যমুনা
ত্ৰিবেণী-সংগমের অন্যতম নদী যমুনা, এ-কথা আগেই উল্লেখ করিয়াছি। এই যমুনা এখন খুজিয়া বাহির করা আয়াসসাধ্য, কিন্তু পঞ্চদশ শতকে বিপ্রদাসের কালে “যমুনা বিশাল অতি”। ত্ৰিবেণী-সপ্তগ্রামের বর্ণনাপ্রসঙ্গে বিপ্রদাস বলিতেছেন, “গঙ্গা আর সরস্বতী যমুনা বিশাল অতি, অধিষ্ঠান উমা মাহেশ্বরী”। রেনেলের নকশায় যমুনা অতি ক্ষীণা একটি রেখা মাত্ৰ।
গঙ্গার উত্তর প্রবাহ
গঙ্গা-ভাগীরথীর দক্ষিণ বা নিম্ন প্রবাহ ছাড়িয়া এইবার উত্তর প্রবাহের কথা একটু বলা যাইতে পারে। এ-সম্বন্ধে সাক্ষ্যপ্রমাণ অত্যন্ত কম; অনেকটা অনুমানের উপর নির্ভর করা ছাড়া উপায় নাই। প্রাচীন গৌড়ের প্রায় পঁচিশ মাইল দক্ষিণে এখন ভাগীরথী ও পদ্মা দ্বিধাবিভক্ত হইতেছে, কিন্তু প্রাচীন বাঙলায়, অন্তত সপ্তদশ শতকপূর্ব বাঙলায় গৌড়-লক্ষ্মণাবতী ছিল গঙ্গার পশ্চিম তীরে, এরূপ মনে করিবার কারণ আছে। বস্তুত, ডি ব্যারোস (১৫৫০) এবং গ্যাসটান্ডির (Gastaldi, ১৫৬১) নকশা দুটিতেই গৌড়ের (Gorij : গ্যাসটান্ডির নকশায় Gaur) অবস্থান গঙ্গা ভাগীরথীর পশ্চিম তীরে, এবং রাঢ় (জাও ডি ব্যারোসের নকশার Rara) দেশের উত্তরে স্বল্প উত্তর-পশ্চিমে। মুসলমান ঐতিহাসিকদের বিবরণ হইতেও মনে হয়, গৌড় ভাগীরথীর পশ্চিম তীরেই অবস্থিত ছিল। রাজমহল পার হইয়া গঙ্গা খুব সম্ভবত তখন খানিকটা উত্তর ও পূর্ব বাহিনী হইয়া গৌড়কে পশ্চিম বা ডাইনে রাখিয়া রাঢ় দেশের মধ্য দিয়া দক্ষিণবাহিনী হইত। বর্তমান কালিন্দী ও মহানন্দা খুব সম্ভব এই উত্তর ও পূর্ব প্রবাহ-পথের প্রাচীন স্মৃতি বহন করে। যাহা হউক, ইহা হইতেছে আনুমানিক দ্বাদশ-ত্ৰয়োদশ হইতে ষোড়শ শতকের কথা; কিন্তু সপ্তদশ শতকেই গঙ্গা-ভাগীরথী এইপথ পরিত্যাগ করিয়া বর্তমান পথ প্রবর্তন করিয়াছে। দ্বাদশ-এয়োদশ শতকেরও আগে গঙ্গা-ভাগীরথীর উত্তর-প্রবাহের প্রাচীনতর পথ বোধ হয় ছিল, এবং এ পথটি বর্তমান প্রবাহপথের পশ্চিমে। পূর্ণিয়ার দক্ষিণ সীমান্ত হইতে আরম্ভ করিয়া রাজমহল-সাঁওতাল পরগনা-ছোটনাগপুর-মানভূম-ধলভূমের নিম্নভূমি ঘেষিয়া দক্ষিণে সমুদ্র পর্যন্ত বিল ও নিম্ন জলাভূমিময় এক সুদীর্ঘ দক্ষিণবাহী রেখা চলিয়া গিয়াছে। এই রেখা এখনও বর্তমান। এই রেখাই গঙ্গা-ভাগীরথীর প্রাচীনতম প্রবাহপথের নিদেৰ্শক বলিয়া আমার ধারণা। ইহারই নিম্নতর প্রবাহে আমি ইতিপূর্বে দামোদর-সরস্বতী-রূপনারায়ণের কিয়দংশের প্রবাহপথের ইঙ্গিত করিয়াছি। এই সমগ্র প্রবাহপথ সম্বন্ধে আমার ধারণা যে নিছক কল্পনামাত্র নয় তাহা মৎস্যপুরাণোক্ত গঙ্গার প্রবাহপথের বর্ণনা হইতেই স্পষ্ট বুঝা যায়। মৎস্যপুরাণে আছে কৌশিক (৷রা বিহার) ও মগধ (দক্ষিণ-বিহার) পার হইয়া গঙ্গা বিন্ধ্যপর্বতের গাত্রে (রাজমহল-সাঁওতালভূম-ছোটনাগপুর-মানভূম-ধলভূম শৈলমূলে) প্রতিহত হইয়া ব্রহ্মোত্তর অর্থাৎ মোটামুটি উত্তর-রাঢ়, বঙ্গ এবং তাম্রলিপ্ত দেশের ভিতর দিয়া প্রবাহিত হইত। ভাগীরথীর পূর্বতীর বঙ্গে, পশ্চিম তীরে তাম্রলিপ্তি, উত্তরতর প্রবাহে উত্তর-রাঢ়।
গঙ্গা ভাগীরথীর প্রবাহপথের প্রাচীন ইতিহাস এখন এইভাবে নির্দেশ করা যাইতে পারে : ১. ঐতিহাসিক কালের সন্ধান সম্ভাব্য প্রাচীনতম পথ; পূর্ণিয়ার দক্ষিণে রাজমহল পার হইয়া গঙ্গা রাজমহল—সঁওতালভূমি-ছোটনাগপুর-মানভূম-ধলভূমের তলদেশ দিয়া সোজা দক্ষিণবাহিনী হইয়া সমুদ্রে পড়িত; এই প্রবাহেই ছিল অজয়, দামোদর এবং রূপনারায়ণের সংগম। এই তিনটি নদীই তখন নাতিদীর্ঘ। এবং এই প্রবাহেরই দক্ষিণতম সীমায় তাম্রলিপ্তি বন্দর; ২৭ ইহার পরের পর্যয়েই গঙ্গার পূর্বদিক যাত্রা শুরু হইয়াছে। রাজমহল হইতে গঙ্গা-ভাগীরথী। খুব সম্ভবত বর্তমান কালিন্দী ও মহানন্দার খাতে উত্তর ও পূর্ববাহিনী হইয়া গৌড়কে ডাইনে রাখিয়া পরে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমবাহিনী হইয়া সমুদ্রে পড়িয়াছে। কিন্তু এই প্রবাহ ১নং খাতের আরও পূর্বদিকে সরিয়া আসিয়াছে। তবে, তখনও দামোদর এবং রূপনারায়ণ-পত্ৰঘাটার জল ভাগীরথীতে পড়িতেছে এবং তাম্রলিপ্তি বন্দরও জীবন্ত। অর্থাৎ, এই পর্যায় অষ্টম শতকের আগেই; ৩, তৃতীয় পর্যায়েও গৌড় গঙ্গার পশ্চিম তীরে; কিন্তু তাম্রলিপ্তি বন্দর পরিত্যক্ত হইয়াছে, অর্থাৎ দামোদর-রূপনারায়ণ-পত্রিঘাটার এবং কিছুদিনের জন্য সরস্বতীরও জল লইয়া ভাগীরথীর যে পশ্চিমতর প্রবাহ তাহা পরিত্যক্ত হইয়াছে এবং কলিকাতা বেতড় পর্যন্ত ভাগীরথীর বর্তমান প্রবাহপথের এবং বেতড়ের দক্ষিণে আদিগঙ্গা পথের প্রবর্তন হইয়াছে। এই পথেরই পরিচয় বিপ্রদাস (১৪৯৫) হইতে আরম্ভ করিয়া ফান ডেন ব্রোক (১৬৬০), দ্য ল’ অভিল (de l’Auvile, 1752), এফ ডি হ্বিট (F. de Witt, 1726), ইজাক টিরিয়ান (Izaak Tirion, 1730), থর্নটন (Thornton) প্রমুখ সকলেরই নকশায় পাওয়া যাইতেছে। আলীবর্দীর সময়ে (অর্থাৎ মোটামুটি ১৭৫০) আদিগঙ্গা পরিত্যক্ত হওয়াতে বেতড়ের দক্ষিণে পুরাতন সরস্বতীর খাতে কী করিয়া ভাগীরথীকে প্রবাহিত করা হয়, তাহা তো আগেই বলিয়াছি। তাই বোধ হয়, রেনেলের নকশায় (১৭৬৪-৭০) আদিগঙ্গার কোনও চিহ্নই প্রায় নাই। কর্নেল টলি (Tolly) সাহেব এই খাতের খানিকটা অংশ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করিয়াছিলেন (১৭৮৫) : তাহার নামানুসারেই Tolly’s Nullah এবং Tolygunje যথাক্রমে এই খাত এবং বামতীরের পল্লীটির বর্তমান নামকরণ।
