স্ফটিক ও অন্যান্য পাথরের তৈরী এই ধরনের ক্ষুদ্রাষ্ট্ৰীয় কারুযন্ত্র পূর্বোক্ত পুরাভূমি নানা জায়গা থেকেই পাওয়া গেছে, কোথাও পরবর্তী কালের কৃষ্ণ-লোহিত মৃৎপাত্রের ভগ্নাবশেষের সঙ্গে, কোথাও বা কোনও অনুষঙ্গ ছাড়াই। ক্ষুদ্রাশ্মীয় কারুষন্ত্রের ব্যবহার মানব ইতিহাসের নবাশ্মীয় পর্বের সঙ্গেই জড়িত, সন্দেহ নেই, কিন্তু টুকরোটাকরা এই সব বিচ্ছিন্ন কিছু কিছু তথ্যাদি ছাড়া পশ্চিমবঙ্গে এখনও এমন কিছু আবিষ্কৃত হয়নি, একমাত্র বীরভানপুর গ্রাম ছাড়া, যার ফলে আমরা প্রাগৈতিহাসিক নবাশ্মীয় পর্বের বঙ্গীয় সমাজের মোটামুটি একটা ধারণা করতে পারি। এ পর্বের যা যা বিশিষ্ট লক্ষণ, যেমন শস্যোৎপাদনের প্রবর্তনা, বন্যপশুকে গৃহপালিত পশুতে পরিণত করা, ইত্যাদির কোনও প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না।
আপেক্ষিক ভাবে সুস্পষ্ট ও কতকটা সুসংবদ্ধ রূপ প্রথম ধরা যায়, প্রত্নতাত্ত্বিকেরা যাকে বলেন তাম্রশীয় পর্ব বা পর্যায়, সেই কাল থেকে। পশ্চিমবঙ্গে সেই পর্বের সূচনা খ্ৰীষ্টপূর্ব প্রায় ১৩০০-১২০০ বৎসর থেকে। নবাশ্মীয় পর্বের যে দু’চারটি লক্ষণ ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলি এই তাম্রাশ্মীয় পর্বেও লক্ষ্য করা যায়; সেজন্য কোনও কোনও প্রত্নতাত্ত্বিক এই পর্বকে নবাশ্মীয়-তাম্রাশ্মীয় পর্ব বা পর্যায় বলেও চিহ্নিত করে থাকেন। এই হচ্ছে মানুষের সামাজিক ইতিহাসের সেই পর্ব যখন সে যন্ত্রপাতি নির্মাণে শুধু পাথর মাত্র আর ব্যবহার করছেনা সঙ্গে সঙ্গে এবং ক্রমবর্ধমান পরিমাণে ধাতুও ব্যবহার করছে, এবং সে ধাতু হচ্ছে তাম্র বা তামা এবং মিশ্রধাতু ব্রোঞ্জ। এই দুই ধাতুনির্মিত যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলেই সমাজের একটি নূতন রূপ দেখা দেয়; সে রূপের প্রধান লক্ষণ চাষের প্রবর্তনা, স্থায়ী বসতি ও বাস্তুনির্মাণ, গৃহপশু পালন, সমাজ-নির্মাণ। এই নুতন রূপটি প্রথম ধরা পড়েছে পাণ্ডুরাজার ঢিবি উৎখননের ফলে। এই রূপই বাঙালীর আদি-ইতিহাসের রূপ।
পাণ্ডুরাজার ঢিবির উৎখননের পদ্ধতি নিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিকদের মধ্যে কিছু মতবিরোধ যে আছে, সে সম্বন্ধে আমি একেবারে অনবহিত নয়। তবু, আমার জ্ঞানবুদ্ধি অনুযায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আমার ধারণা হয়েছে, এই উৎখনন নির্গত প্রত্নতথ্যাদি মোটামুটি নির্ভরযোগ্য এবং তার আশ্রয়ে বাঙালীর আদি-ইতিহাসের একটা কাঠামো দাড় করানো কঠিন নয়।
যে কোনও প্রত্নোৎখননের নিম্নতম স্তর প্রাসঙ্গিক প্রত্নেতিহাসের আদিতম বা প্রথম স্তর। পাণ্ডুরাজার ঢিবির এই আদিতম স্তর বালিময় পলিমাটির স্তর। এই স্তরের উপর পাওয়া গেছে নানা প্রকারের মৃৎপাত্রের ভগ্নাবশেষের টুকরোটাকরা যার ভেতর উল্লেখযোগ্য হচ্ছে কৃষ্ণ-লোহিত মৃৎপাত্রের ছোট ছোট টুকরো। সবচেয়ে উল্লেখ্য হচ্ছে, নরকঙ্কাল সমেত কয়েকটি শবসমাধি। এই কঙ্কালগুলির উপরাধ পাওয়া যায়নি, কিন্তু শবদেহগুলি যে পূর্বশিরে শায়িত ছিল, এ সম্বন্ধে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। এই স্তরটি ঢাকা পড়েছে একটি শ্বেত-হরিদ্রাভ পাতলা বালির আস্তরণে; উৎখনক অনুমান করেছেন, আস্তরণটি অজয়ের কোনও প্লাবনের পলিমাটি। আস্তরণটির উপর পাওয়া গেছে কিছু কাঠকয়লার টুকরো, কয়েকটি ক্ষুদ্রাশ্মের তৈরী কারুযন্ত্র এবং শ্বেতাভ চিত্ররেখাঙ্কিত ঘনধুসর রঙের মৃৎপাত্রের কয়েকটি টুকরো।
পাণ্ডুরাজার ঢিবির দ্বিতীয় স্তরে আহৃত প্রত্নবস্তু ও প্রত্নতথ্য অর্থবহ। এ স্তরে যে সব প্রত্নবস্তু পাওয়া গেছে তার মধ্যে আছে নানা আকৃতি-প্রকৃতির ক্ষুদ্রাশীয় কারুযন্ত্র, চিত্রিত এবং ছিদ্রকৃত লাল ও কৃষ্ণ-লোহিত মৃৎপাত্রের ভগ্নাবশেষ, জলনালীযুক্ত মৃৎজলপাত্র, তামার তৈরী নানা অলংকার (তার ভেতর আছে পেচানো সর্পিল বালা, আংটি ও কাজল লাগাবার কাঠি) তামার মাছ ধরবার বঁড়শি ইত্যাদি। মৃৎপাত্রগুলির রং, গড়ন ও অলংকরণ, এগুলির আকৃতি-প্রকৃতি এবং তামার ব্যবহার, এসব লক্ষণ সন্দেহের কোনও অবকাশ রাখে না যে, রাঢ়ের এই অঞ্চল তখন মানব-সভ্যতার তাম্রাশ্মীয় পর্বে উন্নীত হয়েছে। তার আরও প্রমাণ পাওয়া যায় এই স্তরে বাস্তুনির্মাণের যে নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে তার ভেতর। সরলরেখায় সুবিন্যস্ত অনেকগুলি গৃহতল এখানে গোচর হয়েছে; এই গৃহতল তৈরী করা হয়েছে গেরুয়া কাকর মাটি দিয়ে এবং তার উপর খুঁটি পোতার গর্তের চিহ্ন সুস্পষ্ট। একটি সরু বাধানো গলির কিছুটা চিহ্ন এখনও আছে; আর আছে একটি বিস্তৃত শব-সমাধিস্থান যেখানে পূর্ব-পশ্চিমশায়ী করে মৃতদেহ সমাধিস্থ করা হতো। এই স্তরেই পাওয়া গেছে কিছু মাটির বড় বড় তাল যার উপর ছাপ লেগে আছে নলখাগড়ার, আর পাওয়া গেছে পোড়ামাটির টালির বড় বড় টুকরো। এ অনুমানে বাধা নেই যে, এই স্তরের মানুষ যে-ঘরে বাস করতো তার বেড়া ছিল নলখাগড়ার যার উপর থাকতো মাটির আস্তরণ, আর চাল ছিল পোড়ামাটির টালির। উত্তর ভারতবর্ষের অন্যত্র তাম্রাশ্মীয় যুগের যে সব লক্ষণ দেখা যায়, এই স্তরেও তার বেশ কিছু লক্ষণ স্পষ্টতই ধরা পড়েছে।
যে শব-সমাধিস্থানটির কথা এই মাত্র বলা হলো তার সমস্তর থেকে কুড়িয়ে নেয়া এক খণ্ড কাঠকয়লা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বীক্ষণাগারে পাঠানো হয়েছিল, তেজস্ক্রিয়অঙ্গারক পরীক্ষা করে তার তারিখ নির্ণয়ের জন্য। সে পরীক্ষায় যে-তারিখ নির্ণত হয়েছে তা হচ্ছে খ্ৰীষ্টপূর্ব ১২১০±১২০, অর্থাৎ ১২০ বৎসর কম বা বেশি খ্ৰীষ্টপূর্ব ১০১২ বৎসর। আদি-ইতিহাসের যুক্তিতেও এ তারিখ সম্বন্ধে আপত্তি করবার কিছু নেই। এর অর্থ এই যে, পাণ্ডুরাজার ঢিবির আদিস্তরের তারিখ আনুমানিক আরও দুশ বছর আগে, অর্থাৎ খ্ৰীষ্টপূর্ব ১২৫০/১২০০। অনুমান করা চলে, এই অঞ্চলেই এই সময়ে মানুষের প্রথম সমাজ-রচনার সুষ্ঠু প্রকাশ এবং সংস্কৃতির পথে প্রথম পদক্ষেপ।
