলা ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকেই ইহার উপর যবনিকা টানিয়া দেয়। ১৫৮৪ খ্ৰীষ্টাব্দের প্রবল বন্যায়। ফতেহাবাদ সরকারে অসংখ্য ঘরবাড়ি, নৌকা এবং দুই লক্ষ লোক নষ্ট হইয়া যায়। ইহার উপর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আরম্ভ হয় মগ ও পর্তুগীজ জলদসু্যদের উন্মত্ত হত্যা ও লুণ্ঠনালীলা; তাহার ফলে বাখরগঞ্জ এবং খুলনার নিম্নভূমি একেবারে জনমানবহীন গভীর অরণ্যে পরিণত হইয়া গেল। রেনেলের নকশায় (১৭৬১) দেখা যাইবে, বাখরগঞ্জ জেলার সমস্ত দক্ষিণাঞ্চলে জুড়িয়া লেখা আছে “মগদের অত্যাচারে পরিত্যক্ত জনমানবহীণ” (“Country depopulated by the Maghs”)।
লৌহিত্য বা ব্রহ্মপুত্র : লক্ষ্যা
পদ্মার পূর্ব-দক্ষিণতম প্রবাহে উত্তর হইতে লৌহিত্য বা ব্ৰহ্মপুত্র আসিয়া মিলিত হইয়াছে। ব্ৰহ্মপুত্র অতি প্রাচীন নদ এবং তাহার তীর্থ-মহিমাও নেহাৎ অর্বািচীন নয়। ততটা না হউক, ব্ৰহ্মপুত্রও পদ্মা-ভাগীরথীর ন্যায় অন্তত কয়েকবার খাত পরিবর্তন করিয়া যমুনা-পদ্মার পথে বর্তমান খাত গ্ৰহণ করিয়াছে এবং চাদপুরের দক্ষিণে মেঘনার সঙ্গে মিলিত হইয়া সমুদ্রে অবতরণ করিয়াছে। গারো পাহাড়ের পশ্চিমের মোড় পর্যন্ত উত্তর-প্রবাহে লৌহিত্যের খাত পরিবর্তনের প্রমাণ বিশেষ কিছু নাই; পাবর্ত্যপথ, খাত পরিবর্তনের সুযোগও কম। কিন্তু গারো পাহাড়ের পশ্চিম-দক্ষিণ মোড় ঘুরিয়াই লৌহিত্য ঐ পাহাড়ের পূর্ব-দক্ষিণ তলভূমি ঘেষিয়া, দেওয়ানগঞ্জের পাশ দিয়া, শেরপুর-জামালপুরের ভিতর দিয়া, মধুপুর গড়ের পাশ দিয়া, মৈমনসিংহ জেলাকে দ্বিধাবিভক্ত করিয়া, বর্তমান ঢাকা জেলার পূর্বাঞ্চল ভেদ করিয়া, সুবর্ণগ্রাম বা সোনার গার দক্ষিণ-পশ্চিমে লাঙ্গলবন্দের পাশ দিয়া ধলেশ্বরীতে প্রবাহিত হইত। এই খাত এখনও বর্তমান, কিন্তু বর্ষাকাল ছাড়া অন্য সময়ে প্রায় মৃত বলিলেই চলে। এই খাতই প্রাচীন এবং ব্ৰহ্মপুত্রের যাহা কিছু তীৰ্থমহিমা তাহা এই খাতেরই; এখনও জামালপুর-মৈমনসিংহ-লাঙ্গলবন্দে অষ্টমী-স্নান পূর্ব-বাঙলার অন্যতম প্রধান ধর্মোৎসব। ফান ডেন ব্রোক (১৬৬০), ইজাক টিরিয়ান (১৭৩০) এবং থর্নটনের নকশায় Salhet (Sylhet) বা শ্ৰীহট্টকে কেন যে এই প্রবাহপথের পশ্চিমে দেখান হইয়াছে তাহা বলা শক্ত; শ্ৰীহট্টের অবস্থিতি সম্বন্ধে বোধ হয়। ইহাদের সুস্পষ্ট জ্ঞান কিছু ছিল না। রেনেল (১৭৬৪-১৭৭৬) কিন্তু শ্ৰীহট্টের অবস্থিতি ঠিক দেখাইয়াছেন। যাহা হউক, ঢাকা জেলার উত্তরে এই ব্ৰহ্মপুত্র প্রবাহেরই ডান দিক হইতে একটি শাখা-প্রবাহ নিৰ্গত হইয়াছে; ইহার নাম লক্ষ্যা (শীতললক্ষ্যা বা শীতলক্ষ্যা), বা ফান ডেন ব্রোকের Lecki। লক্ষ্যা ব্ৰহ্মপুত্রের পশ্চিম দিক দিয়া ব্ৰহ্মপুত্রেরই সমান্তরালে প্রবাহিত হইয়া বর্তমান ঢাকার দক্ষিণে (ব্ৰহ্মপুত্ৰ-ধলেশ্বরী-সংগমের কিঞ্চিৎ দক্ষিণে) নারায়ণগঞ্জের নিকটে ধলেশ্বরীর সঙ্গে আসিয়া মিলিত হইত। লক্ষ্যার এই প্রবাহ এখনও বর্তমান, কিন্তু ধারা ক্ষীণ, অথচ ফান ডেন ব্রোকের আমলে এবং তারপরে উনবিংশ শতকের গোড়ায়ও লক্ষ্যা প্রশস্ত বেগবতী নদী। লক্ষ্যার কথা ছাড়িয়া ব্ৰহ্মপুত্রের মূল প্রবাহে ফিরিয়া আসা যাইতে পারে। ফান ডেন ব্রোক, ইজাক টিরিয়ান, থর্নটন, রেনেল ইত্যাদি সকলের নকশা আলোচনা করিলে নিঃসন্দেহে এই সিদ্ধান্তে পৌছানো যায় যে, সপ্তদশ শতকে ফান ডেন ব্রোকের আগেই ব্ৰহ্মপুত্র এই খাত পরিত্যাগ করিয়াছিল। কারণ, এই নকশাগুলিতে দেখা যায় ব্ৰহ্মপুত্র আর ধলেশ্বরীতে প্রবাহিত হইতেছে না; বর্তমান ঢাকা জেলার সীমায় পৌছবার অব্যবহিত পূর্বে মৈমনসিংহের ভিতর দিয়া আসিয়া পূর্ব-দক্ষিণতম কোণে ভৈরব-বাজার বন্দরের নিকট উত্তরাগত সুরমা-মেঘনার সঙ্গে ব্রহ্মপুত্রের মিলন ঘটিতেছে। এবং উভয়ের সম্মিলিত ধারা চাদপুরের দক্ষিণে সন্দ্বীপের উত্তরে গিয়া সমুদ্রে পড়িতেছে। ভৈরববাজারের নিকট হইতে সমুদ্র পর্যন্ত এই ধারা রেনেলের সময়েও মেঘনা (Megna) নামেই খ্যাত। ব্ৰহ্মপুত্রের সদ্যোক্ত প্রবাহই তাহার পূর্বতম প্রবাহ; কিন্তু ব্ৰহ্মপুত্র এই প্রবাহও পরিত্যাগ করে উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি কোনও সময়ে; জলপ্রবাহ এখনও বিদ্যমান। কিন্তু ধারা ক্ষীণ এবং গ্ৰীষ্মে মৃতপ্রায়। মেঘনা প্রধানত তাহার নিজের জলরাশিই সমুদ্রে নিষ্কাশিত করে। উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি হইতে ব্ৰহ্মপুত্রের অন্যতম শাখা যমুনা প্রবলতর হইয়া উঠে, এবং বর্তমানে মৈমনসিংহের উত্তর-পশ্চিমতম কোণে ফুলছড়ির নিকট হইতে উৎসারিতা, বগুড়া-পাবনার পূর্বসীমা-বাহিতা এই যমুনাই ব্ৰহ্মপুত্রের বিপুল জলরাশি বহন করিয়া আনিয়া এখন গোয়ালন্দের কাছে পদ্মাপ্রবাহে ঢালিয়া দিতেছে।
