কুমার
এ অনুমান যুক্তিসংগত যে, এই সমস্ত প্রবাহটিরই যথার্থ নাম ছিল কুমার এবং কুমারই পরে বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন নামে পরিচিত হইয়াছে। তবে শিলা(ই)দহ নামটি পুরাতন বলিয়াই যেন মনে হয়। ফরিদপুরে প্রাপ্ত ধর্মদিত্যের একটি পট্রেলীতে শিলাকুণ্ড নামে একটি জলাশয়ের উল্লেখ আছে। শিলাকুণ্ড ও শিলা(ই)দহ একই নাম হইতেও পারে; দুয়েরই অর্থ প্রায় এক। এই কুমার নদীর সাগর-মোহনার মুখ (হরিণঘাটা) বা কৌমারকই বোধ হয় (দ্বিতীয় শতকের।) টলেমির গঙ্গার পঞ্চমুখের তৃতীয় মুখ কাম্বেরীখন (Kamberikhon)। যাহা হউক, সাতট-পদ্মাবতী বিষয়ের উল্লেখ হইতে বুঝা যাইতেছে যে, দশম-একাদশ শতকেই পদ্মা বা পদ্মাবতীর প্রবাহ ইদিলপুর-বিক্রমপুর অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, এবং ঐদিক দিয়াই বোধ হয় সাগরে প্রবাহিত হইত। কুমারতািলক মণ্ডলের (যে মণ্ডল কুমার নদীর তল বা অববাহিকা, নদীর দুই ধারের নিম্নভূমি) উল্লেখ হইতে অনুমান হয় কুমার নদীও। তখন বর্তমান ছিল এবং পদ্মাবতীর সঙ্গে তাহার যোগও ছিল। সাত ‘শত বৎসর পর রেনেলের নকশায় তাহা লক্ষ্য করা যায়, এবং গড়াই-মধুমতী-শিলা(ই)দহ-বালেশ্বর যদি কুমারের সঙ্গে অভিন্ন না হয় তাহা হইলে সে যোগ এখনও বর্তমান।
ইদিলপুর পট্টোলীর প্রায় সমসাময়িক একটি সাহিত্যগ্রন্থেও বোধ হয় গুহ্য রূপকছলে পদ্মানদীর উল্লেখ আছে। দশম-দ্বাদশ শতকের বিজযান বৌদ্ধধর্ম-সাধনার গুহা আচার-আচরণ সম্বন্ধে প্রাচীনতম বাঙলা ভাষায় যে-সমস্ত পদ হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও প্রবোধচন্দ্র বাগচী মহাশয়ের কল্যাণে আজ সুপরিচিত হইয়াছে, তাহার মধ্যে একটি পদের প্রথম চার লাইন এইরূপ :
বাজণাব পাড়ী পঁউআ খাঁলে বাহিউ।
অদঅ বঙ্গালে ক্লেশ লুড়িউ৷।
আজি ভুসু বঙ্গালী ভইলী।
নিঅ ঘরিণী চণ্ডালী লেলী৷ [৪৯ নং পদ, ভুসুকু সিদ্ধাচার্যের রচনা]
সিদ্ধাচার্য ভুসুকু একাদশ শতকের মধ্যভাগের লোক। ডক্টর শহীদুল্লাহ মনে করেন, ভুসুকু তাহার গুরু দীপংকর-অতীশ-শ্ৰীজ্ঞানের পঞ্চাশিয্যের অন্যতম এবং “এই বাঙ্গাল দেশেরই এক প্রাচীন কবি।” উদ্ধৃত লাইন চারিটির আপাত অর্থ এই : ‘পদ্মাখালে বজ্রনৌকা পাড়ি বহিতেছে। অদ্বয়-বঙ্গালে ক্লেশ লুটিয়া লইল। ভুসু, তুই আজ (যথার্থ) বঙ্গালী হইলি। চণ্ডালীকে তুই নিজ ঘরণী করিয়া লইয়াছিস।’ এখানে পদ্মাখাল, বঙ্গ, বঙ্গালী প্রভৃতি শব্দের এবং সমস্ত পদটির সহজিয়া মতানুগত গুহ্য অর্থ তো আছেই, তবে সেই গুহ্য অর্থ গড়িয়া উঠিয়াছে কয়েকটি বস্তুসম্পর্কগত শব্দকে অবলম্বন করিয়া। ভুসুকু বাঙ্গালী অর্থাৎ পূর্ব-দক্ষিণ বঙ্গবাসী ছিলেন। ১০২১-২৫ খ্ৰীষ্টাব্দে রাজেন্দ্ৰচোল দক্ষিণ-রাঢ়ের পরেই বঙ্গাল দেশ জয় করিয়াছিলেন, অর্থাৎ ভাগীরথীর পূর্বতীরে বর্তমান দক্ষিণবঙ্গই বঙ্গলদেশ এবং এই বঙ্গালদেশ অন্তত বিক্রমপুর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তিনি যখন বঙ্গালী এবং বঙ্গালদেশের সঙ্গে পদ্মাখালের কথা বলিতেছেন, তখন পঁউআ খাঁল এবং পদ্মাবতী নদী যে এক এবং অভিন্ন, এ কথা স্বীকার করিতে আপত্তি হইবার কারণ নাই। তাহা হইলে, ইদিলপুর লিপি এবং ভুসুকুর এই পদটিই পদ্মা বা পদ্মাবতী নদীর প্রাচীনতম নিঃসংশয় ঐতিহাসিক উল্লেখ। তবে, পদ্মা তখনও হয়তো এত বড় নদী হইয়া উঠে নাই; বোধ হয় খালোপমই ছিল।
দশম-একাদশ শতকে পদ্মার উল্লেখ দেখা গেল। কিন্তু পদ্মা যে গঙ্গা-ভাগীরথীর অন্যতম। শাখা তাহা খুব প্রাচীন লোকস্মৃতির মধ্যেও বিধৃত হইয়া আছে। দক্ষিণবাহী গঙ্গা-ভাগীরথী হইতে পদ্মার উৎপত্তিকাহিনী বৃহদ্ধর্ম পুরাণ, দেবী ভাগবত, মহাভাগবত-পুরাণ এবং কৃত্তিবাসী রামায়ণের আদিকাণ্ডে বর্ণিত হইয়াছে। ইহাদের একটিও অবশ্য খ্রীষ্টীয় দ্বাদশ শতকের আগের রচিত গ্রন্থ নয়, কিন্তু কাহিনীগুলির প্রকৃতি বিশ্লেষণ করিলে মনে হয়, গঙ্গা-ভাগীরথীর পূর্বর্যাত্রায় প্রবাহপথ অর্থাৎ পদ্মা দশম-একাদশ শতক হইতেও প্রাচীন। তবে, তখন বোধ হয় পদ্মা এত প্রশস্ত ও বেগবতী নদী ছিল না, হয়তো ক্ষীণতোয়া সংকীর্ণ ধারাই ছিল। তাহা না হইলে কামরূপ হইতে সমতট যাইবার পথে য়ুয়ান-চোয়াঙকে এই নদীটি পার হইতে হইত এবং তাহার বিবরণীতে আমরা নদীটির উল্লেখও পাইতাম। এই অনুল্লেখ হইতে মনে হয় পদ্মা তখন উল্লেখযোগ্য নদী ছিল না। তাহা ছাড়া, ষষ্ঠ শতকে পুণ্ড্রবর্ধনভূক্তি হিমবচ্ছিখর হইতে দ্বাদশ শতকে সমুদ্রতীর পর্যন্ত বিস্তৃত হইয়াছিল; পদ্মা আজিকার মতন ভীষণা প্রশস্ত হইলে হয়তো একই ভুক্তি পদ্মার দুই তীরে বিস্মৃত হইত না। জ্যোতির্বেত্তা ও ভৌগোলিক টলেমি (Ptolemy, 150 AD.) তাঁহার আন্তর্গাঙ্গেয় (India intra-Gangem) ভারতবর্ষের নকশা ও বিবরণীতে তদনীন্তন গঙ্গা-প্রবাহের সাগরসংগমে পাঁচটি মুখের উল্লেখ করিয়াছেন। টলেমির নকশা ও বিবরণ নানা দোষে দুষ্ট এবং সর্বত্র সকল বিষয়ে খুব নির্ভরযোগ্যও নয়। তবু, তাহার সাক্ষ্য এবং পরবর্তী ঐতিহাসিক উপাদানের উপর নির্ভর করিয়া কিছু কিছু অনুমান ঐতিহাসিকেরা করিয়াছেন, এবং এইসব মোহনা অবলম্বনে প্রাচীন ভাগীরথী-পদ্মার প্রবাহ-পথেরও কিছু আভাস দিয়াছেন। এ-সম্বন্ধে জোর করিয়া কিছু বলা শক্ত; তবে মোটামুটি মতামতগুলির উল্লেখ করা যাইতে পারে। পশ্চিম হইতে পূর্বদিকে যথাক্রমে এই মোহনাগুলির নাম : ১. Kambyson; তারপর Poloura নামে নগর; ২. Mega (great); ৩. Kamberj-khon; তারপর Tilogrammon নামে এক নগর; ৪. Pseudostomon (false mouth); এবং সর্বশেষে পূর্বতম মোহনা ৫. Antibole (thrown back)৷ নলিনীকান্ত ভট্টশালী মহাশয় এই মোহনাগুলিকে যথাক্রমে ১, তাম্রলিপ্ত-নিকটবর্তী গঙ্গাসাগর মুখ, ২০ আদিগঙ্গা বা রায়মঙ্গল-হরিয়াভাঙ্গা মুখ, ৩। কুমার-হরিণঘাটা মুখ, ৪. দক্ষিণ সাহাবাজপুর মুখ, এবং ৫. সন্দ্বীপ-চট্টগ্রাম-মধ্যবর্তী আড়িয়াল খা নদীর নিম্নতম প্রবাহমুখ বলিয়া মনে করেন। হেমচন্দ্র রায়চৌধুরী মহাশয় মনে করেন, ১৯ কালিদাস-কথিত কপিশা বা বর্তমান কাসাইর মুখ, ২০ ভাগীরথীর সাগরমুখ, ৮। কুমার-কুমারক-হরিণঘাটা মুখ, ৪. পদ্মা-মেঘনার সম্মিলিত প্রবাহমুখ, এবং ৫ বুড়িগঙ্গা মুখই।থাক্রমে টলেমি-কথিত গঙ্গর পঞ্চমুখ। এই দুই মতের মধ্যে ১ ও ২ নং ছাড়া আর কোথাও গুণ মূলগত বিশেষ কিছু পার্থক্য নাই; ২নং মুখের পার্থক্যও খুব মূলগত নয়। ৩, ৪, ও ৫ নং মুখ সম্বন্ধে যদি সদ্যোক্ত মত দুইটি সত্য নয় তাহা হইলে স্বীকার করিতেই হয় টলেমির সময়েই অন্তত ঢাকা-ফরিদপুর অঞ্চল পর্যন্ত গঙ্গার পূর্ব-দক্ষিণবাহী প্রবাহপথ অর্থাৎ পদ্মার প্রবাহপথের অস্তিত্ব ছিল। খুব অসম্ভব নাও হইতে পারে, তবে এ-সম্বন্ধে জোরােকরিয়া কিছু বলা যায় না।
