এই উৎখননের তৃতীয় স্তরে বাস্তব সংস্কৃতির যে সব উপাদান উপকরণ পাওয়া গেছে তা মোটামুটি দ্বিতীয় স্তরেরই মতো। বস্তুত, আমার দৃষ্টিতে দ্বিতীয় ও তথাকথিত তৃতীয় স্তরে ভেদ কিছু আছে, এমন মনে হয় না। জলনালীযুক্ত মৃৎজলপাত্র, একপদী মৃৎভাণ্ড, নানা আকৃতি-প্রকৃতির চিত্রিত ও নকশাযুক্ত মৃৎপাত্রের ভগ্নাবশেষ, লোহিত ও কৃষ্ণ-লোহিত মৃৎপাত্রের ভাঙ্গা টুকরো, তামার তৈরী অলংকারাদি এবং প্রচুর ক্ষুদ্রাশ্মীয় যন্ত্রপাতিও পাওয়া গেছে। তা ছাড়া পাওয়া গেছে পশুর হাড় বা শিং-এর তৈরী কিছু যন্ত্র, কিছুটা বড় সূচ জাতীয়। এ ধরনের সূচ দ্বিতীয় স্তরেও কিছু পাওয়া গেছে; কিন্তু এই তৃতীয় স্তরে এমন সংখ্যায় পাওয়া গেছে যাতে সন্দেহ হয়, এখানে এ ধরনের যন্ত্র-নির্মাণের ছোটখাটাে একটা কারখানাই বুঝি বা ছিল। পোড়ামাটির তৈরী একটি নারীমূর্তির দেহের কিয়দংশ এবং দুটি বিজাতীয় পুরুষ-মূর্তির মাথাও পাওয়া গেছে এই স্তর থেকেই। রান্নার উনুনের নিদর্শনও আছে। কিন্তু তৃতীয় স্তরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও অর্থবহ আবিষ্কার হচ্ছে একদিকে মসৃণ তীক্ষাগ্র নবাশ্মীয় কয়েকটি cells এবং অন্যদিকে লোহার তৈরী ছোট কয়েকটি ফলা ও তীক্ষাগ্র সূচ। খুব তুচ্ছ পরিমাণে হলেও এই স্তরে লোহার এই ব্যবহার একটু বিস্ময়কর, বোধ হয়, সন্দেহজনক। এই তৃতীয় স্তরেই অনেকটা জায়গা জুড়ে প্রচুর ছাই-এর চাপ উৎখনকদের গোচরে এসেছে। এ থেকে তারা অনুমান করেছেন, কোনও এক সময়ে বড় একটা অগ্নিকাণ্ডে এখানকার অনেক ঘরবাড়ি পুড়ে গিয়েছিল; ছাইয়ের চাপ সেই অগ্নিদাহের। বিস্ময়ের কথা এই যে, এই ছাই-এর চাপের উপরই পাওয়া গেছে আরও প্রচুর লোহার তৈরী যন্ত্রপাতি এবং তার সঙ্গে সঙ্গেই পাওয়া যাচ্ছে একেবারে নূতন ধরনের মৃৎপাত্রশিল্পের প্রচুর নিদর্শন, যা সাধারণত পাওয়া যায় ৬০০–২৫০ খ্ৰীষ্টপূর্ব কালের ভূগর্ভ স্তরে। কোনও কোনও বিশেষজ্ঞ মনে করেন, অগ্নিদাহের পর জায়গাটি পরিত্যক্ত হয়েছিল; পরে ৬০০-২৫০ খ্ৰীষ্টপূর্ব তারিখের ভেতর কোনও নূতন আগন্তুকেরা এখানে এসে বসবাস শুরু করেন; মৃৎপাত্রের ভগ্নাবশেষগুলি তাদেরই সংস্কৃতির পরিচায়ক। কিন্তু লোহার যন্ত্রপাতি ও অস্ত্রশস্ত্র যা তৃতীয় স্তরে পাওয়া গেছে তা নিয়ে এ ধরনের কোনও সন্দেহ নেই, অন্তত উৎখনকদের মনে; তাদের দৃঢ় ধারণা, খ্ৰীষ্টপূর্ব আনুমানিক ১০০০ বৎসরের কাছাকাছি, তৃতীয় স্তরে একই সঙ্গে ক্ষুদ্রাশ্মীয় যন্ত্রপাতি, তামার অলংকারাদি এবং লোহার যন্ত্রপাতি ও অস্ত্রশস্ত্র একই সঙ্গে ব্যবহৃত হতো। উল্লেখ প্রয়োজন যে, লোহার অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যে পাওয়া গেছে বাটসহ তীক্ষ্ণমূখ একটি ছোট তরোয়াল, নাতিক্ষুদ্র তীরের শিরাগ্র এবং একটি নাতিক্ষুদ্র bar celt | ব্যক্তিগতভাবে আমি এ সম্বন্ধে উৎখনকদের মতামতে গভীর সন্দিহান। আমার ধারণা, তৃতীয় স্তরের লৌহ-অভিজ্ঞান যা কিছু সমস্তই কিছুটা পরবর্তী কালের; নূতন ধরনের মৃৎপাত্র নিয়ে যে সব নূতন আগন্তুক এসেছিল এখানে নূতন বসতি স্থাপন করতে তারাই নিয়ে এসেছিল লোহার ব্যবহার, লোহার যন্ত্রপাতি, লোহার অস্ত্রশস্ত্র। এবং এ ব্যাপারটা খ্ৰীষ্টপূর্ব ৭০০ শতকের আগে ঘটেছিল বলে একেবারেই আমার মনে হয় না।
আমার সন্দেহের প্রথম কারণ, পাণ্ডুরাজার ঢিবির উৎখননের চতুর্থ স্তরে লোহার তৈরী কোনও যন্ত্রপাতি, কোনও অস্ত্রশস্ত্ৰ-নিদর্শনের সন্ধান পাওয়া যায়নি, যা, উৎখনকের যুক্তিতে, পাওয়া উচিত ছিল। অন্তত পরেশচন্দ্রের বিবরণে তার কোনও উল্লেখ নেই। তৃতীয় স্তরে লোহা ব্যবহারের প্রচলন থাকলে চতুর্থ স্তরে তার অভিজ্ঞান আরও অনেক বেশি থাকবার কথা; বস্তুত তা নেই। সন্দেহের দ্বিতীয় কারণ, ভারতবর্ষে, বিশেষ করে উত্তর ভারতে লোহার ব্যবহারের সূচনা ও বিস্তৃতির দীর্ঘ ইতিহাস এবং অন্যদিকে মানব-সংস্কৃতির বিকাশে লোহা-ব্যবহারের প্রভাব ও প্রতিপত্তির ইতিহাস। এই উভয় ইতিহাসের আলোচনার স্থান এই গ্রন্থের পরিশিষ্ট্রের পরিমিত সীমার মধ্যে সম্ভব নয়; হয়ত প্রয়োজনও নেই। শুধু এটুকু বলাই বোধ হয় যথেষ্ট যে, পশ্চিম এশিয়া থেকে শুরু করে লোহার ব্যবহার তক্ষশীলা ভেদ করে (খ্ৰীষ্টপূর্ব আনুমানিক ১১০০/১০০০), পশ্চিম যুক্ত-প্রদেশের আত্রাঞ্জিখেরা হয়ে (আনুমানিক ৯০০), বিহার ছুয়ে (আনুমানিক ৮০০/৭০০) রাঢ়দেশে পৌছুতে আনুমানিক খ্ৰীষ্টপূর্ব ৭০০’র আগে হবার কথা নয়। অবশ্য আমি অবহিত আছি যে, ছোটনাগপুর অঞ্চলে আকরিক লৌহবালুকা থেকে লোহা গলাবার আদিম একটা পদ্ধতি স্থানীয় আদিম অধিবাসীদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। কিন্তু এই ঢিবির তৃতীয় স্তরে পাওয়া লৌহ যন্ত্রগুলির লোহা এই আদিম পদ্ধতির লোহা বলে মনে হয় না। আমার ভুল হতে পারে, কিন্তু এই স্তরে লোহা ব্যবহারের যে তারিখ (খ্ৰীষ্টপূর্ব ১০০০) পরেশচন্দ্র ধার্য করতে চান সে সম্বন্ধে আমার সন্দেহ রয়ে গেল। আমার সন্দেহের তৃতীয় কারণ, বোলপুর সন্নিহিত মহিষদলে লোহা ব্যবহারের তারিখ; তেজস্ক্রিয়-অঙ্গারক পরীক্ষায় এখানকার যে তারিখ নির্ণীত হয়েছে তা খ্ৰীষ্টপূর্ব ৭০০’র আগে নয়।
যাই হোক, পাণ্ডুরাজার ঢিবির চতুর্থ স্তরের উৎখনন বিবরণ পড়ে আশঙ্কা হয়, এখানকার ভূমিস্তর একাধিকবার বেশ আবর্তিত হয়েছে; কখন হয়েছে বলা কঠিন; এই স্তরের দুই পর্যায়ে যে সব প্রত্নবস্তু পাওয়া গেছে তা একই সংস্কৃতির লক্ষণে চিহ্নিত, এমন মনে হয় না। ত্রিকোণাকৃতি পোড়ামাটির বাটি, সাধারণ মৃৎভাণ্ড, লাল রঙের মৃৎপাত্র, মুদ্রিত অথবা খোদিত নানা নকশাযুক্ত মৃৎভাণ্ড, জলের ঝাঁঝরি, কয়েকটি পোড়ামটির পশু ও স্ফীতবক্ষ নারীমূর্তি, সুবিন্যস্ত একসারি মাছ ও তার উপর তির্যক রেখায় খোদাই করা একটি মৃৎভাণ্ড প্রভৃতির ভগ্নাবশেষ এই স্তর থেকে আহত হয়েছে। এ সমস্তই অল্পবিস্তর পরিচিত ঐতিহাসিক কালের; এই সব বস্তু আদি ইতিহাসের লক্ষণে চিহ্নিত নয়, এবং সে-ঐতিহাসিক কাল মোটামুটি খ্ৰীষ্টপূর্ব ৫০০ থেকে ৩০০/২৫০ পর্যন্ত বিস্তৃত। চতুর্থ স্তরের একটি গর্তে কালো steatite পাথরের একটি গোল শীলমোহর পাওয়া গেছে; এই প্রত্নদ্রব্যটি নিঃসন্দেহে মূল্যবান। শীলমোহরটির উপর তিনভাগে বিভক্ত তিনটি উচ্চাবচ (relief) চিত্র যার বিষয় উদ্ধার করতে আমি অপারগ। পরেশচন্দ্র এই চিত্রগুলির একটা বর্ণনা দিয়েছেন; সে-বর্ণনা আমি ছবির সঙ্গে ঠিক মেলাতে পারছিনে। জনৈক ইংরেজ প্রত্নতাত্ত্বিক বলেছেন, শীলমোহরটির উৎস প্রাচীন মিনোয়া (Minoan) সংস্কৃতি। এ উৎস আমি দেখতে পাচ্ছিনে, সখেদে তা স্বীকার করছি। এই শীলমোহরটির এবং একটি মৃৎফলকের অভিজ্ঞান, তমলুকে প্রাপ্ত কয়েকটি মৃৎভাণ্ডের ভগ্নাবশেষ,চব্বিশ পরগণা জেলার হরিনারায়ণপুর ও চন্দ্রকেতুগড়ে প্রাপ্ত কয়েকটি শীলমোহর ও মৃৎপাত্রের ভগ্নাবশেষের মধ্যে পরেশচন্দ্র প্রাচীন ক্রিটিয় (cretan) ও মিশরীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির লক্ষণ লক্ষ করেছেন এবং তা থেকে অনুমান করেছেন, পাণ্ডুরাজার ঢিবির এবং বাঙালীর আদি-ইতিহাসের সংস্কৃতি ও জীবনচর্য প্রধানত ব্যবসা-বাণিজ্য নির্ভর ছিল এবং সে-ব্যবসাবাণিজ্য বৈদেশিক, ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলির সঙ্গে। এ অনুমান যথার্থ কি অযথার্থ, তা বলা আমার পক্ষে আপাতত কঠিন, যেহেতু আমি পরেশচন্দ্র কথিত সাদৃশ্যগুলি সম্বন্ধে কিছুটা সন্দিহান, এবং এই অনুমিত সাদৃশ্য ছাড়া এ পর্বে এ ধরনের বিস্তৃত বৈদেশিক বাণিজ্যের অন্য কোনও প্রমাণ এখনও দেখতে পাচ্ছিনে।
