পাঠ-পঞ্জি
তাম্রলিপ্তে মৃৎশিল্প-নিদর্শন পাওয়া গেছে। প্রচুর। এই নিদর্শনগুলি প্রধানত আশুতোষ মুজিয়ুম, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব দপ্তরের সংগ্রহশালা এবং তাম্রলিপ্ত সংগ্রহশালায় রক্ষিত আছে। তাম্রলিপ্তের মৃৎশিল্প নিয়ে ছোট ছোট ইংরেজি ও বাঙলা নিবন্ধ এদিক-সেদিক কিছু কিছু প্রকাশিত হয়েছে, তাম্রলিপ্ত সংগ্রহশালা থেকে একটি প্রচার-পুস্তিকাও প্রকাশ করা হয়েছে, কিন্তু এই অতি মূল্যবান আবিষ্কার নিয়ে বিশদ আলোচনা আজও কিছু হয়নি, প্রামাণিক গ্ৰন্থও লেখা হয়নি। চন্দ্ৰকেতুগড়ের নিদর্শনও কিছু কম সুপ্রচুর নয়; সেগুলি রক্ষিত আছে প্রধানত আশুতোষ মুজিয়ুমে এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব-দপ্তরের সংগ্রহশালায়। এগুলো নিয়ে কিছু কিছু ইংরেজি বাঙলা নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে; তার ভেতর থেকে দু-তিনটি উল্লেখ করা যেতে পারে,
*RM, Dasgupta, P.C., “Early Terracottas from Chandraketugarh” in Lalit Kala (Historical), no. 6. October, 1959; Chakravorty, D. K. “Some inscribed Terracotta Sealings from Chandraketugarh” in Journal of the Numismatic Society of India, XXXIX, Parts।-l, 1977; Ray, Niharranjan, “Chandraketugarh, a Port-city of Bengal; its Art and Archaeology”, in Pushpanjali, an annual volume on Indian art and culture, Bombay, 1980.
ধাতব প্রতিমা-শিল্প
প্রস্তর-ভাস্কর্যের প্রচুর নিদর্শন ইতিমধ্যে প্রাচীন বাঙলার নানা স্থান থেকে আবিষ্কৃত হয়েছে, এখনও হচ্ছে। কিন্তু আগেই বলেছি, এ-সম্বন্ধে শিল্পরূপ ও রীতির দিক থেকে নূতন কিছু বলবার নেই। গ্ৰন্থশেষের চিত্ৰ-সংগ্রহে এই সব নূতন আবিষ্কারের অনেকগুলি নিদর্শনের ফটো-প্রতিলিপি মুদ্রিত হয়েছে এবং চিত্র-পরিচিতিতে সংক্ষিপ্ত পরিচয়ও দেওয়া হয়েছে। ধাতব মূর্তিশিল্প সম্বন্ধেও প্রায় একই উক্তি করা যেতে পারে।
তবে, ইতিমধ্যে ময়নামতীর ধ্বংসাবশেষ থেকে, চট্টগ্রাম জেলার ঝেওয়ারী গ্রাম থেকে এবং পশ্চিমবঙ্গের দু-একটি জায়গা থেকে বেশ কিছু ধাতব প্রতিমা-শিল্পের উল্লেখযোগ্য নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। এই নিদর্শনগুলির কথা কিছু বলতেই হয়।
ঝেওয়ারীর আবিষ্কার এ—গ্রন্থের প্রথম সংস্করণ প্রকাশের অনেক আগেই হয়েছিল; সে-সংস্করণের একাধিক জায়গায় তার উল্লেখও ছিল, কিন্তু ধাতব প্রতিমাগুলি সম্বন্ধে শিল্পকলা অধ্যায়ে বিশেষভাবে কিছু বলিনি। এখন দু-চার কথা বলা প্রয়োজন মনে করছি এবং সে-উদ্দেশে বর্তমান সংস্করণের চিত্ৰ-সংগ্রহে তিনটি নিদর্শনের প্রতিলিপি মুদ্রিত হচ্ছে। এই নিদর্শন তিনটিকে ঝেওগারীর শ্ৰেষ্ঠ তিনটি প্রতিনিধি বলে মনে করা যেতে পারে। এদের একটি সমপদস্থানে দণ্ডায়মান, অভয়মুদ্রালাঞ্ছিত বুদ্ধমূর্তি; দ্বিতীয়টি, লীলাসনোপবিষ্টা, মুকুট ও বিচিত্রীলংকারশোভিত, প্রসারিত দক্ষিণকরকমলে ধনভাণ্ড ও বামহস্তে শস্যশীর্ষধুতা মহাযান বৌদ্ধদেবী বসুধারা; এবং তৃতীয়টি ধ্যানাসনোপবিষ্ট, ভূমিস্পর্শমুদ্রালাঞ্ছিত বুদ্ধ। প্রথম ও দ্বিতীয়টি স্পষ্টতই দশম শতকীয় পূর্ব-ভারতীয় প্রস্তর-ভাস্কর্য শিল্পীরূপের ধাতব অনুবাদ। তৃতীয়টি একাদশ শতকে নির্মিত হয়েছিল বলে আমার অনুমান, কিন্তু সমকালীন পূর্বভারতীয় প্রস্তর বা ধাতব শিল্পের রূপের সঙ্গে এই মূক, আড়ষ্ট বুদ্ধ প্রতিমাটির সমগোত্রীয়তা ততটা আছে বলে যেন আমার মনে হয় না। যতটা আছে সমসাময়িক আরাকানী বৌদ্ধ প্রতিমাশিল্পের সঙ্গে। ঝেওয়ারীর প্রায় সব নিদর্শনই বৌদ্ধধর্মীয়, এবং অধিকাংশই একাদশ-দ্বাদশ শতকীয়; সন্দেহ নেই, সবই ছিল স্থানীয় কোনও বৌদ্ধ মন্দির-বিহারের সম্পত্তি। অনুমান হয়, এই মন্দির-বিহারের সঙ্গে সমসাময়িক আরাকানের বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলির একটা যোগাযোগ ছিল এবং সেই যোগাযোগের ফলেই একাদশ-দ্বাদশ শতকীয় ঝেওয়ারীর ধাতব শিল্পের সঙ্গে আরাকানী প্রতিমা শিল্পের কিছুটা আত্মীয়তা ঘটে থাকবে।
ময়নামতীর ধ্বংসাবশেষ থেকে বেশ কিছু ধাতব প্রতিমাশিল্প-নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে, তার ভেতর থেকে যে কয়েকটি নিদর্শনের প্রতিলিপি বর্তমান সংস্করণে ছাপা হচ্ছে সেগুলিকে ময়নামতীর ধাতব প্রতিমা শিল্পের প্রতিনিধি বলে মনে করা যেতে পারে। চিত্র-পরিচিতিতে নিদর্শনগুলির প্রতিমা-পরিচয় পাওয়া যাব; এখানে সংক্ষেপে শিল্পীরূপের কথা বলাই প্রাসঙ্গিক হবে। নিদর্শন ক’টি সবই নবম-দশকীয় পূর্বভারতীয় প্রস্তরশিল্পের প্রায় ধাতব অনুবাদ। শুধু তা-ই নয়, এ-গুলির সঙ্গে সমসাময়িক বিহারের, অর্থাৎ কুর্কিহার ও নালন্দার, বিশেষ ভাবে নালন্দার, ধাতব প্রতিমা শিল্পের সাদৃশ্য এত গভীর ও সর্বতোভদ্ৰ যে, কেউ যদি বলে এ-গুলি রচিত ও নির্মিত হয়েছিল নালন্দারই কর্মশালায় তা হলে তাকে খুব ভ্রান্ত বলা হয়ত যায় না। প্রমাণ কিছু দেওয়া কঠিন, প্রায় অসম্ভব বললেই চলে, তবু, আমার অনুমান, এই ছোট ছোট নিদর্শনগুলি নালন্দার কর্মশালায়ই নির্মিত হয়েছিল এবং সেখান থেকে ভক্ত বৌদ্ধ তীর্থযাত্রীরা এগুলি বহন করে নিয়ে গিয়েছিলেন ভবদেবী-মহাবিহারের মন্দিরে নিবেদন করুবার জন্য।
ধৰ্মকৰ্ম-অধ্যায়ের সংযোজনে বলেছি, নবম-দশম-একাদশ-দ্বাদশ শতকে উত্তর বর্ধমান, বীরভূম, বিশেষ ভাবে বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া অঞ্চলে জৈনধর্মের বেশ প্রসারলাভ ঘটেছিল। গত পঁচিশ-ত্রিশ বছরের ভেতর এ-ব্যাপারে প্রচুর প্রত্ন-প্রমাণ পাওয়া গেছে; তার ভেতর মন্দির ও প্রতিমা-প্রমাণও আছে, এমন কি ধাতব প্রতিমারও। তেমন একটি সুন্দর ধাতব প্রতিমাশিল্প-নিদর্শন বর্তমান সংস্করণের চিত্র-সংগ্রহে প্রকাশিত হচ্ছে। কায়োৎসর্গ ভঙ্গিতে দণ্ডায়মান, পাদপীঠে ঋষভলাঞ্ছিত, নগ্ন, জৈন তীর্থঙ্কর ঋষভনাথের এই প্রতিমাটি স্পষ্টতই নবম শতকীয় পূর্ব-ভারতীয় প্রতিমাশিল্পের একটি উজ্জ্বল নিদর্শন।
