মৃৎশিল্প
চন্দ্ৰকেতুগড়ে ও ময়নামতী-লালমাই পাহাড়ে প্রত্নখননের ফলে এবং তাম্রলিপ্তের সুবিস্তীর্ণ সমতলে প্রত্নানুসন্ধানের ফলে অগণিত পোড়ামাটির ছাচে ঢালা ফলক ও হাতে গড়া নানা শিল্পনিদৰ্শন আবিষ্কৃত হয়েছে, তবে হাতে-গড়া নিদর্শন সংখ্যায় বেশি নয়। তাম্রলিপ্ত ও চন্দ্ৰকেতুগড়ে যা পাওয়া গেছে, শিল্পশৈলীর উপর নির্ভর করে সাধারণ ভাবে বলা যায়, তা সবই নির্মিত হয়েছিল খ্ৰীষ্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে শুরু করে খ্ৰীষ্টীয় পঞ্চম শতকের ভেতর, তবে অধিকাংশই, দশভাগের আট ভাগ, কি তারও বেশি, খ্ৰীষ্টপূর্ব প্রথম থেকে খ্ৰীষ্টীয় তৃতীয় শতাব্দীর ভেতর, অর্থাৎ তথাকথিত শুঙ্গ-শক-কুষাণ আমলে, বিশেষ ভাবে খ্ৰীষ্টীয় দ্বিতীয়-তৃতীয়-চতুর্থ শতকে, যখন এই দুই সামুদ্রিক বন্দরে ভারত-রোম বাণিজ্যের সমৃদ্ধ বিস্তার ও তার আনুষঙ্গিক নাগরিকতার গভীর প্রভাব। ফর্ম বা রূপে হয়তো তেমন নয়, কিন্তু কনটেনট বা বিষয়বস্তুতে এ-দুয়েরই প্রভাব কিছুতেই দৃষ্টি এড়াবার কথা নয়, না চন্দ্ৰকেতুগড়ে, না তাম্রলিপ্ততে। গ্রন্থের শেষে মৃৎশিল্পের যে-সব প্রতিলিপি মুদ্রিত হয়েছে তার ভেতরও অনেক নিদর্শন আছে যাতে এ-প্রভাব সুস্পষ্ট। চিত্র-পরিচিতিতে তার ইঙ্গিত রাখতে চেষ্টা করবো। বেশ কিছু ফলকের শীর্ষদেশে বা পেছনে উপরের দিকে এক বা একাধিক ছিদ্র থেকে অনুমান হয়, ফলকগুলির ব্যবহার হতো ঘরের দেয়াল বা কুলুঙ্গী সাজাবার জন্য, এবং সে সব ঘর তাম্রলিপ্ত ও চন্দ্ৰকেতুগড়ের (Gange বন্দরের?) নাগরিকদের। এ-গ্রন্থের প্রথম সংস্করণেই বলেছিলাম, নূতন আবিষ্কারগুলো দেখে আবার বলছি, এ-যুগের, অর্থাৎ শুঙ্গান্ত শক-কুষাণ আমলের (প্রথম থেকে প্রায় চতুর্থ খ্ৰীষ্টীয় শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত) মৃৎফলকগুলির বিষয়বস্তুতে, অলংকরণে, কেশবিন্যাসে, পরিধেয়-বিন্যাসে এবং সাধারণ ভাবে ও রূপে যে রুচির পরিচয় স্বপ্ৰকাশ তা স্পষ্টতই নগর রুচি, কৃষিজীবী বা ছোট কারুজীবী গ্রামবাসীর গ্রামীণ রুচি নয়। এই নগর রুচিই গুপ্ত আমলের মৃৎশিল্প পর্যন্ত বিস্তৃত।
তবে, সপ্তম-অষ্টম শতকের পাহাড়পুরের এবং অষ্টম-নবম দশম শতকের ময়নামতীর মৃৎশিল্প নিদর্শনগুলি সদ্যোক্ত মৃৎশিল্পের সমগোত্রীয় নয়; ভাবে, রূপে ও রীতিতে পাহাড়পুর ও ময়নামতীর মৃৎশিল্পের চরিত্র ভিন্নতর। কী শিল্পীরূপে কী বিষয়বস্তুতে এদের উপর লোকায়ত জীবনের প্রতিফলন সুস্পষ্ট, তা পাহাড়পুরের বর্ণনাত্মক শিল্পেই হোক বা ময়নামতীর স্থাপত্যালংকরণে পশুপক্ষীর বিচিত্ৰ কল্পিত শিল্পীরূপেই হোক। স্মরণ রাখ, ভালো যে, এই শিল্পদ্রব্যগুলি ব্যবহৃত হয়েছিল বাণিজ্য-নগরে গৃহের শোভাবর্ধনের জন্য নয়, দু-টি বৌদ্ধ ধর্মপ্ৰতিষ্ঠানের মন্দির-বিহারের প্রাচীর সজ্জার জন্য।
মৌর্য-পর্বের মৃৎশিল্প নিদর্শন স্বল্প হলেও কিছু কিছু পাওয়া গেছে তাম্রলিপ্ত ও চন্দ্ৰকেতুগড় উভয় জায়গা থেকেই। আবক্ষ যক্ষিণী মূর্তির মুখাবয়ব ও তার গড়ন, তার মোটা ও ভারী কনের গয়না এবং তার পর্যাপ্ত কেশদামের বিন্যাস অনিবার্য ভাবে প্রাচীন পাটালীপুত্রের ধ্বংসাবশেষ থেকে আহৃত যক্ষিণী মূর্তিগুলির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ঠিক শুঙ্গ আমলের নয়। কিন্তু কেশবিন্যাসে, শিরোভূষণে, অলংকরণে শুঙ্গ লক্ষণযুক্ত প্রচুর ব্যক্ষিণী মূর্তি আহৃত ও আবিষ্কৃত হয়েছে। এ দু-জায়গা থেকেই। ভূষণালংকারের প্রাচুর্য, যৌনপ্রতীকের প্রাধান্য ও কোনও কোনও ফলকে শস্য বা মাছের প্রতীকের ব্যবহার থেকে স্বভাবতই মনে হয়,শ্ৰীষ্টীয় দ্বিতীয়-তৃতীয় শতকের এই ফলকগুলি প্রায়শ প্রজনন-শক্তির, প্রাচুর্যের, শ্ৰী বা লক্ষ্মীর প্রতীক বলেই গণ্য করা হতো। কোনও কোনও ফলকে পুরুষ ও নারীর পরিধেয় বিন্যাসের রীতি গন্ধার শিল্পের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, আবার কোনও কোনও ফুলকে পুরুষের দেহের গড়ন ও দেহভঙ্গি স্মরণ করিয়ে দেয়। কুষাণ-শিল্পের কথা বা উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের গ্রেকো-রোমান শিল্পের কথা। তাম্রলিপ্তের অনেক ফলকে গ্রেকো-রোমান শিল্পের প্রভাব অত্যন্ত স্পষ্ট, আর চন্দ্রকেতুগড়ে পদযুগল-সহ যে-পাদুকা জোড়ার মৃৎপ্রতিলিপিটি পাওয়া গেছে তা যে গ্রেকো-রোমান তাতে সন্দেহ করবার কোনও কারণ নেই, পদযুগলটি যারই হোক। বস্তুত, এ-দুই বন্দরের ধ্বংসাবশেষের ভেতর কুষাণ-আমলের, অর্থাৎ দ্বিতীয়-তৃতীয় শতকের অসংখ্য মৃৎফলকে মথুরা অঞ্চলের শিল্পীরূপের প্রভাবের চেয়েও গন্ধার অঞ্চলের শিল্পের প্রভাব যেন বেশি সক্রিয় বলে মনে হয়। তাম্রলিপ্তে কয়েকটি ফলক পাওয়া গেছে যার বিষয়বস্তু বৌদ্ধ জাতকের গল্প থেকে নেওয়া হয়েছে, এবং একটি মৃৎভাণ্ড পাওয়া গেছে যার স্কন্ধগাত্র ঘিরে ধারাবাহিকতায় রামায়ণের একটি কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে। জাতক-ফলকগুলি নিঃসন্দেহে খ্ৰীষ্টীয় প্রথম-দ্বিতীয় শতকের, কিন্তু মৃৎভাণ্ডের নিচু রিলিফটির শিল্পীরীতি দেখে মনে হয়, ভাণ্ডটি একাদশ-দ্বাদশ শতকের আগে তৈরি হয়নি, যখন বন্দর হিসেবে তাম্রলিপ্তের অস্তিত্ব আর কিছু ছিল না। অষ্টম-নবম-দশম শতকীয় ময়নামতীর মৃৎশিল্প সম্বন্ধে নূতন করে বলবার কিছু নেই; এ-শিল্প মোটামুটি ভাবে পাহাড়পুরের সমসাময়িক মৃৎশিল্পেরই অনুরূপ। তবে, একটি নিদর্শনের প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যেতে পারে; এই ফলকটি পাওয়া গেছে ময়নামতীর শালবন-বিহারের ধ্বংসাবশেষের ভেতর থেকে, এবং এতে রূপায়িত হয়েছেন হয় কোনও বোধিসত্ত্ব অথবা কোনও রাজকুমার। প্রচুর অলঙ্কারশোভিত, কুঞ্চিত ও দুল্যমান কেশদামযুক্ত, মুকুটপরিহিত, সুঠাম ও সুমণ্ডিতদেহ এই নরমূর্তিটি নবম শতকীয় প্রস্তর-ভাস্কর্যেরই মৃৎশিল্পানুবাদ বা প্রতিরূপ ՀԱՀ।।
