প্রাচীন রাঢ়ের, বিশেষভাবে পূর্বোক্ত নদনদীগুলির তীরে তীরে নানা জায়গায় তাম্রাশ্মীয়-নবাশ্মীয় পর্বের নানা প্রত্ন-নিদর্শন পাওয়া গেছে, কিন্তু পাণ্ডুরাজার ঢিবির উৎখননই এই সব আবিষ্কারের সূচনায়। বস্তুত, এই ঢিবিই বাঙালীর আদি ইতিহাসের কুঞ্চিকা। এই কারণেই এই উৎখননের বিবরণ একটু সবিস্তারেই বলতে হলো।
এই উৎখনন-বিবরণের পরই বলতে হয় বোলপুর সন্নিহিত কোপাই-তীরবর্তী মহিষদল গ্রামে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগের উৎখননের কথা। এখানকার প্রথম স্তর একান্তই তাম্রাশ্মীয়। পাণ্ডুরাজার ঢিবিতে যেমন, এখানেও সেই মাটির আস্তরণযুক্ত নলখাগড়ার দেয়ালওয়ালা ঘরবাড়ির ধ্বংসাবশেষ, পাথরের ধারালো ফলার যন্ত্রপাতি, তামার তৈরী চ্যাপ্টা cell, কৃষ্ণ-লোহিত মৃৎপাত্রের ভগ্নাবশেষ, লাল মৃৎপাত্রের টুকরো, নালিযুক্ত জলপাত্র। তা ছাড়া উল্লেখ্য হচ্ছে, এখানে পাওয়া গেছে বেশ কিছু পরিমাণে পোড়া ধান-চালের অঙ্গার। তেজস্ক্রিয় অঙ্গর পরীক্ষায় এই স্তরের তারিখ নির্ণত হয়েছে খ্ৰীষ্টপূর্ব ১৩৮০ থেকে ৮৫৫’র ভেতর। দ্বিতীয় স্তরেও একই ধরনের মৃৎপাত্র নিদর্শন, তবে এই স্তরের পাত্রগুলির প্রকৃতি একটু স্থূল। কিন্তু এই স্তরের বিশিষ্ট লক্ষণ হচ্ছে লোহার আবির্ভাব। এই স্তরেও তেজস্ক্রিয় অঙ্গার পরীক্ষা হয়েছে; তারিখ পাওয়া গেছে খ্ৰীষ্টপূর্ব মোটামুটি ৭০০।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব সংস্থা অজয়-কুন্নুর-কোপাইর অববাহিকার, নানা প্রত্নস্থানে প্রচুর প্রত্নানুসন্ধান করেছেন। বসন্তপুর, রাজার ডাঙ্গা, গোস্বামীখণ্ড, মঙ্গলকোট, গঙ্গাডাঙ্গা, কীর্ণহার, চণ্ডীদাস-নানুর, বেলুটি, সুপুর, মন্দিরা, শালখানা, সুরথরাজার ঢিবি, যশপুর প্রভৃতি নানা জায়গায় প্রত্নানুসন্ধানে যা পাওয়া গেছে তা প্রায় সবই তাম্রাশ্মীয় পর্বের এবং মোটামুটি পাণ্ডুরাজার টিবি ও মহিষদলের সাংস্কৃতিক জীবনের সমর্থক। বস্তুত, সন্দেহের কোনও কারণ নেই যে, এই অঞ্চলেই ইতিহাসের তাম্রাশ্মীয় পর্বের বাঙালী বসতিস্থাপন করে বাস্তু তৈরী করে শস্যোৎপাদন, পশুপালনে এবং সমাজগঠনে প্রথম অভ্যস্ত হয়েছিল।
১৯৭৪-এ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব-সংস্থা বর্ধমান শহর থেকে ২৮/২৯ কিলোমিটার উত্তরে বড়বেলুন গ্রামের বানেশ্বরডাঙ্গায় কিছু প্রত্নোৎখনন করেছিলেন। এই খননেরও প্রথম ও দ্বিতীয় স্তরে তাম্রাশ্মীয় পর্বের বাস্তব সভ্যতার নানা নিদর্শন পাওয়া গেছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ডক্টর শ্রীমতী অমিতা রায়ের সৌজন্যে এবং পরেশচন্দ্রের অনুগ্রহে পরেশচন্দ্রেরই রচিত এই খননের একটি সংক্ষিপ্ত (অপ্রকাশিত) বিবরণ আমার দেখার সুযোগ হয়েছে। তাতে দেখতে পাচ্ছি, এখানে প্রাপ্ত নানা আকৃতি-প্রকৃতির মৃৎপাত্রাবশেষ প্রাচুর্য যেন পাণ্ডুরাজার ঢিবির চেয়েও বেশি। ক্ষুদ্রাশ্মীয় যন্ত্রপাতির ভগ্নাংশ, হাড় ও তামার তৈরী দ্রব্যাদি এবং ঘরবাড়ির ধবংসাবশেষও পাওয়া গেছে, যেমন পাওয়া গেছে এই পর্বে পাণ্ডুরাজার টিবি ও মহিষদলে। কিছু কিছু অভিজ্ঞান থেকে মনে হয়, এই পর্বে এখানকার মানুষ ধান চাষ করতো, মাছ এবং পশু শিকারও করতো; প্রচুর মাছ ও পশুর কাটা ও হাড় পাওয়া গেছে এই প্রত্নস্থানের প্রথম দুই স্তরেই। তৃতীয় স্তরে পাওয়া গেছে লোহা ব্যবহারের কিছু অভিজ্ঞান | চতুর্থ স্তরে ঐতিহাসিক পর্ব শুরু হয়ে গেছে।
১৯৭৫-৭৬-এ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ডক্টর অমিতা রায়-এর নেতৃত্বে এক বিস্তৃত প্রত্নানুসন্ধানাভিযান চালিয়েছিলেন ময়ূরাক্ষী-বক্রেশ্বর ও অজয়-কুন্নুর-দামোদরের অববাহিকার নানা অঞ্চলে। আমার প্রাক্তন ছাত্রী অমিতা রায় এই অভিযানের যে-প্রতিবেদন রচনা করেছেন তার একটি প্রতিলিপি তিনি আমায় ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের প্রাচীন রাঢ়ের বিস্তৃত অংশে বাঙালীর আদি-ইতিহাসের চেহারাটা কী ছিল তার একটা মোটামুটি সামগ্রিক পরিচয় এ-যাবৎ অপ্রকাশিত এই প্রতিবেদনটিতে পাওয়া যায়।
পাণ্ডুরাজার ঢিবি, বানেশ্বরভাঙ্গা, মহিষদল, ভরতপুর ও অন্যান্য প্রত্নস্থান থেকে আদি-ইতিহাসের যে-চিত্র দৃষ্টিগোচর, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিযানের আবিষ্কৃত প্রত্নবস্তু সমস্তই সে-চিত্রকে আরও স্ফুটতর করেছে। তবে, এ অভিযান থেকে মনে হচ্ছে, ময়ূরাক্ষী বক্রেশ্বর-কোপাই-অজয়-কুকুর-দামোদরবিধৌত রাঢ়দেশেও তাম্রাশ্মীয় সংস্কৃতির বিস্তার সর্বত্র সমান নয়। ময়ূরাক্ষী-বক্রেশ্বরের উপর দিকের প্রবাহে, অর্থাৎ বীরভূম জেলার উত্তর-পশ্চিমাংশে এ সংস্কৃতির বিস্তার অপেক্ষাকৃত কম, মধ্য ও দক্ষিণাংশে বেশি, এবং পূর্বদিকে, অর্থাৎ বক্রেশ্বর-অজয়-দামোদরের সংযোগ স্থলের দিকে এগিয়ে গেলে মনে হয়, তাম্রাশ্মীয় পর্বের লোকেরা যেন ক্রমশ সেইদিকেই বিস্তৃত হতে থাকে। যাইহোক, এ বিষয়ে কোনও সংশয় নেই যে, তাম্রাশ্মীয় সংস্কৃতির কেন্দ্র ছিল এই ময়ূরাক্ষী-বক্রেশ্বর-অজয়-কুমুর-দামোদরের অববাহিকা অঞ্চল। এই উর্বর, শস্যপ্রসূ অঞ্চলের সঙ্গে জলপথে ও স্থলপথে দেশের ও বিদেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ ছিল, এ সম্বন্ধেও সন্দেহ নেই, এবং এই কারণেই এই অঞ্চলে এতগুলি তাম্রাশ্মীয় প্রত্নস্থান ইতস্তত প্রকীর্ণ। এই অঞ্চলে নবাশ্মীয় celts অনেকগুলির প্রত্নস্থান থেকেই পাওয়া গেছে, কিন্তু নবাশ্মীয় প্রাথমিক কৃষি-সংস্কৃতি থেকে কী করে তাম্রাশ্মীয় পর্বের বিবর্তিত বিস্তৃত কৃষি-সংস্কৃতির উদ্ভব হলো তার কোনও প্রত্নতাত্ত্বিক অভিজ্ঞান আজও আমাদের জানা নেই। পাণ্ডুরাজার ঢিবির প্ৰথম স্তরের প্রত্নবস্তুর মধ্যেও এ সম্বন্ধে যা অভিজ্ঞান পাওয়া যায়, তা খুব স্পষ্ট ও পরিষ্কার নয়; সেখানে নবাশ্মীয় ও তাম্রাশ্মীয় অভিজ্ঞান এমনভাবে মিশে আছে যে, তা থেকে সুস্পষ্ট কোনও ধারণা করা যায় না |
