পদ্মা
ভাগীরথী বা ছোটগঙ্গার কথা বলা হইল; এইবার বড়গঙ্গা বা পদ্মার কথা বলা যাইতে পারে। রেনেল সাহেব তো ইহাকেই গঙ্গা বলিয়াছেন। আগেই বলিয়াছি, পদ্মা অর্বাচীনা নদী; কিন্তু পদ্মাকে যতটা অর্বাচীনা পণ্ডিতেরা সাধারণত মনে করিয়া থাকেন ততটা অর্বাচীনা হয়ত সে নয়। রাধাকমল মুখোপাধ্যায় মহাশয় তো মনে করেন ষোড়শ শতক হইতে গঙ্গার পূর্বািযাত্রার অর্থাৎ পদ্মার সূত্রপাত। ইহা ইতিহাস-বিরুদ্ধ বলিয়াই মনে হয়। রেনেল ও ফার্ন ডেন ব্রোকের নকশায় পদ্মা বেগবতী নদী। সিহাবুদ্দিন তালিস (১৬৬৬) ও মির্জা নাথনের (১৬৬৪) বিবরণীতে দেখিতেছি গঙ্গা-ব্ৰহ্মপুত্রের সংগমের উল্লেখ, ইছামতীর সংগমে, ইছামতীর তীরে যাত্রাপুর এবং তিন মাইল উত্তর-পশ্চিমে ডাকচার, এবং ঢাকার দক্ষিণে গঙ্গা-ব্ৰহ্মপুত্রের সম্মিলিত প্রবাহের সমুদ্রযাত্ৰা— ভলুয়া এবং সন্দীপের পাশ দিয়া। যাত্রাপুর হইতে ইছামতী বাহিয়া পথই ছিল তখন ঢাকায় যাইবার সহজতম পথ, এবং সেই পথেই টেভারনিয়ার (১৬৬৬) এবং হেজেস (১৬৮২) যাত্রাপুর হইয়া ঢাকা গিয়াছিলেন। কিন্তু তখন সর্বত্র গঙ্গার এই প্রবাহের পদ্মা নামকরণ দেখিতেছি না। এই নামকরণ দেখিতেছি। আবুল ফজলের ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থে (১৫৯৬-৯৭), মির্জা নাথনের ‘বহারিস্তান-ই ঘায়বি’ গ্রন্থে, ত্রিপুরা রাজমালায় এবং চৈতন্যদেবের পূর্ববঙ্গ ভ্ৰমণপ্রসঙ্গে। আবুজ ফজলের মতে কাজিহাটার কাছে গঙ্গা দ্বিধাবিভক্ত হইয়াছে; একটি প্রবাহ পূর্ববাহিনী হইয়া পদ্মাবতী নাম লইয়া চট্টগ্রামের কাছে গিয়া সমুদ্রে পড়িতেছে। মির্জা নাথন বলিতেছেন, করতোয়া বালিয়ার কাছে একটি বড় নদীতে আসিয়া পড়িতেছে; এই বড় নদীটির নাম অন্যত্র বলা হইয়াছে পদ্মাবতী। ত্রিপুরারাজ বিজয়মাণিক্য ১৫৫৯ খ্ৰীষ্টাব্দে ত্রিপুরা হইতে ঢাকায় আসিয়া ইছামতী বাহিয়া যাত্ৰাপুরে আসিয়া পদ্মাবতীতে তীর্থস্নান করিয়াছিলেন। চৈতন্যদেবও (জন্ম ১৪৮৫) ২২ বৎসর বয়সে পূর্ববঙ্গ ভ্ৰমণে আসিয়া পদ্মাবতীতে তীৰ্থস্নান করিয়াছিলেন, কোনও কোনও চৈতন্য-জীবনীতে এইরূপ উল্লেখ পাওয়া যায়। ষোড়শ শতকেই পদ্মা এবং ইছামতী প্রসিদ্ধা নদী, তাহার কিছু তীৰ্থমহিমাও আছে, এবং ঢাকা পার হইয়া চট্টগ্রামের নিকটে তাহার সাগরমুখ—এ তথ্য তাহা হইলে অনস্বীকার্য। ষোড়শ শতকের জাও ডি ব্যারোস এবং সপ্তদশ শতকের ফান ডেন ব্রোকের নকশায়ও এই তথ্যের ইঙ্গিত পাওয়া কঠিন নয়। পঞ্চদশ শতকের গোড়ায় কৃত্তিবাস যে এই পদ্মাবতীকেই বলিতেছেন বড়গঙ্গা তাহা তো আগেই দেখিয়াছি। চতুর্দশ শতকে ইবন বতুতা (১৩৪৫-৪৬) চীন দেশ যাইবার পথে সমুদ্রতীরবর্তী চট্টগ্রামে (Chhadkawan-চাটগা) নামিয়াছিলেন। তিনি চট্টগ্রামকে হিন্দুতীর্থ গঙ্গানদী এবং যমুনা (Jaun) নদীর সংগমস্থল বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। যমুনা বা Jaun বলিতে বতুতা ব্ৰহ্মপুত্রই বুঝাইতেছেন, এ সম্বন্ধে সন্দেহ নাই। তিনি বলিতেছেন,
“The first town of Bengal, which we entered, was Chhadkawan (Chittagong), situated on the shore of the vast ocean. The river Ganga, to which the Hindus go in pilgrimage and the river Jaun (Jamuna) have united mear it before falling into the sea.”
তাহা হইলে দেখা যাইতেছে, অন্তত চতুর্দশ শতকেও গঙ্গার পদ্মাবতী-প্রবাহ চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, এবং তাহার অদূরে সেই প্রবাহ ব্ৰহ্মপুত্র-প্রবাহের সঙ্গে মিলিত হইত। তটভূমি প্রসারের সঙ্গে চট্টগ্রাম এখন অনেক পূর্ব-দক্ষিণে সরিয়া গিয়াছে, ঢাকাও এখন আর গঙ্গা-পদ্মার উপরে অবস্থিত নয়। পদ্মা এখন অনেক দক্ষিণে নামিয়া গিয়াছে; ঢাকা, এখন পুরাতন গঙ্গা-পদ্মার খাত অর্থাৎ বুড়ীগঙ্গার উপর অবস্থিত; আরও পদ্মা-ব্ৰহ্মপুত্রের (যমুনা) সংগম এখন গোয়ালন্দের অদূরে। এই মিলিত প্রবাহ আরও পূর্ব-দক্ষিণে গিয়া চাঁদপুরের অদূরে মেঘনার সঙ্গে মিলিত হইয়া সন্দ্বীপের (স্বর্ণদ্বীপ= সোনাদ্বীপ=সন্দ্বীপ) নিকট গিয়া সমুদ্রে পড়িয়াছে। বস্তুত, সমতটীয় বাঙলায়, বিশেষত, তাহার পূর্বাঞ্চলে বরিশাল হইতে আরম্ভ করিয়া চাদপুর পর্যন্ত পদ্মা-ব্ৰহ্মপুত্র-মেঘনা যে কী পরিমাণে ভাঙাগড়া চালাইয়াছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরিয়া, তাহা জাও ডি ব্যারোস হইতে আরম্ভ করিয়া রেনেল পর্যন্ত নকশাগুলো বিশ্লেষণ করিলে খানিকটা ধারণাগত হয়। কিন্তু তাহা আলোচনার স্থান। এখানে নয়। প্রাচীন বাঙলায় গঙ্গার এই পূর্ব-প্রবাহের অর্থাৎ পদ্মা বা পদ্মাবতীর আকৃতি-প্রকৃতি কী ছিল তাঁহাই আলোচ্য। পঞ্চদশ শতক হইতে আরম্ভ করিয়া উনবিংশ শতক পর্যন্ত পদ্মার প্রবাহপথের অদলবদল বহু আলোচিত; কাজেই, এখানে তাহার পুনরুক্তি করিয়া লাভ নাই।
গড়াই : মধুমতী : শিলাইদহ
চতুর্দশ শতকে ইবন বতুতার বিবরণের আগে বহুদিন এই প্রবাহের কোনও সংবাদ পাওয়া যাইতেছে না। দশম শতকের শেষে একাদশ শতকের গোড়ায় চন্দ্ৰবংশীয় রাজারা বিক্রমপুর-চন্দ্ৰদ্বীপ-হরিকেল অর্থাৎ পূর্ব ও দক্ষিণ বঙ্গের অনেকাংশ জুড়িয়া রাজত্ব করিতেন। এই বংশের মহারাজাধিরাজ শ্ৰীচন্দ্র তাহার ইদিলপুর পট্টোলী দ্বারা “সতীট-পদ্মাবতী বিষয়ের অন্তর্গত ‘কুমারতালিক মণ্ডলে একখণ্ড ভূমিদান করিয়াছিলেন। সতট-পদ্মাবতী বিষয় পদ্মানদীর দুই তীরবর্তী প্রদেশকে বুঝাইতেছে, সন্দেহ নাই; পদ্মাবতীও নিঃসন্দেহে আবুল ফজল-ত্রিপুরা রাজমালা চৈতন্যজীবনী উল্লিখিত পদ্মাবতী, তাহাতেও সন্দেহের অবকাশ নাই। কুমারতালক মণ্ডলের উল্লেখ আরও লক্ষণীয়। কুমারতালক এবং বর্তমান গড়াই নদীর অদূরে ফরিদপুরের অন্তর্গত কুমারখালি দুইই কুমার নদীর ইঙ্গিত বহন করে তাহা নিঃসন্দেহ। বর্তমান কুমার বা কুমার নদী পদ্মা-উৎসারিত মাথাভাঙ্গা নদী হইতে বাহির হইয়া বর্তমান গড়াইর সঙ্গে মিলিত হইয়া বিভিন্ন অংশে গড়াই, মধুমতী, শিলা(ই)দহ, বালেশ্বর নাম লইয়া হরিণঘাটায় গিয়া সমূদ্র পড়িয়াছে।
