এই অধ্যায়ে আমি যাহা বলিতে চেষ্টা করিলাম, যে ভাবে অস্ফুট অপরিস্তুত ঐতিহাসিক উষাকালের রেখাচিত্র আঁকিতে, যে সব ইঙ্গিত দিতে চেষ্টা করিলাম, ঐতিহাসিকেরা সকল ক্ষেত্রে তাহা স্বীকার করিবেন, আমি তাহা আশা করি না। সুস্পষ্ট সুনির্দিষ্ট পাথুরে প্রমাণ না পাইলে সাধারণত ইতিহাসের দাবি মেটে না; অথচ যে প্রাগৈতিহাসিক কালের কাহিনী এই অধ্যায়ের বিষয়বস্তু সেই কালের ঐতিহাসিক-গ্রাহ্য প্রমাণ সুদুর্লভ। তবু, মানুষের জানিবার আকাঙক্ষা দুর্নিবার, সেই আগ্রহে মানুষ নূতন নূতন উপায় উদ্ভাবন করে; নরতত্ত্ব, জনতত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব এবং প্রাগৈতিহাসিক প্রত্নতত্ত্ব তাহা কয়েকটি উপায় মাত্র। এইসব উপায়ের সাহায্যে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরা এ পর্যন্ত যে সব নির্ধারণে পৌঁছিয়াছেন, তাহাই বিচার ও বিশ্লেষণ করিয়া, কিছু রাখিয়া কিছু ছাঁটিয়া, কিছু বাছিয়া, নানা ইঙ্গিতগুলি ফুটাইয়া আমার এই রেখাচিত্র। ঐতিহাসিক কালে বাঙলার ও বাঙালীর যে ইতিহাস আমাদের চোখের সম্মুখে উন্মুক্ত হয়, তাহার সকল তথ্য, সকল ইঙ্গিত, সকল ভাব-কল্পনা, ধ্যান-ধারণা, উপাদান-উপকরণ, আচার-অনুষ্ঠান, গতি-প্রকৃতি ইত্যাদি ঐতিহাসিক কালের তথ্য-প্রমাণের মধ্যে পাওয়া যায় না, সে তথ্য ও প্রমাণ ঐতিহাসিক কাল অতিক্রম করিয়া প্রাগৈতিহাসিক কালের মধ্যে বিস্তৃত। বাঙালীর ইতিহাস বলিতে বসিয়া সেইজন্য সেই অস্ফুট কাল সম্বন্ধে এই সুদীর্ঘ প্রস্তাবের অবতারণা করিতে হইল। শুধু প্রাচীন নয়, আজিকার বাঙালীরও এই ক্ষীণালোকদীপ্ত উষার ইতিহাস যতটুকু সাধ্য জানা প্রয়োজন। এই ইতিহাস বাদ দিলে বাঙালীর ইতিহাস সম্পূর্ণ হয় না; এই কারণেই আমি এমনভাবে এমন ইঙ্গিতে এই ইতিহাস উপস্থিত করিলাম যাহার ফলে বাঙালীর এবং বাঙলার জীবন-প্রবাহের মূল উৎস আমাদের হৃদয়মনের নিকটতর হইতে পারে। “আরম্ভের পূর্বেও আরম্ভ আছে। সন্ধ্যাবেলায় দীপ জ্বালার আগে সকালবেলায় সলতে পাকানো।” এই অধ্যায় সেই ‘সকালবেলায় সল্তে পাকানো।’
৯. সংযোজন – ইতিহাসের গোড়ার কথা
দ্বিতীয় অধ্যায় । ইতিহাসের গোড়ার কথা
সংযোজন
১. বাঙালীর ইতিহাসে নরগোষ্ঠী ও জন
ভারতবাসীর ও বাঙালীর নরগোষ্ঠীগত আলোচনা ইতিমধ্যে আর বেশি অগ্রসর হয়নি; বস্তুত পণ্ডিতদের মধ্যে এ বিষয়ে গবেষণা আলোচনা-বিশ্লেষণে উৎসাহ ও ঔৎসুক্যে যেন একটু ভাটা পড়েছে বলে মনে হয়। যা হোক, এ বিষয়ে যারা আরও জানতে আগ্রহী তারা শ্ৰীযুক্ত অতুল সুর রচিত ‘বাঙালীর নৃতাত্ত্বিক পরিচয়’ (জিজ্ঞাসা, কলকাতা, ১৯৭৭) বইখানা পড়তে পারেন। এই ছোট বইখানাতে সাম্প্রতিকতম জ্ঞাতব্য সমস্ত তথ্যই সুশৃঙ্খলায় সুবিন্যস্ত করা হয়েছে। প্রাসঙ্গিকভাবে এই লেখকের বই ‘বাঙলার সামাজিক ইতিহাস’ (কলকাতা, ১৯৭৬) বইখানাও পাঠকদের কাজে লাগতে পারে বলে আমার ধারণা।
নরগোষ্ঠীর প্রসঙ্গটি উত্থাপন করছি একটু অন্য কারণে। এ ব্যাপারে আমার চিন্তা বেশ কিছু দিন যাবৎ একটু অন্য খাতে বইছে, এবং আমারই মতো অনেকের, অন্তত র্যারা মানুষের সামাজিক ইতিহাস নিয়ে চিন্তা করেন, তাদের। Race অর্থাৎ নরগোষ্ঠী প্রাণীবাচক (zoological) শব্দ, সংস্কৃতিবাচক নয়। এ অর্থে বিশুদ্ধ কোনও ‘race’ বা নরগোষ্ঠীর কোথাও কিছু অস্তিত্ব কখনও ছিল এমন তথ্য কারও জানা নেই। রক্তের গুণাগুণের এবং কতকগুলো বিশেষ শারীরসাদৃশ্যর উপর নির্ভর করে নৃতাত্ত্বিকেরা পৃথিবীর যাবতীয় মানুষকে কয়েকটি বিভিন্ন নরগোষ্ঠীতে ভাগ করেছেন এবং বিভিন্ন পণ্ডিতেরা বিভিন্ন নামে তাদের চিহ্নিত করেছেন। বিশুদ্ধ ভূমধীয়, অ্যালপীয় বা আদি-অষ্ট্রেলয়েড় বা ভেড়িড় বা ইন্ডিডের কোথাও কেউ সাক্ষাৎ পেয়েছেন, এমন জানা নেই। নামকরণ ক্রিয়াটি যে সাদৃশ্যের তারতম্য-নির্ভর, তা সহজেই অনুমেয়, অর্থাৎ, যে সব মানবগোষ্ঠীর শারীর-পরিমিতি গণনা করা হয়েছে, বা রক্ত পরীক্ষা করা হয়েছে তারা সভ্য সমাজ থেকে যত দূরেই হোক, যত বন্য, যত আদিমই হোক না কেন, তাদের কারও মধ্যেই রক্তের অবিমিশ্র বিশুদ্ধতা তখন আর ছিল না, অল্পবিস্তর সংমিশ্রণ সর্বত্রই ঘটেছে। এই সংমিশ্রণই তারতম্যের হেতু। যা হোক, একথা স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, মানব সমাজে বিশুদ্ধ race-এর অস্তিত্ব একান্তই প্রকল্পিত (hypothetical); এর বাস্তব অস্তিত্ব কখনও কোথাও কিছু ছিল, এমন কোনো প্রমাণ নেই। দ্বিতীয়ত, নরগোষ্ঠীগত গবেষণা-আলোচনাদির সার্থকতা নিশ্চয়ই আছে, কারণ পৃথিবীর কোথায়, কোন সমাজে কোন নরগোষ্ঠীর কতটা বিস্তৃতি, কতটা প্রভাব তা ঐতিহাসিকের ও সমাজবিজ্ঞানীর জানা প্রয়োজন, দেশকালকৃত মানব-সমাজকে বোঝবার জন্যই। কিন্তু তার চেয়েও অনেক বেশি প্রয়োজন, কোথায় কখন কোন নরগোষ্ঠী বাস্তব, ব্যবহারিক ও সাংস্কৃতিক প্রয়োজন-পরিবেশের প্রভাবে কিভাবে বিবর্তিত ও পরিবর্তিত হয়ে নূতন রূপে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। প্রধানত এই রূপান্তরই নরগোষ্ঠী থেকে জন-এ রূপান্তর, race থেকে people-এ। এবং জন বা people-রচনার সূচনা থেকেই যথার্থ ইতিহাসের ভিত্তি রচনার সূত্রপাত।
জন সাংস্কৃতিক শব্দ, প্রাণীবাচক নয়। যে কোনও raceবা নরগোষ্ঠীর বেশ কিছু সংখ্যক লোক কোনও একটা স্থানে স্থিত হয় কোনও এক কালে; তখন সেই কাল ও স্থানের প্রয়োজন-পরিবেশ, ব্যবহারিক-প্রতিবেশিক রীতিপদ্ধতি ইত্যাদি অনুযায়ী বিশেষ এক জীবনচর্যায় তাদের অভ্যস্ত হতে হয়; কখনও কখনও নিজস্ব নরগোষ্ঠী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্যতর নরগোষ্ঠীর সম্মুখীনও হতে হয়, ক্রমে ক্রমে রক্ত ও ভাষার মিশ্রণও ঘটে। স্থান ও কালের সাংস্কৃতিক প্রভাবে নরগোষ্ঠী তখন জন-এ বা people এ বিবর্তিত-পরিবর্তিত হয়, নরগোষ্ঠীগত পার্থক্য তখন বিলুপ্ত হয়ে যায়। ভারতীয় ধ্যানধারণায় নরগোষ্ঠীর ধারণা নেই বললেই চলে, কিন্তু জন-এর ধ্যানধারণা অত্যন্ত স্পষ্ট ও প্রাচীন। প্রাচীন পুরাণ গ্রন্থে, বিশেষ ভাবে মার্কণ্ডেয় পুরাণে, ভারতবর্ষের জন-সমূহের একটি তালিকা আছে; হয়ত তালিকাটি সম্পূর্ণ নয়, কিন্তু সুদীর্ঘ। লক্ষণীয় এই যে, সর্বত্রই নামগুলি দেওয়া হয়েছে বহুবচনে, অর্থাৎ people অর্থে, যেমন মগধাঃ, অঙ্গাঃ ইত্যাদি। অঙ্গজন ও মগধজনের লোকেরা যেখানে বাস করেন সেই স্থানের নাম অঙ্গজনপদ, মগধ জনপদ। এই জন ও জনপদ রচনা ঋগ্বেদ রচনার কাল থেকেই, হয়ত তার আগে থেকেই দেখা দিয়েছিল, কিন্তু তার কোনও লিখিত প্রমাণ নেই।
