প্রাচীন বঙ্গদেশেও এই জনদের কথাই লিখিত ইতিহাসের আদিতম পর্বে। বঙ্গাঃ, রাঢ়াঃ, সুহ্মাঃ, পুণ্ড্রাঃ এদের নিয়েই বাঙালীর ইতিহাসের কথা শুরু। এদের আগে ছিল কোন জনেরা, তা আমাদের জানা নেই; অনুমান করা যেতে পারে শবর ও নিষাদ জনেরা, কোল্প-ভিল্ল-কিরাত জনেরা। এদের কে কোন নরগোষ্ঠীর বা raceর, এ-প্রশ্নের উত্তর প্রাচীন কোনও সাক্ষ্য প্রমাণে নেই।
২. বাঙালীর প্রাক ও আদি ইতিহাস
[এই অনুচ্ছেদটি নাতিদীর্ঘ একটি অধ্যায় বলেও গণিত হতে পারতো, কিন্তু যেহেতু প্রাক ও আদি ইতিহাস ইতিহাসেরই গোড়ার কথা, সেই হেতু অনুচ্ছেদটিকে দ্বিতীয় অধ্যায়েই সংযোজন করা হলো। ]
মূল গ্রন্থটি যখন রচিত ও প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল তখন সৃজ্যমান বাঙালীর প্রাক ও আদি ইতিহাসের কোনও তথ্যই আমাদের জানা ছিল না বললেই চলে। গত পঁচিশ বৎসরে পশ্চিমবঙ্গ ও বাঙলাদেশে প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার যা হয়েছে তা গুণে ও পরিমাণে সুপ্রচুর। বাঙলাদেশের আবিষ্কার প্রধানত ঐতিহাসিক কাল সংক্রান্ত, এবং সে আবিষ্কারের ফলে পঞ্চম খ্ৰীষ্ট শতাব্দী থেকে শুরু করে ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত বাঙালীর ইতিহাসের প্রচুর নূতন তথ্য ও তার অর্থনির্দেশ আমাদের গোচরে এসেছে। এ গ্রন্থের এই পরিশিষ্টে যথাস্থানে তা উল্লিখিত হবে, অবশ্যই যথাসম্ভব সংক্ষিপ্ততায়।
তবে বিস্ময়কর আবিষ্কার ঘটেছে পশ্চিম বঙ্গে, এবং সে আবিষ্কার অনুসরণ করে নূতন নূতন অনুসন্ধান আজও চলছে। কিন্তু ইতিমধ্যেই যা পাঠকসাধারণের এবং বিশেষজ্ঞদের গোচরে এসেছে তার যোগফল বাঙালীর ইতিহাসে নূতন একটি অধ্যায় রচনার সূচনা করেছে, এমন একটি অধ্যায় যার শুরু খ্ৰীষ্টপূর্ব একহাজার বৎসরেরও আগে এবং যাকে বাঙালীর বাস্তব ইতিহাসের প্রাক উষা অধ্যায় বলে অভিহিত করা যেতে পারে। এ অধ্যায় পরম্পরাগত শ্রুতির উপর প্রতিষ্ঠিত নয়, সাহিত্যধৃত অস্পষ্ট স্মৃতি বা কাহিনীর উপরও নয়; এ অধ্যায় প্রতিষ্ঠিত প্রাথমিক বাঙালী কৃষি-সমাজের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব উপাদান-উপকরণের উপর।
প্রাচীন রাঢ়দেশের কেন্দ্রভূমি বর্তমান বীরভূম ও বর্ধমান জেলা। এই দুই জেলার প্রাণপ্রবাহ ময়ূরাক্ষী-বক্রেশ্বর-কোপাই-অজয়-কুকুর-দামোদর নদনদীমালা। এই দুই জেলার সংলগ্ন সুবর্ণরেখা ও কংসাবতী বিধৌত মেদিনীপুর, বাকুড়া ও পুরুলিয়া। এই নদনদীগুলির প্রত্যেকটিরই উৎসস্থল বিন্ধা-শুক্তিমান কুলাচল দুটির পূর্বতম বিস্তৃতি ছোটনাগপুর-ওড়িশার নিম্নশায়ী পাহাড়গুলি। শীতে ও গ্রীষ্মে এই নদনদীগুলি শীর্ণকায়া, ক্ষীণধারা, কিন্তু বর্ষায় স্ফীতকায়া, খরস্রোতা, দুর্বার, ভীষণা ও দুকুলপ্লাবিনী। হাজার হাজার বছর ধরে প্রতি বর্ষার দুর্বার খরস্রোত ছোটনাগপুর-ওড়িশার পাহাড়গুলি থেকে ছোটবড় কাকর মেশানো লাল-গেরুয়া মাটি বয়ে এনে ঢেলে দিয়েছে নদীগুলির তীরে তীরে, প্লাবনের স্রোত সেই মাটিকে ঠেলে নিয়ে গেছে দূরে দূরান্তরে, কোথাও বেশি, কোথাও কম; যত দূরে তত কম, যত কাছে তত বেশি। বীরভূম, বর্ধমান, বাকুড়া, পুরুলিয়া, পশ্চিম মেদিনীপুরের ইহাই ভূপ্রকৃতি; পশ্চিম বঙ্গের ইহাই পুরাভূমি। এই ভূমি কঠিন, রুক্ষ, প্রান্তর জুড়ে কাকর-লালমাটির ঢেউ, কোথাও কোথাও ছোটবড় পাথর-স্তুপের উৎক্ষেপ। জৈন আচারঙ্গ সূত্রের একটি কাহিনীতে বলা হয়েছে, মহাবীর জিন এসেছিলেন রাঢ়দেশের কোনও এক অঞ্চলে, যে অঞ্চলের নাম বলা হয়েছে বজ্রভূমি। বর্ধমান-বীরভূম-বাঁকুড়া-পুরুলিয়ার ভূমি যথার্থতই বজ্রভূমি।
অথচ, কিছু কিছু অংশ বাদ দিলে এই বজ্রভূমি আজও উর্বরা, শস্যপ্ৰসূ। গত পনেরো-বিশ বৎসরের প্রত্নানুসন্ধান ও উৎখননের ফলে আমরা আজ যেন জেনেছি, এই ভূমির প্রাণদাত্রী নদনদীগুলির তীরে তীরেই বাঙালীর প্রাচীনতম সংস্কৃতির অভ্যুদয় ঘটেছিল, বাঙালীর চাষবাস, ধান্য শস্যোৎপাদন, ঘরবাড়ি নির্মাণ, জীবনোপায়ের নানা পথ। এ জানা সম্ভব হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের উদ্যোগে ও বিভাগীয় অধিকর্তা, আমার প্রাক্তন ছাত্রদের অন্যতম পরেশচন্দ্র দাশগুপ্তের কৃতিত্বে। উৎখননের যত দোষক্ৰটি থাকুক, তার বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যার সঙ্গে যতোমত-পার্থক্যই পণ্ডিতদের থাকুক, পরেশচন্দ্রই বাঙালীর ইতিহাসে এই নূতন অধ্যায় যোজনার প্রথম ও প্রধান নায়ক।
বীরভূম জেলার বোলপুর শহরের অদূরেই অজয়তীরবর্তী বনকাটি গ্রাম। প্রায় তারই সংলগ্ন ইলামবাজার, একটু দূরেই অধুনা বিখ্যাত পাণ্ডুরাজার টিবি। প্রত্নানুসন্ধানের ফলে এই বনকাটিতে আবিষ্কৃত হয়েছে প্রত্নাশ্মীয়পর্বসুলভ অশ্মীভূত কাঠের এবং স্ফটিকে তৈরী অনেক ছোটবড় কারুযন্ত্র। দামোদর নদের তীরে বীরভনপুর গ্রাম। এই গ্রামের একটি স্থানে উৎখননের ফলে অসংখ্য স্ফটিক ও অন্যান্য গুড়ো পাথরের তৈরী ক্ষুদ্রাশ্মীয় কারুযন্ত্র পাওয়া গেছে, তিনফুট মাটির নীচে। তারও নীচে নবাশ্মীয় পর্বের সমভূমিতে গোচর হয়েছে কয়েকটি গর্ত; গর্তগুলি যে বাশের বা কাঠের বা পাথরের খুঁটির তা সহজেই অনুমেয়। এ অনুমানেও বাধা নেই যে, খুঁটির উপর একটি চালও ছিল। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এখানে ক্ষুদ্রাষ্ট্ৰীয় যন্ত্রপাতি নির্মাণের একটি কারখানা ছিল। যাই হোক, প্রত্নানুসন্ধানের ফলে জানা গেছে যে, এই উৎখনিত স্থানটির আশে পাশে প্রায় এক বর্গমাইল জুড়ে একটি ক্ষুদ্রাশ্মীয়পর্বের প্রত্নস্থান বিস্তৃত।
