তাম্রাশ্মীয় পর্বের প্রধান লক্ষণ যে কৃষ্ণ-লোহিত মৃৎপাত্র, অমিতা রায়-এর অভিযানের পর এ সম্বন্ধে আর সন্দেহের অবকাশ নেই। তবে, এই ধরনের মৃৎপাত্রের বিস্তৃতি এ অঞ্চলের সর্বত্র সমান নয়। যা হোক, তার এ অনুমান হয়ত যথার্থ যে, তাম্রাশ্মীয় এই সংস্কৃতিই গামা-সমাজ সংঘটন ও উন্নততর, বিস্তৃততর কৃষিকর্মের দ্যোতক। কোনও কোনও বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই সংস্কৃতির সঙ্গে নাড়ীর যোগ ছিল গাঙ্গেয় ভারত, মধ্যভারত ও রাজস্থানের তালাশ্মীয় সংস্কৃতির। কিন্তু, এমনও তো হতে পারে যে, এই যোগাযোগটা ঘটেছিল গাঙ্গেয় ভারতের মাধ্যমে নয়, ওড়িশার মাধ্যমে। এই প্রসঙ্গে অমিতা রায় আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন কিছু কিছু ক্ষুদ্রাশ্মীয় যন্ত্রপাতি এবং কৃষ্ণ-লোহিত মৃৎপাত্রের ভগ্নাবশেষের প্রতি, যা পাওয়া গেছে বীরভূম-বর্ধমানে নয়, পাওয়া গেছে কংসাবতী-বিধৌত মেদিনীপুর-ধাকুড়া-পুরুলিয়ায়, অর্থাৎ যার ইঙ্গিত ওড়িশামুখী।
মহিষদল-উৎখননের প্রথম স্তরে তামার তৈরী ভাঙা একটি কুড়োল মতো জিনিস পাওয়া গেছে। ঠিক এই ধরনের তামার তৈরী কুড়ালোপম প্রত্নবস্তু কিছু কুড়িয়ে পাওয়া গেছে মেদিনীপুর-ধাকুড়া-পুরুলিয়ার নানা প্রত্নস্থান থেকে। ইতিহাসের আদিপর্বে এই অঞ্চলে তামার তৈরী যন্ত্র, অস্ত্র প্রভৃতির ব্যবহার প্রচলিত হয়েছিল, সন্দেহ নেই, কিন্তু এর পূর্বাপর – কী, এই বিশিষ্ট ধাতুশিল্পটির কী স্থান ছিল এই অঞ্চলের সমসাময়িক জীবনে, সে সম্বন্ধে কোনও ধারণা করবার উপায় এখনও নেই।
অমিতা রায়-এর অভিযান-প্রতিবেদন থেকে একটি তথ্য যেন কিছুটা স্পষ্টতর হয়ে ধরা পড়েছে। দেখা যাচ্ছে, ময়ূরাক্ষী-বক্রেশ্বর-অজয় অঞ্চলে তাম্রাশ্মীয় পর্বের এবং লোহা ব্যবহারকারী লোকদের পর নিরবচ্ছিন্ন জনবসতি আর যেন নেই। যে কারণেই হোক, এ অঞ্চল থেকে মানুষ যেন অন্যত্র সরে গেছে। কিন্তু অজয়-কুনুর-দামোদর- ভাগীরথী অঞ্চলের আদি-ঐতিহাসিক চিত্রটা যেন বেশ অন্য প্রকারের। এ অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান লোহার যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে বেশ একটু লক্ষণীয় বৈষয়িক সমৃদ্ধি যেন দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। পাণ্ডুরাজার ঢিবির তৃতীয় স্তরেই তা কিছুটা দেখা গেছে, কিন্তু তা স্পষ্টতর হয়েছে অজয়-কুমুর-ভাগীরথীর সংযোগস্থলের প্রত্নস্থানগুলিতে। এ অঞ্চলে দেখা যাচ্ছে, লৌহ-ব্যবহার-চিহ্নিত সমৃদ্ধ জনবসতি নিরবচ্ছিন্নতায় ঐতিহাসিক কালে এসে মিশে গেছে। খ্ৰীষ্টপূর্ব আনুমানিক ৩০০ নাগাদ এই অঞ্চল যে সমসাময়িক উত্তর-ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে এ সম্বন্ধে সন্দেহের আর কোনও অবকাশ নেই। যে সব প্রত্নবস্তু এ অঞ্চলের প্রত্নস্থানগুলিতে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া গেছে, যেমন, উত্তর-ভারতীয় কৃষ্ণচিক্কণ মৃৎপাত্রের ভগ্নাবশেষ, নানা চিহ্নে মুদ্রিত মুদ্রা, ছোটবড় bead ও অন্যান্য শিল্পদ্রব্য, তার ভেতরই সে-সাক্ষ্য নিহিত। বস্তুত, খ্ৰীষ্টপূর্ব মোটামুটি ৩০০ থেকে শুরু করে খ্ৰীষ্ট-পরবর্তী ২০০ বৎসরের মধ্যে পূর্ব বীরভূম (যেমন, কোটাসুর গ্রাম) থেকে শুরু করে সমুদ্রশায়ী মেদিনীপুর, (যেমন, তাম্রলিপ্ত বা তমলুক), নিম্নগাঙ্গেয় ২৪ পরগণা (যেমন, চন্দ্রকেতুগড়), ভাগীরথীঘৃত মুর্শিদাবাদ (যেমন, চিরুটি), গাঙ্গেয় উত্তরবঙ্গ (যেমন, মহাস্থান গড়) পর্যন্ত যে একটি বিস্তৃত সমৃদ্ধ সমাজ-জীবন ও সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল তার প্রচুর প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ গত ২৫/৩০ বৎসরের মধ্যে আহৃত হয়েছে, কিছু উৎখননের ফলে, অধিকাংশ প্রত্নানুসন্ধানের ফলে। কোটাসুর, চন্দ্রকেতুগড় ও মহাস্থানে প্রাপ্ত আরোপিত অলংকরণযুক্ত পোড়ামাটির শিল্পদ্রব্য, অজয় কুন্নুর-ভাগীরথীর ব-দ্বীপ অঞ্চলে এবং নিম্নগাঙ্গেয় ২৪ পরগণা, মেদিনীপুর, মুর্শিদাবাদ ও পূর্ব-বীরভূমের বহু প্রত্নস্থলে প্রচুর পরিমাণে প্রাপ্ত উত্তর-ভারতীয় কৃষ্ণচিকণ মৃৎপাত্রের ভগ্নাবশেষ, চিহ্নমুদ্রিত মুদ্রা, ঢালাই করা তাম্রমুদ্রা, পোড়ামাটির ঝাঝরা, ধূসর মৃৎপাত্রের টুকরো, নানা রকমের পোড়ামাটির নরনারী ও পশুমূর্তি, খেলনা, কুণ্ডলীকৃত নকশাযুক্ত মৃৎপাত্র প্রভৃতি প্রত্নদ্রব্যের মধ্যেই সে প্রমাণ সোচ্চারে বিদ্যমান। এ অনুমানে বোধ হয় বাধা নেই যে, এই সমৃদ্ধ সমাজ-জীবন ও সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল প্রধানত মৌর্যযুগে বঙ্গদেশ মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রভাব-পরিধির অন্তর্ভুক্ত হবার সময় থেকে এবং এর মূলে ছিল ক্রমবর্ধমান লৌহ-যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং ধানচাষের বিস্তার। এর প্রস্তুতি-পর্বের শুরু অবশ্য তাম্রাশ্মীয় পর্ব থেকেই, বিশেষভাবে লোহার যন্ত্রপাতির প্রচলন (খ্ৰীষ্টপূর্ব আনুমানিক ৭০০/৬০০) থেকে।
০৩. দেশ-পরিচয়
০১. যুক্তি – দেশ-পরিচয়
দেশ ও জাতির বাস্তব ইতিহাস জানিতে হইলে সর্বাগ্রে দেশের যথার্থ ভৌগোলিক পরিচয় লওয়া প্ৰয়োজন। মহাকালের কোনও রূপ নাই; কাল অনন্ত, অব্যয় এবং অরূপ। দেশের আধারকে আশ্রয় করিয়া, অসংখ্য বস্তু ও প্রাণীরূপ পাত্রকে অবলম্বন করিয়া। তবে সেই কাল নিজের সীমায়িত রূপ প্রকাশ করে। দেশ এবং পাত্র নিরপেক্ষ কালের কোনও রূপের কল্পনা অ্যাবসট্রাক্ট কল্পনা মাত্র, তাহার বস্তুগত ভিত্তি নাই; দেশ এবং পাত্র, অর্থাৎ দেশান্তৰ্গত বস্তু ও প্রাণী-জগৎ কালকে তাহার বস্তুপ্রতিষ্ঠা দান করে। তখনই সম্ভব হয়। কালের বাস্তব স্বরূপ উপলব্ধি করা। তাই, ইতিহাসের অর্থই হইতেছে কাল, দেশ ও পাত্রের যথাযথ বর্ণনা এবং এই ত্রয়ীর সম্মিলিত রূপ ও তারহার ব্যঞ্জনাকে প্রকাশ করা। পূর্ববর্তী অধ্যায়ে এই ত্রয়ীর তৃতীয়টির, অর্থাৎ পাত্রের (দেশান্তর্গত প্রাণিজগতের মধ্যে যে শ্রেষ্ঠ প্রাণী সেই মানুষের) আদি কথা বলিয়াছি। এই মানুষকে লইয়াই তো মানুষের গর্ব, এবং মনুষ্যসমাজের কথাই ইতিহাসের কথা; কাজেই পরবর্তী সকল অধ্যায়ে তাহাদের কথাই সবটুকু জুড়িয়া থাকিবে। বর্তমান অধ্যায়ে ত্রয়ীর দ্বিতীয়টির অর্থাৎ দেশের বাস্তব বিবরণের কথা বলিবার চেষ্টা করা যাইতে পারে; কারণ দেশই হইতেছে মানুষের ইতিহাসের ভিত্তি ও পরিবেশ। দেশের বস্তুগত রূপ বহুল পরিমাণে দেশান্তর্গত মানুষের সমাজ, রাষ্ট্র, সাধনা-সংস্কৃতি, আহার-বিহার, বসন-ব্যাসন, ধ্যান-ধারণা ইত্যাদি নির্ণয় করে। কাজেই, বাংলাদেশের মানুষের কর্মকৃতির কথা বলিবার আগে বাঙলাদেশের বস্তুগত ভৌগোলিক পরিচয় লওয়া অযৌক্তিক হইবে না।
০২. সীমানির্দেশ – দেশ-পরিচয়
কোনও স্থান বা দেশের রাষ্ট্ৰীয় সীমা এবং উহার ভৌগোলিক বা প্রাকৃতিক সীমা সর্বত্র সকল সময় এক না-ও হইতে পারে রাষ্ট্ৰীয় সীমা পরিবর্তনশীল; রাষ্ট্ৰীয় ক্ষমতার প্রসার ও সংকোচনের সঙ্গে সঙ্গে, কিংবা অন্য কোনও কারণে রাষ্ট্রসীমা প্রসারিত ও সংকুচিত হইতে পারে, প্রায়শ হইয়াও থাকে , প্রাচীনকালে হইতো, এখনও হয়। প্রাকৃতিক সীমা, যেমন নদনদী, পাহাড়পর্বত, সমুদ্র ইত্যাদি কখনও কখনও রাষ্ট্ৰসীমা নির্ধারণ করে সন্দেহ নাই; প্রাচীন ইতিহাসে তাঁহাই ছিল সাধারণ নিয়ম। কিন্তু, বর্তমান কালে রাষ্ট্রসীমা অনেক সময়ই প্রাকৃতিক সীমাকে অবজ্ঞা করিয়া চলে; বর্তমান যন্ত্র-বিজ্ঞান রাষ্ট্রকে সেই অবজ্ঞার শক্তি দিয়াছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, বর্তমান বাঙলাদেশের পশ্চিম ও পশ্চিম-দক্ষিণ সীমা কোনও প্রাকৃতিক সীমাদ্বারা নির্দিষ্ট হয় নাই। কোথায় যে বাঙলাদেশের শেষ, কোথায় যে বিহারের আরম্ভ, কোথায় যে মেদিনীপুর শেষ হইয়া ওডিশার আরম্ভ, কোথায় যে ত্রিপুরা, মৈমনসিং জেলা শেষ হইয়া শ্ৰীহট্ট জেলার আরম্ভ, বলা কঠিন। ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক সীমা প্রধানত নির্নীত হয়। ভূ-প্রকৃতিগত সীমাদ্বারা, এবং তাহা সাধারণত অপরিবর্তনীয়। দ্বিতীয়ত এক-জনত্বদ্বারা, এবং তৃতীয়ত ভাষার একত্ব দ্বারা। সাধারণত দেখা যায়, বিশিষ্ট প্রাকৃতিক সীমার আবেষ্টনীর মধ্যেই জাতি ও ভাষার একত্ব-বৈশিষ্ট্য গড়িয়া উঠে। অন্তত, প্রাচীন বাঙলায় তাহাই হইয়াছিল। জন ও ভাষার ওই একত্ব-বৈশিষ্ট্য বাঙলাদেশে নিঃসন্দেহে একদিনে গড়িয়া উঠে নাই। প্রাগৈতিহাসিক কাল হইতে আরম্ভ করিয়া এই একত্ব দানা বাঁধিতে বাঁধিতে একেবারে প্রাচীনযুগের শেষাশেষি আসিয়া পৌঁছিয়াছে; বস্তুত, মধ্যযুগের আগে তাহার পূর্ণ প্রকাশ দেখা যায় নাই। বাঙলার বিভিন্ন জনপদরাষ্ট্র তাহাদের প্রাচীন পুণ্ড্র-গৌড়-সুহ্ম-রাঢ়-তাম্রলিপ্তি-সমতট-বঙ্গ-বঙ্গাল-হরিকেল ইত্যাদির ভৌগোলিক ও রাষ্ট্ৰীয় স্বাতন্ত্র্য বিলুপ্ত করিয়া এক অখণ্ড ভৌগোলিক ও রাষ্ট্ৰীয় ঐক্য-সম্বন্ধে যখন আবদ্ধ হইল, যখন বিভিন্ন স্বতন্ত্র নাম পরিহার করিয়া এক বঙ্গ বা বাঙলা নামে অভিহিত হইতে আরম্ভ করিল, তখন বাঙলার ইতিহাসের প্রথম পর্ব অতিক্রান্ত হইয়া গিয়াছে। প্রাচ্যদেশীয় প্রাকৃত ও মাগধী প্রাকৃত হইতে স্বাতন্ত্র্য লাভ করিয়া, অপভ্রংশ পর্যায় হইতে মুক্তিলাভ করিয়া বাঙলা ভাষা যখন তাহার যথার্থ আদিম রূপ প্রকাশ করিল, তখন আদিপর্বশেষ না হইলেও প্রায় শেষ হইতে চলিয়াছে। এই জন ও ভাষার একত্ব-বৈশিষ্ট্য লইয়াই বর্তমান বাঙলাদেশ, এবং সেই দেশ চতুর্দিকে বিশিষ্ট ভৌগোলিক বা প্রাকৃতিক সীমাদ্বারা বেষ্টিত। বর্তমান রাষ্ট্রসীমা এই প্রাকৃতিক ইঙ্গিত অনুসরণ করে নাই সত্য, কিন্তু ঐতিহাসিককে সেই ইঙ্গিতই মানিয়া চলিতে হয়, তাহাই ইতিহাসের নির্দেশ।
