মহেন্-জো-দড়োর ধ্বংসাবশেষ হইতে মনে হয় সেখানকার লোকেরা মৃতদেহ কবরস্থ করিত, কেহ কেহ আবার খানিকটা পোড়াইয়া শুধু অস্থিগুলি কবরস্থ করিত।
অ্যাল্পো-দীনারায় নরগোষ্ঠীর মানস-সংস্কৃতি সম্বন্ধে কিছুই বলিবার উপায় নাই। তবে, মহেন-জো-দড়োর উপরিতম স্তরের ধ্বংসাবশেষ হইতে মনে হয়, ইহারা মৃতদেহ বা শব (এটি দ্রাবিড়গোষ্ঠীর শব্দ) আগে পোড়াইয়া ভস্মশেষ একটি পাত্রে রাখিয়া তাহা কবরস্থ করিত। আগেই বলিয়াছি, আর্যভাষী নর্ডিকেরা ইহাদের ভাষাজ্ঞাতি অ্যালপো-দীনারায় লোকদের প্রীতির চক্ষে তো দেখিত না, বরং ‘ব্রাত্য’ বা পতিত বলিয়া ঘৃণা করিত। এই ‘ব্রাত্য’রাও অন্যদিকে বৈদিক আর্যভাষীদের যাগযজ্ঞ, আচারানুষ্ঠান প্রভৃতিকে প্রীতির চক্ষে দেখিত না। এককথায় এই দুই গোষ্ঠীর মানস-সংস্কৃতি একেবারেই বিভিন্ন ছিল, এ অনুমান কতকটা নিঃসংশয়েই করা যায়।
ভারতীয়, তথা বাঙলাদেশের মানস-সংস্কৃতিতে মোঙ্গোলীয় ভোটত্ৰহ্ম বা চৈনিক বা অন্য কোনও নরগোষ্ঠীর স্পর্শ বিশেষ কিছু লাগে নাই। লাগিলেও তাহা এত ক্ষীণ যে, আজ আর তাহা ধরিবার কোনও উপায় নাই।
বাঙলাদেশে, শুধু বাঙলাদেশেই বা কেন, সমগ্র উত্তর ভারতেই আজ বিশুদ্ধ নিগ্রোবটু অবলুপ্ত; বহুদিন আগেই তাহারা কোথায় যে বিলীন হইয়া গিয়াছে আজ আর তাহা বুঝিবারও উপায় নাই।
অস্ট্রিক, মিশ্র অস্ট্রিক ও নেগ্ৰিটো; দ্রাবিড়, মিশ্র দ্রাবিড় ও অস্ট্রিক; মিশ্র নেগ্রিটো ও দ্রাবিড় এবং মিশ্র অস্ট্রিক-নেগ্রিটো-দ্রাবিড়, এইসব জনগণ, যখন উত্তর-ভারতের অনার্য জনরূপে নিজ মিশ্র ধর্ম ও সংস্কৃতি লইয়া বাস করিতেছে, যখন দেশ ছিল খণ্ড, ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত, এবং দেশে কোনও ঐক্য-বিধায়িনী কেন্দ্রাভিমুখী শক্তিও ছিল না— এমন সময়ে ধীরে ধীরে প্রচণ্ড শক্তিশালী, একান্তরূপে কৰ্মী, অপূর্ব কল্পনাশীল, disciplined বা শৃঙ্খলাসম্পন্ন, সুদৃঢ়রূপে সংঘবদ্ধ, গুণগ্রাহী কিন্তু আত্মসমাহিত, বাস্তবে সভ্যতায় কিঞ্চিৎ পশ্চাৎপদ অথচ নুতন বস্তু উপযোগী হইলে গ্রহণ করিতে সদা-চেষ্টিত, এমন আর্য [ভাষী] জাতি ভারতে দেখা দিল। আর্য ভাষীরা আসিয়া খণ্ড ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত ভারতকে এক ধর্মরাজ্যপাশে, এক ভাষা ও এক সংস্কৃতির গ্রন্থিতে বাঁধিয়া দিল। …ভারতবর্ষে তাঁহারা বৈদিকধর্ম ও দেবতাবাদ এবং বেদের কিছু কিছু মন্ত্র বা সুক্ত লইয়া আসিল; তাহারা আনিল তাঁহাদের নিজস্ব সংস্কৃতি; সেই সংস্কৃতিতে বাবিল ও আসুরীয় এবং পশ্চিম-এশিয়ার অন্য সভ্য (ভূমধ্য) নরগোষ্ঠীর প্রভাব যথেষ্ট পরিমাণে ছিল।
৮. মন্তব্য – ইতিহাসের গোড়ার কথা
দ্বিতীয় অধ্যায় । ইতিহাসের গোড়ার কথা
অষ্টম পরিচ্ছেদ – মন্তব্য
মন্তব্য
শতাব্দী পর শতাব্দীর বিরোধ-মিলনের মধ্য দিয়া এমন করিয়া ধীরে ধীরে ভারতবর্ষের বুকে আর্যভাষী আদি-নর্ডিকেরা এক সমন্বিত জন, ধর্ম, সভ্যতা ও সংস্কৃতি গড়িয়া তুলিল। সে জনের রক্তবিশুদ্ধতা আর রহিল না; তাহার রক্তে বিচিত্র রক্তধারার স্রোতধ্বনি রণিত হইতে লাগিল, কোথাও ক্ষীণ, কোথাও উচ্চগ্রামে। এই সমন্বিত জনের নাম ভারতীয় জন। সে ধর্মও আর বেদ-ব্ৰাহ্মণের ধর্ম রহিল না। তাহার মধ্যে বিভিন্ন বিচিত্র পূর্বতন ধর্মের আদর্শ, আচার, অনুষ্ঠান সব মিলিয়া মিশিয়া এক নূতন ধর্ম গড়িয়া উঠিল; তাহার নাম পৌরাণিক ব্রাহ্মণ্য ধর্ম। সে সভ্যতাও বৈদিক আর্যভাষীর সভ্যতা থাকিল না; বিচিত্র পূর্বতন সভ্যতার উপাদান উপকরণ আহরণ করিয়া তাহার এক নূতন রূপ ধীরে ধীরে পৃথিবীর দৃষ্টির সম্মুখে ফুটিয়া উঠিল। এই নূতন সমন্বিত সভ্যতার নাম ভারতীয় সভ্যতা। আর সেই সংস্কৃতিই কি বেদ-ব্ৰাহ্মণের সংস্কৃতি থাকিতে পারিল? তাহার মানসলোকে কত যে পূর্বতন জন ও সংস্কৃতির সৃষ্টি-পুরাণ, দেবতাবাদ, ভয়-বিশ্বাস, ভাব-কল্পনা, স্বভাব-প্রকৃতি, ইতিকাহিনী, ধ্যানধারণা আশ্রয়লাভ করিল তাহার ইয়ত্তা নাই। সকলকে আশ্রয় দিয়া, সকলের মধ্যে আশ্রয় পাইয়া, সকলকে আত্মসাৎ করিয়া, সকলের মধ্যে বিস্তৃত হইয়া এই সংস্কৃতিও এক নূতন সমন্বিত রূপ লাভ করিল; তাহার নাম ভারতীয় সংস্কৃতি। আজ আবার গত সাতশত বৎসর ধরিয়া আর এক বৃহৎ সমন্বয় চলিতেছে এবং তাহার ফলে আমাদের এই বৃহৎ দেশখণ্ডে আর এক নূতন জন, ধর্ম, সভ্যতা ও সংস্কৃতি রূপ লাভ করিতেছে।
এই সমন্বিত জন, ধর্ম, সভ্যতা এবং সংস্কৃতিও একটি চলমান প্রবাহ। এই প্রবাহ আজও চলিতেছে। পরবর্তী কালে ইতিহাসের আবর্তচক্রে বারবার নূতন নূতন জন, ধর্ম, সভ্যতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে বিচিত্ররূপে তাঁহাদের বিরোধ-মিলন ঘটিয়াছে, আজও ঘটিতেছে। ইহাই প্রাকৃতিক নিয়ম। চলমান প্রবাহ, বিরুদ্ধ প্রবাহ, সমন্বিতপ্রবাহ—ইহাই জীবনের গতিধর্ম। এই গতিধর্ম স্মৃতি ঐতিহ্যবহ; এই ধর্মই জীবনীশক্তি, প্রাণশক্তি। ভারতবর্ষের ইতিহাসে এই ধর্মের বিকাশের দিকে তাকাইয়া বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ভারতীয় কবির কণ্ঠে ধ্বনিত হইয়াছে;
রণধারা বাহি জয়গান গাহি উন্মাদ কলরবে
ভেদি মরুপথ গিরিপর্বত যারা এসেছিল সবে
তারা মোর মাঝে সবাই বিরাজে, কেহ নহে নহে দূর—
আমার শোণিতে রয়েছে ধ্বনিতে তারি বিচিত্র সুর।
যাহাই হউক, যে সমন্বিত জন, ধর্ম, সভ্যতা ও সংস্কৃতির কথা এইমাত্র বলিলাম, তাহার জন্মনীড় হইল উত্তর-ভারতের গাঙ্গেয় প্রদেশ। তাঁহাদের বাহন হইল আর্যভাষা। এই আর্যভাষাকে আশ্রয় করিয়া ধীরে ধীরে গাঙ্গেয় প্রদেশের ধর্ম, সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রবাহ বাঙলাদেশে প্রবাহিত হইতে আরম্ভ করে খ্ৰীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ-সপ্তম শতক হইতে। আদিমতম স্তরে, আদি-অষ্ট্রেলীয়, তারপর দীর্ঘমুণ্ড ভূমধ্য-নরগোষ্ঠী, গোলমুণ্ড অ্যালপো-দীনারায় নরগোষ্ঠী এবং সর্বশেষে উত্তর ভারতের গাঙ্গেয় প্রদেশের মিশ্র আদি-নর্ডিক নরগোষ্ঠীর ক্ষীণ ধারা— এই কয়েকটি ধারার মিলনে বাঙালী জনের সৃষ্টি। অ্যালপো-দীনারায় প্রবাহপূর্ব আদিম-বাঙালী মুখ্যত অনার্য; আর্য-প্রবাহ প্রথম আনিল অ্যালপো-দীনারীয় জাতিই। তারপর দ্বিতীয় প্রবাহ ক্ষীণ ধারায় আনিল আদি-নর্ডিকেরা, কিন্তু উত্তর ভারতের সেই প্রবাহ মিশ্রিত হইয়া গিয়াছিল। যাহাই হউক, উত্তর ভারতের মিশ্র আদি-নর্ডিকদের এবং কিয়ৎপরিমাণে অ্যালপো-দীনারীয়দের আর্যভাষাই সৃজ্যমান বাঙালী জনকে একটা নূতন মানসরূপ দান করিল; আদিম বাঙালীর আদি-অষ্ট্রেলীয় ও দ্রাবিড় মন ও প্রকৃতির উপর ব্রাত্য অ্যালপো-দীনারায় এবং মিশ্র আদি-নর্ডিক নরগোষ্ঠীর মন ও প্রকৃতির চন্দনানুলেপন পড়িল এবং তাহাই বাঙালীকে, বাঙালী চরিত্রকে একটা ফুটতর বৈশিষ্ট্য দান করিল। এই বিবর্তন-পরিবর্তন একদিনে হয় নাই, হাজার বৎসরেরও (খ্ৰীষ্টপূর্ব তাহা ষষ্ঠ-সপ্তম শতক হইতে খ্ৰীষ্টপরবর্তী ষষ্ঠ-সপ্তম শতক পর্যন্ত মোটামুটি) অধিককাল ধরিয়া তাহা চলিয়াছিল। কিন্তু সে তথ্য এবং তথ্যগত বিবরণ ইতিবৃত্তের কথা; এ অধ্যায়ে তাহার স্থান নাই।
