প্রাচীন বাঙলা ও বহির্ভারতের মন্দির
পাহাড়পুর-মন্দিরের সঙ্গে বহির্ভারতের পাগান, লোরো-জোংরাং প্রভৃতি স্থানের কোনও কোনও শ্রেণীর মন্দিরের সমগোত্রীয়তার কথা বলিয়াছি। কিন্তু শুধু পাহাড়পুর-মন্দিরই নয়। প্রাচীন বাঙলার যে কয়েকটি রূপ ও রীতির মন্দিরের কথা কিছু আগে বলিয়াছি সে-সব রূপ ও রীতির মন্দিরের সঙ্গে বহির্ভারতের বিশেষভাবে ব্ৰহ্মদেশের এবং যবদ্বীপের অনেক মন্দিরের একটা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা কিছুতেই অস্বীকার করা যায় না। সে-সব মন্দিরের তুলনা করিলে প্রাচীন বাঙলার মন্দিরগুলির আকৃতি-প্রকৃতিও অনেকটা পরিষ্কার হইতে পারে। যে ক্রমহ্রস্বায়মান ঢালু। চালের ভদ্র বা পীড় রীতির মন্দিরের কথা আগে বলিয়াছি, ব্ৰহ্মদেশে এই রীতি এক সময়ে সুপ্রচলিত ছিল এবং পরেও সমস্ত মধ্যযুগ জুড়িয়া কাঠে ও ইটে, বেশির ভাগ কাঠে, এই ধরনের ‘পায়াথাট’ বা প্রাসাদ-মন্দির প্রচুর নির্মিত হইত। পাগানের আনন্দ-মন্দিরের অনেকগুলি প্রস্তরফলকে পঞ্চস্তলে, সপ্ততিলে, এই ধরনের মন্দির উৎকীর্ণ আছে। এই পাগানেরই বিদগ তাইক (ত্রিপিটক)–মন্দির ও মিমালাউং চ্যঙ্গ মন্দির (একাদশ ও দ্বাদশ শতক) এই ধরনের মন্দিরের সুস্পষ্ট নিদর্শন। ক্ষুদ্রাকৃতি এবং একটি মাত্র পাথরে তৈরি এই ধরনের মন্দির যবন্দ্বীপের চণ্ডী-পানাতরমের প্রাঙ্গণে দুই চারিটি আজও বিদ্যমান। বলিদ্বীপে ও ব্রহ্মদেশে তো এই ধরনের ভদ্র বা পাড় দেউল আজও নির্মিত হয়, তবে সাধারণত কাঠের। এই ভদ্র বা পাড় শ্রেণীর মন্দির ছাড়া চতুষ্কোণ গৰ্ভগৃহের উপর স্তূপ বা শিখর শীর্ম ভদ্র বা পীড় দেউল তো প্রাচীন ব্ৰহ্মদেশের চিত্তই হরণ করিয়াছিল বলিয়া মনে হয় এবং তাহা প্রায় ষষ্ঠ-সপ্তম শতক হইতেই। প্রোম-হমজার ষষ্ঠ-সপ্তম শতকীয় বেৰে, লমে’থনা, ইয়াহানাদা-প্ত প্রভৃতি মন্দির হইতে আরম্ভ করিয়া পাগানের একাদশ-দ্বাদশ শতকীয় স্তূপশীর্ষ পাটো থাম্মা ও অভয়দান এবং শিখর শীর্ষ আনন্দ, সর্বজ্ঞ, থিটুসোয়াদা, টিহু-লো-মিনহ-লো মন্দির পর্যন্ত সমস্তই এই ধরনের দেউলের সউজ্জল নিদর্শন। তাহা ছাড়া, হামজা ও পাগানের প্রচুর মুৎ ও প্রস্তুর-ফলকে এই ধরনের মন্দিরের উৎকীর্ণ নিদর্শন বিদ্যমান। যবন্দ্বীপের স্তূপশীর্ষ চণ্ডা-পাওন মন্দিরও এই রীতিরই অন্যতম নিদর্শন। বলা বাহুল্য, প্রাচীন প্রাচ্যদেশ, বিশেষভাবে প্রাচীন বাঙলাদেশই এই সব বহির্ভারতীয় প্রচেষ্টার মূল অনুপ্রেরণা।
উপরোক্ত চারিপ্রকারের মন্দিরশৈলী ছাড়া খননবিষ্কারের ফলে প্রাচীন বাঙলার আরও কয়েকটি এমন মন্দিরের অস্তিত্ব জানা যায় যাহা কোনও শ্রেণী-চিহ্নে চিহ্নিত করা যায় না। এই মন্দিরগুলির যে কিছু সুস্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায় এমন নয়; তবু ইহাদের কথা না বলিলে মন্দির-কাহিনী অসম্পূণ থাকিয়া যায়। দিনাজপুর জেলার বৈগ্রামের যে-মন্দিরটির ধ্বংসাবশেষ বিদ্যমান সে-মন্দিরটি বোধ হয় ৪৪৮-৪৯ খ্রী তারিখের গুপ্তপট্টোলীকথিত শিবানন্দী-মন্দির। ভূমি-নকশা হইতে মনে হয়, ইহার গর্ভগৃহ ছিল চতুষ্কোণ এবং চারিদিক ঘিরিয়া ছিল প্ৰদক্ষিণ-পথ; পশ্চিম দিকে ছিল ইহার প্রবেশ তোরণ। চালের কী যে ছিল রূপ বলিবার কোনও উপায় নাই। গুপ্ত-আমলের এক ধরনের মন্দিরে যে প্রদক্ষিণ-পথযুক্ত চতুষ্কোণ গৰ্ভগৃহ এবং সমতল চালের রীতি প্রচলিত দেখা যায়, এই মন্দিরটি সেই রীতির হওয়া বিচিত্র নয়। মহাস্থানের আশে পাশেও দুই চারিটি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ দেখিতে পাওয়া যায়। এখানকার বৈরাগী-ভিটায় পাল-আমলের দুইটি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ বিদ্যমান; ইহাদের মধ্যে একটির ভূমি-নকশা যে প্রাচীন বাঙলার সুঅভ্যস্ত ও সুপরিচিত প্রসারিত চতুষ্কোণ, এ-সম্বন্ধে সন্দেহু নাই। মহাস্থানের গোবিন্দ-ভিটায়ও কয়েকটি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ দৃষ্টিগোচর; ইহাদের মধ্যে কয়েকটি মন্দির গুপ্ত-আমলের হওয়াও অসম্ভব নয়; কিন্তু আজ আর ইহাদের মৌলিক রূপ সম্বন্ধে কিছুই বলিবার উপায় নাই। এই স্থানেরই গোকুল-পল্লীতে, সুবৃহৎ মোড়স্তাপে এক সময় একটি অতিকায় মন্দির প্রতিষ্ঠিত ছিল। খনানাবিষ্কারের ফলে আজ শুধু তাহার ভিত্তিভূমির কতকটা পরিচয় পাওয়া যায়। এই ভিত্তিভূমির বিন্যাস ঠিক একটি মাকড়সার জালের মতন করিয়া বোনা অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চতুষ্কোণ কোষকক্ষের সমষ্টি মাত্র। একটু মনোযোগে বিশ্লেষণ করিলে বুঝিতে দেরী হয় না যে, এই কোযকক্ষের জালের পরিকল্পনা শুধু বৃহৎ পরিকল্পনার একটি মন্দিরের ভিত্তিভূমিকে দৃঢ় করিয়া গড়িবার জন্য। মন্দিরটির ভূমি-নকশা শুধু ধরা যায়, আর কিছুই বিদ্যমান নাই। বহু বাহুবিশিষ্ট এই ভূমি-নকশার বহু কোণ এবং ইহাদের মধ্যে বিধৃত একটি সুবৃহৎ বৃত্ত। এই বৃত্তের চারিপাশ ঘিরিয়া নিরেট চারিটি সুপ্ৰশস্ত দেয়াল এবং এই দেয়াল চারিটির উপরই ছিল মন্দিরটির স্থাপনা। দেয়াল এবং বৃত্তের ফাক ভরাট করা হইয়াছে, সমান্তরালে দেয়ালের পর দেয়াল গাথিয়া এবং মাটি ভরাট করিয়া। এ-সমস্তই যে মন্দিরটির ভিত্ সুদৃঢ় করিয়া গড়িবার জন্য তাঁহাতে সন্দেহ নাই। কিন্তু এই সুবৃহৎ মন্দিরের কী যে ছিল আকৃতি-প্রকৃতি, তাহা বুঝিবার এতটুকু উপায় আজ আর নাই।
সমসাময়িক ওড়িশার ভুবনেশ্বরে বা পুরী-কোেনারকে বা মধ্য-ভারতের খাজুরাহোতে, ব্ৰহ্মদেশের পাগানে বা ব্যবদ্বীপের প্রাস্বনাম-পানাতরমে, কাম্বোজের অঙ্কোর-থোমে বা দক্ষিণ-ভারতের কাঞ্চীপুরে বা অন্যত্র যে সুবিস্তৃত মন্দির-নগরীর কথা আমরা জানি, প্রাচীন বাঙলার কোথাও সে ধরনের সুবিস্তৃত মন্দির-নগরীর পরিচয় পাইতেছি না। প্রত্নসাক্ষ্যই হোক আর সাহিত্য বা লিপি-সাক্ষ্যই হোক, সমস্ত সাক্ষ্যেরই ইঙ্গিত যে বিচ্ছিন্ন দুই চারিটি মন্দিরের দিকে এবং সে-মন্দিরও খুব বৃহদায়তন নয়। বস্তুত, এক পাহাড়পুর এবং গোকুলের মন্দির দুটি এবং হয়তো আরও দুই চারিটি ছাড়া বৃহৎ কল্পিত, বিস্তৃতায়তন মন্দিরের কথা বড় একটা জানা যায় না, অন্তত প্রত্নসাক্ষ্যে তেমন প্রমাণ নাই। মনে হয়, অধিকাংশ মন্দিরই ছিল স্বল্পায়তন। বস্তুত, প্রাচীন বাঙলায় স্থাপত্যের ক্ষেত্রে বৃহৎ দুঃসাহসী কল্পনা-ভাবনা, বৃহৎ কর্মশক্তি বা গভীর গঠন-নৈপুণ্যের পরিচয় খুব বেশি নাই; গ্রাম্য কৃষিনির্ভর জীবনে সে-সুযোগও ছিল স্বল্পই। প্রাচীন বাঙলায় স্থাপত্যেই শুধু নয়, ভাস্কর্য ও চিত্রকলার ক্ষেত্রেও প্রাচীন বাঙালী খুব বৃহৎ দুঃসাহসী কল্পনা-ভাবনার দিকে কোথাও অগ্রসর হয় নাই, খুব প্রশস্ত ও গভীর গঠনকর্মে নিজের প্রতিভাকে নিয়োজিত করে নাই। ইহার কারণ দুর্বোধী নয়। তাহার কৃষিনির্ভর জীবনের অর্থসম্বল ছিল পরিমিত, চিত্তসমৃদ্ধি ছিল ক্ষীণায়ত এবং বৃহৎ গভীর দুঃসাহসী জীবনের গভীর ও ব্যাপক উল্লাসের কোনও গভীর ও প্রশস্ত স্পশ সে জীবনে লাগে নাই। কাজেই শিল্পেও সে পরিচয় নাই।
০৮. সংযোজন – শিল্পকলা
গত পঁচিশ ত্ৰিশ বছরের ভিতর প্রাচীন বাঙলার নানা জায়গা থেকে পোড়ামাটির প্রচুর ফলক, পাথর ও মিশ্র ধাতুর তৈরি প্রচুর মূর্তি ও প্রতিমা এবং সংখ্যায় বেশ কিছু নূতন সচিত্ৰ পাণ্ডুলিপি আমাদের গোচরে এসেছে। এ-সব নূতন আবিষ্কার তথ্যের দিক থেকে নিশ্চয়ই মূল্যবান, এবং সেই হেতু আমাদের জ্ঞাতব্য। এই কারণেই গ্ৰন্থ-শেষের চিত্র-সংগ্রহে দেখা যাবে, মাত্র কয়েকটি পুরাতন নিদর্শন ছাড়া আর যত শিল্প-নিদর্শন ছাপা হয়েছে তা সবই প্রায় নূতন আবিষ্কার; শুধু তাই নয়, এ-সব নিদর্শনের অধিকাংশ এখনও সর্বজনের গোচরে আসেনি। কিন্তু কোনও আবিষ্কার, কোনও তথ্যই এমন নয় যে, গ্রন্থের প্রথম সংস্করণে বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-প্রকাশিত History of Bengal, vol. 1-3 real exists firsfrégis &fs2.itis (R-Kists (sett বলেছিলাম , যে-রেখাঙ্কন করেছিলাম, রূপ (form) ও প্রসঙ্গের (content-র) যে-বৰ্ণনা ও ব্যাখ্যা দিয়েছিলাম তাতে কিছু সংশোধন বা পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে। যা কিছু নূতন তথ্য জানা গেছে তা শুধু আগেকার বক্তব্যের পরিপূরক মাত্র। তবে, তথ্যমাত্র হলেও মৃৎশিল্পে, ধাতব প্রতিমাশিল্পে এবং চিত্রশিল্পে গত পঁচিশ-ত্রিশ বছরে গুণে ও পরিমাণে অর্থবহ এমন নূতন তথ্য আবিষ্কৃত হয়েছে যে, অন্তত এ-তিনটি বিষয় কিছু কিছু সংযোজন প্রয়োজন মনে করছি। স্থাপত্যশিল্প সম্বন্ধেও হয়তো দু-চার কথা বলা প্রয়োজন হতে পারে।
