পূর্ব-ভারতীয় ধাতব শিল্পের ইতিহাস, রূপ, রীতি ও আঙ্গিক সম্বন্ধে কালানুক্রমিক, ধারাবাহিক বিশ্লেষণ ও আলোচনা পাওয়া যাবে বর্তমান গ্রন্থকারের প্রকাশেমুখ সুবৃহৎ একটি গ্রন্থ (Eastern Indian Bronzes, Lalit Kalia Akademi, New Delhi)।
চিত্রশিল্প
এ—গ্রন্থের প্রথম সংস্করণের শিল্পকলা-অধ্যায়ে যখন লিখেছিলাম তখন মাত্র ২১টি চিত্রিত পাণ্ডুলিপি আমার জানা ছিল এবং তার উপর নির্ভর করেই চিত্রশিল্প সম্বন্ধে আমার যা বক্তব্য তা বলেছিলাম। সে-বক্তব্যে নূতন কিছু সংযোজনের প্রয়োজন আমি বোধ করছিনে, অর্থাৎ শিল্পরূপ ও রীতি সম্বন্ধে নূতন কথা বলবার মতো অর্থগৰ্ভ নূতন আবিষ্কার ইতিমধ্যে বিশেষ কিছু হয়নি। তবে, কিছুদিন আগে অধ্যাপক শ্ৰীসরাসীকুমার সরস্বতী প্রাচীন বাঙলার চিত্ৰকলা সম্বন্ধে একটি অতি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা ও প্রকাশ করছেন (“পালযুগের চিত্রকলা”, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলিকাতা, ১৯৭৮ : পূ: ১৮৮, ৪৫ রঙীন ও ১০ সাদাকালো চিত্র)। এ-গ্রন্থে গ্রন্থকার এই শিল্পের ইতিহাসের সুশৃঙ্খল একটি ধারাবাহিক বিস্তৃত বিবরণ দিয়েছেন, কালক্ৰম অনুসরণ করে; শিল্পীরীতি ও প্রতিমালক্ষ্মণও আলোচনা করেছেন, কিন্তু সবচেয়ে যা মূল্যবান তা হচ্ছে, প্রচুর নুতন তথ্যের সংবাদ তিনি বহন করে এনেছেন, এবং তার ভেতর অনেক তথ্য তার নিজেরই আবিষ্কার। র্যারা এ-বিষয়ে বিশেষভাবে উৎসাহী তারা তো গ্ৰন্থখানা পড়বেনই, কিন্তু সাধারণ ইতিহাস-পাঠকেরও গ্রন্থোক্ত নূতন তথ্যগুলো জানা উচিত।
গ্ৰন্থকার সর্বসুদ্ধ অনুনি ৬০ খানা চিত্রিত পুঁথির সংবাদ দিচ্ছেন এবং বলছেন, “এ ছাড়াও আছে কিছু সংখ্যক তারিখ-বিহীন চিত্র-সংযুক্ত নেপালী পুঁথি।” যাই হোক, সদ্যোক্ত এই ৬০ খানা চিত্ৰিত পুঁথিতে তিনি তিন ভাগে ভাগ করেছেন; ভাগ তিনটি এই:
১. তারিখ-সহ চিত্র সংযুক্ত পূর্ব-ভারতীয় পুঁথি (২৮)। তালিকাশেষে প্রত্যেকটি পুঁথির তারিখ সম্বন্ধে বিস্তৃত আলোচনা আছে।
২. তারিখ-বিহীন, চিত্র-সংযুক্ত পূর্ব-ভারতীয় পুঁথি (১৪)।
৩. তারিখ-সহ চিত্র-সংযুক্ত নেপালী পুঁথি (১৮)। এ-পুঁথিগুলি লিখিত ও চিত্রিত হয়েছিল নেপালে, কিন্তু সমসাময়িক নেপালে যে পুঁথিচিত্রশৈলী প্রচলিত ছিল তা স্পষ্টতই পূর্ব-ভারতীয়, এবং সেই হেতু পর্তমান প্রসঙ্গের অন্তর্ভুক্ত। এ-ক্ষেত্রেও তালিকা শেষে তারিখ সম্বন্ধে প্রয়োজনানুরূপ আলোচনা আছে।
চিত্রাঙ্কনের রীতিপদ্ধতি সম্বন্ধে গ্রন্থকার যে আলোচনা করেছেন এবং সে-প্রসঙ্গে যে-সব নিদর্শন উদ্ধার করেছেন তা পূর্ণাঙ্গ ও যথাযথ তাতেও কিছু নূতন তথ্যের পরিচয় পাওয়া যায়।
স্থাপত্যশিল্প
ধর্মকর্ম অধ্যায়ের সংযোজনে বর্ধমান জেলায় পানাগড়ের কাছে ভরতপুর গ্রামে যে বৌদ্ধ স্তূপটির ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে, তার কথা ইতিপূর্বেই বলেছি। এযাবৎ আমরা যতদূর জানি, এই স্তূপটিই প্রাচীন বাঙলার আদিতম স্তূপ। স্তূপটির পাটাতনটিই শুধু অবশিষ্ট আছে, উপরিভাগের আর যা কিছু সবই মাটির ধূলায় মিশে গেছে। সুতরাং কী ছিল অণ্ডের, হর্মিকের ও ছত্রাবলীর আকৃতি-প্রকৃতি কিছুই আজ আর বলবার উপায় নেই। গোলাকৃতি পাটাতনটি দাড়িয়ে আছে একটি সমাচতুষ্কোণ ভিতের উপর; ভিতটির প্রত্যেকটি দিকে পাঁচটি করে রথ বা Projection, অর্থাৎ এটি একটি পঞ্চরথভৃপ যার সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটেছে ওড়িশার রত্নগিরির ধ্বংসাবশেষের ভেতর। ভিত ও পাটাতন তৈরি হয়েছিল ইটের উপর ইট সাজিয়ে, গেঁথে গেঁথে; বোধ হয় সমস্ত স্তূপটিই ছিল ইটের তৈরি। পাটাতন-কুলুঙ্গির প্রস্তর বুদ্ধ-প্রতিমাগুলির শিল্পশৈলী ও স্তূপটির গঠনরীতি ও রূপ দেখে মনে হয়, স্তূপটি নির্মিত হয়েছিল নবম শতকের কোনও is GTI (Excavations at Bharatpur, by S. N. Samanta in Burdwan University Souvenir, 1980)।
ইতিমধ্যে বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া জেলায় যে বেশ কয়েকটি রেখবর্গীয় দেবায়তনের খবর জানা গেছে, তার কথা ইতিপূর্বেই বলেছি। অধিকাংশ মন্দির ইটের তৈরি, কিন্তু দু’একটি পাথরের মন্দিরও আছে। এ-গুলি সম্বন্ধে স্থাপত্যশিল্পের দিক থেকে নূতন কিছু বলবার নেই; সবই রেখবর্গীয় মন্দির-শিল্পের স্থানীয় ক্ষুদ্রতর সংস্করণ। তবু, এ-সমস্তই তথ্য হিসেবে জ্ঞাতব্য। এমন কয়েকটি মন্দিরের প্রতিলিপি চিত্ৰ-সংগ্রহে মুদ্রিত হ’লো। মন্দিরগুলি সবই দশম-একাদশ-দ্বাদশ শতকীয় বলে অনুমান হয়।
এ-গ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণ যখন প্রকাশিত হয় তখন সুবিস্তৃত তেলকুপীগ্রামের অবস্থিতি ছিল বিহারন্তর্গত মানভূম জেলার রঘুনাথপুর থানার অধীনে। ১৯৫৬ খ্ৰীষ্টাব্দে রঘুনাথপুর থানা তেলকুপীসহ চলে এলো পশ্চিমবঙ্গে, পুরুলিয়া জেলায়। পাল-সম্রাট রামপাল (আ, ১০৬৯-১১২২) যখন কৈবৰ্তরাজ ভীমের হাত থেকে বরেন্দ্ৰ পুনরুদ্ধার করেন তখন তাঁর অনেক ‘সামন্ত-মহাসামন্ত তাকে সাহায্য করেছিলেন; এঁদের মধ্যে একজন ছিলেন তৈলকল্পীর রুদ্রশিখর। বর্তমান তেলকুপী প্রাচীন তৈলকল্পীর ভ্ৰষ্টরূপ এ-সম্বন্ধে সন্দেহের অবকাশ নেই; তেলকুপী-পাঞ্চের্ট (পঞ্চকোট) অঞ্চল এখনও শিখরভূম, অর্থাৎ শিখর রাজবংশের অঞ্চল বলেই পরিচিত। দশম থেকে ত্ৰয়োদশ শতক পর্যন্ত এই শিখরভূমের রাজধানী তেলকুপী স্মার্ত-পৌরাণিক ব্রাহ্মণ্য পঞ্চদেবতা পূজার এবং আঞ্চলিক ভাস্কর্য ও স্থাপত্য শিল্পের, বিশেষভাবে স্থাপত্য শিল্পের একটি জনপ্রিয় প্রসিদ্ধ কেন্দ্র ছিল। এ-গ্ৰন্থ যখন রচিত হচ্ছিল, তখন আমি সে-সব প্রত্নসাক্ষ্য প্রত্যক্ষ করেছিলাম। আজ এ—গ্রন্থের বর্তমান সংস্করণ যখন প্রকাশিত হচ্ছে তখন সে-সব প্রত্নসাক্ষ্যের কিছুই আর লোকচক্ষুর গোচরে নেই। প্রায় ২৫/২৬টি মন্দির তাদের ধ্বংসাবশেষের বিভিন্ন অবস্থায় তখনও ইতস্তত দাড়িয়েছিল, প্রাচীন ঐশ্চর্য ও গৌরবের মূক সাক্ষী হিসেবে। আজ পাঞ্চেটি বা পঞ্চকোটে দামোদর নদের যে বিরাট বাঁধ তৈরি হয়েছে তার ফলে সমস্তই ডুবে গিয়েছে দামোদরের গভীর জলের নীচে। একটি মন্দিরের চূড়াও আজ আর দেখা যায় না; কিছু যে এখানে কখনও ছিল এমনও মনে হয় না। ভারতীয় প্রত্নতত্ত্বানুসন্ধান বিভাগ যখন জানলেন, তেলকুপীর সলিল-সমাধি রচিত হচ্ছে তখন আর এই বিপুল প্রত্নসাক্ষ্যকে রক্ষা করবার কোনও উপায়ই অবশিষ্ট ছিল না।
