সরস্বতী
এক শতাব্দী আগে, ষোড়শ শতকে জাও ডি ব্যারোসের নকশায় দেখিতেছি, সরস্বতীর একেবারে ভিন্নতর প্রবাহপথ। সপ্তগ্রামের (Satigam) নিকটেই সরস্বতীর উৎপত্তি, কিন্তু সপ্তগ্রাম হইতে সরস্বতী সোজা পশ্চিমবাহিনী হইয়া যুক্ত হইতেছে দামোদর-প্রবাহের সঙ্গে, বাকা দামোদর সংগমের নিকটেই। এই বাঁকা দামোদরের কথা বলিয়াছেন। সপ্তদশ শতকের (১৬৪০) কবি ক্ষেমানন্দ তাহার ‘মনসামঙ্গল’ কাব্যে সে কথা পরে উল্লেখ করিয়াছি। যাহাই হউক, দামোদর বর্ধমানের দক্ষিণে যেখান হইতে দক্ষিণবাহী হইয়াছে সেইখানে সরস্বতীর সঙ্গে তাহার সংযোগ-ইহাই জাও ডি ব্যারোসের নকশার ইঙ্গিত। আমার অনুমান, এই প্রবাহপথই গঙ্গা-ভাগীরথীর প্রাচীনতর প্রবাহপথ, এবং সরস্বতীর পথ ইহার নিন্ন অংশ মাত্র। তাম্রলিপ্ত হইতে এই পথে উজান বহিয়াই বাণিজ্যপোতগুলি পাটলিপুত্র-বারাণসী পর্যন্ত যাতায়াত করিত। এবং এই নদীতেই পশ্চিম দিকে ছোটনাগপুর-মানভূমের পাহাড় হইতে উৎসারিত হইয়া স্ব-স্বতন্ত্র অজয়, দামোদর, রূপনাৱায়ণ প্রভৃতি নদ তাহাদের জলস্রোত ঢলিয়া দিত।
অজয়, দামোদর, রূপনারায়ণ
ইহাই প্রাচীন বাঙলার গঙ্গা-ভাগীরথীর নিম্নতর প্রবাহ। এখনও ময়ূরাক্ষী, অজয়, দামোদর, রূপনারায়ণ, শিলাই, দ্বারকেশ্বর প্রভৃতি নদনদী ভাগীরথীতে জলধারা মেশায় সত্য, কিন্তু ইহাদের ভাগীরথীসংগমস্থান ভাগীরথীপ্রবাহপথের সঙ্গে সঙ্গে অনেক পূর্বদিকে সরিয়া আসিয়াছে; এবং ইহাদের বিশেষভাবে দামোদর এবং রূপনারায়ণের, প্রবাহপথও নিম্নপ্রবাহে ক্রমশ অধিকতর দক্ষিণবাহী হইয়াছে। বর্ধমানের দক্ষিণে দামোদরের প্রবাহপথের পরিবর্তন খুব বেশি হইয়াছে। ফান ডেন ব্রোকের নকশায় (১৬৬০) দেখা যায় বর্ধমানের দক্ষিণ-পথে দামোদরের একটি শাখা সোজা উত্তর পূর্ববাহী হইয়া আম্বোনা (Ambona)-কালনার কাছে ভাগীরথীতে পড়িতেছে। ক্ষমানন্দ বা ক্ষেমানন্দ দাসের (কেতকাদাসের) ‘মনসামঙ্গলে’ (১৬৪০ আনুমানিক) এই শাখাটিকেই বুঝি বলা হইয়াছে “বাঁকা দামোদর”। এই বাঁকা নদীর তীরে তীরে যে-সব স্থানের নাম কেতকাদাস-ক্ষমানন্দ করিয়াছেন তাহার তালিকা এই; কুঝাটি বা ওঝটি, গোবিন্দপুর, গঙ্গাপুর, দেপুর, নেয়াদা বা নর্মদাঘাট, কেজুয়া, আদমপুর, গোদাঘাট, কুকুরঘাটা, হ্রাসনহাটি, নারিকেলডাঙ্গ, বৈদ্যপুর ও গহরপুর; গহরপুরের পরেই বাঁকা দামোদর “গঙ্গার জলে মিলি”য়া গেল। দামোদরের দক্ষিণবাহী প্রবাহপথেই যে এক সময় সরস্বতীর প্রবাহপথ ছিল আমার এ অনুমান আগেই লিপিবদ্ধ করিয়াছি। জাও ডি ব্যারোসের নকশার ইঙ্গিত তাঁহাই। পরে সরস্বতী এই পথ পরিত্যাগ করিয়া সোজা দক্ষিণবাহী হইয়া রূপনারায়ণ-পত্ৰঘাটার প্রবাহপথে কিছুদিন প্রবাহিত হইত। বস্তুত রূপনারায়ণের নিম্নপ্রবাহ একদা-সরস্বতীরই প্রবাহপথ বলিয়া মনে হয়। যাহাই হউক অষ্টম শতকের পরেই সরস্বতী-ভাগীরথীর এই প্রাচীনতর প্রবাহপথের মুখ এবং নিম্নতম প্রবাহ শুকাইয়া যায়, এবং তাহার ফলেই তাম্রলিপ্ত বন্দর পরিত্যক্ত হয়। অষ্টম হইতে চতুৰ্দশ শতকের মধ্যে কোনও সময় সরস্বতী তাহার প্রাচীনতর পথ পরিত্যাগ করিয়া বর্তমানের খাত প্রবর্তন করিয়া থাকিবে এবং সেই খাতেও কিছুদিন ভাগীরথীর প্রবলতর স্রোত চলাচল করিয়া থাকিবে। চতুর্দশ শতকের গোড়াতেই সপ্তগ্রামে মুসলমানদের অন্যতম রাজধানী প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল, এ তথ্য সুবিদিত। কিন্তু দশম শতক হইতে নিম্নপ্রবাহে কলিকাতা-বেতড় পর্যন্ত ভাগীরথীর বর্তমান পথই প্রধানতম পথ এবং আরও দক্ষিণে আদি গঙ্গার পথ। আলীবর্দীর সময়ে আদিগঙ্গা পরিত্যক্ত হইয়া মধ্যযুগের সরস্বতীর পরিত্যক্ত পথেই গঙ্গা-ভাগীরথীর পথ প্রবর্তিত হয়। বিপ্রদাসের চাঁদ সদাগর ত্রিবেণীর পরেই সরস্বতীতীরে সপ্তগ্রামের সুদীর্ঘ বর্ণনা দিয়াছেন। ১৪৭৫ খ্ৰীষ্টাব্দে সপ্তগ্রাম সমৃদ্ধিশালী বন্দর-নগর, তাহার বর্ণনাই তাহা প্রমাণ করিতেছে। কিন্তু সপ্তগ্রাম ছাড়িয়া চাঁদ সওদাগর সরস্বতীর পথে আর অগ্রসর হইতেছেন না; তিনি বর্তমান ভাগীরথীর প্রবাহে ফিরিয়া আসিতেছেন; কারণ, সপ্তগ্রামের পরেই উল্লেখ পাইতেছি কুমারহাট এবং হুগলীর। মনে হয় ১৪৯৫ খ্ৰীষ্টাব্দেই সরস্বতীর পথে বেশিদূর আর অগ্রসর হওয়া যাইতেছে না, এবং সেই পথে বৃহৎ বাণিজ্যতরী চলাচল বন্ধ হইয়া গিয়াছে। ১৭৬০ খ্ৰীষ্টাব্দে দেখিতেছি। ফান ডেন ব্রোকের নকশায় Olegli বা হুগলী খুব ফাপিয়া উঠিয়াছে; তখনও Tripeni (ত্রিবেণী), Coatgam (সাতগা) বিদ্যমান, কিন্তু উভয়েই মুমূর্ষ। ইহাই ইতিহাসগত। কারণ আগরপাড়া (Agrapara), বরাহনগর (Bernagar) ইত্যাদির উল্লেখ ব্যারোসের নকশাতে দেখিতেছি (১৫৫০); তাহার নকশায় কিন্তু হুগলীর উল্লেখ নাই। ১৫৬৫ খ্ৰীষ্টাব্দে ফ্রেডরিক সাহেব স্পষ্ট বলিতেছেন, বাতোর (Bator) বা বেতড়ের উত্তরে সরস্বতীর প্রবাহ অত্যন্ত অগভীর হইয়া পড়িয়াছে, সেইজন্য ছোট ছোট জাহাজও যাওয়া আসা করিতে পারে না। নিশ্চয়ই এই কারণে পর্তুগীজেরা ১৫৮০ খ্ৰীষ্টাব্দে সপ্তগ্রামের পরিবর্তে হুগলীতেই তাহাদের বাণিজ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিল। ইহার পর ১৬৬০ খ্ৰীষ্টাব্দে ফান ডেন ব্রোক Olegi খুব মোটা মোটা অক্ষরে উল্লেখ করিবেন তাহা মোটেই আশ্চর্য নয়!
