ধলেশ্বরী : বুড়ীগঙ্গা
পদ্মার প্রাচীনতম প্রবাহপথের নিশানা সম্বন্ধেও নিঃসংশয়ে কিছু বলা যায় না। ফান ডেন ব্রোকের (১৬৬০) নকশায় দেখা যাইতেছে পদ্মার প্রশস্ততর প্রবাহের গতি ফরিদপুর-বাখরগঞ্জের ভিতর দিয়া দক্ষিণ শাহাবাজপুরের দিকে। কিন্তু ঐ নকশাতেই প্রাচীনতর পথটিরও কিছুটা ইঙ্গিত বোধ হয় আছে। এই পথটি রাজশাহীর রামপুর-বোয়ালিয়ার পাশ দিয়ে চলনবিলের ভিতর দিয়া ধলেশ্বরীর খাত দিয়া ঢাকার পাশ দিয়া মেঘনা-খাড়িতে গিয়া সমুদ্রে মিশিত। ঢাকার পাশের নদীটিকে যে বুড়ীগঙ্গা বলা হয়, তাহা এই কারণেই; ঐ বুড়ীগঙ্গাই প্রাচীন পদ্মা-গঙ্গার খাত। কিন্তু তাহারও আগে কোন পথে পদ্মা প্রবাহিত হইত–সে-সম্বন্ধে কিছু বলা কঠিন।
জলাঙ্গী : চন্দনা
পদ্মার প্রধান প্রবাহ ছাড়া উৎসারিত আরও কয়েকটি নদীর প্রবাহপথে ভাগীরথী-পদ্মার জল নিষ্কাশিত হয়। ইহাদের ভিতর জলাঙ্গী এবং চন্দনা নদী দুইটি পদ্মা হইতে ভাগীরথীতে প্রবাহিত; এবং দুইটি নদীই ফান ডেন ব্রোকের নকশায় দেখানো আছে। চন্দনা তদানীন্তন যশোহরের পশ্চিম দিক দিয়া প্রবাহিত হইত। পদ্মা হইতে সমুদ্রে প্রবাহিত প্রাচীন নদীগুলির মধ্যে কুমারই প্রধান এবং প্রাচীনতম। কিন্তু কুমার এখন মরণোম্মুখ।
ভৈরব : মধুমতী : আড়িয়ল খাঁ
মধ্যযুগে এই নদীগুলির মধ্যে ভৈরবও ছিল অন্যতম; সেই ভৈরবও মরণোম্মুখ। বর্তমানে সাগরগামী পদ্মাশাখার মধ্যে মধুমতী ও আড়িয়ল খাঁই প্রধান। ধলেশ্বরী-বুড়ীগঙ্গা যেমন পদ্মার উত্তরতম প্রবাহপথের স্মারক, আড়িয়ল খাঁ (মির্জা নাথনের অণ্ডল খাঁ) তেমনই দক্ষিণতম প্রবাহপথের দ্যোতক। যাহা হউক-মধুমতী ও আড়িয়ল খাঁ, এই দুইটি নদীর অস্তিত্ব সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকের নকশাগুলিতেই দেখা যাইতেছে, যদিও বর্তমানে প্রবাহপথ অনেকটা পরিবর্তন হইয়াছে।
বাংলা খাড়ি : ভাটি
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরিয়া ভাগীরথী-পদ্মার বিভিন্ন প্রবাহপথের ভাঙা-গড়ার ইতিহাস অনুসরণ করিলেই বুঝা যায়, এই দুই নদীর মধ্যবর্তী সমতটীয় ভূভাগে, অর্থাৎ নদী দুইটির অসংখ্য খাড়ি-খাড়িকাকে লইয়া কি তুমুল বিপ্লবই না চলিয়াছে। যুগের পর যুগ। এই দুইটি নদী এবং তাহাদের অগণিত শাখাপ্রশাখা-বাহিত সুবিপুল পলিমাটি ভাগীরথী-পদ্মা মধ্যবর্তী খাড়িময় ভূভাগকে বারবার তছনছ করিয়া বারবার তাহার রূপ পরিবর্তন করিয়াছে। পদ্মার খাড়িতে ফরিদপুর অঞ্চল হইতে আরম্ভ করিয়া ভাগীরথীর তীরে ডায়মণ্ড হারবারের সাগরসংগম পর্যন্ত বাখরগঞ্জ, খুলনা, চব্বিশ-পরগনার নিম্নভূমি ঐতিহাসিক কালেই কখনও সমৃদ্ধ জনপদ, কখনও গভীর অরণ্য, অথবা অনাবাসযোগ্য জলাভূমি, কখনও বা নদীগর্ভে বিলীন, আবার কখনও খাড়ি-খড়িকা অন্তৰ্হিত হইয়া নূতন স্থলভূমির সৃষ্টি। ফরিদপুর জেলায় কোটালিপাড়া অঞ্চল ষষ্ঠ শতকের একাধিক তাম্রপট্টোলীতে নব্যাবকাশিকা বলিয়া অভিহিত হইয়াছে; নব্যাবকাশিকা সেই ভূমি, যে ভূমি (বা অবকাশ) নূতন সৃষ্ট হইয়াছে। ষষ্ঠ শতকে নব্যাবকাশিক সমৃদ্ধ জনপদ এবং নৌ-বাণিজ্যের অন্যতম সমৃদ্ধ কেন্দ্ৰ, অথচ আজ এই অঞ্চল নিম্ন জলাভূমি। পট্রেলীগুলি হইতে মনে হয়, নৌকান্দ্বারাই এইসব অঞ্চলে যাওয়া-আসা করিতে হইত। আশ্চর্যের বিষয় এই, ত্ৰয়োদশ শতকের প্রথম পাদে সেনরাজ বিশ্বরূপ সেনের সাহিত্য-পরিষৎলিপিতে বঙ্গের নাব্য অঞ্চলে রামসিদ্ধি পাটক নামে একটি গ্রামের উল্লেখ আছে। এই গ্রাম বাখরগঞ্জ জেলার গৌরনদী অঞ্চলে। এই নাব্য অঞ্চলেরই অন্তর্ভুক্ত বিনয়তিলক গ্রামের পূর্ব সীমায় ছিল সমুদ্র। শ্ৰীচন্দ্রের (দশম-একাদশ শতক) রামপাল পটোলীতে নানা মণ্ডলের উল্লেখ আছে; কেহ কেহ। মনে করেন। ইহার যথার্থ পাঠ নাব্যমণ্ডল, এবং ঐ পট্টোলীর নাব্যমণ্ডলান্তৰ্গত নেহকাণ্ঠি গ্রাম বাখরগঞ্জ জেলার বর্তমান নৈকাঠি গ্রাম। এই অনুমান মিথ্যা নয় বলিয়াই মনে হয়। যাহাই হউক, প্রাচীন বাঙলার নব্যাবকাশিকা নবসৃষ্ট ভূমি এবং ফরিদপুর-বাখরগঞ্জ অঞ্চল নাব্য অর্থাৎ নৌ-যাতায়াতলভ্য এবং তাহার পূর্ব-সীমায় সমুদ্র। খুলনায় নিন্ন অঞ্চলে তো ভাঙাগড়া মধ্যযুগে এবং খুব সাম্প্রতিক কালেও চলিয়াছে, এখনওঁ চলিতেছে। মধ্যযুগে মুসলমান ঐতিহাসিকেরা, তারনাথ প্রভৃতি বৌদ্ধ লেখকেরা, ময়নামতীর গানের রচয়িতা প্রভৃতিরা ভাগীরথীর পূর্বতীর হইতে সুবা বাঙলার পূর্বদিকে বেঙ্গলা (Bengala=ঢাকার বাঙ্গালাবাজার?) পর্যন্ত, বোধ হয়। চট্টগ্রাম পর্যন্ত সমস্ত নিম্নাঞ্চলটাকে বাটি বা ভাটি নামে অভিহিত করিয়াছেন। আবুল ফজল বাটি বা ভাটি বলিতে সুবা বাঙলার পূর্বাঞ্চল বুঝিয়াছেন। মানিকচন্দ্র রাজার গানেও “ভাটি হইতে আইল বাঙ্গাল লম্বা লম্বা দাড়ি”—এই ভাটিরও ইঙ্গিত সমুদ্রশায়ী এইসব খাড়ি-খাড়িকাময় নিম্নভূমির দিকে, অর্থাৎ, বঙ্গালভূমির দক্ষিণ অঞ্চলের দিকে। এই ভাটিরই কিয়দংশ প্রাচীন বাঙলার সমতট, এইরূপ অনুমান বোধ হয় খুব অসংগত নয়। অর্থের দিক হইতে সমতট হইতেছে সেই ভূমি যে ভূমি (সমুদ্র) তাঁটের সঙ্গে সমান, অর্থাৎ জোয়ারের জল যে-পর্যন্ত প্রবেশ করে; ভাটি অর্থও প্রায় তাহাই।
সুন্দরবন
কিন্তু, সবচেয়ে বিস্ময়কর পরিবর্তন ঘটিয়াছে বর্তমান সুন্দরবন অঞ্চলে, চব্বিশ পরগনা-খুলনা–বাখরগঞ্জের নিম্নভূমিতে; এবং সমস্ত পরিবর্তনটাই ঘটিয়াছে মধ্যযুগে। কারণ এই অঞ্চলের পশ্চিম দিকটায় অর্থাৎ চব্বিশ পরগনা জেলার নিম্নাঞ্চলে পঞ্চম-ষষ্ঠ শতক হইতে আরম্ভ করিয়া দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত সমানে সমৃদ্ধ-ঘনবসতিপূর্ণ জনপদের চিহ্ন প্রায়ই আবিষ্কৃত হইয়াছে ও হইতেছে। জয়নগর থানায় কাশীপুর গ্রামের সূর্যমূর্তি (আনুমানিক ষষ্ঠ শতক); ডায়মণ্ড হারবারের প্রায় ২০ মাইল দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বকুলতলা গ্রামে প্রাপ্ত লক্ষণ সেনের পটোলী (দ্বাদশ শতক) এবং ১৫ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে মলয় নামক স্থানে প্রাপ্ত জয়নাগের তাম্র-পট্টেলী (সপ্তম শতক) , রাক্ষসখালি দ্বীপে প্রাপ্ত ডোম্মন পালের পট্টোলী (দ্বাদশ শতক); ঐ দ্বীপেই প্রাপ্ত লিপিউৎকীর্ণ এক-ঝাঁক মাটির শীলমোহর (একাদশ শতক); খাড়ি পরগনায় প্রাপ্ত অসংখ্য পাথরের মূর্তি, ২/৪ টি ভগ্ন মন্দির, কালীঘাটে প্রাপ্ত গুপ্তমুদ্রা, ইত্যাদি সমস্তই চব্বিশ পরগনা (জেলার নিম্নভূমিতে প্রাচীন বাঙলার এক বা একাধিক সমৃদ্ধ জনপদের ইঙ্গিত করে। সেন রাজাদের ও ডোম্মনপালের আমলে খাড়িমণ্ডল ও খাড়িবিষয় পুণ্ড্রবর্ধনভূক্তির অন্তর্গত একটি প্রসিদ্ধ৷ বিভাগই ছিল। অথচ, আজ এইসব অঞ্চল প্রায় পরিত্যক্ত; কিছুদিন আগে তো সমস্তটা জুড়িয়া গভীর অরণ্যই ছিল। এখনও বহু অংশেই অরণ্য; কিছু কিছু অংশে মাত্র নূতন আবাদ ও বসতি হইতেছে। খুলনার দিকে এবং বাখরগঞ্জের কিয়দংশে তো এখনও গভীর অরণ্য। রালফ ফিচ (FRalph Fitch, 1583-91) বলিতেছেন, Bengala দেশ ব্যাঘ, বন্য-মহিষ ও বন্য-মুরগী (হাঁস) অধ্যুষিত বনময় জলাভূমি। ধৰ্মপালের খালিমপুর লিপি, দেবপালের নালন্দা লিপি এবং লক্ষণ সেনের আনুলিয়া লিপিতে ব্যাঘ্রতটী মণ্ডল নামে পুণ্ড্রবর্ধনভূক্তির অন্তর্গত একটি স্থানের উল্লেখ আছে। নামটির বুৎপত্তিগত অর্থ ধরিলে (যে সমুদ্রতট ব্যাঘ্র দ্বারা অধ্যুষিত) মনে হয়, চব্বিশ পরগনা, খুলনা, বাখরগঞ্জের দিকেই যেন স্থানটির ইঙ্গিত। এ অনুমান সত্য হইলে স্বীকার করিতে হয় নবম-দ্বাদশ শতকে দক্ষিণ-বঙ্গের অন্তত কিয়দংশ গভীর অরণ্যময় ছিল। ব্যাঘাতটি বাগডী হইলেও হইতে পারে, না-ও হইতে পারে।
