১. প্রথমোক্ত রীতির, অর্থাৎ, ভদ্র বা পীড় দেউল যে প্রাচীন বাঙলার সুপ্রচুর ছিল তাহার কিছুটা আভাস পাওয়া যায় অগণিত প্রস্তরফলকে উৎকীর্ণ মন্দিরের প্রতিকৃতিগুলিতে। এই রীতির প্রাথমিক রূপটি দেখিতেছি ঢাকা আশ্রফপুরে প্রাপ্ত সপ্তম শতকের ব্রোঞ্জনির্মিত একটি ফলকে। চারিটি খাজকাটা কাঠের স্তম্ভের উপর ঢালু ক্রমহ্রস্বায়মান দুটি চাল, তাহার উপর সুন্দর একটি চূড়া। ইহাই এই রীতির মন্দিরের মূল রূপ; এই রূপই ক্রমশ আরও সমৃদ্ধ এবং জটিল হইয়াছে। একটি একটি করিয়া ঢালু চালের সংখ্যা গিয়াছে বাড়িয়া, সর্বোচ্চ চালটির উপর চূড়ার নীচেই গ্ৰীবাদেশের গোলাকৃতি আগুটি ক্রমশ আমলক শিলায় বিবর্তিত হইয়াছে, এবং গ্ৰীবানিম্নের চালটির (ঘােড়চক্রের) চারিকোণে চারিটি ঝম্পসিংহ-মূর্তির অলংকরণ সংযোজিত হইয়াছে। ভূমি-নকশা সাধারণত চতুষ্কোণ রথাকৃতি; প্রত্যেক দিকের বিলন্বিত রেখাটি কেন্দ্রীয় অংশটির সম্মুখ দিকে বাড়াইয়া দিয়া রথের আকৃতি দান করা হইয়াছে। এই ধরনের রথাকৃতি ভূমি-নকশায় উপর দুই বা ততোধিক ঢালু ক্রমহ্রস্বায়মান চালের মন্দির, মধ্যযুগের বাঙলাদেশেও সুপ্রচলিত রীতি ছিল, সন্দেহ নাই। ষোড়শ-সপ্তদশ শতকের অনেক মৃৎফলকে এই ধরনের মন্দিরের প্রতিকৃতি বিদ্যমান। প্রায় সমসাময়িক কালের ইষ্টকনির্মিত এই রীতির মন্দিরের একাধিক নিদর্শন (যেমন বাঁকুড়া জেলার এক্তেশ্বর মন্দিরের নদীমণ্ডপ)। আজও দৃষ্টিগোচর। লোকায়ত বাঙলার দ্বিতল বা ত্রিতল খড়ের চালের রূপ হইতেই যে এই রীতির উদ্ভব, তাহাঁতে সন্দেহের কোনও কারণ নাই। যাহাই হউক, প্রাচীনতর রূপের বিবর্তনের বিভিন্ন স্তর একমাত্র প্রস্তর-ফলকে উৎকীর্ণ প্রতিকৃতি-চিত্রেই দৃষ্টিগোচর; মন্দিরাবশেষ কিছু নাই বলিলেই চলে। হিলিতে প্রাপ্ত এবং ঢাকা-সাহিত্য-পরিষদে রক্ষিত কল্যাণ-সুন্দর শিবমূর্তির ফলকে, চব্বিশ পরগণা-কুলদিয়ার এবং রাজশাহীর-বরিয়ার সূর্যমূর্তির ফলকে, বিক্রমপুরের রত্নসম্ভব-মূর্তির ফলকে, ঢাকা-মধ্যপাড়ার বুদ্ধমূর্তি-ফলকে, বিরোলের উমা-মহেশ্বর প্রতিমা-ফলকে, এবং রাজশাহী-কুমারপুরের একটি সুবৃহৎ প্রস্তরখণ্ডের উপর উৎকীর্ণ প্রতিকৃতিতে এই রীতির মন্দিরের বিবর্তনের বিভিন্ন স্তরগুলি ধরিতে পারা খুব কঠিন নয়।
২. দ্বিতীয়োক্ত রীতির অর্থাৎ রেখা বা শিখরা-দেউলের সর্বপ্রাচীন নিদর্শন বোধ হয় বর্ধমান-বরাকরের ৪ নং মন্দিরটি। এই মন্দিরটি পাথরে তৈরি, নিচু ভিতের উপর গর্ভগৃহটি অপেক্ষাকৃত উচ্চ, এবং গর্ভগৃহের উপর খর্বাকৃতি একটি রেখা বা শিখরের চাল। গোড়া হইতেই শিখরের ক্রমবিক্ৰ রেখাটি উপরের দিকে উঠিয়া গিয়াছে; শিখরের উপর একটি বৃহৎ আমলক-শিলা। শিখরের পগ রেখাগুলি সুতীক্ষ্ণ ও সুকঠোর সারল্যে নিয়ন্ত্রিত। স্থাপত্যরূপের দিক হইতে এই মন্দিরটি ভুবনেশ্বরের পরশুরামেশ্বর মন্দিরের সমকালীন, অর্থাৎ অষ্টম শতকীয়।
এই রেখা-দেউলের বিবর্তনের পরবর্তী স্তরটি ধরা পড়িয়াছে তিনটি ক্ষুদ্রায়তন নিবেদন-মন্দিরে; এই তিনটির দুইটি পাথরে তৈরি (একটি দিনাজপুরে এবং আর একটি রাজশাহী নিমদীঘিতে প্রাপ্ত), তৃতীয়টি ব্রোঞ্জে গড়া (এবং চট্টগ্রাম জেলার ঝেওয়ারীতে পাওয়া)। আকৃতি-প্রকৃতি এবং বিবর্তনের দিক হইতে এই তিনটিই সমকালীন, সন্দেহ নাই। রেখাকৃতি ভূমি-নকশার উপর গর্ভগৃহ; গর্ভগৃহের চারদিকে চারিটি ত্ৰিবলীতে তোরণা বা কুলুঙ্গি; চালে ক্রমবিক্ৰাকৃতি শিখর এবং শিখরের শীর্ষে সংকীর্ণ গ্ৰীবার উপর আমলক। বিবর্তনের এই স্তরেও পগরেখা তীক্ষ ও সরল, তবে শিখরের অঙ্গে চৈত্য-গবাক্ষের অলঙ্কার। পাথরের নিদর্শন দুইটিতে গর্ভগৃহ ও শিখরের মাঝখানে দুই বা তিনস্তরে মণ্ডনায়িত রেখা, কিন্তু ব্রোঞ্জ-নিদর্শনটিতে তাহা নাই।
বিবর্তনের তৃতীয় স্তরে প্রায় চারি পাঁচটি ভগ্ন ও অর্ধভগ্ন নিদর্শন বিদ্যমান— বর্ধমানের সিদ্ধেশ্বর-মন্দির, বাঁকুড়া জেলার দোহার-গ্রামের পাথরে তৈরি সরেশ্বর ও সল্লেশ্বর-মন্দির, এবং সুন্দরবনের জটার-দেউল। প্রথম চারিটি মন্দিরের অত্যন্ত ভগ্নদশা; পঞ্চম মন্দিরটির এমন সংস্কার-সংরক্ষণ করা হইয়াছে যে, ইহার মূল আকৃতি-প্রকৃতিই গিয়াছে বদলাইয়া। এই মন্দিরগুলি ভূমি-নকশা, গর্ভগৃহ, শিখর ও অলংকরণ প্রভৃতির বিশ্লেষণ করিলে সহজেই ধরা পড়ে, সদ্যোক্ত শিখরাকৃতি নিবেদন-মন্দিরগুলির সঙ্গে ইহাদের মৌলিক পার্থক্য বিশেষ কিছু নাই, তবে এই মন্দিরগুলি আয়তনে ও অলংকরণে আরও সমৃদ্ধতির, আকৃতি-প্রকৃতিতে আরও জটিলতর। মৌলিক পার্থক্যের মধ্যে শুধু দেখিতেছি, শিখরের পগরেখাগুলির তীক্ষ্ণতা মার্জনা করিয়া একটু গোলাকার করিয়া দেওয়া হইয়াছে। তাহার ফলে সমগ্র শিখরটিরই আকৃতি হইয়া পড়িয়াছে খানিকটা গোলাকার। তাহা ছাড়া, মূল শিখরের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষুদ্রাকৃতি শিখরালংকারে সজা সংযোজিত হইয়াছে এবং প্রবেশ তোরণের দিকে একটি অলিন্দও যোগ করা হইয়াছে। দেউলিয়ার মন্দিরটি বোধ হয়। পাচটির মধ্যে সর্বপ্রাচীন এবং ইহার কিছুকাল পরেই বহুলাড়ার সিদ্ধেশ্বর-মন্দির। এই দুইটি মন্দিরেই শিখরের পগরেখা গর্ভগৃহের ভূমি পর্যন্ত আলম্বিত এবং রেখার তীক্ষতা মার্জিত ও গোলায়িত। বহুলাড়ার সিদ্ধেশ্বর-মন্দিরটির গর্ভগৃহের বহিঃপ্রাচীরে কুলুঙ্গির অলংকার এবং শিখরের কেন্দ্রীয় রথটিতে ক্ষুদ্রাকৃতি শিখরালংকার। এই মন্দির দুটি বোধ হয় দশম-একাদশ শতকীয়৷ দেহারের সরেশ্বর ও সল্লেশ্বর-মন্দির দুইটির গর্ভগৃহের ধ্বংসাবশেষ ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নাই; তবে, গর্ভগৃহের আকৃতি-প্রকৃতি দেখিয়া মনে হয়, এই দুটি মন্দির ও বহুলারার সিদ্ধেশ্বর-মন্দিরের সমসাময়িক। সুন্দরবনের জটার-দেউলটিও বোধ হয় একই কালের, কিন্তু যুক্তিহীন, জ্ঞানহীন সংস্কার ও সংযোজনার ফলে মন্দিরটির মৌলিক রূপ আজ আর কিছু বুঝিবার উপায় নাই। তবে পুরাতন এবং সংস্কারপূর্ব একটি আলোকচিত্র হইতে মনে হয়, এই দেউলটিও অনেকটা সিদ্ধেশ্বর-মন্দিরের মতনই ছিল, তবে শেষোক্ত মন্দিরের শিখরের রেখা বোধ হয় ছিল অপেক্ষাকৃত বেশি বক্ৰ।
