এই চতুঃসংস্থান-সংস্থিত সুবৃহৎ বিহার-মন্দিরটিকে বিপুলশ্রমিত্রের নালন্দা-লিপিতে বিশেষিত করা হইয়াছে বসুধার একতম নয়নানন্দ বলিয়া। খননবিষ্কারের ফলে বিহারটির যে ধ্বংসাবশেষ দৃষ্টিগোচর তাহাতে এই বিশেষণ অত্যুক্তি বলিয়া মনে হয় না। বলা বাহুল্য, এই সুবৃহৎ বিহার একদিনে নির্মিত হয় নাই এবং ইহার প্রায় চারি শতাব্দীর সুদীর্ঘ জীবনে একাধিকবার সংস্কার ও সংযোজনের প্রয়োজনও হইয়াছিল। তবু, এ-তথ্য অনস্বীকার্য বলিয়া মনে হয় যে, গোড়া হইতেই এই বিহারের নকশা, বিন্যাস ও আকৃতি-প্রকৃতি যাঁহারা রচনা করিয়াছিলেন তাঁহাদের বুদ্ধি ও কল্পনায় বিহারটির সামগ্রিক রূপের একটা সুস্পষ্ট ধারণা সক্রিয় ছিল এবং নির্মাণ, সংস্কার ও সংযোজনকাল বা তাহার ফলে সেই রূপটির কোনও ব্যত্যয় ঘটে নাই। তাহা ছাড়া এ-ও মনে হয়, সামগ্রিক নির্মাণ কার্যটি একটানা একবারেই হইয়াছিল, পরবর্তী কালে সংস্কার প্রয়োজন হইলেও সংযোজনের প্রয়োজন বোধহয় বিশেষ কিছু হয় নাই। সূচনায় বিহারের কক্ষগুলি বাসগৃহ রূপেই ব্যবহৃত হইত, সন্দেহ নাই। কিন্তু অধিকাংশ কক্ষের সমৃদ্ধ অলংকরণ দেখিয়া মনে হয়, পরবর্তী কালে আবাসিক ভিক্ষু সংখ্যা কমিয়া যাওয়ায় সেই কক্ষগুলি বোধ হয়। পূজাগৃহ রূপেই ব্যবহৃত হইত।
এই সুবৃহৎ বিহার-মন্দিরের ব্যবস্থা-কর্ম পরিচালনার জন্য একটি দপ্তর ছিল এবং সে দপ্তর-গৃহটি ছিল প্রধান প্রবেশ তোরণের পাশেই। তাল হইতে তলে, কক্ষ হইতে কক্ষে, অঙ্গন হইতে অঙ্গনে জল-নিঃসরণের একটি প্রণালী সুদীর্ঘ পথ বাহিয়া বাহিয়া বিহার-মন্দিরটির সমস্ত জল নিষ্কাশিত করিত বিহার-সীমার ভিতরেই একটি ক্ষুদ্রাকৃতি দীর্ঘিকায়। কক্ষশ্রেণীর মাঝে মাঝে, সুপ্রশস্ত অঙ্গনের নানা স্থানে ছোট ছোট মন্দির, নিবেদন-স্তূপ, কৃপ, স্নানািচমানাগার, অশনস্থান ইত্যাদি ইতস্তত বিক্ষিপ্ত।
নালন্দা, শ্রাবস্তি প্রভৃতি স্থানের সুবৃহৎ বিহার-প্রতিষ্ঠানগুলিও ধ্বংসাবশেষ দেখিলে, মনে হয়, সোমপুর-বিহারটির সাধারণ নকশা ও বিন্যাস ছিল প্রায় একই ধরনের, আদর্শ এবং উদ্দেশ্যও ছিল একই। কিন্তু, সন্দেহ নাই, পাহাড়পুরের মতন সুসমৃদ্ধ, সুবৃহৎ ও সবিন্যস্ত বিহার এ-পর্যন্ত আর কোথাও আবিষ্কৃত হয় নাই; বোধ হয় ছিলও না, অন্তত প্রত্নসাক্ষ্যে বা লিপি ও সাহিত্য-সাক্ষ্যে তাহা জানা যায় না।
০৭. মন্দির স্থাপত্য
লিপি ও সাহিত্য-সংক্ষ্যে জানা যায়, প্রাচীন বাঙলায় মন্দির নির্মিত হইয়াছিল অসংখ্য; কিন্তু একাদশ-দ্বাদশ শতকের কয়েকটি ভগ্ন, অর্ধভগ্ন মন্দির ছাড়া এই অসংখ্য মন্দিরের কিছুই আর অবশিষ্ট নাই। অথচ ভারতীয় স্থাপত্যের ইতিহাসে মন্দিরেই যাহা কিছু বাঙলার বৈশিষ্ট্য। বাঙলার মন্দিরই ব্যবদ্বীপ ও ব্ৰহ্মদেশের বিশিষ্ট মন্দির-স্থাপত্যের মূল প্রেরণা। সমসাময়িক লিপিমালা ও সাহিত্যে প্রাচীন বাঙলার কোনও কোনও মন্দিরের সমৃদ্ধির বর্ণনা দৃষ্টিগোচর; কোনও কোনও মন্দিরের আপেক্ষিক প্রসিদ্ধিও ছিল, সন্দেহ নাই। এমন দুই চারিটি মন্দিরের প্রতিকৃতি দেখা যায় সমসাময়িক পাণ্ডুলিপিচিত্রেী এবং তক্ষণফলকে, যেমন রাঢ়া ও পুণ্ড্রবর্ধনের বুদ্ধ-মন্দির, বরেন্দ্রর তারা-মন্দির, সমতট, বরেন্দ্ৰ, নালেন্দ্র, রাঢ়া এবং দণ্ডভুক্তির লোকনাথ মন্দির। এই সব মন্দিরের প্রতিকৃতির আকৃতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণ করিলে দেখা যায়, প্রাচীন বাঙলায় মোটামুটি চারিটি বিভিন্ন শৈলীর মন্দির-নির্মােণরীতি প্রচলিত ছিল। রীতি ও শৈলীর এই বিভিন্নতা ভূমি-নকশানির্ভর নয়, বস্তুত, প্রত্যেকটি রীতিতেই ভূমি-নকশার যুক্তি ও বিন্যাস প্রায় একই ধরনের। এই বিভিন্নতা প্রধানত গর্ভগৃহের উপরিভাগ অর্থাৎ ছাদ বা চালের রূপ ও আকৃতিনির্ভর। সদ্যোক্ত চারিটি রীতি নিম্নোক্ত ভাবে তালিকা।গত করা যাইতে পারে।
১. ভদ্র বা পীড় দেউল। রীতিতে গর্ভগৃহের চাল ক্রমহ্রস্বায়মান পিরামিডাকৃতি হইয়া ধাপে, ধাপে উপরের দিকে উঠিয়া গিয়াছে। ধাপ বা স্তর সংখ্যায় তিনটি, পাচটি বা সাতটি। সর্বোচ্চ এবং ক্ষুদ্রতম স্তরের উপরে আমলক ও চূড়া। এই ভদ্র বা পীড় দেউলই ওড়িশার রেখা বা শিখর-মন্দির সমূহের সম্মুখভাগের জগমোহন বা ভোগমণ্ডপ।
২. রেখা বা শিখর দেউল। এই রীতিতে গর্ভগৃহের চাল ঈষদবক্ৰ রেখায় শিখরাকৃতি হইয়া সোজা উপরের দিকে উঠিয়া গিয়াছে। শিখরের উপরিভাগে আমলক ও চূড়া। এই রেখা বা শিখর দেউল উত্তর-ভারতীয় এবং ওড়িশার নাগর পদ্ধতির মন্দিরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তায় যুক্ত।
৩. স্তূপযুক্ত পীড় বা ভদ্ৰ দেউল। এই ধরনের দেউলে চালের ক্রমহ্রস্বয়মান পিরামিডাকৃতি স্তরের উপরে একটি স্তূপ। স্তূপটির উপর চূড়া।
৪. শিখরযুক্ত পীড় বা ভদ্ৰ দেউল। এই ধরনের দেউলের চালের ক্রমহ্রস্বায়মান পিরামিডাকৃতি স্তরের উপর একটি শিখর। শিখরের উপর চূড়া।
স্মরণ রাখা প্রয়োজন, এই চার বিভিন্ন রীতির প্রত্যেকটির স্থাপত্য-নিদর্শন আমাদের কালে আসিয়া পৌঁছায় নাই; তৃতীয় ও চতুর্থ রীতির মন্দিরের কোনও নিদর্শন আমরা আজও জানি না, যদিও ঐ ধরনের মন্দির ছিল, এ-সম্বন্ধে সন্দেহ করা চলে না। প্রথমোক্ত রীতির নিদর্শনও জানি, দুয়ে তাহা বলা যায় না, তবে, দ্বিতীয় রীতির মন্দিরের কয়েকটি নিদর্শন আজও দৃষ্টিগোচর।
